Home » স্মৃতিচারণ » শর্বরী দত্ত এবং নারীচেতনা

শর্বরী দত্ত এবং নারীচেতনা

শতরুপা বোস রায়

সালটা ২০০৬। আমি তখন কলকাতার এক নামি ইংরিজি সংবাদ পত্রে কর্মরত। নারী স্বাধীনতা নিয়ে একটা ফিচার লিখতে কলকাতার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের ফোন করে চলেছি একের পর এক।  কারুর সঙ্গে আলাপচারিতায় ঘন্টা কেটে যাচ্ছে আবার কারুর সঙ্গে ৫ মিনিটের বেশি এই নিয়ে আলোচনা করতেই কাল ঘাম ছুটছে। এই ধরণের সংবাদ পত্রের অফিসের ডেস্কে একটি সেলিব্রিটিদের তালিকা থাকে। “যাকে বলে, কমন নেমস ফর কোটস”, যারা সহজেই কোন একটা বিষয়ে চট করে মতামত দিয়ে দিতে পারেন। সব তারকাদের তো আবার সে ক্ষমতা থাকে না, তাই হাতে গুনে কয়েকজনের নামই বার বার খবরের কাগজের পাতায়, ফিচারের মধ্যে দেখা যায়।

আমি সেদিন সেই তালিকা অন্তর্ভুক্ত কিছু মানুষজনকে ফোন করে নারী স্বাধীনতা নিয়ে তাদের মতামত জিজ্ঞেস করছিলাম, হঠাৎ আমাদের এডিটর সাহেব এসে বললেন, শর্বরী দত্তকে ফোন করো।  এ বিষয়ে ওনার মতো কারুর ‘কোট’ যে ব্যবহার করা যেতে পারে সত্যি আমার মাথায় আসেনি। আমি পাল্টা প্রশ্ন না করে ফ্যাশন বিটের এক কলিগ বন্ধুর কাছ থেকে ওনার নাম্বার নিয়ে ওনাকে ফোন করলাম। বললাম, “আমি শতরূপা, অমুক কাগজের অফিস থেকে ফোন করছি, আপনার সঙ্গে একটি আর্টিকেলের বিষয়ে কথা বলতে চাই একটু।”মিষ্টি সুরে বলে উঠলেন শর্বরী দত্ত, “এখন তো ব্যস্ত আছি ভাই, এক ঘন্টা পরে ফোন করলে খুব ভালো হয়।” সেই প্রথম ওনার সঙ্গে আমার আলাপ। সেদিন এক ঘন্টা পরে ফোন করে একটা এক লাইনের কোটের জন্য প্রায় আধ ঘন্টা কথা বলেছিলাম। তারপর অফিস ফেরত ঠিক করলাম, আর্টিকেলের মোড় ঘোরাতে এনার থেকেই ভিন্ন স্বাদের রসদ পাওয়া যেতে পারে। ফোনে বলেই দিয়েছিলাম, “বিকেলে দেখা হবে”, ৬টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম। 

ব্রড স্ট্রিটের বাড়িটার গাছের ছায়া ঘেরা গাড়ি বারান্দা পেরিয়ে এক তলার বাইরের ঘরে উনি বসে ছিলেন, অপেক্ষা করছিলেন আমার জন্য। আমি জুতো খুলে ভেতরে ঢুকে মাটিতে পাতা ফরাসের ওপরে গিয়ে বসলাম। উনি ধুতির পাড় আঁকছিলেন মনে হলো দেখে। হাতের কাজ সরিয়ে রেখে বললেন, “তুমি একটু চা খাও? অফিস থেকে এলে?” সাংবাদিকদের আতিথেয়তা অনেকেই করেন, আর আমাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সেই আতিথেয়তার ধরণ বুঝতে আমাদের সাহায্য করে থাকে। ভালো কন্টেন্টের আশায় নাকি নিরলংকার আটপৌরে বাঙালি আপ্যায়নে, নাকি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নিপুন হাতের কাজে আমি কেমন যেন মোহ মুগ্ধ হয়ে রইলাম কিছুক্ষণ তারপর বললাম, “হ্যাঁ, চা খেতে পারি” .
গল্প এগোলো। কোথায় থাকি, কতদিন খবরের কাগজে কাজ করছি, কাগজে প্রকাশিত একটা দুটো লেখা উনি পড়েছেন আমার সেই সব সৌজন্যতা সেরে আমি এবারে প্রশ্ন পর্বে এলাম। বললাম আমার স্টোরি লাইন। একবিংশ শতকে এসেও আমরা কেনই বা নারী মুক্তি নিয়ে কথা বলছি? এই শব্দটার কি সত্যি কোনো  সামাজিক মূল্য আছে? থাকলেও ওনার কাছে মেয়েদের মুক্তির সঠিক অর্থ কি? 

বহু বছর আগে নেওয়া একটা সাক্ষাৎকার। কাগজ গুলো হারিয়ে গেছে আজ। শর্বরীদিও আজ আর নেই. তবুও ওনার ভাবনা গুলো যে অবিনশ্বর। 
“নারী মুক্তি নিয়ে তো অবশ্যই ভাবা উচিৎ। সংসারে নিশ্চয় নারীদের সমান অধিকার পাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু জানো? এখানে একটা ভাবনা কাজ করে. আমরা পুরুষকে বলশালী ভাবি বলেই তো ওদের মতো হবার চেষ্টা করি. কিন্তু সেই প্রচেষ্টায় বার বার আমরাই ব্যর্থ হই।  আর ব্যর্থ হই বলেই তাদের যোগ্য সম্মানটুকু দিতে পারিনা। একজন পুরুষের কথা শুনে চলা, তার পাশে থাকা মানেই কি আমার স্বাধীনতা খর্ব হলো? আমার স্বাধীনতা কি এতই ঠুনকো?” 

কথা গুলোর অন্তর্নিহিত অর্থ সেই সময় বোঝবার সাধ্য ছিল না।  সে সময় শুধুই চাকরি করছিলাম। ভালো কন্টেন্ট পেলে হুড়মুড়িয়ে অফিস ফিরে স্টোরি লিখতে হবে, ব্যাস ওই টুকুই। এখন বুঝি।  এখন যখন মেয়েদের স্বাধীনতা নিয়ে পড়াশুনা করি, মেয়েদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে চিন্তা করি, যখন বিদেশে এসে ইউরোপিয়ান মেয়েদের দেখি, তাদের কথা জানি, তখন বুঝি শর্বরীদি কতটা খাঁটি কথা বলেছিলেন সেদিন। 

ওনাকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলাম, “তাহলে কি মেয়েরা তাদের স্বাধীনতা নিয়ে একটু বেশিই মাতামাতি করে?” সেই বার্নিং দা ব্রা কনসেপ্ট? স্মিত হেসে জবাব দিয়েছিলেন শর্বরীদি। “একটু বাড়াবাড়ি তো বটেই। সমান হবার চেষ্টা অন্য কোনো ভাবে করলে হয়তো বা আমাদের সমাজ আরও অনেক বেশি বলিষ্ঠ হতো .” 
আজ থেকে প্রায় ১৮ বছর আগের ঘটনা এটা।  ১৮ বছর আগের ভাবনা, একটা বিশ্বাস। একটা সমাজ বোধ। তার মূল্যায়ন সেদিন আমার মতো ক্ষুদ্র সাংবাদিক করতে পারিনি ঠিকই কিন্তু ওনার থেকে ভাবনাটুকু নিজের করে নিয়েছিলাম। বিশ্বাস করেছিলাম, আমার স্বাধীনতা আমার মধ্যেই। একজন পুরুষ যেমন আমায় স্বাধীন করতে পারে না তেমনি আমিও তাকে ক্ষুদ্র ভাবতে পারিনা। আমার মতো তাদেরও  সমান অধিকার। 

আজ যারা নারীবাদের ধ্বজা উড়িয়ে, পুরুষকারের অবমাননা করে পুরুষ তান্ত্রিক সমাজের নিন্দা করেন তারা এটুকু বোঝেন কি যে স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যায় না?  আমার স্বাধীনতা অন্য কারুর ওপরে নির্ভরশীল নয়। জাগতিক বন্ধন, সাংসারিক বাগডোর সেটা যে প্রত্যেকটি মেয়ের দৈনন্দিন। যে নৈমিত্তিক কাজ আমরা মেয়েরা বেছে নিয়েছি নিজেরাই। দৈনন্দিনের থেকে মুক্তি মানেই কি আমরা স্বাধীন? নিজের মধ্যে যেদিন নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার শক্তি খুঁজে পাবো, অন্য আর কিছুর প্রয়োজন পরবে না, সেদিনই প্রকৃত অর্থে আমরা স্বাধীন। 

শর্বরীদি বিশ্বাস করতেন এমন স্বাধীনতায়। তাই তো কি আবেগে , কি যত্নে পুরুষদের পোশাক তৈরী করে গেছেন। বাণিজ্যিক দিকটা নিয়ে নাই বা ভাবলাম। হয়তোবা সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতেই তাঁর এই প্রচেষ্টা? তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই জীবন পেয়েছে তার বিশ্বাস। একটা সুস্থ্য সমাজে নারী পুরুষের মধ্যে সত্যি যে কোন বিভেদ থাকে না সেটাই হয়তো বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলেন এতগুলো বছর ধরে, আমরাই স্থূল ভাবে বিচার করেছি। 

আপনার মতামত:-