Home » রহস্য গল্প » ঘসেটি বেগমের জড়োয়া

ঘসেটি বেগমের জড়োয়া

শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার

রোববারের সকাল। ফেলুদা মন দিয়ে টেলিগ্রাফের ক্রসওয়ার্ড সলভ্ করতে বসেছে। এই একটা ব‍্যাপারে ওর আগ্রহ এখনো কমেনি। বরং ডিকশনারি ছাড়াই বেশ কয়েকবার এর পুরোটা সলভ্ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ঘড়িতে এখন পৌনে ন’টা। আর মিনিট পনেরোর মধ‍্যে জটায়ুর আবির্ভাব হবার কথা। ভদ্রলোক খুব শখ করে একটা স্মার্টফোন কিনে এনে বেজায় বেকায়দায় পড়েছেন। ফেলুদা অবিশ‍্যি নিজে এসব ব‍্যবহার না করলেও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন‍্য এসবের খোঁজ খবর দিব‍্যি রাখে। কাজেই বস্তুটার ব‍্যবহারবিধি শিখতে ফেলুদা ছাড়া ওঁর আর গতি নেই। আমি অবশ‍্য গত জন্মদিনেই ফেলুদার কাছ থেকেই একটা ট‍্যাবলেট উপহার পেয়েছি। কাজেই আজকাল লেখালিখির ব‍্যাপারটা ওতেই সেরে রাখি। আসলে তথ‍্যপ্রযুক্তি আজকে যে ভাবে এগোচ্ছে তাতে এগুলোকে আর  বাদ দেওয়া  অসম্ভব।


জটায়ু অন‍্যদিন কলিংবেলটা একবার টিপেই ছেড়ে দেন। আজ যখন পরপর দু’বার বাজালেন আর সেটা শুনেই ফেলুদা মুচকি হেসে আমায় বললো – “জটায়ু’র দেখছি স্মার্ট হওয়ার আর তর সইছেনা?”ভদ্রলোক হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে শ্রীনাথকে চা এর হাঁক ছেড়ে সোফায় ধপ্ করে বসে পড়লেন। এখন আগস্টের শেষ বলে গরমটা একটু কম। তাও ভদ্রলোকের টাকে ঘামের বিন্দু জমেছে দেখে ফেলুদা বললো, 
-“এ উত্তেজনা তো আপনার স্মার্টফোন শেখার জন‍্য নয়! জাফরগঞ্জের রায়বাড়ি থেকে জড়োয়া নেকলেস চুরির খবরটা আজকের কাগজে পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে?” 
– “যা বলেচেন মশাই! উফ্ কি করে সব আগেভাগে টের পেয়ে যান বলুন তো!” জটায়ু এতক্ষণে দন্তবিকশিত করে গদগদ হয়ে পড়লেন। আজকের কাগজে খবরটা আমিও পড়েছিলাম। জাফরগঞ্জের রায়বাড়ি থেকে দিনসাতেক আগে একটা জড়োয়া নেকলেস রহস‍্যজনকভাবে খোয়া যায়। তেমনটাই লিখেছে কাগজে। ওটা নাকি সারাবছর ব‍্যাঙ্কের লকারেই থাকত। একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে পড়ার জন‍্য লকার থেকে উঠিয়ে বাড়িতে আনা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের দিন ওটাকে খুঁজে না পাওয়ায় হইচই পড়ে যায়। পুলিশ তদন্ত করছে বটে তবে চোর বা নেকলেস কোনওটারই খবর পাওয়া যায়নি।
জটায়ুর উৎসাহে জল ঢেলে ফেলুদা ওঁকে জিজ্ঞাসা করল – “ওই নেকলেসটা কার ছিল জানেন? মানে কি ভাবে ওটা রায়বাড়িতে এল সেটা বলতে পারলে আপনাকে স্মার্টফোন ব‍্যবহারের  আরএকটা আজব কায়দা শিখিয়ে দেব!” 
একথা শুনে জটায়ু কেন এমনকি আমিও হাঁ হয়ে গেছি। এত কথা তো কাগজেও লেখা নেই। ফেলুদা ফস্ করে একটা চারমিনার ধরিয়ে বলল – “ওই নেকলেসটা হল ঘসেটি বেগমের। অর্থাৎ বাংলা বিহার উড়িষ‍্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার মাসির! ওই রায় বাড়ির এক পূর্বপুরুষ ওদের মুনশী ছিলেন। পলাশীর যুদ্ধের পরে সিরাজের কোষাগার লুঠ হয় জানিস তো! সেখান থেকেই সম্ভবত ওটা ঘসেটি বেগমের হাতে আসে। আর তিনি ওই মুনশীকে ওই নেকলেসটা  ইনাম দিয়েছিলেন কোনও বিশেষ এক গোপন কার্য উদ্ধারের জন‍্য!”
” মানে আ-আপনি কি করে এতোওওও…” জটায়ুর সাথে সাথে আমিও ওই একই কথা ফেলুদাকে জিজ্ঞাসা করতে বাধ‍্য হলাম। ফেলুদা তার একপেশে হাসিটা ঠোঁটের ডগায় ঝুলিয়ে বলল, 
 -“কাল রাত্তির এগারোটার পরে একটা ফোন এসেছিল মনে আছে তোর? রায়বাড়ির বর্তমান মালিক দেবীপ্রসাদ রায় আমার ক্লাসফ্রেন্ড হাইকোর্টের অ‍্যাডভোকেট সুব্রত বোসের এর আপন মামা হন। ভদ্রলোক ওর কাছ থেকে আমার খবর পান, আর এই চুরির কেসে সাহায‍্য চেয়েই ফোনটা করেছিলেন। “
এতক্ষণে জটায়ু স্বস্তি পেয়ে বললেন – “যাক সকাল থেকে যে রকম ভেল্কি দেখাচ্ছেন। আমার তো সব গুলিয়ে যাচ্ছিল মশাই..” 

সেই ঘুরঘুটিয়ার ঘটনার সময় একবার পলাশী জায়গাটায় যাওয়া হয়েছিল। সে সময় জটায়ু যাননি আমাদের সঙ্গে। তাই এবারের জাফরগঞ্জের অভিযানে যে তিনিও সঙ্গে থাকবেন সেটা আর বলে দেওয়ার দরকার হয়না। অবিশ‍্যি আমরা ওঁর গাড়িতেই যাব।  হরিপদবাবু কদিন  ছুটি নিয়েছেন বলে ফেলুদাই ড্রাইভ করবে। সামনের রোববার সকাল সকাল আমরা জটায়ুর বাড়ি পৌঁছে যাব। আর সেখান থেকে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সোজা এন এইচ থার্টি ফোর।

এরমধ‍্যে ফেলুদা একবার সর্দার শঙ্কর রোডে সিধুজ‍্যাঠার কাছ থেকে ঘুরে এসেছে। আমাদের দেখে বই এর ফাঁক থেকে একগাল হেসে সিধুজ‍্যাঠা বলে উঠলেন – 
” কিহে ফেলুচাঁদ! পসার বেড়েছে বলে তোমার আজকাল টিকিটিও দেখা যাচ্ছেনা বড়? সিরাজের সব ষড়যন্ত্রকারীদের কি দশা হয়েছিল সেটা বোধহয় আর একবার এই বুড়োর কাছ থেকে জানতে এসেচো তো?”
ফেলুদা সত‍্যিই এরমধ‍্যে অনেকদিন সিধুজ‍্যাঠার কাছে আসেনি। তাই লজ্জা লজ্জা মুখ করে ঝোলা থেকে একটা আদ‍্যিকালের ‘সংবাদ প্রভাকর’এর ঝুরঝুরে একটা এডিশন বের করে সিধুজ‍্যাঠার কাছে নামিয়ে রাখল। আমি জানি হেদুয়ার কাছে একজন অ‍্যান্টিক বুক ডিলারের কাছ থেকে ফেলুদা মাঝেমধ‍্যেই পুরনো বইপত্তর কিনে থাকে। এটাও সেখান থেকেই আনা। সিধুজ‍্যাঠার পুরনো খবর জমানোর শখ বলে ও এটা ওঁকে উপহার দেবে বলে কিনেছে। সিধু জ‍্যাঠার বাড়িতে বরাবর ভাল দার্জিলিং চা এর চল। ফেলুদাও মকাইবাড়ির ফ‍্যান । কাজেই তিনজনের জন‍্য তিন কাপ চা আর মামলেটের এর ফরমায়েশ করে হাসিমুখে বলতে শুরু করলেন, 
” ক্লাইভ গলায় ক্ষুর চালিয়ে মরে, নন্দকুমার মরে ফাঁসির দড়িতে, মীরজাফর কুষ্ঠ রোগে, মহম্মদী বেগ পাগল হয়ে কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে, বক্সারের যুদ্ধের পর মুঙ্গেরের দূর্গ থেকে গলায় বস্তা বেঁধে জীবন্ত অবস্থায় ছুঁড়ে ফেলে রায়দুর্লভকে খুন করে মীরকাশিম  আর সিরাজের মাসি ওই ঘসেটি বেগম’কে জিঞ্জিরা প্রাসাদের নজরবন্দী রেখে একদিন বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে মারে মীরণ…এসবই  তো জানা তোমার নিশ্চয়ই? ” 


 সিধুজ‍্যাঠা এই বলে ফেলুদার দিকে একবার  তাকালেন। ঘটনাগুলোর কিছু কিছু আমি জানলেও সিধুজ‍্যাঠার মুখ থেকে এখন আবার  শুনতে দিব‍্যি লাগছিল। চা খেতে খেতে ফেলুদা বলল – 
” কিন্তু এত কটা লোক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেও দাগ লাগল একা মীরজাফরের গায়ে! এক্ষেত্রে ইতিহাসটা একটু একপেশে হয়ে গেল না?”
” সে তো গিরিশ ঘোষের সিরাজদ্দৌলা নাটক পড়ে হে ফেলু! নইলে কেষ্টনগরের কেষ্টচন্দর, সুতানুটির হুজুরীমল আর শো’বাজারের নব মুনসীরও তো রাতারাতি অাঙুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছিলো! ” সিধু জ‍্যাঠা রহস‍্যময় চোখে একবার আমাদের দিকে তাকিয়ে এবার গলাটা গম্ভীর করে খাদে নামিয়ে বেশ নাটকীয় স্বরে বললেন – 
 ” ঘসেটি বেগমের জড়োয়ার খোঁজে নামছো তো! এরজন‍্য তোমায় ওই পলাশীর ষড়যন্ত্রের ইতিহাসটাও একবার ভালো করে জেনে রাখতে হবে বৈকি?” আমরা দুজনেই অবাক! তবে ফেলুদা সঙ্গে সঙ্গে একগাল হেসে নিজের অপ্রস্তুত ভাবটা সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, ” সেজন‍্যই তো আসা আপনার কাছে। ” 
সিধুজ‍্যাঠা একগাল হেসে বই এর তাক থেকে গোটাকতক পুরনো বই নামিয়ে ফেলুদার হাতে দিয়ে বললেন,”তথাস্তু! এতে জাফরগঞ্জের রায়বাহাদুর  দীনদয়াল রায়ের  ব‍্যাপারে অনেক খবর পাবে। ভদ্রলোক পলাশীর পরে নিমকের দেওয়ানী করে প্রথমটায় খুব বড়লোক হয়েছিলেন তারপর সে সব ছেড়ে ইংরেজ কোম্পানীর যত বড় বড় বাসভবন, আপিস টাপিস তৈরী হয়েছিলো তাতে ইমারতিদ্রব‍্য সাপ্লাইয়ের ব‍্যবসা ফাঁদেন। চারপুরুষ ধরে ওরা যা টাকা করেচে তাতে আরো চার পুরুষের বসে খাওয়ার কথা!”
শনিবার রাতের মধ‍্যেই ফেলুদা পলাশীর যুদ্ধ ও সিরাজের বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্রের ব‍্যাপারে সিধুজ‍্যাঠার বাড়ি থেকে আনা বইগুলো সব পড়ে ফেলে আবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মিউজিয়াম সহ  ন‍্যাশনাল লাইব্রেরী আর এশিয়াটিক সোস‍্যাইটি থেকেও বার দুয়েক ঢুঁ মেরে এসেছে। মোটামুটি হোমওয়ার্ক না করে ফেলুদা কখনো কাজে হাত দেয়না। এবারেও  তাই করলো। এরমধ‍্যে জটায়ু প্রত‍্যেকদিন দুবার করে ফোন করে এসব খবর শুনে উত্তেজনায় লাফাচ্ছেন। উনি সিরাজের ব‍্যাপারটা সম্পর্কে এত খবর জানতেন না। তাই শুনছেন আর বারবার করে “মিরাকিউলাস”, “মিরাকিউলাস” বলে উঠছেন থেকে থেকে। ওঁর মতে এত কটা অপঘাত মৃত‍্যু  যখন ঘটেছে তখন এই ব‍্যাপারটায় কোনভাবে ভূতপ্রেতের যোগ থাকাটাও বিচিত্র নয়। ব‍্যাপারটা এক্ষেত্রে লালমোহনবাবু যে খুব একটা ভুল বলেননি তিনি সেটা অবশ‍্য একেবারে রহস‍্যের শেষটায় গিয়ে বোঝা গেছিল। 
” ঘসেটি বেগম নবাব আলীবর্দী খান-এর জ্যেষ্ঠা কন্যা। আসল নাম মেহেরুন্নেসা। নবাব আলীবর্দী খান তাঁর তিন মেয়েকেই তাঁর বড়ভাই হাজী আহমদের তিন ছেলের সাথে বিয়ে দেন। ঘসেটি নিজে ছিলেন নিঃসন্তান। এদিকে তিনি মেজবোন আমিনা বেগমের ছেলে সিরাজের প্রতি দাদুর নির্লজ্জ পক্ষপাত আর তার ফলে  হঠাৎ করে তার  একেবারে  সটান নবাবী মসনদে বসে পড়াটা মন থেকে মেনে নিতে না পেরে তাঁর ছোটবোনের ছেলে পূর্ণিয়ার জায়গীরদার শওকতজঙ্গকে দত্তক নিয়ে বসলেন,আর সিংহাসন দাবী করে ঘোঁট পাকাতে থাকলেন। এদিকে আলীবর্দীর প্রধান সেনাপতি মীরজাফরও সিরাজউদ্দৌলার মসনদ লাভে স্বস্তি বোধ করেন নি। ঘসেটি গোপনে তখন মীরজাফরের সাথে একটা  মিত্রতা গড়ে তোলেন। সিরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্তের স্বার্থে তিনি প্রচুর অর্থ প্রদান করেছেন। এরপর ব্যবসায়ী জগৎশেঠ এবং  উমিচাঁদের সাথে মিলে ঘসেটিও মীরজাফরের সাথে সিরাজ বিরোধী এই ষড়যন্ত্রে যোগ দেন।” গাড়ি চালাতে চালাতেই ফেলুদা আমাদের ঘসেটি বেগমের সম্পর্কে একটা বেসিক ধারণা দিয়ে দিচ্ছিলো। এসব শুনে উত্তেজিত গলায় লালমোহন বাবু বললেন – “সারাজীবন মীরজাফরকেই বদমাইশ জেনে এসেচি। আজ প্রথম জানলাম মশাই সিরাজের এই মাসির কথা!”
কৃষ্ণনগরের কাছে একটা মিষ্টির দোকানে আপাততঃ দাঁড়ানো হয়েছে। এখানে দেখছি বিখ‍্যাত সরভাজা আর সরপূরিয়া বিক্রী হচ্ছিল। তা তো খাওয়া হলই তার সাথে গরম গরম হিংএর কচুরি আর ছোলার ডালটাও দিব‍্যি লাগলো। ভাতজংলা ছাড়িয়ে পূর্বদিকের রাস্তা ধরে প্রায় সত্তর কিলোমিটার গেলেই আমাদের গন্তব‍্যে পোঁছে যাব। দেবপ্রসাদবাবুকে ফেলুদা আগেই ফোন করে বলে দিয়েছিল যে আমাদের পৌঁছতে পৌঁছতে এগারোটা বেজে যাবে। কাজেই পথেই আমরা ব্রেকফাস্টটা সেরে নিলাম আর একবার। 
” আড়াইশো বছরেরও বেশী যুগ পরে সেদিনের ‘পলাশীর প্রান্তর’ বললেই যদি আজকে যদি একটা ফাঁকা মাঠ আর তাতে সারি সারি পলাশ গাছের বাগান দাঁড়িয়ে আছে ভেবে থাকেন তবে কিন্তু ঠকতে হবে। এমনকি  সেই বিখ‍্যাত আমবাগানটাও আজ আর নেই!” জটায়ুকে  উদ্দেশ‍্য করে ফেলুদা কথাটা বলে একটা চারমিনার ধরালো।  এই জাফরগঞ্জ জায়গাটা পলাশী থেকে তিরিশ কিলোমিটার দূরে। ফেলুদা বলল সব ঠিকঠাক মিটে গেলে ফিরতি পথে আমাদের ওখানটা ঘুরিয়ে আনবে। 
এদিকটায় আগের রাত্রে বৃষ্টি হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। আসতে আসতে রাস্তায় জল আর কাদা দুটোই দেখতে পেলাম। আকাশের মুখ আজও ভার। জটায়ু বললেন – “আচ্ছা ফেলুবাবু! ওই গয়নাটা মানে ইয়েটা যেটা চুরি গেছে তার কত প্রাইস এক্সপেক্ট করছেন?” 
গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে ফেলুদা বলল,-“মণিমুক্তোর কথা না হয় ছেড়েই দিন। অ‍্যান্টিক পিস হিসাবে ধরলেও কম করে ওটার দাম এক কোটি হলেও আশ্চর্য হবোনা।”! গাড়িটা একটা গর্তের ওপর পড়ে জোরসে ঝাঁকুনি দেওয়ায় “কো- কো-ট” এর বেশী জটায়ুর মুখ থেকে আর একস্ট্রা শব্দ বেরোল না। 
এরপর ফেলুদা লালমোহনবাবুকে এইসব অ‍্যান্টিক জিনিস আর তার মূল্য সম্পর্কে একটা ছোটখাটো লেকচার দিতে দিতে আমরা ভাতজংলা মোড় ছাড়িয়ে ডানদিকের রাস্তা ধরলাম।


রায়বাড়ি পৌঁছাতে বেলা সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। মাঝখানে কিছুটা রাস্তায় গতরাত‍ের বৃষ্টিতে কাদা হয়ে যাওয়ায় গাড়ি স্পীডে চালানো যাচ্ছিল না। আমি  ট‍্যাবের নোটপ‍্যাডে এযাবৎ যেটুকু ইনফর্মেশন পেয়েছি তা নোট করে রেখেছি। লালমোহনবাবু  অবশ‍্য তাঁর স্মার্টফোনটাকে কলকাতায় রেখে এসেছেন। তিনি খুব গম্ভীর ভাবে আমায় বোঝালেন যে আপাতত তাঁর কাছে ঘসেটি বেগমের জড়োয়ার কেসটাই এখন প্রায়োরিটি। নতুন ফোনটা সাথে থাকলে ডিফোকাসড্ হয়ে যেতে পারেন। 
 বিশাল জমিদারি কম্পাউন্ড পার করে পোর্টিকোর নীচেই  দেবীপ্রসাদবাবু আমাদের জন‍্য অপেক্ষা করছিলেন। এরকম বাড়ি আগেও আমরা দেখেছি। উত্তর কলকাতার আর পাঁচটা সাবেকী  বড়লোক জমিদারবাড়ির  মতই এই জাফরগঞ্জের রায়বাড়ি। সেকালের বড় বড় কোরিন্থীয়ান থামের বেশ কয়েকটা ভগ্নপ্রায় হয়ে গেলেও যেটুকু আছে সেটুকু যে ভালই মেইন্টেন্ড হয় বোঝা গেল। আলাপপর্ব সেরে আমরা  বৈঠকখানায় অতিকায় ভিক্টোরিয়ান কৌচে এসে বসলাম। সাথে সাথে  পেস্তা দেওয়া মালাই সরবৎ আর গাওয়া ঘিয়ে ভাজা নিমকি, নারকেলের তক্তি আর মোহনভোগ এসব এলো। দেবীপ্রসাদ বাবু বললেন এই খাবার নাকি সব পুজো উপলক্ষে বাড়িতেই বানানো। 
জলখাবারের সদ্ব‍্যবহার করতে করতেই ফেলুদা কাজের প্রসঙ্গে চলে এলো। ভদ্রলোক যেন আলোচনার জন‍্য একরকম প্রস্তুত ছিলেন। উনি বললেন, “আমরা হলাম তিন ভাই আর আমাদের বোন টোন নেই। আমার পেপার মিলের ব‍্যবসা, মেজভাই শিবপ্রসাদ বিলেতে ডাক্তারী করে আর ছোটভাই অখিলপ্রসাদ ছিলেন স্পোর্টসম‍্যান। একসময় মোহনবাগানের হয়ে হকি টকি খেলতেন। তিনি ছিলেন অকৃতদার। সেরিব্রাল স্ট্রোকে এই দুবছর আগে তিনি হঠাৎ মারা যান।”
এই বলে টেবিলের ওপরে রাখা একটা ব্রাউন রংএর খামের মধ‍্যে থেকে একটা ফোটোগ্রাফ বার করে আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন।এটা ওই বিখ‍্যাত নেকলেসটার ছবি। একটু হেসে উনি বললেন, “আসলে নব্বই সালে সেই কলকাতার তিনশো বছরের সময় একটা এগজিবিশনে এটা ডিসপ্লে করার পর থেকেই বন্ধুবান্ধবরা সবসময় একবার বস্তুটাকে দেখতে চায়। তাই এই ব‍্যবস্থা! অবশ‍্য এই ছবির একটা করে কপি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আর হাজারদুয়ারী মিউজিয়ামেও পাবেন।”
জড়োয়ার নেকলেসটার পুরোটাই অসংখ‍্য ছোটো ছোটো হীরে দিয়ে সাজানো। মধ‍্যিখানে একটা গোলাপের মোটিফ বসানো আছে ফেলুদা দেখে বলল ওগুলো বার্মিজ চুনীর। আর সবচেয়ে দেখবার জিনিস হল ফুলটার একেবারে মাঝখানে  বসানো একটা খাঁজকাটা কমলহীরে। পুরো ব‍্যাপারটাই যাকে বলে অভাবনীয়। ফেলুদা ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিটা দেখে বললো –               “এর ভ‍্যালু তো কয়েক কোটি টাকা হবে তাই না?” তারপর  দেবীপ্রসাদ বাবুকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলো, ” আপনি এ ব‍্যাপারে বাড়ির কাউকে সন্দেহ করছেন নাকি? মানে এটা তো আর খুব একটা বাইরে বের হয়না বললেন। মানে আপনাদের এই রায় বাড়িতে সবার নিশ্চয়ই গয়নাটার ওপর একটা….।”


ফেলুদার প্রশ্নে দেবীপ্রসাদবাবু হঠাৎ যেন একটু চমকে উঠে বললেন,
” মেজভাই শিবপ্রসাদ আর তার বিদেশিনী স্ত্রী সোফিয়া শেষবার এখানে এসেছিল সেই নাইন্টি নাইনের জুলাইয়ে বোধহয়। আর ওটা তো বরাবর আমিই দেখাশোনা করতাম। এখানে বলে রাখা দরকার যে, আমাদের এই রায়বাড়ির কূলদেবতা হলেন যমেশ্বর শিব। পুরো শ্রাবণমাসের চারটি বা পাঁচটি সোমবার জুড়ে এ বাড়িতে শিবের একটা বিশেষ পুজো চলে। এটা অবশ‍্য সেই আমার অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহ দীনদয়াল রায়ের সময় থেকে চলে আসছে। এই বাড়িও তো তাঁরই আমলের। আর সেই অনুষ্ঠানের জন‍্যই এখন আমি আমার স্ত্রী, দুই ছেলে আর তাদের পরিবার, এছাড়া চারজন চাকর ও এস্টেটের ম‍্যানেজার মিলিয়ে এখন জনা দশেক লোক এখানে আছি। অন‍্যসময় তো বাড়ি খালি পড়ে থাকে ম‍্যানেজার আর চাকরদের জিন্মায়।” -“বেশ! তবে ওই গয়নাটা কে ব‍্যবহার করতেন? আপনার স্ত্রী?” ফেলুদা আবার ভদ্রলোককে পাল্টা প্রশ্ন করল।


দেবীপ্রসাদবাবু এবারে একটা পাকানো কাগজে হাতে লেখা কুলজী আমাদের সামনে মেলে ধরলেন। তারপর বললেন-“এই হল আমাদের বংশতালিকা। ভাগ‍্যের পরিহাসে আমাদের পূর্বপুরুষ সিরাজ বিরোধী চক্রান্তের একটা অংশ হয়ে জড়িয়ে পড়েন। দীনদয়াল রায় ছিলেন কাশিমবাজারের সেরেস্তাদার। লর্ড ক্লাইভের সাথে নবাবের  আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যে আর্মানী খোজা পেট্রুস অ্যারাটুন সাহেব ছিলেন,  তাঁর সুনজরে পড়েন তিনি। সাহেবের সুপারিশে  রাতারাতি কাশিমবাজার থেকে মুর্শিদাবাদে আনানো হয় তাঁকে। আসলে সিরাজের তৎকালীন সেরেস্তা আর কোষাগারের ধনসম্পদের একটা  মোটামুটি হিসাব জানার জন‍্যই স্বয়ং ঘসেটি বেগমের মতিঝিল প্রাসাদে তাঁর তলব পড়ে। আস্তে আস্তে নিজের উপস্থিত বুদ্ধি আর কর্মদক্ষতার জোরে দীনদয়াল মতিঝিলের অন্দরমহলে একটা বিশেষ জায়গা করে নেন। পলাশীর পর সিরাজের মৃত‍্যু হলে তার সাথে বেগমমহলের অন‍্য সব কটি নবাবের অনুগামীদেরও মীরজাফর একরাত্রে খাবারের সাথে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেন। সেইসময় ঘসেটি বেগম একদিন হঠাৎ জানতে পারেন যে নবাবের একটি পুত্রসন্তান এখনো জীবিত রয়ে গেছে। যদিও সেই ছেলে কোনও বেগমের নয়। সে ছিল এক বাঈজীর গর্ভজাত। তবুও শত্রুর শেষ রাখতে নেই বলে ঘসেটি বেগম ছেলেটিকে রাতের বেলায় হীরাঝিল থেকে লেঠেল দিয়ে চুরি করিয়ে এই দীনদয়ালের হাতে তুলে দেন। আর বলেন দীনদয়ালের কাজ হবে ওকে সম্পূর্ণভাবে গোপনীয়তার সাথে নিজের বাড়িতে একে লুকিয়ে রাখা যতদিন না উনি ঢাকা থেকে আবার মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন।
আর এই কাজের জন‍্য নিজের একটি জড়োয়ার হার গলা থেকে খুলে দীনদয়ালকে ইনাম দেন। কিন্তু দুর্ভাগ‍্য এই, যে ঘসেটি বেগমের আর মুর্শিদাবাদে ফেরা হয়নি। শোনা যায় মীরজাফর আর মীরণ ষড়যন্ত্র করে বুড়িগঙ্গায় নৌকাডুবি করিয়ে একদিন ঘসেটিকেও খুন করে দেয়!” 
” আর সেই ছেলের কি হল?” জটায়ু আর তাঁর উত্তেজনা সামলাতে না পেরে ফস্ করে জিজ্ঞাসা করে ফেললেন।
দেবীপ্রসাদ বাবু তারপর বলে চললেন, ” সে ছেলে দীনদয়ালের কাছেই থাকত। কিন্তু পলাশীর যুদ্ধের পালাবদলের কয়েকমাসের মধ‍্যেই ভেদবমিতে সেই ছেলেরও একদিন অকালমৃত‍্যু হয় বলে শোনা যায়। সেই থেকে ওই নেকলেসটা এ বাড়িতেই রয়ে যায়। তবে এটা এবাড়ির কোনও সদস‍্যার জন‍্য ব‍্যবহার করার হুকুম দীনদয়াল দেন নি। 
পলাশীর যুদ্ধের পরবর্তীকালে তিনি নিমকমহালের দেওয়ানী করে বিস্তর টাকা রোজগার করে এই বাড়ি আর যমেশ্বরের মন্দির দুটি  প্রতিষ্ঠা করেন। একবার একটি স্বপ্নাদেশ পেয়ে দীনদয়াল শ্রাবণমাসের শেষ সোমবার  পট্টোযোগিনী তন্ত্রমতে যমেশ্বরের সাথে দেবী কিরীটেশ্বরীর বিবাহঅনুষ্ঠানের এক বিচিত্র পুজোর পত্তন করেন। আর সেই পুজোয় যমেশ্বর মহাদেব ওই গহনাটি প্রতিবার যৌতুক হিসাবে দেবী কিরীটেশ্বরীকে উপহার দেন বলে কথিত।  অবশ্য গয়নাটা তার আগেই যবন রমণীর ব্যবহৃত আর তার গলায় থাকত বলে ছোঁয়া সেটা আগেভাগেই পূজো করে ওটাকে দেবকার্যে ব্যবহারের জন্য রীতিমত শাস্ত্রমতে পুজো টুজো করে নিয়ে শুদ্ধ করে নিয়েছিলেন।তাই এইরকম রীতিই সেকাল থেকে এখনো চলে আসছে। কাজেই ও জিনিস বছরে এই একবারই লকার থেকে বাইরে আসে। অার পুজো হয়ে গেলেই লকারে ফিরে যায়। “
আমরা এতক্ষণে তন্ময় হয়ে এই বিচিত্র ইতিহাস শুনছিলাম। ফেলুদার কপালে ভাঁজ পড়া দেখে বোঝা যাচ্ছে যে ও অলরেডি মাথার কাজ শুরু করে ফেলেছে। 
কথায় কথায় বেলা হয়ে গেছে দেখে দেবীপ্রসাদ বাবু একজন চাকরকে ডেকে আমাদের ফ্রেশ হয়ে আসার জন‍্য অতিথিশালার দুটি ঘর খুলে দিতে বললেন। বেলা দুটোর পরে ডাইনিংরুমে খাওয়ার সময় বাকি সকলের সাথে আলাপপরিচয় করিয়ে দেবেন বলে দেবীপ্রসাদবাবু ভিতরে চলে গেলেন আর আমরাও স্নানটান সেরে রেডি হবার জন‍্য চাকরটির সাথে অতিথিশালার দিকে রওনা হলাম। 
খাওয়ার ঘরটা রীতিমত বড় হোটেলের ব‍্যাঙ্কোয়েট হলের মতন। দীনদয়ালের আমন্ত্রণে নাকি একদা কর্নেল ওয়াটসন্ সাহেব পুজোর সময়ে এখানে এসে নেমন্তন্ন খেয়ে গেছেন। দেবীপ্রসাদবাবুর দুই ছেলের একজন ওভারসিজ ব‍্যাঙ্কের ম‍্যানেজার। নাম দেবকুমার রায়। তাঁর স্ত্রী মঞ্জুলা একটি কনভেন্ট ইস্কুলের ইংরেজির শিক্ষিকা। ওঁরা নিঃসন্তান। ছোটছেলে দেবমাল‍্য বাবার সাথে পেপারমিলের কারবার সামলান। ওঁর স্ত্রী  সুদেষ্ণার কলকাতার নিউ আলিপুরে একটা বুটিকের দোকান আছে। ওঁদের একটিই মেয়ে তুলতুলির বয়স বছর সাতেক হবে। এছাড়া রয়েছেন আর রয়েছেন দেবীপ্রসাদ বাবুর স্ত্রী এ বাড়ির গৃহিণী জয়শ্রী দেবী। সবার সঙ্গে আলাপ পরিচয় হতে সময় লাগলো ঝাড়া দশ মিনিট। তারপর খাওয়ার পর্ব মিটতে লাগল আরো একঘন্টা। পুজোর সময় বলে এখন সব নিরামিষ রান্না হলেও তা খেতে দিব‍্যি লাগলো। বাঙালী রান্নার নিরামিষেও এত রকম ভ‍্যারাইটি হতে পারে সেটা আমারও জানা ছিলো না। 
খাওয়া দাওয়ার পর্ব মিটলে ফেলুদা আমাদের আসার কারণটা সবাইকে খুলে বললো। আর এও বললো যে সে একবার  সকলের সাথে আলাদা করে কথা বলতে চায়। এমনকি বাড়ির ম‍্যানেজার আর চাকরবাকরদের সাথেও ওর একান্তে  কথা বলাটাও জরুরী। 

জয়শ্রী দেবী হাতজোড় করে ফেলুদাকে বললেন  “আপনাদের কথা এত শুনেছি আর কি বলব! ওরকম একটা জিনিস এ বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গেল! ঠাকুরদেবতার রোষের হাত থেকে বাঁচলে হয় ? আর চারদিন পর সেই পুজো। এরমধ‍্যে ওটা না পেলে পুজোয় বিশাল খুঁত রয়ে যাবে…বুঝতেই পারছেন বয়স হচ্ছে আমাদের। স্বামী, দুই ছেলে- দুই বৌমা, নাতনীটাকে নিয়েই আমার সংসার….” ভদ্রমহিলা কথা বলতে বলতে মুখে আঁচলচাপা দিয়ে কান্নার ভাবটা আড়াল করলেন।

সবার সাথে আলাদা আলাদা করেই ফেলুদা কথা বললো। আমি এক এক করে কি কথা হল সেটা লিখছি। প্রথমে এল দেবকুমারবাবুর পালা।
ফেলুদা-“এই ব‍্যাপারটায় আপনার মা বোধহয় সব থেকে শকড্, তাই না?”
দেবকুমার- “শুধু মা কেন! আমরা সবাই। বুঝতে পারছেন একটা রিলিজিয়াস সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে আছে। তাছাড়া ওইরকম একটা অ‍্যান্টিক পিস।”
ফেলুদা-“হুম। ওটা তো ওভারসিজ ব‍্যাঙ্কের লকারেই থাকতো নিশ্চয়?”
দেবকুমার-“সেটাই তো স্বাভাবিক। তবে কলকাতার কোন ব্রাঞ্চে নয়। ওটাকে জাফরগঞ্জের কাছেই কৃষ্ণনগরের ব‍্রাঞ্চেই জমা রাখা হতো। এমনিতেও কলকাতা থেকে ওটা সঙ্গে এতটা পথে বয়ে নিয়ে আসাটা বেশ রিস্কি!”
ফেলুদা- “সেদিন লকার থেকে ওটা কে আনতে গিয়েছিলেন? আপনি কি?”
দেবকুমার-“ও হ‍্যাঁ। ব্রাঞ্চ ম‍্যানেজার আমার ব‍্যাচমেট। কাজেই আমিই গেছিলাম আনতে।”
ফেলুদা-“ওটা শেষ কবে আপনি চোখে দেখেছেন?”
দেবকুমার-“ওই তো! লকার থেকে নিয়ে এসে মা এর হাতে দিয়ে ব‍্যাস। বুঝতেই পারছেন যতক্ষণ ওটা হাতে থাকে একটা টেনশন থেকেই যায়।” 


এরপর ছোটছেলে দেবমাল‍্য এলেন। উনি আর ওঁর স্ত্রী ঘটনার দিন বিকেলে এসেছেন। কাজেই জড়োয়ার নেকলেসটাকে এবারে আর চোখে দেখার সুযোগ ঘটেনি। ওরা আসার আগেই নেকলেসটা উধাও হয়ে গেছে। তবে সুদেষ্ণাদেবী বললেন ওই দিন রাতে শুতে যাওয়ার আগে হঠাৎ একটা ছায়ামূর্তিকে বারান্দার ওপাশে একঝলক দেখতে পান। তিনি সঙ্গে সঙ্গে স্বামীকে ডেকে আনতে আনতে অবশ‍্য আর কাউকেই দেখতে পান নি। ফেলুদা শুনে বলল- “ওই ছায়ামূর্তির ঘটনা বাড়ির আর সকলে জানেন?” তার উত্তরে সুদেষ্ণাদেবী জানালেন যে উৎকন্ঠার আশঙ্কায় সেটা উনি দেবমাল‍্য বাবু ছাড়া অার কাউকেই জানাননি। 
দেবকুমার বাবুর স্ত্রী মঞ্জুলা দেবীকে দেখলাম এই ব‍্যাপারটায় একটু যেন বেশীই ভয় পেয়ে গেছেন। কথায় কথায় ভদ্রমহিলা ফেলুদাকে তো বলেই ফেললেন-“আমি ওকে কতবার ওভারসিজ ব‍্যাঙ্কে গয়নাটা রাখতে মানা করেছিলাম। শেষমেশ কখনো একটা বিশ্রী ব‍্যাপার হলে সবাই ওকেই দোষ দেবে..ও শোনেনি!”
ফেলুদা ওনাকে আশ্বস্ত করে বললো- “কিন্তু ওটাতো এ বাড়িতে আসার পর হারিয়েছে। এতে আপনার স্বামী দায়ী হবেন কেন? বরং কলকাতা থেকে ওটা সঙ্গে করে আনাটা আরো রিস্কি হয়ে যেত না?”


বাড়ির সবার সাথে কথা বলার পর ফেলুদা ম‍্যানেজার প্রমোদ বাবুর সাথে বাগানে পায়চারি করতে করতে কথা বলছিলো। জানা গেল উনি প্রায় বিশবছর এখানে ম‍্যানেজারি করছেন। কাছেই একটা গ্রামে থাকেন। সকাল আটটায় কাছারিতে আসেন আর বিকেল চারটের মধ‍্যে ফিরে যান। ফেলুদা নেকলেসটার ব‍্যাপারে  জিজ্ঞাসা করায় বললেন- “বাবু! অতসব কি আর আমি জানি! তবে ওসব হল পাপের জিনিস! একদিন না একদিন সেটা যেতোই।”
ঘরে ফিরে এসে ফেলুদা কপালে ভাঁজ ফেলে চারমিনার ধরিয়ে বলল- “সোমবারের আগে ওটা যে করেই হোক বের করতে হবে!” জটায়ু বললেন, “আমার মাথায় কিস‍্যু ঢুকছে না মশাই। ফেলুদা একটু গম্ভীর হয়ে বলল -“আপনার মাথা দিয়ে আমি তদন্ত চালাই কি? কাজেই আপনার অত ভাববার কিছু নেই। তার চেয়ে আপনারা দুজনে বরং এ বাড়ি আর আশপাশটা সার্ভে করে আসুন। বিশেষ কিছু দেখতে পেলে বলবেন। আমি এখন একটু একা বসে ভাবতে চাই।” 


অগত‍্যা আমি আর লালমোহনবাবু বাড়িটার ভেতরমহলের টানা বারান্দা দিয়ে হাঁটতে লাগলাম। বিশাল অট্টালিকা। কড়িবরগার ছাদ। আর দেওয়ালে অজস্র খোপকাটা কুলুঙ্গি। একসময় ওখানে পিদিম জ্বালানো হত বোঝা যায়। প্রায় সতেরটা ওরকম কুলুঙ্গি আছে দেখলাম। পুরু মোটা চুন সুরকির দেওয়াল বলে বাড়ির ভিতরটা একটু ঠান্ডা। উত্তরের ঘরগুলোই এখন ব‍্যবহার হয়। একদম শেষের ঘরটায় দেবমাল‍্যবাবুরা আছেন। তুলতুলিকে দেখলাম মালীর সাথে বাগানে বেড়াতে বেরিয়েছে। উত্তরের শেষপ্রান্তে একটা বড় দীঘি। একসময় এটা বোধহয় স্নানের ঘাট ছিল। এখন অবশ‍্য জঙ্গুলে ঝোপঝাড় আর পানায় ভর্তি। লালমোহনবাবু দেখে বললেন, “বুঝলে তপেশ! নবাবী আমলে ওই পুকুরেই যত খুনখারাপী করে নিশ্চয়ই সব নরকঙ্কাল পুঁতে রাখতেন দীনদয়াল। সুদেষ্ণাদেবীর দেখা ওই ছায়ামূর্তির ব‍্যাপারটা ভুলোনা কিন্তু!”


ফেলুদা কখন আমাদের পিছন পিছন এসে দাঁড়িয়েছে টের পাইনি। একটা চারমিনার ধরাতে ধরাতে বললো, “বারো আনা জাল গুটিয়ে এনেছি রে তোপসে। খালি দুটো ব‍্যাপারে সিওর হলেই কেল্লা ফতে!” লালমোহনবাবু চোখ কপালে তুলে বললেন-“সেকি মশাই এর মধ‍্যেই? একটু খুলে বলুন তো!”  ঝকঝকে হাসিটার সাথে সাদা ধোঁয়ার রিং ছাড়তে ছাড়তে বললো, “ক্ল‍্যাইমাক্স তো আজ রাতে মশাই! ততক্ষণ অন্তত ধৈর্য‍্যটা ধরুন!” 


ফেলুদা হটাৎ কি মনে করে বাড়ির সবাইকে তাদের যে কটি রেনকোট আছে তা যেন একবার তাকে দেখানো হয়। সে কথা শুনে জটায়ু বললেন – “তোমার দাদা রাত্রের এ‍্যাকশনের সময় বৃষ্টির হাত থেকে সেফটি চাইছেন আর কি!” চাকর এসে খবর দিল এ বাড়ির কারুর রেনকোট নেই। তাও একটা অবিশ‍্যি পাওয়া গেলো। সেটা আবার অনেক পুরনো আর স্থানে স্থানে ফেটে যাওয়ায়  এখন আর ব‍্যবহার হয়না। আসলে প্রমোদবাবুই আগে ওখানা ব‍্যবহার করতেন। তাই তিনিই  কাছারিবাড়ি থেকে সেটা ফেলুদাকে এনে দিয়ে চলে গেলেন।


 রেনকোটটার অবস্থা সত‍্যিই শোচনীয়। বাঁহাতের নীচটা বোধহয় ইঁদুরে কেটে নিয়েছে। ফেলুদা ওটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ নেড়েচেড়ে দেখলো। তারপর দু’বার নিজের মনে “হুম! হুম!” বলে মাথা নাড়তে লাগল।
রাতের ব‍্যাপারটা ও বাড়ির কাউকে জানানো হয়নি। খালি বিকেলে চা খেতে খেতে ফেলুদা দেবীপ্রসাদবাবুকে বললো,- “কাল  সকাল দশটার সময় সবাই যেন বৈঠকখানায় হাজির থাকেন।” দেবীপ্রসাদবাবুর মুখে একটা আশার আলো জ্বলে আবার হঠাৎ নিভে গেলো। ফেলুদাকে ভদ্রলোক শুধু একবার বললেন,
 “জড়োয়ার ব‍্যাপারে আশাকরি সবরকম স্বচ্ছতা আপনি মান‍্য করবেন। সেটা অপ্রিয় সত‍্য হলেও জানাতে দ্বিধা করবেন না!” ফেলুদা একটু হেসে বলল – ” প্রকৃত সত‍্যিটাকে জানানোই তো আমার পেশা মিস্টার রায়। অবশ‍্য তার সাথে সাথে এ বাড়ির সম্মানরক্ষাটাও আমার কাছে ঠিক ততোটাই জরুরী।”

সোমবার দিনে পুজোর পর বিকেলে শখের যাত্রার আসর বসছে নাটমন্দিরে। স্থানীয় একটা দল “দক্ষ যজ্ঞ” পালাটা করছে। এটা নাকি বহুবছরের রেওয়াজ। আগে কবির লড়াই, বাঈজী নাচ আর ঢপ-কীর্তন সেসবও হত। এখন অবিশ‍্যি  শুধু  একদিনই যাত্রা হয়। আমি আর লালমোহনবাবু  নাটমন্দিরের একপাশে বসে যাত্রার মহলা দেখছিলাম বসে বসে। ফেলুদা তখন “শোন! তোরা এখানেই বরং থাক। আমি একটু ঘুরে আসছি।” বলে ধাঁ করে কোথায় চলে গেল। জটায়ু গম্ভীর গলায় বললেন, “এইবারটা তোমার দাদার ডিসেকশনের মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না!” ভদ্রলোক উত্তেজনার চোটে বোধহয় ডিডাকশান বলতে চেয়ে ডিসেকশন বলে ফেলেছেন!
খানিকপরে আমাদের পাশে রায়বাড়ির ম‍্যানেজার প্রমোদবাবু এসে বসলেন। এই যাত্রাদলে ওঁর ছোটছেলে কিঙ্কর ফিমেল লীড মানে দক্ষকন‍্যা সতীর রোলে অ‍্যাক্টিং করছে। সে কথাই বলছিলেন আমাদের। তার নাকি আশপাশের গ্রাম থেকেও ডাক আসে। গতবার বড়কর্তা মানে দেবীপ্রসাদবাবু “সীতার বনবাস” পালায় ওর অভিনয় দেখে নাকি মেডেল দিয়েছিলেন। আমাদের সাথে নানা বিষয়ে গল্প করতে করতে  ক্রমশ এ বাড়ির পুরোনো দিনের কথা উঠলো। একথা সেকথার পর প্রমোদবাবু গলাটা খাদে নামিয়ে বললেন-“ছোটবেলায় শুনিচি! যখন এ বাড়িতে কোন দুর্যোগ ঘনিয়ে আসে তখন নাকি সাদা কাপড় পড়া এক নারীমূর্তিকে এ বাড়ির আনাচে কানাচে ঘুরতে দেখা যায়। লোকে কানাঘুষো বলে থাকে এ নাকি সেই ঘসেটি বেগমের বিদেহী আত্মা। তা এবারেও নাকি…” কথাটা শেষ হলনা কারণ দেবমাল‍্য বাবু সিগারেট ধরাতে ধরাতে নাটমন্দিরের দিকে আসছেন দেখা গেল। ওঁকে দেখে প্রমোদ বাবু ফস করে উঠে চলে গেলেন, বোধহয় মনিবপুত্র বলেই। 


-“আপনার দাদাটিকে  দেখছি না যে? তা তদন্ত কদ্দুর এগোলো? সোমবারের মধ‍্যে ওটা না পেলে ইয়ে মানে কেলেঙ্কারির একশেষ!” -“উনি একটু হাঁটতে গেছেন। বোধহয় সিগারেট ফুরিয়েছে।” জটায়ুর সময়ে সময়ে স্মার্টনেসটা কিন্তু বেশ কাজে দেয়। -“আরে ধুর! নিজে গেলেন কেন। এতকটা চাকরবাকর আছে যখন!” বলতে বলতে যেমন এসেছিলেন তেমনি আবার অন্দরমহলের দিকে আবার চলে গেলেন। জটায়ু ফিসফিস করে বললেন – “এই ভদ্রলোকটিকে প্রথম থেকেই একটু ইয়ে ইয়ে ঠেকছে!” বলাবাহুল‍্য এই “ইয়ে ইয়ে” লাগার কোনো জুৎসই কারণ তিনি ব‍্যাখ‍্যা করতে পারলেন না।
ফেলুদা অবশ‍্য আধঘন্টার মধ‍্যেই ফিরে এল। প্রমোদবাবুর কাছে আমরা দুজনে যা যা কথাবার্তা শুনলাম সেটা সঙ্গে সঙ্গে ওকে ব্রিফ করলাম। সব শুনেটুনে ও বললো, “যাক! ওই একটা ব‍্যাপারেই একটা খটকা গিয়েও যাচ্ছিল না। এতক্ষণে নিশ্চিত হওয়া গেলো।” ফেলুদার ভাবভঙ্গী দেখে এটা পরিস্কার যে এখন ওকে ঘাঁটালেও মুখ খুলবেনা। কিন্তু এও বুঝতে পারলাম ওর মধ‍্যে আগের কনফিডেন্সটা ফিরে এসেছে।

রাতের খাওয়া দাওয়ার পর ঘরে ঢুকে জটায়ু কি কারণে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। হঠাৎ একটু পরে আমায় বললেন, “জানো তপেশ  ভায়া! আমাদের সেই এথিনিয়াম ইস্কুলের বাংলার মাস্টারমশাই বৈকুন্ঠ মল্লিক পলাশীর যুদ্ধ নিয়েও কি অসাধারণ একটা পদ‍্য লিখেছিলেন ? বলেই  চোখ বুজেটুজে যাত্রার ঢঙে  বলতে শুরু করলেন-
” ভেবে দেখ গর্জিছে কামান সকল!সেথায় দাঁড়ায়ে আছে সৈন‍্য নকলকেহ চুপ! কেহ ধীর, কেহ আছে স্হির!স্বাধীনতা খোয়া গেল পায়েতে জঞ্জীর!ঘোর কলি! নহে যুগ সত‍্য কি দ্বাপর,সিরাজের গদি ‘পরে কূট মীরজাফর…”
“ভদ্রলোক দেখছি নবীনচন্দ্র সেনের পলাশীর  যুদ্ধ পড়ে নিজেকে আর সামলাতে পারেননি!” ফেলুদার টিপ্পনীটা লালমোহনবাবু সম্পূর্ণ অগ্রাহ‍্য করে আবার পরের লাইনগুলোও বলতে যাচ্ছিলেন, সেই সময় হঠাৎ দরজায় দুবার ঠকঠক করে টোকা পড়ল। কিন্তু দরজা খুলতে বাইরে কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। বরং একঝলক ঠান্ডা জোলো হাওয়া ঘরের মধ‍্যে পাক খেয়ে ঘুরে গেল আর সেই হাওয়ায় ভেসে আসছে আতরের উগ্র গন্ধ। ফেলুদা সঙ্গে সঙ্গে একছুটে উত্তরের বারান্দাটা থেকে এক-চক্কর লাগিয়ে এসে ঘরের ভিতর ঢুকে  মিটিমিটি হাসতে লাগলো। তারপর বললো,  “এটা তো ফিরদৌসী ঈত্বরের গন্ধ বলেই মনে হচ্ছে। নবাবী আমলে এসবের খুব চল ছিল। এখন অবিশ‍্যি প্রায় উঠেই গেছে…! তাহলে মনে হচ্ছে লালমোহনবাবুর পঞ্চাশতম রহস‍্য রোমাঞ্চ উপন‍্যাসে প্রখর রুদ্রের সাথে ঘসেটি বেগমের প্রেতাত্মার সাথে একটা মোলাকাতের দৃশ‍্য রাখতেই হচ্ছে!” 


“প্রে…প্রেতা.. ত্মা…” জটায়ুর মুখ ব্লটিং পেপার। ফেলুদা বলল,”আমার কোল্ট পয়েন্ট থ‍্রীটু থাকতে ভয় কি?”
 এরপর ভোররাত্রির সময় যা ঘটলো, সেটা চিরদিন মনে থাকবে। এইরকম একটা পরিবেশে এতদিন কাটানোর পর এই প্রথম বুঝলাম ফেলুদার নার্ভ কত স্টেডি। ও যে বাজিমাৎ করতে চলেছে সেটা যদিও বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু সেটা যে এভাবে হবে তা কল্পনার বাইরে ছিল। 
মাঝরাত পার করে রাত দুটো নাগাদ যখন সারা বাড়ি পুরো নিঝুম, তখন ফেলুদা আমাদের ঘুম থেকে ডেকে হঠাৎ তুলে দিলো। আমরা টর্চ আর দরজার হুড়কো-টাকে দুজনে হাতে নিয়ে ফেলুদার পিছন পিছন গিয়ে একটা চওড়া থামের আড়ালে গিয়ে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়ালাম। ফেলুদা আমায় ফিসফিসিয়ে বললো, “এখন  চুপচাপ খেলা দেখে যা। আমি না ডাকলে এগোবিনা…আর শোন জটায়ুকে কিন্তু একটু সামলে রাখিস!”
পাড়াগাঁয়ের রাত আড়াইটা মানে একেবারে গভীর রাত। অবিশ্রান্ত ঝিঁঝি আর ব‍্যাঙের ডাকের সাথে সাথে মনে হলো উত্তরের যমেশ্বরের মন্দিরের  দিক থেকে দু-একটা হুক্কা হুয়া ডাক শোনা খেল। ঘন্টাখানেক পর তারপর শুকনো পাতার ওপর মচমচ শব্দ শোনা গেল। কেউ যেন পা ফেলে এবার এদিকেই আসছে। ক্রমশ আওয়াজটা স্পষ্ট হলো। এবারে তার সাথে রুনুঝুনু করে নুপূরেরও শব্দ পাচ্ছি। তার মানে এই কি সেই বিদেহী আত্মা? 
ফেলুদা ওর রিভলবারটা বের করে ধীরে ধীরে সতের নম্বর কুলুঙ্গির দিকে এগিয়ে গেলো। ওর কথা মতো আমরা একটু দূর থেকেই নজর রাখছি। একটু পরে একটা সাদা কাপড় পড়া নারীমূর্তি কুলুঙ্গিটার কাছে এগিয়ে আসতেই ফেলুদা পিছন থেকে গিয়ে জুডোর প‍্যাঁচ কষে তাকে ধরাশায়ী করে ফেলে বুকের ওপর রিভলবার তাক করে বসে পড়লো। কিছুক্ষণ ওই  নারীমূর্তিটার সাথে ধস্তাধস্তি চলতে চলতে একটানে সাদা কাপড় আর সাদা পরচুলাটা খুলে দিতেই ফেলুদার ডান হাতে সে অতর্কিতে একটা ছোরা বের করে খানিকটা বসিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ফেলুদার বাঁহাতের একটা বিরাশি সিক্কার মুষ্টিযোগ শেষপর্যন্ত তার চোয়ালে পড়তেই   ‘আহআআআ’ আর্তনাদ করে যে অজ্ঞান হয়ে গেল সে যে আসলে ছদ্মবেশী কিঙ্কর, সেটা ততক্ষণে বুঝতে আর আমাদের বাকি নেই। কিন্তু এত রাতে সে কিজন‍্য এই রায়বাড়িতে? 


বারান্দার গোলমাল শুনে ততোক্ষণে ঘরে আলো জ্বলে উঠেছে। দেবীপ্রসাদ বাবু আর তাঁর বড়ছেলে দেবকুমার বাবু শশব‍্যস্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছেন।
তাঁদের আশ্বস্ত করতে ফেলুদা কিঙ্করকে দেখিয়ে বললো, “এই যে আপনাদের ঘসেটী বেগম!” 
ফেলুদার কান্ড দেখে ওদের সাথে সাথে আমাদেরও মুখ হাঁ হয়ে গেছে। আপাততঃ ফেলুদার হাতে ব‍্যান্ডেজ করা আর কিঙ্করের জ্ঞান ফেরানোর জন‍্য জলের ঝাপটা দেওয়াটা  চলছে। কিঙ্করকে ওঁদের বৈঠকখানার ঘরের একটা চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা হলো। ফেলুদা এবার ইস্পাতকঠিন ঠান্ডা স্বরে বললো – “আপনারা সবাই যখন উঠেই পড়েছেন তাহলে এখনই যবনিকা পতনটা সেরে ফেলি? কিন্তু দেবীপ্রসাদবাবু আপনার ছোট ছেলে আর বাড়ির মহিলাদেরকেও ডেকে আনুন। নইলে এতবড় একটা রহস‍্যের শেষাংশটা জানবেন কি করে? “

বাড়ির সবাই এখন বৈঠকখানায় জড়ো হয়েছেন। এই সময় হঠাৎ উঠে আসতে হয়েছে বলে দেবমাল‍্যবাবু একটু অসন্তুষ্ট হয়ে আছেন মনে হল। সুদেষ্ণাদেবী ততক্ষণে সবার জন‍্য গরম গরম কফি তৈরী করে এনেছেন। ভোর হতে আর বেশী দেরী নেই। ফেলুদার হাত থেকে রক্ত পড়াটাও বন্ধ হয়েছে। কিঙ্কর হতভম্ব হয়ে ঘোলাটে চোখে একবার আগ্রহী দর্শকদের দিকে তাকাচ্ছে আর একবার ফেলুদার দিকে দেখছে। তার চোয়ালের ব‍্যথাটা ভুলতে বেশ কদিন লাগবে বোঝা যাচ্ছে। 


ফেলুদা গলা খাঁকরিয়ে বলা শুরু করল। – ” আপনারা সবাই জানেন তিনদিন আগে আমি দেবীপ্রসাদ বাবুর আমন্ত্রণে আমরা এই রায়বাড়িতে আসি একটা ঐতিহাসিক মূল‍্যযুক্ত জড়োয়ার নেকলেস উদ্ধার করতে। এ সেই নেকলেস যা স্বয়ং ঘসেটী বেগম আপনাদের পূর্বপুরুষ দীনদয়াল রায়কে একটি বিশেষ কাজের জন‍্য অগ্রিম ইনাম হিসাবে দিয়েছিলেন। সে কাজটা যদিও আর করতে হয়নি তাঁকে। ঢাকায় স্বয়ং ঘসেটী বেগমের অপঘাত মৃত‍্যু আর রাজনৈতিক পালাবদলের সাথে দীনদয়ালেরও ভাগ‍্য ফেরে। ক্রমে এই অট্টালিকাটির সাথে পত্তন করেন আর একটি বিশেষ পূজোর রেওয়াজ। মনে হয় অপরাধবোধ অথবা অন‍্য কোনো সংস্কার বশতঃ এ বাড়ির কোন সদস‍্যার বদলে ওই নেকলেসটিকে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে যান। সেই থেকে বছরে একবার ওটি প্রকাশ‍্যে আনা হয় আর তারপর বর্তমানে ব‍্যাঙ্কের লকারে ঢুকে যায়। 
কিন্তু এবারে সেটা আর ঘটল না। গয়নাটি লকার থেকে এল ঠিকই কিন্তু রহস‍্যজনকভাবে সিন্দুক থেকে উধাও হয়ে গেল! কিন্তু প্রশ্ন এই যে সেটা হল কিভাবে?  এবাড়ির পুরনো ম‍্যানেজার প্রমোদবাবুর কাছে সব কটি ঘর ও সিন্দুকের ডুপ্লিকেট চাবি থাকে। বছরের বাকি সময়টা উনিই এই এস্টেটের দেখভাল করে আসছেন গত বিশ বছর ধরে।  কাজেই প্রমোদবাবুর কাছ থেকে সেই চাবি দিয়ে রায়বাড়ির গৃহিণী জয়শ্রী দেবীর অসর্তকতার সুযোগ নিয়ে ওটিকে সিন্দুক থেকে চুরি করাটাই খুব সহজ বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে এই কাজটি অবশ‍্য করে কিঙ্কর। তারজন‍্য এই বাপ-বেটাকে  মোটা টাকার লোভ দেখিয়ে সেটা করিয়েছেন অবশ‍্য একজন ভদ্রলোক। যদিও এরপর তাঁকে আর ভদ্র বলাটা উচিত হবেনা।”


দেবমাল‍্যবাবু উশখুশ করছেন দেখে ফেলুদা তাঁকে দাবড়ানি দিয়ে বললো, ” কি দেবমাল‍্যবাবু! বাকিটা আপনি বলবেন না আমিই বলব? শেয়ার বাজারে গত একবছরে কত লাখ টাকা খুইয়েছেন সেটা অবশ‍্য আপনাদের পেপার মিলের খাতার হিসেব মেলালেই ধরা পড়বে। কিন্তু পুত্রস্নেহে আপনার বাবা সেটা মেনে নিয়েছেন। অথচ বংশের মুখে এতবড় কালি মাখাতে আপনার একটুও বাধলো না? ” 
জটায়ুর মুখটা ক্রমে হাঁ হয়ে চোয়ালটা ঝুলে পড়ছে। ফেলুদা বলে চললো, “একটা জনশ্রুতি আছে যখনই কোন দুর্যোগ এসে উপস্থিত হয় তার আগে নাকি ঘসেটী বেগমের প্রেতাত্মাকে এ বাড়িতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়! এ গল্পটা প্রমোদবাবুর কাছ থেকে শুনে তার ছেলে লীড ফিমেল আর্টিস্ট কিঙ্করকে নকল চুল আর পরচুলা পরিয়ে প্রতি রাত্তিরে ঘসেটী সাজিয়ে মাঝে মাঝে বারান্দা ধরে দু-এক পাক হাঁটাতে থাকেন আসন্ন চুরির একটা পূর্বাভাস তৈরী করতে। সেদিন ওই গয়নাটা নিয়ে লুকোনোর সময় সে একদিন সুদেষ্ণাদেবীর সামনে পড়ে কেলেঙ্কারি বাঁধিয়ে ফেলছিল আর একটু হলেই। অবশ‍্য দেবমাল‍্য বাবু সেটা বুঝতে পেরে নিজে একটু দেরী করে ঘর থেকে বেরোনোয় তার পালানোর কাজটা সহজ হয়ে যায়। তারপর এ বাড়িতে থাকা একটা পুরোনো রেনকোটের হাতার অংশ ছিঁড়ে সেটা দিয়ে জড়োয়ার নেকলেসটা মুড়ে উত্তরের দীঘির ঘাটের সিঁড়ির নিচে একটা চোরা কুঠুরির মধ‍্যে রেখে আসা হয়। সারা বাড়ি আর চারপাশ ঘুরতে ঘুরতে আমি যখন দীঘিটার সবজায়গায় পানা থাকলেও এতবছর অব‍্যবহৃত হওয়া সত্ত্বেও ঘাটের একদিকের  কিনারার জল স্বচ্ছ দেখি তখনই আমার মনে প্রথম সন্দেহ হয়। এসব বাড়িতে ডাকাতির হাত থেকে ধনসম্পদ লুকিয়ে রাখতে গুপ্তঘর বা চোরাকুঠুরি থাকার কথাটা তখনই মাথায় আসে।  তারপর রিহার্সালের সময় সুযোগ বুঝে ঘাটের ধাপের পাশে কুঠুরির ভিতর থেকে আমি নিজে হাতসাফাই করে একসময় জড়োয়াটিকে সরিয়ে রাখি আর তার জায়গায় নুড়ির টুকরো ভরা একটা কাপড়ের পুঁটলি রেনকোটটার বাকী অংশ দিয়ে সীল করে রেখে আসি। আমার বন্ধু আর খুড়তুতো ভাইটি যখন এ বাড়ির কুলুঙ্গির বিশেষত্বের কথা যখন আমায় বলে তখন ব‍্যাপারটা আমার কাছে একদম দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে যায়। ওই সতেরো নম্বর কুলুঙ্গির কাছের ঘরটিতে থাকেন দেবমাল‍্য বাবু। আর দেখবেন ওইটির ভিতরের দেওয়ালের ওপরের দিকে শিরীষকাগজ ঘষে কিছুটা রঙ চটিয়ে ফেলা হয়েছে যাতে রেনকোটের টুকরো মোড়া গয়নাটি লিউকোপ্লাস্ট দিয়ে ভাল করে  সেঁটে রাখা যায় এবং দেবমাল‍্যবাবু ওটি সময়মতন সরিয়ে নিজের স‍্যুটকেসে চালান করতে পারেন। 

এই পুরো চুরির প্ল‍্যানটা অবশ‍্য কলকাতায় বসে ফোনে ফোনেই সারা হয়। আর নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে আর তার সাথে নিজের দাদাটিকে চাপে ফেলতে ইচ্ছে করেই ঘটনার দিন বিকেলে তিনি রায়বাড়িতে আসেন। কারণ ওটা অন্যসময় ওভারসিজ ব‍্যাঙ্কের লকারেই থাকতো আর দেবকুমারবাবুই শেষবারের মত ওটা এনে ওঁর মায়ের হাতে তুলে দেন…কাজেই!” 
দেবীপ্রসাদ বাবু বিস্ফারিত চোখে ফেলুদার কথা শুনছেন আর একবার করে ছোটছেলেকে দেখছেন। দেবমাল‍্যবাবু অবশ‍্য ততক্ষণে মাথা নীচু করে বসে আছেন একদম স্পীকটি নট হয়ে। 
এবার পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা কাপড়ের মোড়ক বের করে জয়শ্রীদেবীর হাতে ফেলুদা তুলে দিল। মোড়কটা সরাতেই ভোরের প্রথম সূর্যের  আলো পড়ে জড়োয়ার নেকলেসটার ভিতরে বসানো অসংখ‍্য ছোটো ছোটো হীরেগুলো ঝলসে উঠলো। আর সেই নবাবী জড়োয়ার মধ‍্যিখানে বসানো  বার্মিজ চুনীর মাঝখানের সেই খাঁজকাটা কমলহীরেটার মধ‍্যে থেকে একটা ছ’কোণা উজ্জ্বল রশ্মি এসে পড়েছে ফেলুদার ঝকঝকে দুটো চোখে। 
একটা নতুন সকাল এখন রায়বাড়িতে। আর একটু পরেই পুজোর তোড়জোড় শুরু হবে।  ঠিক সেইসময় দেখলাম রায়বাড়ির গৃহিণী  জয়শ্রীদেবীর চোখে জল টলমল করছে ঠিক ওই কমলহীরেটার মতোই।
********
(কৃতজ্ঞতা স্বীকার – শ্রী সত্যজিৎ রায়)

আপনার মতামত:-