Home » বরেণ্য বাঙ্গালী » বাংলার বিপ্লবী সৈনিক কানাইলাল দত্ত

বাংলার বিপ্লবী সৈনিক কানাইলাল দত্ত

সোমনাথ সিনহা

বিচারকের প্রশ্ন ছিল – তুমি কোথা থেকে রিভলভর পেয়েছিলে … কে তোমাকে রিভলভর দিয়েছিল? উত্তর এলো, ক্ষুদিরামের ভূত … ক্ষুদিরাম বসুর ভূত আমাকে এই রিভলভর দিয়ে গেছে স্যার।
জীবন-মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে, ভরা আদালতে, ১৯০৮ সালের সেইসময়ের সবচেয়ে হাইভোল্টেজ ‘মুরারীপুকুর বোমা মামলার’ মধ্যে ‘নরেন গোঁসাই হত্যা মামলায়’ বিচারকের প্রশ্নের উত্তরে এইভাবে মস্করা করার মতো বুকের পাটা তাঁর ছিল – তিনি বাংলার বিপ্লবী সৈনিক কানাইলাল দত্ত। 


কানাইলাল দত্ত যে বাড়িতে থাকতেন তার দক্ষিণ দিকে কিছুটা দূরে এক পল্লী ছিল। সেই পল্লীতে প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে সাহেবদের মদের আসড় বসতো। সাহেবরা মদ খেয়ে প্রচণ্ড হৈ-হুল্লোড় করতো আর আশেপাশের সাধারণ মানুষকে ধরে ধরে মারতো। একদিন কানাইলাল আর সহ্য করতে না পেরে একাই সেই পল্লীতে যান। সেখানে গিয়ে সাহেবদের এইসব কাজ করতে নিষেধ করেন। তাতে হৈ-হুল্লোড় মাত্রা আরোও বেড়ে গেল। এবার হঠাৎ এক সাহেবের নাকের ওপর এসে পড়ল এক ঘুসি, সাহেব তিনপাক খেয়ে সোজা নর্দমায়। অবস্থা দেখে বাকি সাহেবরা ছুটে পালাতে লাগল। কানাইলাল তাদের তাড়া করে আর একজন কে ধরে দিল আরেক ঘুসি, এবারে সেই সাহেব এক ঘা’তেই অজ্ঞান। না, একজন ভারতীয় বাঙালির হাতে মার খেয়ে লজ্জায় কোনও সাহেবই থানায় অভিযোগ জানায়নি, আর তারপর থেকে সেই পল্লীতে সাহেবদের মদের আসড়ও বন্ধ হয়ে যায়।


কানাইলাল দত্ত অনেক কম বয়স থেকেই বক্সিং অভ্যাস করতেন। ছাত্র অবস্থায় তাঁর বিভিন্ন সাহসের পরিচয়ে স্বয়ং মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসুও মুগ্ধ ছিলেন, তৈরি হয়েছিল নিবিড় যোগাযোগ। বাবার কাজের সূত্রে কিশোর বয়স পর্যন্ত কাটে বম্বেতে (মুম্বই)। মেধাবী কানাইলাল ফিরে এসে জন্মস্থান চন্দননগরে ভর্তি হন ডুপ্লে কলেজে (বর্তমানে কানাইলাল বিদ্যামন্দির)। বি.এ পরীক্ষা দেন হুগলির মহসিন কলেজ থেকে। পড়ার সময় প্রখ্যাত বিপ্লবী ডুপ্লে কলেজের অধ্যক্ষ চারুচন্দ্র রায় ও মহসিন কলেজ অধ্যাপক জ্যোতিষচন্দ্র ঘোষের সান্নিধ্যে আসেন। অনেক বিপ্লবী কাজে, সভা-সমিতিতে কানাইলাল জড়িয়ে পড়েন, নিজে তৈরি করেছিলেন এক ‘ব্যায়াম সমিতি’।

এই ব্যায়াম সমিতির আড়ালে বিপ্লবী কাজকর্ম, দুঃস্থ মানুষের সেবার কাজ চলত। ১৯০৭ সালে বিজয়া দশমীর দিন সন্ন্যাসীর বেশে বারীন ঘোষ চন্দননগরে এলে বিপ্লবী সংগঠন আরো জোরদার হয়। বন্ধু মতিলাল রায়ের সাথে সেই সংগঠনে আসেন কানাইলাল দত্ত। তবে তিনি কলকাতায় বারীন ঘোষের ডাকে ‘গুপ্ত সমিতি’তে যোগ দেন বি.এ পরীক্ষার পরে। তাঁকে ‘পি.এম’ কাজের ভার দেওয়া হয়, অর্থাৎ – পলিটিক্যাল মার্ডার। সেইজন্য কানাইলাল বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগোর থেকে বোমা তৈরির শিক্ষাও নিয়েছিলেন। অসাধারণ সংগঠক শিক্ষিত কানাইলাল সেই সূত্রেই কলকাতার শ্যামবাজারে ১৫ নং গোপীমোহন দত্ত লেনে তৈরি করেছিলেন ‘যুবক সমিতি’।

৩০ এপ্রিল, ১৯০৮, কিংসফোর্ট হত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হবার পরে প্রফুল্ল চাকী আত্মহত্যা করলেও ক্ষুদিরাম বসু ধরা পড়ে যান। সেই সূত্রে গোপীমোহন দত্ত লেন থেকেই ২ মে, ১৯০৮, ভোর রাত্রে, ইংরেজ পুলিশ কানাইলাল দত্তকে গ্রেপ্তার করে, সঙ্গে নির্মল রায়। তার আগে সেই রাত্রেই মুরারীপুকুর বাগান বাড়ি থেকে প্রচুর বোমা-বন্দুকের সাথে বারীন ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত সহ ৩৪ জন বিপ্লবী ধরা পড়ে গেছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৮নং গ্রে স্ট্রীট থেকে অরবিন্দ ঘোষ সহ আরো তিনজন; ১৩৪নং হ্যারিসন স্ট্রীট থেকে দুই কবিরাজ ভাই নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত ও ধরণীনাথ গুপ্ত সহ আরো তিনজন; ৩৮/৪ রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রীট থেকে হেমচন্দ্র কানুনগো। পরে চন্দননগরের ফরাসী সরকার অধ্যক্ষ চারুচন্দ্র রায়কে গ্রেপ্তার করে ইংরেজ সরকারের হাতে তুলে দেয়।

গ্রেপ্তার হবার কিছুদিন পরে, বাংলা তথা সাড়া দেশের মানুষের সামনে বিপ্লবের কীর্তি তুলে ধরার জন্য বারীন ঘোষ স্বীকারোক্তি দেওয়া স্থির করেন। যদিও এতে দলের মধ্যে প্রচণ্ড মতোবিরোধ তৈরি হয়; আর এই স্বীকারোক্তিতেই ইংরেজ পুলিশ শ্রীরামপুরের জমিদার পুত্র নরেন গোস্বামী বা গোঁসাইকে গ্রেপ্তার করে। যে উচ্চ আদর্শের প্রচারের জন্য বারীন ঘোষের এই চেষ্টা, তার উল্টো ফলে নরেন গোঁসাই ফাঁসির ভয়ে রাজসাক্ষী হয়ে পুলিশকে সবকিছু জানিয়ে দেয়। এখানেই বারীন ঘোষ ও নরেন গোঁসাইয়ের স্বীকারোক্তির পার্থক্য। ফলে মন্ত্রগুপ্তি ভাঁঙার অপরাধে নরেনকে হত্যার পরিকল্পনা হয়, যদিও অরবিন্দ ঘোষের তাতে মত ছিল না।

সবসময় পুলিশি ঘেরায় থাকা নরেন’কে হত্যার জন্য বাংলার বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বিপ্লবী গুপ্ত দলের ওপর সেই দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই অসম্ভব কাজে কেউ রাজি না হলেও একমাত্র মেদিনীপুর বিপ্লবী দল সেই দায়িত্ব নেয়। বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বা সত্যেন বসুকে এর আগে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল, মেদিনীপুর বিপ্লবী দল নরেন হত্যার দায়িত্ব তাঁকে দেয়। সত্যেন বসু অরবিন্দ ঘোষের থেকে বয়সে ছোট হলেও সম্পর্কে তাঁর মামা হন। দায়িত্ব পেয়ে সত্যেন বসু হাঁপানি রোগী সেজে জেল থেকে হাসপাতালে ভর্তি হন। জেলের বিপ্লবীদের কাছে সত্যেন বসুর এই খবর পৌঁছে গেলে হঠাৎ কানাইলাল দত্ত দলের কাউকে কিছু না জানিয়ে পেটব্যাথা বলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যান। হাসপাতালেই এই দুই বিপ্লবীর পরিচয় ও পরিকল্পনা হয়ে যায়। ইতিমধ্যে বারীন ঘোষ জেল ভাঁঙার পরিকল্পনা করার জন্য বন্দুক সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছিলেন। সেই সূত্রে বিপ্লবী শ্রীশচন্দ্র ঘোষ ও মতিলাল রায় দুটি রিভলভর দুভাবে জেলের মধ্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তারমধ্যে একটি কাঁঠালের মধ্য এসেছিল বলে পরে জানা যায়। জেল থেকে সেই দুটি রিভলভর হাসপাতালে সত্যেন বসু ও কানাইলাল দত্তের হাতে পৌঁছে যায়। বাইরে থেকে জেলের ভেতরে আবার জেল থেকে হাসপাতাল, বন্দুক আনার মূল কারিগর ছিলেন কানাইলাল দত্ত।

এবারে পরিকল্পনা অনুসারে হাঁপানির কষ্ট ভুগতে ভুগতে সত্যেন বসুর ‘মনে হল’ তিনিও রাজসাক্ষী হবেন। দেখা করতে চাইলেন নরেন গোঁসাইয়ের সাথে, কিছু গোপন কথা আছে। কাজ হল, টোপ গিলল নরেন, অতি আনন্দে বিশ্বাস করল ব্রিটিশ সরকার। সামনাসামনি কথা চললো কিছুদিন। ‍১লা সেপ্টম্বর, ১৯০৮, সোমবার, (মতান্তরে ৩১ আগস্ট) সবে সকাল, দুই অসুস্থ বিপ্লবীর জন্য পাহারা ঢিলেঢালা। এই সময়ে নরেন দেখা করতে আসে, সুযোগ বুঝে প্রথম গুলি চালায় সত্যেন বসু। গুলি নরেনের উরুতে লাগে, তবু নরেন দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে পালাতে থাকে। সেখানে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা কানাইলাল দত্ত এই সময় নরেনকে গুলি করলে নরেন পড়ে যায়। এরপর সত্যেন বসু ও কানাইলাল দত্ত একসাথে নরেনকে গুলি করেন।

নরেন’কে না মারলে সেদিন সাড়া বাংলায় যতটুকু বিপ্লব বেঁচে ছিল, তাও থাকত না। বিশ্বাসঘাতক, রাজসাক্ষীর হত্যার পরে বাংলার বহু জায়গায়ে মিষ্টিমুখ হয়। বিচারে দুই বিপ্লবী কারুর নাম মুখে আনেননি। যদিও কানাইলাল দত্ত নরেন হত্যার দায় নিজ মুখে স্বীকার করেছিলেন, পূর্ব পরিকল্পনায় সত্যেন বসু অস্বীকার করেছিলেন। রিভলভরের ব্যাপারে কেউ কিছু জানান নি। বিচারে দুই জনেরই ফাঁসির হুকুম হয়ে যায়। কানাইলাল দত্তের ফাঁসি হয় আগে ১০ নভেম্বর, সত্যেন বসু আপীল করায় কিছুটা পিছিয়ে হয় ২৩ নভেম্বর।

শোনা যায় কিশোর বয়সে কানাইলাল দুই লিটার মহিষের দুধ খেতেন, চিরবিদায়ের আগে মা’য়ের কাছে মুড়ি আর দুধ খেতে চেয়েছিলেন। ফাঁসির আগে ওজন বেড়ে গেছিল, তাঁর হাসিখুশি চেহারা দেখে জেল কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায়। এক ইংরেজ সাহেব বারীন ঘোষকে এসে জিজ্ঞাসা করে, তোমাদের হাতে এইরকম ছেলে আর কতগুলি আছে? সবচেয়ে আশ্চর্য, যা কেউ কোনও দিন ভাবতে পারবে না যে ফাঁসির দড়ি নিজের গলায় কানাইলাল দত্ত নিজেই ঠিক করে বসিয়ে নিয়েছিলেন। যে উন্মত্ত জনতা কালীঘাটের শ্মশানে তাঁর দেহের ওপর ফুল ফেলতে আর তাঁর চিতার ছাই সংগ্রহের জন্য ছুটে আসেন, তাতে প্রমাণিত হয় কানাইলাল দত্ত মরেও মরেন নি।
ফাঁসির মঞ্চে বাংলার দ্বিতীয় শহীদ কানাইলাল দত্তের শহীদ দিবসে জানাই শত শত প্রণাম।

জন্ম – ১৮৮৭, ১০ সেপ্টম্বর – মতান্তরে ১৮৮৮, ৩০ আগস্ট – মতান্তরে ৩১ আগস্ট

পিতা – চুনীলাল দত্ত

মাতা – ব্রজেশ্বরী দেবী

শহীদ – ১০ নভেম্বর, ১৯০৮

তথ্যসূত্র: @বিপ্লবী কানাইলাল : জ্যোতিপ্রসাদ বসু;@আমার দেখা বিপ্লব ও বিপ্লবী : মতিলাল রায়।।

আপনার মতামত:-