Home » বরেণ্য বাঙ্গালী » ভারতীয় ক্রিকেটে আলোর দিশারী

ভারতীয় ক্রিকেটে আলোর দিশারী

প্রিয়াশ্রী কর

সালটা ২০০০। সবে উদিত হয়েছে নতুন সহস্রাব্দের সূর্য আর ঠিক সেই সময়েই ‘অদ্ভূত আঁধার এক’ নেমেছে ক্রিকেটের বুকে! একশো কোটির আবেগ ছিঁড়ে খাচ্ছে ‘শেয়াল শকুন’ গড়াপেটাকারীর দল৷ কেউ বাদ নেই! ১৯৮৩-তে দেশকে জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসনে বসানো ঝকঝকে হাসি মুখটা আজ কান্নায় ভেঙে পড়েছে। টিভির পর্দায় সে দৃশ্য দেখেছে গোটা দেশ। তথাকথিত ক্রিকেটের ভগবানের বিয়ের ছবিতে পাওয়া গেছে কুখ্যাত বুকিদের উপস্থিতি। আরও ডজন ডজন নামী অনামী খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের গায়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে পাঁক ঘাঁটার দাগ।

ঠিক পাশাপাশি চলছে আরেকটা চলচ্চিত্র। যেখানে নির্দাগ, নিষ্কলঙ্ক বেহালার ছেলেটা ঠিক একই সময়ে দুনিয়া কাঁপাচ্ছে প্রতিভার দাপটে! কত ষড়যন্ত্র, কত কুচক্র যার বিরুদ্ধে চলে আসছে ১৯৯২ এর সেই শুরুর লগ্ন থেকে। জীবনের অমূল্য চারটে বছর অকারণে তার থেকে কেড়ে নেওয়ার পরও যে আবার পরিশ্রম, প্রতিভা ও অদম্য মানসিকতার বলে নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে স্বমহিমায়! বিগত তিনটে বছরে যার দাপটে ম্লান দেখাচ্ছে স্বয়ং তথাকথিত ভগবানকেও! পরপর শতরানের বন্যা যাকে এনে দিয়েছে নতুন নাম সউ-রান গান-গুলি! সাহারা থেকে পাকিস্তান, ৯৬-এ লর্ডস থেকে ৯৯-এ টনটন, ব্যাটিংয়ে বোলিংয়ে বারবার উঠে আসছে একটাই নাম!

পাশাপাশি এই দুটো সিনেমা তো চলতে দেওয়া যায় না! একটা সুপারফ্লপের পাশে একটা সুপারহিট চলতে দিলে অনেকের অপরাধ, অনেকের অক্ষমতা নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ছে যে! তাই রচিত হল এক নতুন চক্রান্ত। মিলিয়ে দিতে হবে এই দুটো সিনেমাকে। কালিমালিপ্ত, অপরাধের ভারে জর্জরিত, প্রতিভাহীন ধুঁকতে থাকা দলটার ভার চাপিয়ে দিতে হবে ওই অপ্রতিহত গতি তরুণের কাঁধে। সে ভার সামলাতে না পেরে নিশ্চয়ই সে ধ্বংস হবে! আর কোনোভাবে যদি সে অসাধ্যসাধন করতে পারে, তবে আজকের এই সিদ্ধান্তের জন্য প্রশংসা কুড়োবে কর্মকর্তারা।

কিন্তু আদি রসায়নবিদের পরিকল্পনা ছিল অন্যরকম। তাই এই দুটো সিনেমাকে মিলিয়ে দিতেই সেই তাঁর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় জন্ম নিল রূপকথা! ছেলেটা দায়িত্বে এসে প্রথমেই জঞ্জাল সাফ করতে হাত লাগাল। মহাশক্তিধর এক চৌম্বকীয় তরঙ্গ যেন দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত বয়ে গিয়ে আকর্ষণ করে নিল প্রতিশ্রুতিমান সব তরুণ প্রতিভাকে। নির্বাচকদের সাথে প্রতি মূহুর্তের রক্তক্ষয়ী লড়াই লড়ে লড়ে ছেলেটা একে একে দলে প্রতিষ্ঠা করল তাদের! চিরাচরিত প্রাদেশিকতা, নেপোটিজম, লবিবাজি লজ্জায় মুখ লুকোল। প্রায় অস্তিত্বহীন একটা দল মাত্র কয়েক মাসে হয়ে উঠল অপ্রতিরোধ্য! ঋজু মেরুদণ্ড ও প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা নিয়ে বদলে গেল তাদের শরীরী ভাষা! মাত্র এক বছরের মধ্যে এই দল নিয়ে সে ছেলে সদর্পে টেনে থামাল দিগ্বিজয়ী অপরাজেয় অস্ট্রেলিয়ার অশ্বমেধের ঘোড়া! দ্বিতীয় বছরে লর্ডসের বুকে ভারতের বিজয়পতাকাসম উড়ল তার গায়ের ভারতীয় জার্সি, যেন নীলরক্তের দুশো বছরের ঔদ্ধত্যের সমুচিত জবাব! তৃতীয় বছরে এল অগ্নিপরীক্ষা- বিশ্বকাপ! দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতের সোনার তরী দুর্বার গতিতে এগোল সবাইকে পেছনে ফেলে… কিন্তু না… শেষরক্ষা হল না… তীরে এসে তরী হঠাৎ ডুবল একশোকোটির অশ্রুজলে। কিন্তু ২০০০ এর পাঁকমগ্ন দলকে টেনে উঠিয়ে মাত্র তিন বছরে বিশ্বজয় করে স্বর্ণপদকের স্বপ্ন দেখানো এবং শেষপর্যন্ত রৌপ্যপদক এনে দিতে সক্ষম হওয়া, এ কি রূপকথা নয়?

চিরকালই ‘বিচিত্র এই দেশ’! তাই এতর পরও ছেলেটাকে কম লাঞ্ছনা, অপমান, নির্যাতন সহ্য করতে হয়নি! তার পরের পাঁচটা বছর সেই ইতিহাসেরই দলিল। বারবার আঁচড়ে, কামড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে ঘরশত্রু ও পরশত্রুর। আর বারে বারে ফিরে এসে প্রমাণ করেছে নিজেকে। মানুষ প্রশ্ন করেছে কেন এই অবিচার, আর কতবার নিজেকে প্রমাণ করতে হবে ওকে! ও কিন্তু প্রশ্ন করেনি। মেঘ মায়া, সূর্যই ধ্রুব এবং সূর্যের ধর্মই হল স্বমহিমায় প্রকাশিত হওয়া, তা সে যতবারই মেঘ এসে আড়াল করুক না কেন… এ কথাই ও স্বাভাবিকভাবে বিশ্বাস করেছে এবং প্রমাণ করেছে বারবার! হাজারবার রক্তাক্ত হবার পর আরও একবার! তাই ও হয়ে উঠেছে সংগ্রামের আরেক নাম, অবদমিতের আত্মবিশ্বাস, ন্যায়ের জয়ের প্রতীকী, সততার জ্বলন্ত রূপ যাকে নাকি শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দেশকে প্রতারণার প্রস্তাব দিতে কখনও সাহসই পায়নি শকুনেরা!

ইতিহাস সাক্ষী আছে যে ভারতের চরম সঙ্কট মূহুর্তে বারবার পূর্ব ভারতের আবেগপ্রবণ, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদানকারী এই জাতিটা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে উদ্ধার করেছে, দেশ যা কাল ভাববে, আজ তা নিজে ভেবে দেশকে পথ দেখিয়েছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের মুখোজ্জ্বল করেছে। দেশের সমাজ সংস্কারের প্রথম সূচনা, প্রথম নারীশিক্ষা, প্রথম সর্বধর্মসমন্বয়ের ডাক, প্রথম নোবেল, প্রথম অস্কার, প্রথম স্বতন্ত্র সরকার, প্রথম সেনাবাহিনী কী দেয়নি এই জাতটা! বিজ্ঞানে, শিল্পে, সাহিত্যে সবদিক থেকে দেশকে উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত করেছে! তবু বাকি দেশবাসীর থেকে বরাবরই পেয়েছে হিংসা, অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য! তার প্রেম/ক্ষমা নাম পেয়েছে দূর্বলতার, তার বিপ্লব/বিদ্রোহ নাম পেয়েছে সন্ত্রাসের!

আমাদের বর্তমান নায়কও তার নিজস্ব পরিসরে দেশের চরম দুর্দিন কাটিয়ে তাকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছে… মরা গাঙে যে বান ও এনে দিয়েছে, আজও সেই জলস্রোত দুকূল ছাপিয়ে বয়ে চলেছে ধরণীর বুক চিরে… ওর উত্তরসূরী, যার অধিনায়কত্ব প্রাপ্তির পর ওকে অসম্মানের বিদায় নিতে হল, তাকেও তো ও-ই আবিষ্কার করেছিল প্রতিভা চেনার সেই অবিশ্বাস্য চৌম্বকীয় শক্তিতে! কিন্তু তার প্রতিদান ছিল বড়ই নির্মম! ইতিহাসের অবিচার সকলই অবগত ছিল ও আর ওর ভক্তরা। তাই তো ওর একটা একটা জয়ের মধ্যে দিয়ে ওর ভক্তদের যেন জুড়োতো যুগ যুগান্তরের জ্বালা! ওর এক একটা বিদ্যুৎগতি শটে যেন লেখা থাকত ইতিহাসের সকল অবিচারকারীর ঠিকানা! ওর দুরন্ত ব্যাট থেকে ছিটকে বেরোনো বল মাঠের সীমানা পেরোনোর সাথে সাথে পেরিয়ে যেত অন্যায়ভাবে রুখতে চাওয়া অবিচারের প্রতীকস্বরূপ সকল গণ্ডি! তাই তো ওর ভক্তরা কখনও বা মুগ্ধ বিস্ময়ে বলে উঠত ‘আরে ও হল আমার বেঁচে থাকার মকসদ!’

আত্মবিশ্বাসপূর্ণ সেই সংগ্রাম আজও অব্যাহত আছে! ক’দিন আগেই ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ওর একটা motivational speech. সেখানে ওর মুখে শোনা গেল অবিস্মরণীয় কিছু জীবনের শিক্ষা যা কিনা ওর একান্ত বিশ্বাস। ওর কথায় ওকে ফুচকা বিক্রি করতে দিলেও ও সেই একই নিষ্ঠা নিয়ে করবে যা নিয়ে ও ক্রিকেট খেলত। কারণ ‘For your own self esteem, whatever you get to do, you must do it at your best!… You can not hide away from anything and be successful! You can not be in the dressing room and become the best player in the world! You have to be in the forefront, you have to take decisions and you have to take responsibilities! That is the only story of life in anything you do!… That’s how people will have faith in you…’ এটাই ওর বিশ্বাস! আর শেষে পাওয়া গেল healthy pride এর সেই চেনা ঝংকার…
‘When things are tough, they think we should dial Ganguly’s number’. ওর কথাটাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে গিয়ে আমি তো বলব Whenever things are tough in India, they have to dial Bengal’s number! এটাই বরাবর হয়ে এসেছে! এ যুগে সেটা ও আবারও প্রমাণ করল!

আপনার মতামত:-