Home » ইতিহাস » হল্যান্ডে রবীন্দ্রনাথ

হল্যান্ডে রবীন্দ্রনাথ

ভাস্বতী ভট্টাচার্য

বিশ্বমানবতার আদর্শে অনুপ্রাণিত রবীন্দ্রনাথ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের প্রজ্ঞা ও মনীষাকে একত্র করে প্রাচ্যের সভ্যতা ও সংস্কৃতি পঠন-পাঠনের জন্য ১৯১৮ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা করেন। কবি চেয়েছিলেন যে শান্তিনিকেতন এবং বিশ্বভারতী প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে এক যোগসূত্র হয়ে উঠবে। ১৯১৯ সালে দক্ষিণ ভারত, এবং ১৯২০ সালের মার্চ মাসের শেষ থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর আদর্শ প্রচারের জন্য গুজরাত, পুনে এবং বোম্বাই সফর করেছিলেন। কলকাতায় ফেরার পর পাশ্চাত্যে তাঁর শিক্ষামূলক ধারণা প্রচারের মাধ্যমে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল সংগ্রহের জন্য বিদেশযাত্রার পরিকল্পনা করা হয়। রথীন্দ্রনাথ এবং প্রতিমাদেবী সমভিব্যহারে রবীন্দ্রনাথ ১৫ই মে বম্বে থেকে যাত্রা করেন। জাহাজ ৫ই জুন প্লিমেথ বন্দরে পৌঁছলে কবির সচিব উইলিয়াম উইনস্ট্যানলী পিয়ার্সন (১৮৮১-১৯২৩) এবং ব্যারিস্টার বন্ধু কেদারনাথ দাশগুপ্ত (১৮৭৮-১৯৪২) তাঁদের অভ্যর্থনা জানান।

লণ্ডনে থাকার সময় ২৬শে জুন রবীন্দ্রনাথ আমস্টারডামের খবরের কাগজ আলঘেমেইন দাঘব্লাদ-এর প্রতিনিধি আই ব্রান্টসকে দ্বিপ্রাহরিক ভোজের জন্য আমন্ত্রন জানান।ঐ দিন তাঁর স্বদেশ এবং শিক্ষামূলক চিন্তাভাবনা সম্বন্ধে ব্রান্টসের সঙ্গে বিশদ আলোচনা হয়। আলোচনার শেষে ব্রান্টস জিজ্ঞেস করেন কবি এই বিষয়ে হল্যাণ্ডে বক্তৃতা দিতে রাজি আছেন কি না। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির আগেই ওলন্দাজ লেখক ও মনস্তত্ত্ববিদ ফ্রেদেরিক ফান এ’দেন এর অনুবাদের সুবাদে হল্যান্ডের পাঠককুল তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত ছিল। কবির সম্মতিক্রমে ব্রান্টসের সঙ্গে আলোচনার সারাংশ হল্যান্ডের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। থিওসোফিক্যাল সোসাইটি’র হল্যাণ্ড-শাখা এবং আমস্টারডামের ফ্রেইয়ে ঘেমে’ন্তে গির্জা ব্রান্টসের মাধ্যমে তাঁকে নিমন্ত্রণ করেন এবং কয়েকটি বক্তৃতা দিতে অনুরোধ করেন। এরপর নেদারল্যান্ডসে বিশ্বকবিকে সংবর্ধনা জানানোর প্রস্তুতি শুরু হয়।

প্রথমে ২২শে জুলাই নেদারল্যান্ডসে আসার কথা হয়। কিন্তু কবি’র শিক্ষামূলক কয়েকটি বক্তৃতা দেওয়া এবং ইন্দোনেশিয়া সম্বন্ধে কিছু তথ্য সংগ্রহ করার পরিকল্পনা থাকার জন্য ঐ [গরমের ছুটি] সময়টি অনুপযুক্ত বলে তাঁকে অনুরোধ করলে ঠিক হয় যে তিনি আগে সুইডেন, এবং সেখান থেকে সেপ্টেম্বর মাসে নেদারল্যান্ড আসবেন । ভারতের এই মহাকবি এবং দার্শনিককে যথোপযুক্ত মর্যাদা সহকারে অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য এক সংবর্ধনা সমিতি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খবরের কাগজে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় যে কবি এখানে যা করতে চান, তা যাতে একপেশে, একমাত্রিক না হয়, সেইজন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রের, ভিন্ন মতের ব্যক্তি এই এই সমিতিতে থাকবেন।

১৯ শে সেপ্টেম্বর রবিবার রবীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ প্রতিমাদেবী এবং পিয়ার্সন প্যারিস থেকে ট্রেনে হল্যান্ডে পৌঁছোন। সংবর্ধনা সমিতির সচিব হোসে ভিগেভেনো, ফান এ’দেন প্রমুখ হল্যান্ড-বেলজিয়ামের সীমান্তে উপস্থিত থেকে কবিকে অভ্যর্থনা জানান। দ্য নেদারলান্ডশে ব্যাঙ্ক-এর অধ্যক্ষ কর্নেলিস ফান এ’ঘেন (১৮৬১-১৯৪০)এবং তাঁর স্ত্রী মেরী বয়সেভ্যাঁ-(১৮৬১-১৯৪০) নার্ডেনে তাঁদের সুবিশাল বাগান-বাড়িতে অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে অতিথিদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য একটি গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়।

২৩ শে থেকে ১লা অক্টোবর পর্যন্ত কবি প্রতিদিন অন্তত একটি করে বক্তৃতা দেন।কবির নেদারল্যান্ডের কর্মসূচী থেকে এই কয়েকদিন তাঁর কেমন ব্যস্ততার মধ্যে কেটেছিল, তার একটা আভাস পাওয়া যায়।

২০ শে সেপ্টেম্বর। ঐ দিন রাণু অধিকারী [পরবর্তীকালে লেডি রাণু মুখার্জী] কে লেখা চিঠি স্ট্রাসবুর্গ থেকে ডাকে দেওয়া হচ্ছে। কবি লিখছেন ঐ দিন রাতে হল্যান্ড [ফিরে] যাচ্ছেন।

[২১-২২ শে সেপ্টেম্বর] ?? ২১ শে সেপ্টেম্বর সম্ভবত ফ্রেদেরিক ফান এ’দেন নার্ডেনের বাংলোয় যান। কিন্তু রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমাদেবী এবং অন্যান্যরা উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষ কথা হয় নি।

২৩ শে সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার। সকালঃ কলোনিয়্যাল ইন্সটিট্যুট পরিদর্শন। সন্ধ্যা ৮টা । ফ্রী চার্চ। শুধুমাত্র থিওসোফিক্যাল সোসাইটী আর ফ্রী চার্চের সদস্যদের জন্য – “Some Village Mystics of Bengal.” বক্তৃতার পরে অভ্যর্থনা সমিতির সদস্যদের অভ্যর্থনার ব্যবস্থা ।

— ফ্রী চার্চের বড় প্রেক্ষাগৃহের ঘন সন্নিবিষ্ট সারিগুলির ওপর দিয়ে অর্গ্যানের গুঞ্জনধ্বনি ভেসে আসছে। দর্শকের আসন একটিও শূন্য নেই; গ্যালারিতে ভিড় করে দাঁড়ানো মানুষের দল যেন অর্গ্যানের একটানা সুরের রহস্যময় প্রার্থনার আলাপের সঙ্গে মিশে গেছে। যাজকের আসনের সামনে পাতা প্রাচ্যের গালিচার রঙের সমন্বয়, মোমদানের সোনালী আলো, ব্রোঞ্জের ফুলদানিতে সাদা চন্দ্রমল্লিকার সমারোহ, আর ভাষণ দেবার ডেস্কের ওপরের বাতির হলুদ আলোর পরিমণ্ডল – সব মিলিয়ে একটা চমৎকার আবহ তৈরি হয়েছে।

প্রেক্ষাগৃহের ভেতর দিয়ে সমবেত দর্শকের পাশ কাটিয়ে প্রাচ্যের দার্শনিক কবি ডঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন, সভায় সমবেত সকলে উঠে দাঁড়ালেন। অর্গ্যানের সুর তখনো বাজছে। কোঁকড়ানো পাকা চুল; পরণে ধূসর রঙের রেশমের কাফতান। তিনি যখন সংবর্ধনা সভার সভাপতি শ্রীযুক্ত ফান ওয়াইনঘার্ডেন আর সহ-সভাপতি শ্রীমতী সি ডাইকঘ্রাফের মাঝখানে যাজকের আসনে আসন নিলেন, তাঁর সম্মানে অর্কেস্ট্রায় বেঠোফেনের এক আদাজিও বাজিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হল। এরপর, ফান ওয়াইনঘার্ডেন কবিকে তাঁর মহৎ উদ্দেশ্যসাধনের দায়িত্ব নিয়ে বিশ্ব-মানবতার বার্তা প্রচারের জন্য সূর্যালোকিত স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার পরিশ্রম স্বীকার করার জন্য ধন্যবাদ জানালেন।

তারপর বলতে উঠলেন শ্রীমতী ডাইকঘ্রাফ। যে কবির গান সারা বিশ্বের অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হয়, ডাইকঘ্রাফের বক্তব্য তাঁর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তির নিবেদন। কবিকে তিনি এবং তাঁর আত্মার আত্মীয় – নেদারল্যান্ডসের অন্যান্য থিওসোফিস্টরা তাঁদের অগ্রজ, শিক্ষক হিসাবে বিবেচনা করেন। তবে তাঁর সম্বোধন বিশেষত সেই কবিকে যিনি আমাদের হৃদয়ে আনন্দের সঞ্চার করেন, আমাদের শৈশবের রৌদ্রোজ্জ্বল রূপকথার দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যান, এবং যাঁর কবিতা থেকে উদ্ভূত সীমাহীন বেদনার অনুভূতি আমাদের কাঁদিয়ে তোলে। তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, চিন্তাবিদ, দার্শনিক এবং কবি, তবে একইসঙ্গে – ডাইকঘ্রাফ আমাদের মনে করালেন – তিনি একজন কর্মযোগী, যিনি শিক্ষাব্রতী হিসাবে শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর সংস্কারমূলক আদর্শ ব্যবহারিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছেন। শান্তিনিকেতনে তাঁর বিদ্যালয়ে শিশুরা কেবলমাত্র কেজো জ্ঞানই অর্জন করে না। তবে সর্বোপরি, সেখানকার পড়াশোনা তাদের মনকে উজ্জীবিত, পুষ্ট করে তোলে।

ডাইকঘ্রাফও দীর্ঘ যাত্রার উদ্যোগ নেওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথকে ধন্যবাদ জানান। যাঁর নামের অর্থ সূর্য, যাঁর আলো সমবেত সকলকে আলোকিত করবে, তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে পেরে সকলেই আনন্দিত।

প্রেক্ষাগৃহে একটি সূচ পড়লেও শুনতে পাওয়া যাবে। কবি তাঁর আসন থেকে উঠে বক্তার ডেস্ক-এর পিছনে গিয়ে দাঁড়ালেন। শীর্ণকায় কবির ধূসর কাফতানের প্রশস্ত হাতা থেকে বেরোন বুদ্ধের মূর্তির হাতের মতো সুগঠিত দুটি হাত দুটি গোচরে এল। কবি তাঁর ভাষণ শুরু করলেন। প্রেক্ষাগৃহে তখনো সূচ-পতন-নীরবতা।

রুপোর মত সূক্ষ্ম স্বরে ডঃ ঠাকুর তাঁর পূর্ব-লিখিত ভাষণটি [Some Village Mystics of Bengal] পড়লেন। তিনি গ্রাম বাংলার হিন্দু আধ্যাত্মিক সম্প্রদায়ের পুরুষ এবং মহিলা সাধকদের [বাউল] কথা বললেন। এঁরা এঁদের চারপাশের প্রাত্যহিক জীবনকে এক সহজ ভক্তি দিয়ে গানের মাধ্যমে এক অনন্য, চিত্তাকর্ষকভাবে ব্যাখ্যা করেন। এঁরা প্রায় নিরক্ষর, কোনরকম সাহিত্যের সঙ্গে এঁদের পরিচয় নেই। অথচ এঁদের লেখা এবং গাওয়া গান গুলি গঠনে নিটোল এবং এক গভীর জ্ঞানের পরিচয়বাহী। [উল্লেখ্য যে (১) কবিগুরুর সংবর্ধনার জন্য এইদিন যে গালিচা পাতা হয়, তা এক ধনী ব্যক্তি তাঁর নিজের বাড়ি থেকে দিয়েছিলেন। রুপোর মোমদান অন্য এক গির্জা থেকে দেওয়া হয়েছিল। (২) গলার স্বরকে সাধারণত ব্রোঞ্জ, রুপো এবং সোনার সঙ্গে তুলনা করা হয়। (৩) মুল রচনাতে রবীন্দ্রনাথ বাউলদের হিন্দু বলেন নি। এটা সম্ভবত সাংবাদিকের অনুমান]।

২৪শে সেপ্টেম্বর, শুক্রবার, সন্ধ্যা ৮টা । ফ্রী চার্চ। সর্বসাধারণের জন্য। – “The Meeting of the East and the West.” বৃহস্পতিবার আর শুক্রবার ঐ ঠিকানাতে বিকেল ৫টায় প্রবেশপত্র সংগ্রহ করা যাবে। ২৫শে সেপ্টেম্বর, শনিবার। লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাগৃহ।“My Ideal of Education.”

২৬ শে সেপ্টেম্বর, রবিবার। ফ্রেদেরিক ফান এ’দেনের সঙ্গে দেখা এবং আলোচনা।

২৭শে সেপ্টেম্বর, সোমবার। আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাগৃহ “My Ideal of Education.” প্রবেশাধিকার নিমন্ত্রণমূলক।

২৮শে সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। য়ুত্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেক্ষাগৃহ। বিষয় ?? ২৯ শে সেপ্টেম্বর, বুধবার। পালাস-এথেনে, আন্তর্জাতিক দর্শনচর্চা কেন্দ্র, আমার্স্ফোর্ট। “Some Village Mystics of Bengal.”

৩০ শে সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার। সঘ্রাভেনহাঘে [দ্য হেগ]। থিওসোফিক্যাল সোসাইটি। অপরাহ্ণঃ কবিকণ্ঠে স্বরচিত কবিতা পাঠ। সন্ধ্যায় বক্তৃতাঃ “The Meeting of the East and the West”।

১লা অক্টোবর, শুক্রবার। সন্ধ্যা ৮টা। রেমন্সট্রাণ্টস গির্জা, রটারডাম। “The Meeting of the East and the West”।

সমস্ত অনুষ্ঠানের ভাষা ইংরেজি। মূল বক্তব্যের ভাব বজায় রাখার জন্য বক্তৃতাগুলি অনুবাদ করা হবে না। বক্তৃতার পরে প্রশ্নোত্তরের সুযোগ থাকবে।

স্কেচ, দ্য কুরান্ট, ২২ শে সেপ্টেম্বর ১৯২০

আপনার মতামত:-