Home » ছোটোগল্প » অলৌকিক

অলৌকিক

অঙ্কুশ

এরকম যে অদ্ভুত বিপদ এসে পড়বে তা কে জানতো…

ফেসবুকে ঘোরার গ্রুপে জায়গাটার নাম দেখেছিলো সুমন্ত। বেশ আনকোরা জায়গা, বেশ অপরিচিত, সুমন্ত এরআগে নামই শোনেনি। পুরুলিয়ায় মার্চ পলাশের জন্য বেশ রঙিন, ওয়েদারও বেশ ভালো। খুব ঠান্ডাও নয় আবার গরমও নয়, রাতে একটা পাতলা চাদর গায়ে দিয়ে আরাম করে ঘুমোনো যায়। গাছ ভর্তি থাকবে পলাশের লালে, তার মাঝখান দিয়ে চলে গেছে পিচের রাস্তা। দেখেই ঠিক করে নিয়েছিলো যাওয়ার কথা। সেই মতো ব্যাগ প্যাক করে লেন্স-ট্রাইপড নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলো। মুরুগামা ড্যাম এর পাশেই জায়গাটার ছবি তুলে বিকেল করে বেরোনোর কথা। কিন্তু তার আগেই বাইকটা গেলো বিগড়ে।

সারানোর দোকানের খোঁজ করতে গিয়ে জগদীশ মাহাতোর সঙ্গে আলাপ। ড্যামের পাশে কোনোরকমে একটা অস্থায়ী ছোটো দোকান, চিপস-গুটখা টুকটাক কটা জিনিস। জগদীশ দোকান লাগাচ্ছিলো, বেলা তো পড়েই এলো। সঙ্গে অমল, ওর সাত বছরের ছেলে। দুজনে খোশমেজাজে কিছু আলোচনা করছে আর হাসছে। মনে হচ্ছে যেনো ওরা এই জটিল দুনিয়াটার অংশ নয়, ওরা পেপার পড়েনা, ফেসবুক খুলে হিংসা-মারামারির খবর দেখেনা। বাপ-ব্যাটা মিলে ছোট্ট দুনিয়ায় বেশ আছে।

সুমন্ত গিয়ে জগদীশের কাছে বাইক খারাপের কথা বললো। কাছেই একটা গ্যারাজ। সুমন্ত বাইক ঠেলতে লাগলো। ওরাও আর সাইকেলটায় চড়লো না, তিনজনে মিলে হাঁটতে লাগলো ড্যামের পাশ ধরে। আকাশের রঙ ক্রমেই ফ্যাকাশে হতে থাকলো, ক্রমে প্রায় হঠাৎ করেই অন্ধকার হয়ে গেলো।

বাইকের দোকানে গেট নামাচ্ছিলো। আলো বিশেষ নেই, এই আলোয় সারানোর কাজ করা মুস্কিল। হলোও তাই, বললো, বাবু রেখে দ্যান বাইকটা, সকাল সকাল সারিয়ে রেডি করে রাখবো।

সুমন্ত পড়লো ফ্যাসাদে। আশেপাশে হোটেলও নেই। এতো সন্ধ্যায় যাবে কোথায়। মোবাইলের চার্জও নেই বেশী। জল, খাবারও নেই, আগে জানলে আনা যেত। কিন্তু এখন এই অজ জায়গায় এই অন্ধকারে..

জগদীশই সমাধান বাতলালো।

আসুন, আমাদের গরীবখানায় থেকে যান, একটা রাতের তো ব্যাপার, সকাল সকাল বেড়িয়ে পড়বেন।

উপায় মন্দ নয়। গ্রামে থাকা হবে। অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা।  সে অভিজ্ঞতা ভালোও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। সারাদিন কাজের পর গরম জলে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করা সুমন্তর অভ্যাস। সেটা পেলে ভালো হতো। যাই হোক, এখন এতো খোঁজাখুজির চেয়ে এটা ভালো অপশন।

তিনজনে হাঁটা লাগলো। জগদীশের ছেলে বেশ চনমনে,  দিব্যি গল্প জমে গেলো। তুমি কলকাতায় থাকো, কলকাতা কত বড়ো জায়গা না, আমি কখনো যাইনি, বইয়ে ছবি দেখেছি, ট্রামের ছবি দেখেছি খুব চাপতে ইচ্ছা করে। সরল কথাবার্তা।

হাঁটার পথ আরও অন্ধকার হতে থাকে। রাস্তা যেনো সাপের মতো বেঁকে গেছে। সুন্দর গন্ধ বইছে বাতাসে। ঝিঁঝিঁর ডাক আরও তীব্র হচ্ছে। জগদীশ টর্চ বার করে।

অনেকক্ষন হাঁটার পরে একটা গ্রামে পৌছয় ওরা। কয়েকটা মাটির বাড়ি পরপর। হ্যারিকেন ঝোলানো মাটির দরজার বাইরে। আবার বাড়ির সারি শেষ হয়। অনেকগুলো গাছ পেরিয়ে আর একটা মাটির বাড়ি। এই বাড়িটার আশেপাশে কোনো বাড়ি নেই। এটাই জগদীশদের বাড়ি।

জগদীশ হ্যারিকেন জ্বালায় একটা। আর একটা মাটির কুপি। কারেন্ট থেকেও নেই। সারাদিনে কয়েকঘন্টা মাত্র থাকে। অবশ্য জগদীশদের দেখে মনে হচ্ছে তাতে ওদের কিছু যায় আসেনা, ওরা এতেই অভ্যস্ত। তিনজনে পা-হাত ধুয়ে জামা পাল্টে নেয়। সুমন্ত ট্র‍্যাকসুট পড়ে নেয়।

জগদীশ কিছুক্ষনে চানাচুর দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে আনে। আর দুধ চা। তিনজনে খেতে বসে। উপরে খোলা আকাশ। আজ পূর্নিমা। চাঁদ পূর্ণ তেজে আলো ছড়িয়ে চলেছে। সুমন্ত ক্যামেরা ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে। অমল হাঁ করে চেয়ে থাকে ক্যামেরার দিকে। এর আগে ও কখনো ক্যামেরা দেখেনি। ক্যামেরার ছবি দেখে আর অবাক হতে থাকে।

একটা প্রশ্ন এখানে আসার পর থেকেই সুমন্তর মনে উশখুশ করতে থাকে। জগদীশ একটু পাশ হতেই অমলকে প্রশ্ন করে সুমন্ত, হ্যাঁ রে তোর মা নেই?

প্রশ্নটা করার পরেই সুমন্ত জিভ কাটে। জগদীশ আবার কখন ফেরত এসেছে খেয়ালই করেনি।

জগদীশ গলা নামিয়ে বলে, আমরা জানিনা ওর মা আছে কী নেই। দু-বছর আগে এরকম একটা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আর ওকে দেখতে পাইনি। অনেক খুঁজেছি, পুরো গ্রাম তল্লাশি করেছি, কোথাও পাইনি..

-পুলিশে জানাননি?

-পুলিশ কী আর আমাদের কথা শোনে?

-কেনো শুনবে না? এফ আর আই করতে পারতেন

-করেছি। কিন্তু কতটা খোঁজা হয়েছে সন্দেহ আছে।

হঠাৎ সবাই চুপ করে যায়। একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা চারিদিকে। ঝিঁ ঝিঁ গুলোও যেনো সুযোগ বুঝে চুপ করে গেছে।

জগদীশই নিস্তব্ধতা কাটায়। অমলের দিকে তাকিয়ে বলে, আজ ভৈরবদেবের পূজো, মনে আছে তো তোর?

সুমন্ত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ভৈরবদেব? এরকম তো নাম শুনিনি আগে?

জগদীশ বলে যায়, এখানকার স্থানীয় দেবতা। ভীষণ জাগ্রত। আজ থেকে অনেক অনেক বছর আগে ভৈরবদেবের পুত্র মারা মারা যায় রোগে। ভৈরবদেব তখন পুত্রের দেহকে সামনে রেখে ধ্যানে বসেন। দিন যায় রাত যায় কিছু না খেয়ে ধ্যান করে যান। শেষে এরকম বসন্ত মাসের পূর্নিমার রাতে দেবতারা প্রসন্ন হয়ে ভৈরবদেবকে বর দেন। সামনে যে পুকুরটা আছে সেখান থেকে জল এনে মাথায় ছিটিয়ে চোখ বন্ধ করে ভৈরবদেব যা ইচ্ছা করবেন, তা পূরণ হবে। এইভাবে ভৈরবদেবের মৃত পুত্র জেগে ওঠেন। তারপর থেকে বসন্তের এই পূর্নিমায় ভৈরবদেবের পূজা হহে থাকে। আজ সেই রাত।

সুমন্ত স্তব্ধ হয়ে গেলো। একবিংশ শতকে এসেও যে মানুষ এসব আজবুজি গল্প বিশ্বাস করতে পারে, ভাবতে অবাক লাগে।

সুমন্ত প্রশ্ন ছুড়ে, আপনি এসব বিশ্বাস করেন?

জগদীশ ঠিক করে উত্তর দেয়না। প্রেসারের সিটি বেজে ওঠে। জগদীশ সেদিকে যায়।

কিছুক্ষন পর জগদীশ পুজোর থালা সাজিয়ে হাজির হয়। একটা পিতলের ঘট আর কটা ফুল।

জগদীশ বুঝিয়ে দিলো সব, খালি পায়ে যেতে হবে, জল তোলার পুরো সময়টাতে কারও সঙ্গে কথা বলা যাবেনা, এসে প্রথমে ঘটের জল দরজার কাছে ছড়িয়ে তারপরে মাথায় দিয়ে যেটা ইচ্ছা মনে মনে বলতে হবে। জগদীশ সুমন্তকে জিজ্ঞেস করে সে-ও যাবে নাকী, না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বে।

সুমন্ত ভাবলো বেশ একটা অন্যরকমের অভিজ্ঞতা হবে, আর ভালো ছবিও পেয়ে যেতে পারে। ক্যামেরা রেডি করে বেড়িয়ে পড়লো বাবা-ছেলের সঙ্গে।

পুকুরের চারপাশে টিমটিম করে জ্বলছে আলো। কুপির, লন্ঠনের। সবাই কোনো কথা না বলে কুপি বা হ্যারিকেন উপরে রেখে জল ভরতে লাগলো। পুকুরের ঠিক মাঝখানে চাঁদের প্রতিচ্ছবি। হাওয়া চলার আওয়াজ বয়ে চলেছে.. সুমন্তর মনে হলো সে থেকে গিয়ে ভুল কিছু করেনি। এই রাত অনেকদিন মনে থেকে যাবে। ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বার করে শাটারে হাত দিলো।

জল নিয়ে এসে জগদীশ দরজার মুখটায় ছড়িয়ে দিলো। তারপরে মাথায় জল ছিটিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে প্রনাম করে চোখ বুঁজলো।

সুমন্ত তাদের দিকে চেয়ে রইলো। পুরো মুখ জুড়ে প্রচন্ড সরলতা। কী চাইছে ওরা ভৈরবদেব নামক আজগুবি দেবতার কাছে? জগদীশ হয়তো আর্থিক নিরাপত্তা চাইছে, যাতে অমলকে ও ভালো স্কুলে ভর্তি করতে পারে, ঠিকমতো খাওয়াতে-পরাতে পারে। পুঁচকুটা কী চাইছে? হয়তো ও স্বপ্ন দেখছে ওর মা আবার ফেরত আসবে, এরকম এক পূর্নিমার রাতে ওর মা ওকে চাঁদ দেখাবে, ঘুমিয়ে পড়লে রেগে-বকে-আদর করে তুলে ‘এই তো এই ভাতটা তোর দাদুর জন্য’, ‘এটাই শেষ, দাদুকে খাওয়াবি,দিদুনকে বাদ দিয়ে দিবি?’ বলে বলে কখন একথালা ভাত খাইয়ে দেবে…

জন্ম থেকে কলকাতায় বড়ো হওয়া চরম আধুনিকমনষ্ক সুমন্তর হঠাৎ করে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করলো ভৈরবদেব নামে এক দেবতা সত্যিই আছে, তার কাছে যা প্রার্থনা করা হয় সেটা সত্যিই সত্যি হয়ে যায়।

অজান্তেই কখন সুমন্তর চোখ বুজে এলো।

আপনার মতামত:-