অন্তরীপ মণ্ডল

না রে না না…50-50! বলা যায়না, গোটাটাই একটা বড়সড় ভাঁওতা হতে পারে। লোকে বিজ্ঞান শুনেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে, কিন্তু তার তলে তলে যে কতকিছু চলে তা যারা এর ভিতরে না ঢুকেছে তাদের পক্ষে জানা অসম্ভব, আর যারা ঢুকেছে তাদের রুটিরুজি থেকে সমাজে প্রতিপত্তি সবেরই চাবিকাঠি বাঁধা এই ঘোলাজল আর বেশী ঘোলা না করায়।

IISER-এর ছাত্র হওয়ার সুবাদে প্রথম দু’বছর আমাদের বিজ্ঞানের সব শাখা-ই পড়তে হত, সেমেস্টার শেষে একটা করে প্রজেক্ট করতে হত। তাতে যে লোকে কিসব যাইতাই প্রজেক্ট করত, বিশেষ করে বায়োলজিতে, তা বলে বোঝানো যায়না। অথচ সবই দিব্যি টপাটপ টপ গ্রেড নিয়ে পাশ হয়ে যেত। আমি নিজেই যে কতরকম জালিয়াতি করেছি তার ইয়ত্তা নেই। জলে পেরেক চুবিয়ে তাতে মর্চে পড়ে “ব্যাকটেরিয়া কজেস রাস্টিং” থেকে শুরু করে ওই দু’বছরে ব্যাক্টেরিয়াকে তেল থেকে লোহা কি যে না খাইয়েছি তার কোন ইয়ত্তা নেই। তাতে দিব্যি ভালো ভালো গ্রেড পেয়েছি। বস্তুত বায়োল্যাবে আমি কখনো A-র কম গ্রেড পাইনি। খুব কম লোকই বোধহয় পেত। সেসব গ্রেড মার্কশীটে সাজিয়ে তুলে রেখেছি বটে, কিন্তু এই বিষয়টার উপর থেকে বিশ্বাস জন্মের মত উঠে গেছে, কারণ এসব আমরা যেগুলো করতাম সেগুলো অনেক খোকাস্তরের জালিয়াতি। বড় জালিয়াতি যদ্দিনকে এসেছিল, অর্থাৎ থার্ড ইয়ার থেকে, তদ্দিনকে আমি গণিতাভিমুখে বায়োলজিকে বাইবাই করে দিয়েছি। সে বড় জালিয়াতির নাম হল “p-value”। ল্যাবরেটরি জালিয়াতির বড়ভাই স্ট্যাটিস্টিকাল জালিয়াতি। আজকের দিনে যাবতীয় রোগ, অসুখ, ওষুধ সব গবেষণার মূল অস্ত্র হল এই “p-value”। এবং একটু খোকাস্তরীয় ল্যাবরেটরি জালিয়াতি আর তার উপর একটু এই স্ট্যাটিস্টিকাল জালিয়াতি দিয়ে বিশ্বসংসারে হেন জিনিস নেই যা প্রমাণ বা অপ্রমাণ করা যায়না।

ফল হয়ে দাঁড়িয়েছে “রেপ্লিকেশন ক্রাইসিস”….অর্থাৎ কিছু কিছু অবিশ্বাসী মন নানান বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে ছাপা নানান বৈজ্ঞানিক গবেষণা আবার করে একবার করতে গিয়ে দেখেন যে ফল আসছে সম্পূর্ণ আলাদা। এরকম গবেষণার সংখ্যা কত? না, বৈজ্ঞানিক পত্রপত্রিকায় যা ছাপা হয় তার ৭০%। এমনকি অন্যে তো নয়ই, ৫০% ক্ষেত্রে গবেষক নিজেই নিজের ছাপা গবেষণা আরেকবার করে দেখাতে পারছেন না, করলে সম্পূর্ণ আলাদা ফল বেরোচ্ছে।IISER-এর সেই পুঁচকে ল্যাবরেটরির থেকে আমেরিকার বড়বড় ল্যাবরেটরিগুলোর পয়সা বেশী থাকতে পারে, আকারে অনেক বড় হতে পারে, কিন্তু সেগুলো চালানোর নীতি তো আর আলাদা নয়, এবং সেগুলো চালায়-ই বা কারা? একইরকমের লোকজন। আমাদের হাবিজাবি “গবেষণা”-য় A যারা দিত তাদেরও সিংহভাগের পিএচডি আমেরিকাতেই। ফলত ক্ষেতও এক, মূলোও এক। এমতাবস্থায় এই “না রে না না, ৫০-৫০” কেস না হওয়াটাই আশ্চর্যের, সে কলকাতার পুঁটিনন্দনই হউন বা মার্কিন কোটিপতি ইলন মাস্ক!

এবং এই সমস্যা শুধু বায়োলজির নয়, আরও তথাকথিত “হার্ডার সায়েন্স”-এও যথেষ্ট আছে….কিন্তু সেগুলো যেহেতু সরাসরি পরীক্ষা করা কঠিন, এবং গাণিতিকভাবে এই “p-value”-র চেয়ে অনেক বেশী জটিল, তা সহজে ধরা পড়ে না। তাই বায়োলজিস্ট ও ডাক্তাররা দয়া করে রেগেমেগে এভাবে জীবনবিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিদ্যাকে সিঙ্গল আউট করার জন্য আমার উপর অগ্নিবর্ষণ করতে শুরু করবেন না। আমার নিজের বিষয়ে জালিয়াতির জাল আরও অনেক বেশী গভীর। সেটা নিয়েও লিখব কোন একদিন নিশ্চয়। মানে আমারও তো একটা রুটিরুজির ব্যাপার আছে, নাকি! ইতিমধ্যে আপনারা গণিতজ্ঞদের বাঁশ দিতে চাইলে সে নিয়ে লিখতেই পারেন, আমার কোন আপত্তির প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু সমস্যা হল যে গণিতজ্ঞদের পক্ষে এই “p-value” জিনিসটা বোঝাটা বিরাট কঠিন কিছু না, কিন্তু উল্টোটা মারকাটারি রকম কঠিন। অতএব এ পর্দাফাঁস করতে গেলে আমাদেরই করতে হবে।

আপনার মতামত:-