Home » রম্য রচনা » লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ৩

লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ৩

নিলয় বরণ সোম

ক -বাবু , কলকাতার একটি কেন্দ্রীয় আধা সরকরি অফিসের সিনিয়র অফিসার। রবীন্দ্রসংগীত প্রেমী শ্রীমতি ক ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। তার অফিসেও অনেক ক’টি চরিত্র আছে. সবার আগে সেকশন অফিসার আদিনাথ ঘোষালের কথা বলতে হয়। এছাড়াও অফিসের না চরিত্র , ব্যক্তিগত বন্ধু , পাড়ার লোকেরা অনেকেই ভিড় করেন তার দৈনন্দিন জীবনে। লক ডাউন ও আনলক ওয়ান চলা কালীন ক -বাবুর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা লিপিবদ্ধ করা আছে এই লেখায় । বলা বাহুল্য, এ লেখায় সব চরিত্র কাল্পনিক।

পড়ে নিন লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ১

লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ২

11.04.2020.

ক- বাবুর আজ সকাল থেকেই মনে ফুর্তি I কাল একটু ভয়ে ভয়ে ছিলেন , তার জন্য তৈরি ‘হোম মেড মাস্কে : তার স্ত্রী রত্ন ‘ আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি’ কিংবা ; চোখের আলোয় দেখেছিলাম ‘ এই জাতীয় কিছু সেলাই করে বসেছেন কিনা I কিন্তু না , সৌভাগ্যবশত , সেসব কিছু করেন নি তিনি I বাস্তবিকই , ওরকম ডিজাইনার মাস্ক পরে দোকান বাজারে যাওয়া ক- বাবুর পক্ষে বাস্তবিকই বিশাল চাপের ব্যাপার হত I
রাত্রে শুতে যাবার আগে সোশ্যাল ডিসটেন্স বজায় রেখেও ক- বাবু শ্রীমতী ক- কে যথেষ্ট আবেগঘন উত্তাপ দিলেন , তার উত্তরে শ্রীমতী ক ‘এমন দিনে তারে বলা যায় ‘ গানটির দু ‘কলি গেয়ে শোনান I
আজ সকালে একটু দেরি করে উঠলেন ক- বাবু । বেশ কিছুদিন আর বাইরে যাওয়ার কোন ব্যাপার নেই – রেশন বাজার ঘরে মজুত I
ডিকশনারি আর ল্যাপটপ নিয়ে একটু আয়েস করে বসলেন I আধা সরকরি সংস্থাতে যোগ দেওয়ার আগে একটি বেসরকারী স্কুলে কিছুদিন চাকরি করেছিলেন তিনি , তার সেই শিক্ষক সত্তা আবার জেগে উঠল I
হাতের কাছের গিনিপিগ, স্বীয় পুত্রকে ডেকে সোৎসাহে লক ডাউন , লক আপ , লক আউট ইত্যাদি শব্দ বন্ধের ব্যুৎপত্তিগত ও ব্যবহারগত অর্থ তিনি বোঝাতে লাগলেন I ছেলের কিন্তু অদম্য ইচ্ছে ,আজকে বাবার ল্যাপটপটির দখল নেওয়া I সেই মহৎ উদ্দেশ্যের জন্য বাবার এটুকু অত্যাচার সে সহ্য করছিল I
বাবা ও ছেলের এই একাডেমিক কাজকর্ম, বাড়িতে যেটিকে ‘স্টাডি রুম ‘ বলা হয় , সেখানে চলছিল।
একটু পরে এককাপ চা নিয়ে শ্রীমতী ক -এর প্রবেশ I
টেবিলে কাপ প্লেট রাখতে রাখতে উনি বললেন , “লক সম্বন্ধে এত জ্ঞান নিশ্চয়ই ভাল , তবে ঘুমোতে যাওয়ার আগে গেটে তালা লাগানো আছে কিনা দেখে নেওয়া আরেকটু ভাল না ? কাল কিন্তু বাইরের দরজা খোলা ছিল!”
ক-বাবু কোনো জবাব না দিয়ে গম্ভীর মুখে প্লেটে রাখা থিন এরারুট বিস্কুটে কামড় দিলেন I

14.04.2020.

সকাল দশটায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনে ক -বাবু জেনে গেছেন , লক ডাউন বেড়ে গেছে। আজ পয়লা বৈশাখ হলেও মানুষের মনে সে আনন্দ নেই। অন্যান্য বছর সাধারণত এপ্রিলের ১৫ তারিখে পয়লা বৈশাখ পরে, সুতরাং অন্য বছরগুলিতে অফিসেই কাটে পয়লা বৈশাখ। রাত্রে শুধু ভাল মন্দ খাওয়া হয় , আর একটু মনের মতন গান শোনা, আত্মীয় -বন্ধুদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় I এবার লক ডাউনের মধ্যে ,পয়লা বৈশাখের দিনটিতে আবার বাবাসাহেব আম্বেদকরের জন্মদিন উপলক্ষে সরকারী ছুটি , সুতরাং ওয়ার্ক ফ্রম হোমের ঝামেলা নেই I
তা ক বাবুর হল কি ,সকালে স্নান করতে করতে হঠাৎ একটা ছড়া মনে মনে বানিয়ে ফেললেন I ভারী আহ্লাদ হল তার। আর্কিমিডিসের মত ‘ইউরেকা ইউরেকা বলে ‘ বাথরুম থেকে বেরোলেন না বটে , কিন্তু স্নান শেষ হতেই , ডায়েরিতে লিখে ফেললেন তিনটি লাইন :
“ভাইরাস করোনা
লোকজন ধরো না
তার চেয়ে মরো না “
সাহিত্যের সমঝদার হওয়া সত্বেও শ্রীমতী ক- কে ছড়াটা দেখানোর সুযোগ হল না , কারণ খাবারের বাহুল্য না থাকলেও উনি আজ ছেলের ফরমায়েশে ছানার পায়েস রাঁধতে ব্যস্ত , মুখে গানের কলি , “নাই, রস নাই !”
অগত্যা সৃষ্টিসুখের উল্লাসে ক -বাবু বন্ধুদের যাবতীয় হোয়াটস্যাপ গ্রূপগুলোতে , অর্থাৎ পাড়ার , স্কুলের , কলেজের বন্ধুদের গ্রূপগুলোতে , এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনি গোষ্ঠীতে পোস্ট করে দিলেন I অফিসের গ্রূপে ইচ্ছে করে দিলেন না , তার পদমর্যাদা ও দপ্তরী ভাবমূর্তির সঙ্গে ব্যাপারটা খাপ খায় না বলে। তবে ছড়াটির নিচে নিজের নাম লিখে চিহ্নটি দিতে ভুললেন না I
ওঁর এই ছড়াটি যে ভাইরাল হয়ে দিকে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে সেটা ক -বাবুর নজরে এল অফিসের সহকর্মী অদিতির হোয়াটস্যাপ থেকে। ‘স্টে হোম ‘বলে অদিতি তার আল্ট্রা মডার্ন রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সের ছবিটিকে ডিপি বানিয়ে , অনেকগুলো দুষ্টু দুষ্টু ইমোজির সঙ্গে ক- বাবুর ছড়াটা তার সান্ধ্য মেসেজে পাঠিয়েছে I তবে ক বাবু লক্ষ্য করলেন , ছড়াটির নীচে লেখা , ‘সংগৃহীত’!

17.04.2020.

আজকে ক- বাবুর মন খারাপ। সারাদিন ফেসবুকে ওঁকে ট্রোল্ড হতে হয়েছে।
ব্যাপারটা কিছু নয়। কলেজে ক -বাবুর প্রাণের বন্ধু ছিল শৌভিক , এখন আমেরিকায় থাকে। লক ডাউনের বাজারে সেও গৃহবন্দী। আজ সে ভিডিও কল করেছিল -অনেকক্ষন গল্প হল।
তারপর ফুর্তির চোটে দু’বছর আগে শৌভিক কলকাতায় আসার পরে বাড়িতে একটা পার্টি হয়েছিল ঘনিষ্ঠ ব্যাচমেটদের। তার কিছু ছবি ফেসবুকে আপলোড করেন।
ব্যাস , আধ ঘণ্টাও কাটে না – বিভিন্ন মন্তব্য আসতে থাকে ওর থ্রেডে – এই দেখুন ,কী রকম দায়িত্বজ্ঞানহীন লোক -সোস্যাল ডিস্ট্যানসিং না মেনে পার্টি করছে , কেউ মুখোশ পরে নি।
একজন আবার ওঁকে সম্রাট নীরোর সঙ্গে তুলনা করলেন !
আরেকজন সমাজসেবিকা প্রশ্ন তুললেন , কত লোক খেতে পাচ্ছে না , তার মধ্যে এদের মোচ্ছব !
সবথেকে আশ্চর্যের হল , এদের অনেককে ক-বাবু চেনেন না – বন্ধুর বন্ধু বা কিছু একটা হবে।
রাগ করে ক-বাবু কিছু উত্তর দিল না , শুভাকাঙ্খী কেউ কেউ ব্যাপারটা পরিষ্কার না করলে আরো জঘন্য হত ব্যাপারটা। শেষ অব্দি হতাশ হয়ে উনি পোস্টটি তুলে নিলেন।
বিকেলে শ্রীমতী ক- এর কাছে এই দুঃখের গল্পটি করছিলেন উনি.I সব শুনে শ্রীমতী ক বললেন , “জানো তো , রবীন্দ্রনাথকেও এরকম কত অপমান সইতে হয়েছে সারাজীবন……”

19.04.2020.

20 তারিখ থেকে লক ডাউন আংশিক শিথিল হচ্ছে I সরকারি ও আধা সরকারী ক্ষেত্রগুলোতে, কোন কোন পদাধিকারীর ক্ষেত্রে উপস্থিতি আবশ্যিক ও স্টাফদের ক্ষেত্রে 33 শতাংশর উপস্থিতির ফরমান জারি হয়েছে।
এই খবরে ক- বাবুর অফিসের ড্রাইভার রহিম , বেশ খুশি I আসলে কমলাকান্তের অনুকরণে বলা যায় , গাঁজাখোরের যেমনি গাঁজার উপর টান , নব্য প্রেমিকের যেমন প্রেমিকার উপর টান , তেমনি ড্রাইভারের হল গাড়ির উপর টান। গাড়ি চালানো বন্ধ হলে ড্রাইভারের জীবনে আর রইল কী !
এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু যখন অধস্তন সুপারভাইজার আদিনাথ ঘোষালের ফোন পেলেন , ক -বাবু প্রমাদ গুনলেন। আদিনাথ ঘোষাল , ইংরেজিতে যাকে বলে ওয়েল মিনিং , ঠিক তাই। কিন্তু কাজে গড়বড় করতে আর সহজ বিষয়কে কঠিন করতে তার জুড়ি নেই।
প্রথামত সম্ভাষণ সেরে ,আদিনাথের আর্জি , ” স্যার একটা কিছু ব্যবস্থা করুন। “
-“বলুন “
– “স্যার , অবিনাশবাবু রিটায়ার করার পর ডিভিশনে কারো পোস্টিং হয় নি “
– ” হ্যাঁ আদিনাথবাবু , ইন্টারনাল ট্রান্সফার পোস্টিং হওয়ার আগেই তো সব বন্ধ হয়ে গেল !”
-” সেটাই বলছিলাম স্যার , কারো একটা পোস্টিং এর ব্যবস্থা করুন , না হলে খুব সমস্যা “
-“আপনার সমস্যা কি সেটা বলুন না !”
– ” আসলে স্টাফদের রোস্টার তৈরী করতে হবে তো ! আমাদের সেকশনের সবমিলিয়ে স্টাফ সংখ্যা 18 হওয়ার কথা , তাহলে 6 জন করে রোস্টার করতাম I কিন্তু এখন 17 জনের 33% কিভাবে কী করব ? শতকরা হিসেবে 5.6% আসছে যে স্যার !
ক-বাবু স্তব্ধ হয়ে রইলেন। এই সমস্যার সমাধান তার কাছে নেইI

আপনার মতামত:-