Home » রম্য রচনা » লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – 8

লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – 8

নিলয় বরণ সোম

ক -বাবু , কলকাতার একটি কেন্দ্রীয় আধা সরকরি অফিসের সিনিয়র অফিসার। রবীন্দ্রসংগীত প্রেমী শ্রীমতি ক ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। তার অফিসেও অনেক ক’টি চরিত্র আছে. সবার আগে সেকশন অফিসার আদিনাথ ঘোষালের কথা বলতে হয়। এছাড়াও অফিসের না চরিত্র , ব্যক্তিগত বন্ধু , পাড়ার লোকেরা অনেকেই ভিড় করেন তার দৈনন্দিন জীবনে। লক ডাউন ও আনলক ওয়ান চলা কালীন ক -বাবুর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা লিপিবদ্ধ করা আছে এই লেখায় । বলা বাহুল্য, এ লেখায় সব চরিত্র কাল্পনিক।

পড়ে নিন লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ১

লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ২

লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ৩

21.04.2020.

ক -বাবুর স্ত্রী নিজের মোবাইলটা ক-বাবুকে দিলেন , ” দ্যাখো , সুমিতা কথা বলতে চায় I “
সুমিতা মানে শ্রীমতী ক-এর পিসতুতো বোনI সুমিতাকে ওরা স্বামী -স্ত্রী বিশেষ স্নেহের চোখে দেখেন I ওদের বিয়ের সময় সে নেহাতই বালিকা। জামাইবাবুর, মানে ক-দার সঙ্গে (তখনও বিজাতীয় জিজু শব্দটি বাঙালীদের মধ্যে এত ব্যাপকভাবে চালু হয় নি ) কিভাবে আলাপ করবে ,ঠিক করতে না পেরে , জ্যামিতির এক্সট্রা বুঝতে এসেছিল !

সেই সুমিতা এখন গৃহিনী। তা সুমিতা পড়াশুনায় অতটা দড় না হলেও আন্তরিকতা , মায়া -মমতা ইত্যদি অনেক কিছুতেই অনেকের থেকে এগিয়ে I

ফোন কানে নিতেই সেই উদ্বেগটাই শোনা গেল সুমিতার গলায় , ” শুনলাম তোমার অফিস শুরু হয়েছে !”
ক-বাবু বললেন , ” হ্যাঁ , শুরু হয়েছে খানিকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে !”
সুমিতার জবাব , ” কী কান্ড ! তুমি যাচ্ছ কেন ! তুমি তো দমদম ক্যান্টনমেন্টে থাকো -এদিকে বলছে ক্যান্টনমেন্ট জোনে নাকি সব কিছু নিষেধ !”

ক -বাবু বুঝলেন , সুমিতা ক্যান্টনমেন্ট আর কনটেনমেন্ট জোন গুলিয়ে ফেলেছে I

পরের দশ মিনিট লাগল ব্যাপারটা সুমিতাকে বোঝাতে I
শেষ অব্দি ভিকি কৌশলে গিয়ে ফোনালাপ শেষ হল I
বিস্তারিত ফোনালাপের পর আপাতত ক-বাবু , শ্রীমতী ক ও সুমিতা , সকলেই কন্টেনডেড !

26.04.2020.

ক -বাবুর সঞ্চিত ভাঁড়ারে টান পড়েছে , তেল নুন কিছু কেনার দরকার পড়েছে। ‘ভরা থাক , ভরা থাক’ গাইতে গাইতে শ্রীমতী -ক লিস্টি বানিয়ে ফেললেন। এদিকে ওঁদের এলাকায় গাড়ির যাতায়াতে কিছু কড়াকড়ি চালু হয়েছে , সুতরাং উনি স্থানীয় থানায় ফোন করে যাওয়া স্থির করলেন।
থানায় ফোন করতেই ‘ক্যা ‘ বলে একটি উত্তর পেলেন।
অনিচ্ছাস্বত্বেও , উপস্থিতবুদ্ধি খরচ করে ক- বাবু নিজের পরিচয়টি বলতেই ফোন গ্রহণকারীর কণ্ঠস্বর পাল্টে গেলো , “আপানি ডিউটি অফিসাররের সঙ্গে কথা বলুন স্যার “
ডিউটি অফিসার ক- বাবুর আগাম অনুমতি ভিক্ষায় সন্তুষ্ট হন ও বলে দেন , ” আপনারা শিক্ষিত মানুষ, সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং সম্বন্ধে আপনাদের তো নতুন করে বলার কিছু নেই !”
ক বাবু বললেন , ” সে নিশ্চয় , আর আমি অমুক সুপার স্টোরে যাব আর আসব “!
ডিউটি অফিসার বললেন , ‘আপনি কোথা থেকে কিনবেন সেটা আপনার চয়েস , তবে আস- পাশের মুদিখানা গুলো কিন্তু ভাল সাপোর্ট দিচ্ছে !”
ডিউটি অফিসারকে ধন্যবাদ জানিয়ে ক বাবু দেখলেন ,সুপার স্টোরের সামনে লাইন একেবারে কম নয়।
স্যানিটাইজার , থার্মাল স্ক্যানার এই সব ধাপ পেরিয়ে দেখলেন ,স্টোরের তাক গুলো ঢুঁ ঢুঁ -অর্ধেক জিনিস নেই I
লাইনে আলাপে তৎপর যে ভদ্রমহিলা ক -বাবুর পেছনে ছিলেন , এবং জানিয়েছিলেন উনি নেহাত একটি জিনিস বদলাতে এসেছেন , কী জানি কোন দয়ায় ক- বাবুকে বললেন , “আপনি দুটো গলি পরে রাস্তার উপরেই ছোট একটা মুদির দোকান আছে দেখবেন -ওখানে সব পেয়ে যেতে পারেন । “
ক বাবু বিয়ের আগে স্ত্রীর সব কথা শুনতেন ও বিয়ের পর থেকে অন্য সকল সুন্দরীদের কথা মেনে চলার চেষ্টা করেন।
ছোট দোকানটিতে গিয়ে ক- বাবু অবাক –লিস্টি ভর্তি জিনিস গাড়ির ডিকি বোঝাই করলেন I
এই সময়টিতে ডিউটি অফিসার ওঁকে দেখতে পেলে নিশ্চয়ই বলতেন , “গরীবের কথা বাসি হলে মিষ্টি হয় !”

27.04.2020.

আজ ক -বাবুর অফিসের বড়কর্তা অফিসের সকলের জন্য একটি সেন্সিটাইজেশন সেমিনার করতে বললেন , অল্প সময়ের জন্য। ক -বাবু চাইছিলেন ভিডিও কনফারেসিং করতে , কিন্তু রামানুজম সাহেব মিটিং রুমে আয়োজন করতে বললেন। অফিসে একটি এক্সিকিটিভ কনফারেন্স রুম ও একটি মিটিং রুম আছে , ৩৩ শতাংশ স্টাফ নিলেও সংখ্যা একেবারে কম নয় , তাই মিটিং রুমেই আয়োজন।
রামামনুজম সাহেবের মাথায় নিত্য নতুন আইডিয়া খোলে। তাছাড়া তিনি , অনেক ব্যাপারেই ‘ত্রিভাষা -সূত্র ‘ মেনে তোলার পক্ষে। তাতে যে কোন কাজে তিনগুন খাটনি হয় I
আজকে যেমন , প্রথমে সামাজিক দূরত্ব সম্পর্কে প্রচারমূলক কিছু পোস্টার বানাতে বললেন।
এই সব কাজে ডাক পরে অর্কপ্রভর I ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি ও বাহারি চশমা নিয়ে তার চেহারায় কবি কবি ভাবটা বেশ খেলে যায়। আসলে যে কোনো বড় অফিসে , বিশেষত সরকারী ও আধা সরকারি অফিসে , এক আধটি উদাস কবি , দু একজন ব্যর্থ প্রেমিক , অন্তত এক পিস্ ছলকানো বৌদি জুটেই যায় আর তারা নিজের মত করে সেটও করে যায়।
অর্কপ্রভর কাব্যপ্রতিভার উপর অনেকের অগাধ আস্থা থাকলেও ক-বাবু মনে করেন , ও খানিকটা ঘেঁটে যাওয়া পাবলিক । তবে আধ ঘন্টার নোটিসে ও কিছু একটা বানিয়ে নিয়ে আসবে , সেটা ঠিকI
হলও তাই , মিনিট চল্লিশ বাদে সেকশন অফিসার অর্কপ্রভকে বগলদাবা করে নিয়ে হাজির – এই দেখুন স্যার -পোস্টার হয়ে গেছে। ত্রিভাষা সূত্র মেনে করা সে পোস্টারের বাংলা লেখা দেখেই ক-বাবু ব্যোমকে গেলেন।
দেখলেন লেখা আছে , “হাতের উপর হাত রাখতে পারা সহজ নয় – সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন !”
“বেশ তো , পোস্টারগুলো টপাটপ লাগিয়ে ফেলুন , বলে ক -বাবু কাজে মন দিলেন।এরপর রামানুজম সাহেবের ঘরে ক-বাবুর ডাক পড়ল। সাহেব নিজের কাজের ক্ষেত্রে অসম্ভব চৌখস , কিন্তু কাজের বাইরে অনেক ক্ষেত্রে ওঁর ধারণাগুলো কেমন ধোঁয়াশা I

ক- বাবুর সঙ্গে করনা নিয়ে কথা বলতে বলতে উনি জানালেন , ‘Co-orbitity ‘ হচ্ছে দারুন সমস্যা। সবাই নাজেহাল হচ্ছে।”
ক -বাবু বলেন , কথাটা বোধহয় Co-morbidity ; তারপর সংক্ষেপে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন বসকেI
ওঁকে নস্যাৎ করে দিয়ে বস বললেন , ওই হল – একটা অরবিটের মধ্যে সবাই ঘুরতে থাকে।
তারপর জানালেন , আজকের সেমিনারের উদ্দেশ্য হচ্ছে কর্মচারীদের মনোবল বাড়ান I সবাই ভয় পেলে কাজ হবে কী করে ?
ক -বাবু শুধু ভাবছিলেন, বস আবার ছড়িয়ে না ফেলেন ! ক-বাবুর আবার দায়িত্ব হচ্ছে ওঁর ইংরেজি ভাষণকে হিন্দী ও বাংলায় তর্জমা করা। বেশি ভুলভাল বললে তর্জমা করাও চাপ।
যথাসময়ে মিটিং হল ভর্তি। সকলেই দুটি করে চেয়ার বাদ দিয়ে বসেছে , সামাজিক দূরত্ব রাখার তাগিদে I
তবে প্রণয়ীযুগল , সুজাতা ও শুভেন্দু পাশাপাশি বসেছিল , সুপারভাইজার আদিনাথ ঘোষালের কথায় তারা এক চেয়ার ব্যবধানে বসল।
বস শুরু করলেন , “কবি গুরু বলেছেন, যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একটা চল রে Iআমরা সবাই একলা চলে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এই করোনা যুদ্ধে সামিল হবI জয় আমাদের হবেই।“ তারপর এ কথা সে কথা বলে বললেন, ” আমরা এখন ‘সফ্ট ইম্যুনিটির মধ্যে রয়েছি। যেদিন হার্ড ইম্যুনিটির মধ্যে চলে এসব , আমাদের আর কোন চিন্তা ‘চিন্তা থাকবে না’ I “
এরকম আরো কয়েকটি মনি মুক্তো ছড়ানোর পর বসের ভাষণ শেষ হলI
এই ভাষণের কী তর্জমা ক-বাবু করেছিলেন তা’ আর মনে নেই, কিন্তু মিটিং হল থেকে বেরোনোর সময় দু’জন কর্মচারীকে বলতে শুনলেন , “আগে সেমিনার হলেই ফ্লুরিস থেকে প্যাকেট আসত , করোনা সেটাও কেড়ে নিল !”

আপনার মতামত:-