Home » ছোটোগল্প » মধুহীন কোকনদে

মধুহীন কোকনদে

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

মাইকেলের মৃত্যুশয্যার পার্শ্বে ভূদেব আসিয়া একবার দাঁড়াইলেন। অচিরেই তাঁহার  দুটি চক্ষু বাষ্পআকূল হইয়া গেল। এই কি তাহার সেই পরমমিত্রবর,  অভিজাত বংশীয়, সেই দত্তকুলোদ্ভব শ্রীমধুসূদন? এ যে অবিশ্বাস্য যেন! তাহার ছাত্রাবস্থা থেকেই সেই সুপেয় মদ্য ও অমোঘ কাব্যপ্রীতির এ কী সকরুণ অবশেষ! 
মাইকেলের গতকাল রাত্রি দ্বিপ্রহর হইতে শেষ সম্বল  বাকশক্তিটিও বিগত হইয়া সে আপাততঃ তাহার আসন্ন মৃত্যুর প্রতীক্ষায় রত। প্রিয়তমা পত্নী অঁরিয়েটও কিছু দিবসের পূর্বে বিনাচিকিৎসার ফলে গতায়ু হইয়াছেন আর সে হতভাগ্য নিজেও তাহা জানিতেই পারে নাই। ভূদেব এইসব কারণে স্তব্ধবাক হইয়া চোখের জল থামাইতে পারেনা আর। অভাগা মধু’র গৃহে এক্ষণে তাহাদের শিশু পুত্রকন্যাগণ বোধহয় উপবাসে বসিয়া রহিয়াছে। হে ঈশ্বর!

এ নির্মম দীনতা কি মধু’র কাম্য? যে কিনা একদিন স্পর্ধিত ভাষায় আসিয়া মেঘনাদবধকাব্য লিখিয়াছে? আজ এই চরম দৃশ্যটির সাক্ষী হতে তাঁহাদের বাল্যের আর এক বন্ধুবর গৌরদাস আর তিনি ভিন্ন মধু’র শেষসময় আর যে কেহই নাই। 

মনোদুঃখে কাতর হইয়া হাসপাতাল  ছাড়িয়া যাইতে যাইতে দেখিলেন গৌরদাস একটি কাপড়ে সযত্নে মধু’র ওষ্ঠপ্রান্ত হইতে নির্গত ক্ষীণ রক্তধারা জননীর স্নেহে মুছিয়া দিয়া একবার নিজের মুখখানি ঢাকিল। 
হায়! প্রিয়তম মিত্র মধু যে কখন ভবসাগর পার করিয়া চলিয়া গেছে অসীমলোকের পথে।
“বঙ্গের পঙ্কজ রবিগেলা অস্তাচলে….”

মধু যে আর সত্যিই ইহজগতে নাই ভাবিতে ইচ্ছা করিতেছে না!বরং বারবার মনে পড়িতেছে তাহার কৈশোরদিনের হাস্যোজ্জ্বল স্মৃতিগুলিই।  কতদিন আগে সে এ্যক্রসটিক ছন্দ তখনই আয়ত্ত করিয়া সবাইকে লিখিয়া চমকাইয়া দিত। তাহার মনে তখন বাসনা ছিল একদিন য়ুরোপীয় কবি মিল্টনের ন্যায় কাব্য সেও লিখিয়া জগতের বুকে খ্যাত হইবে। 

কিন্তু এই কবিবর বোধকরি তখন জানিত না যে তাহার হৃদয়ে আজীবন ধরিয়া জননী জাহ্ণবীই বহিয়া চলিয়াছে আজন্মকালের কপোতাক্ষের মৃদুমন্দ গতিটির সাথেই।
সেদিন তাহার ধর্মত্যাগের বাসনা আর অসময়ে নিজেকে ধীরে ধীরে শেষ করিবার প্রবল ইচ্ছা ভূদেব কখনো মন থেকে মানিতে পারে নাই।

 মিত্রবরটি যে বড়োই খেয়ালী ও জেদী প্রকৃতির তাহা বিলক্ষণ জানিতেন। আবার এ হেন মধু’ই যে মাতৃভাষারূপ খনিটির সন্ধান একদিন ঠিক পাইবে এও যেন অবধারিতই ছিল। 
হাসপাতালের বিনামূল্যের বিছানায় আজ যে মৃতদেহটি করুণভাবে শুইয়া আছে সেই কি তাঁর মিত্র শ্রীমধুসূদন? এ প্রশ্নের প্রত্যুত্তরে চোখের অবিরাম ধারা ভিন্ন এক্ষণে তিনি আর কিই বা দিতে পারেন পরমজনটিকে। 
উত্তরপাড়ায় তিনি দ্রুত খবর পাঠাইলেন। রাজা জয়কৃষ্ণ এ খবর শুনিয়াই শতব্যস্ততাতেও  না আসিয়া থাকিতে পারিবেন কি?

দ্বিপ্রহরের পরে ঠিক হল লোয়ার সার্কুলার রোডে যে খ্রীস্টানদিগের কবরখানা আছে সেইখানেই তাহাদের মধু’কে তাহার প্রিয়তমাটির পার্শ্বেই শেষবার আনিয়া শোয়াইতে হবে। 
হে পরম কারুণিক! এইটুকুও অধিকারওকি তাহাদের মধু পাইতে পারিবেনা? 
সে অবাধ্য হইয়া আপন প্রতিভাকে অপচয়ের পথে জলাঞ্জলি দিলেও সে যে প্রকৃতই কৃতী সেটাতো আর কেহই অস্বীকার করিতে পারিবে না এখন। বাংলাভাষায় মধু যাহা আজ লিখিয়া গিয়াছে তাহা লোকে অনন্তকাল ধরিয়া সম্মানের সাথেই পড়িবে। 

এক্ষণে বাদুড়বাগানের বাড়ী হইতে কাঁদিতে কাঁদিতে বিদ্যাসাগর মহাশয় আসিয়া মধু’র  ললাটে তাঁর শিরোশ্চুম্বনটি করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতেই আবার চলিয়া গেলেন। মধু’র শেষকৃত্য যথাযথ মর্যাদার সহিত যাহাতে হয় সেজন্য কুড়িটি টাকা মধু’র চরণে আহুতি দিয়া আবার পরক্ষণে “ভিড্” নিজেই প্রবল মনোকষ্টে ভাঙিয়া পড়িয়াছেন দেখিয়া গৌরদাস তাঁহাকে ধরিয়া ধীরে বহির্দ্বারের দিকে লইয়া গেলেন। 
আজ কলিকাতার আকাশও কৃষ্ণকায় মেঘে মুখ ঢাকিয়া গম্ভীর ও শোকস্তব্ধ। এইবার সকলে একে একে  মধু কে লইয়া শবানুগমন করিল। 

সে এমনি হতভাগ্য যে কিছুদিন আগেই নিজের এপিটাফটিকে সে নিজেই অলংকৃত করিয়া দিয়াছে তাহার সেই অমিত্রাক্ষর ছন্দের অনিবার্য অক্ষরে। 
মহাকালের স্রোতে যদি কেহ দয়া করিয়া তাহার সেই সমাধির কাছে আসিয়া যদি একবার প্রিয়স্পর্শ উন্মুখ মধু’র নিকটে কিছুক্ষণ  দাঁড়াইয়া থাকে, তবে যেন সেই পথিকের পায়ের একটু পদধূলির জন্য তৃষিত থাকিবে বঙ্গভাষার কূলতিলক কবি ও সদাভাগ্যবিড়ম্বিত এই দুটি সম্মিলিত পরিচয়ের নিভৃত শবাধারে শায়িত সেই  চিরপ্রণত শ্রী মধুসূদন দত্ত।
” দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তববঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতিবিরাম) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃতদত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!”
…………………..
Attachments area

You need to add a widget, row, or prebuilt layout before you’ll see anything here. 🙂

আপনার মতামত:-