Home » রম্য রচনা » লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ৫

লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ৫

নিলয় বরণ সোম

28.04.2020.

ক -বাবু খবরের কাগজ পড়ছেন , শ্রীমতী ক এসে বললেন ,আচ্ছা লিপস্টিক কোম্পানি কি সব বন্ধ হয়ে যাবে ?

কাগজ থেকে মুখ তুলে ক-বাবু বললেন , “কেন , বন্ধ হবে কেন ? লক ডাউনের দরুন কিছু কোম্পানি বন্ধ হতে পারে , কিন্তু সব লিপস্টিক কোম্পানি বন্ধ হবে কেন ?”

শ্রীমতী ক বললেন , “বা রে ! সবসময় যদি মাস্কে মুখ ঢাকতে হয় , তাহলে আর মুখে লিপস্টিক মাখবে কে ? নো ডিমান্ড মিন্স নো সাপ্লাই , সিম্পল ইকনমিক্স!”

ক -বাবু একটু সময় নিয়ে বললেন , “আসলে লিপস্টিক কোনো কাজের বস্তু না। পরশুরাম ‘সিদ্ধিনাথের প্রলাপ ‘ গল্পে সিদ্ধিনাথের মুখ দিয়ে কি বলিয়েছেন মনে আছে ?”

শ্রীমতী ক-এর মুড্ ভাল ছিল , গল্পটি শুনতে চাইলেন I

ক-বাবু জানালেন , সিদ্ধিনাথের মতে , ফর্সা রমনীরা লিপস্টিক মাখলে মনে হয় , তাড়কা রাক্ষসী , সদ্য ঋষি খেয়েছে I আর , কৃষ্ণবর্ণা রমনী ,তা ‘ লাগালে মনে হয় , ভালুকে রাঙা আলু খেয়েছে !

-“গল্পের নাম কি বললে ?’

-“সিদ্ধিনাথের প্রলাপ “

-” ও, প্রলাপ তো , তাই !”

ক-বাবু এই রাউন্ডে হেরে গেলেও আবার অফেন্সে গেলেন – “আসলে , নারী সৌন্দর্য্যে ওষ্ঠ বা ঠোঁটের কোনো ভূমিকা নেই I”

-“মানে ?”

– “নারীর বর্ণনা আছে এমন একটি কবিতার কথা বললে কোন কবিতার কথা মনে আসে ?”

– “কেন, বনলতা সেন !”

-দ্যাখ , কোথাও বনলতা সেনের ঠোঁটের বর্ণনা আছে ? চুল বিদিশার নেশা , মুখ শ্রাবস্তীর কারুকার্য , পাখির নীড়ের মত চোখ – ঠোঁটের কোন আলাদা অস্তিত্ব নেই !

ক-বাবু আরো বলে চলেন , ” গানেও তেমনি ! দেখেছি তাহার কালো হরিণ চোখ , তোমার ওই এলো চুলের রাশি , নেইম এনি সং , ঠোঁট নেই !”

শ্রীমতী ক কিছু একটা আঁকড়ে ধরার মত বললেন , না, একটা আছে , তার ঠোঁটে নেমে আসা , রঙে রঙে ভালবাসা “

ক-বাবু জানেন, রবীন্দ্রসংগীতের বাইরে শ্রীমতী ক এর জ্ঞান গম্যি সীমিত , তাই ঠিক করে দিলেন, ওটাও ঠোঁট নয় , তার চোখে নেমে আসা -মহাম্মদ রফি !

শ্রীমতী ক বললেন , তাহলে বিয়ের ঠিক আগে আমাকে লিপস্টিক প্রেজেন্ট করেছিলে কেন ?

ব্যাপারটি ক-বাবুর ঠিক খেয়াল নেই – তবে আন্দাজ হল , সেলে বোধহয় কোন অফার ছিল, পকেট বাঁচিয়ে হবু স্ত্রী কে খুশী করেছিলেন !

মুখে বললেন , “তোমার ব্যাপারটা আলাদা , লিপস্টিকে তোমাকে রাজনন্দিনী লাগে !তবে চিন্তা করো না , লিপস্টিক উঠে গেলেও ডিজাইনার মাস্ক বাজারে বেরোল বলে ! মাস্ক বুটিকও খুলে যাবে গোটা কয় -তোমার রূপচর্চার অভাব হবে না !”

শ্রীমতী ক এবার খুশি হলেন I ‘আমার সকল দুখের প্রদীপ ‘ গাইতে গাইতে উনি ভেতরে চলে গেলেন, আর ক -বাবু আবার কাগজে মন দিলেনI

15.05.2020.

লক ডাউনের পর ক -বাবুর বাড়ির উল্টোদিকে ডাক্তারের ক্লিনিকে বন্ধ, শহরের বেশির ভাগ প্রফেশনালদের মত I
ক্লিনিকের মালিক শিবপদ বাবু , ওরফে ড : শিবপদ সামন্ত , সরকারী চাকরীর ফাঁকে ফাঁকে হোমিওপ্যাথী করতেন I মাঝ খানে যখন রেইকি , প্রাণিক হিলিং এসবের হিড়িক উঠেছিল , তখন সামন্ত বাবু কোথা থেকে একটা দুটো করেসপন্ডেস কোর্স করে এসে নিজের একটা চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করেন -দ্য গোল্ডেন টাচ থেরাপি I এই ট্রিটমেন্ট ক্যান্টন্টমেন্টের গোল্ডেন টাচ ক্লিনিক ছাড়া কোথাও সম্ভব নয় , ‘কারণ ইহা বিজ্ঞানসম্মত ও ইহার কোনো শাখা নাই I ‘
শিবপদবাবু কী আশায় বড় বড় হরফে ইউনিসেক্স ক্লিনিক লিখে রেখেছিলেন কে জানে , খুব ভিড় কখনও হত না, দু এক জন বিগতযৌবনা পৃথুলা ভদ্রমহিলা অথবা স্ফীতোদর ভদ্রলোকদের পদস্পর্শে ধন্য হত ক্লিনিক I
তবে বছরখানেক ক্লিনিকের ভোল পাল্টে দিয়েছে সিমরান , সামন্তবাবুর নতুন এসিস্টেন্ট I
সুরূপা এই এসিস্টেন্ট ঢোকার পর থেকে সামন্তবাবুর প্রাকটিস বেড়ে চললো , কানে দুল, হাতে বালা , চোখে সানগ্লাস সোনার টুকরো ছেলেরা নির্বাণ লাভের নয়া তারিকার সন্ধানে ক্লিনিকে ভিড় করতে লাগল I দুর্গাপূজার অষ্টমীর ভোগ স্পনসর করা আর পাড়ার এক নম্বর নেতার ফ্রি চিকিৎসা করা ছাড়া সামন্তবাবুর বেশি হুজ্জুতি কিছু হয় নি I
তবে লক ডাউন উঠে গেলেও গোল্ডেন টাচ ক্লিনিকের রমরমা পর্ব অন্তত অদূর ভবিষ্যতে আর ফিরবে না , ক -বাবু নিশ্চিত I টাচের নাম শুনলেই লোকেরা তখনও ভিরমি খাবে I , তবে ভিড় বাসে এক শ্রেণীর লোকের অসভ্যতা বন্ধ হবে আর মেট্রোর প্রেমও নিকষিত হেম হয়ে যাবে I
আরো কয়েক পা এগিয়ে ,ক বাবুর মনে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিঙ প্রাকটিস করতে করতে টাচ শব্দটির স্থান বোধহয় টাচ স্ক্রীন ফোন ছাড়া আর থাকবে না I

20.05.2020.

সময়ের কাজ সময়ে করতে হয় , লক ডাউন ক-বাবুকে  এই শিক্ষা দিল I

এখন আপশোস হচ্ছে , অফিসের চাপে , সংসারের নানা কাজে কলেজ জীবনের বন্ধু  মানসের  নিমন্ত্রণ রক্ষা  করতে না পারা I

মানস ত্রিকোণ পার্কের  দোতলা বিরাট বাড়িতে একাই থাকে , বাংলা সিনেমা উপন্যাসে যে রকম একটি বিশ্বস্ত চাকর থাকে , তেমন  এক স্যাম্পল ভজহরি কে নিয়ে I টুকটাক কনসালটেন্সি ছাড়া পৈতৃক ক’টি বাড়ির ভাড়া বাবদ আয় নিয়ে তার জীবন  ভালোই কাটছিল , নিজের মত পড়াশুনা, লেখালেখি ও সিনেমা দেখা নিয়ে I আর ওই যে বলে না , ভগবান যাকে  দেন, ছপ্পর ফাড়কে দেন, তেমনি , অকৃতদার এক মামার মৃত্যুর  পরে  একমাত্র উত্তরাধিকারী  হিসেবে  স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি মন্দ পায় নি I

দেশ বিদেশ ঘোরার শখ মেটানো ছাড়া , ভোজনরসিক মানসের ইচ্ছে হল  কলকাতা শহরে একটা এথনিক  ফুড ট্যুর করা I অর্থাৎ , বাঙালী বালিগঞ্জ প্লেস থেকে পাঞ্জাবী সাঁঝাচুলা কি কেরালার ট্যামারিন্ড প্রত্যেকটিতে ঢুকে খাবার চেখে  দেখা I মেক্সিকান থেকে লেবানিজ রেস্টুরেন্টও কলকাতায় আছে Iমানসের  ইচ্ছে, প্রত্যেকটিতে আর কেউ নয়, ক-বাবুকেই সঙ্গে যেতে হবে I   ক বাবু নিজেও খেতে ভালবাসেন , স্ব -রচিত কবিতা পড়ে শোনানোর নেশা  মানসের  মাথায় চেপে না বসলে  তার সঙ্গ ভালোই লাগে ক -বাবুর I তাই এমন সূবর্ণ  আমন্ত্রণ  হাতছাড়া হয়ে যাওয়াতে এখন নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে তার I  

আরো আছে I

কলেজ জীবনের হার্টথ্রব স্বর্ণালী  ক বাবুর  স্মৃতির আড়ালেই চলে গিয়েছিল , কিন্তু হঠাৎ  কলেজের একটা হোয়াটসআপ গ্রূপ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ হয় , আর স্বর্ণালী তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল কফি পানের আমন্ত্রণে I আর কিছু নয় ,  এ ধরনের বৈঠকে পুরানস্মৃতির  উত্তাপ খানিকটা  ধুমায়মান কফির মত উষ্ণতা ছড়িয়ে আবার খালি কাপের নিঃশ্বেষতায় মিলিয়ে যায় I করোনার হামলায় সে স্বপ্ন বৈঠকও বুঝি বা হল না I শুধু মাঝে  সাঝে  কথোপকথনের  শেষে স্বর্ণালীর ‘ কিপ ইন টাচ ‘ বাক্যবন্ধটি তাকে আশা জুগিয়ে চলেছে, একদিন না একদিন করনা  ধ্বংস হবেই I

তবে সময়ের কাজ সময়ে করার অভ্যাস এখন থেকে ক- বাবু আয়ত্ত করে ফেলেছেন I তাই , শ্রীমতী ক -এর কথামত ঘর গেরস্থালির কাজ গুলো শেষ করতে উনি  আর সময় নিলেন না I (শেষ)

আপনার মতামত:-