Home » রম্য রচনা » লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ২

লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ২

নিলয় বরণ সোম

ক -বাবু , কলকাতার একটি কেন্দ্রীয় আধা সরকরি অফিসের সিনিয়র অফিসার। রবীন্দ্রসংগীত প্রেমী শ্রীমতি ক ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। তার অফিসেও অনেক ক’টি চরিত্র আছে. সবার আগে সেকশন অফিসার আদিনাথ ঘোষালের কথা বলতে হয়। এছাড়াও অফিসের না চরিত্র , ব্যক্তিগত বন্ধু , পাড়ার লোকেরা অনেকেই ভিড় করেন তার দৈনন্দিন জীবনে। লক ডাউন ও আনলক ওয়ান চলা কালীন ক -বাবুর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা লিপিবদ্ধ করা আছে এই লেখায় । বলা বাহুল্য, এ লেখায় সব চরিত্র কাল্পনিক।

পড়ে নিন লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ১

09.04.2020.

গতকাল -ক’- বাবুর বাজার অভিযানের একটি গল্প বলা হয় নি I আজ সেটা বলা যাক I বাজার করার আগে উনি একটি মুদি ও স্টেশনারি দোকানের কাছে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন I দোকানের সামনে পরপর বৃত্ত করা আছে , সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য I এমনিতে ভিড় ছিল না , একজন বৃদ্ধ কেনাকাটা করছিলেন, তার পিছনের বৃত্তে ক্লাস ওয়ান কি টুয়ে পরে এমন একটি বাচ্চা ও তার মা I
ছেলেটি মাকে জিজ্ঞাসা করল , ‘ মা , এগুলো কী ?”

মায়ের জবাব , ” These are circles – can you spell it baba ?”
ছেলেটি একটু ভেবে বলল , ” S, I, R, K, L, E “
মা জবাব করলেন ,” No , it is C-I-R-C-L- E . These round shapes are called circles.
ভাবলাম , লক -ডাউনের কল্যানে ছেলেটির হাতে কলমে জ্যামিতি ও ইংরেজি দুটোই শেখা হচ্ছে , মন্দ নয়I
কৌতুহূলী ছেলেটির প্রশ্ন , “Mamma , moon is also round. Then moon is also a circle , Maa ?
মাও ইংরেজিতেই চালিয়ে গেলেন , ” No , Moon is not always a circle. Only Purnima Moon is a circle.”
লাইনের প্রথম বৃদ্ধ ভদ্রলোক লম্বা লিস্টি নিয়ে এসেছেন, সুতরাং শিশুপাঠ চলতেই থাকল I

-‘ What is Purnima Moon Mamma ?”
ভদ্রমহিলা পূর্ণিমার চাঁদের মানে যে ঝলসানো রুটি জানেননা নিশ্চিত , উনি এর ইংরেজিটাও জানেন না I আর পাকামি করে ফুল মুন বলে দিলে ভদ্রমহিলা সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং ভুলে গিয়ে ওকে অর্ধচন্দ্র দিতে পারেন, এই ভয়ে ক- বাবু চুপচাপ রইলেন I
মায়ের যুদ্ধ তখন অব্যাহত , ” Fifteen fifteen days the moon becomes a big round – like this , It is called Purnima Moon.”
ছেলের জবাব , ” Is it like a round plate , থালা ? “
মা খুশী হলেন , ” Now you are right Sona !”
ক বাবু উঁকি দিয়ে দেখলেন , বৃদ্ধ এবার ওয়ালেট থেকে টাকা বের করছেন I

ছেলেটির উৎসাহ কিন্তু কমে না , এবার মাতৃভাষায় , ” মা , মুন যদি থালার মত হয় , তাহলে তুমি যে বল বাবার অফিসের শ্রাবন্তী আন্টির মুখ থালার মত , আন্টি কী তাহলে মুনের মত দেখতে ?”
ছেলেটির ডিডাক্টিভ লজিকের ক্ষমতায় ক বাবু খুশি হলেও মা বোধহয় খুশী হন না I
বলেন , ” পড়ার কথা তো কিচ্ছু মনে থাকে না , এসব তো ঠিক মনে থাকে ! এখন মাস্ক পরে আছিস বলে, নাহলে তোকে সবার সামনে চড় মারতাম !”
ভদ্রমহিলা এত রেগে গেছিলেন , যে বৃদ্ধ ভদ্রলোক দাম চুকিয়ে চলে গেছেন , খেয়াল করেন নি I
ক বাবু বললেন , ” ম্যাডাম , আগের সার্কেলটাতে চলে যান !
এবার ক বাবু ঘড়িতে দেখলেন , আটটা পাঁচ – দশ মিনিট কেটে গেল লাইনেই I

10.04.2020.

ক-বাবুর স্ত্রী আজ হাসিমুখে বললেন , ” জানো ,আজ বাড়ির সবার জন্য মাস্ক বানিয়েছি নিজের হাতে I তোমারটা পরে দেখাব , দারুন লাগবে তোমায় পরলে ! এখন এক কাজ করো না, আমি আমার মাস্কটা পরছি , তুমি একটা ভাল করে কাভার পিকচার করে দাও না , ফেসবুকে আপলোড করব !

ক -বাবু বললেন,”এ আবার কী খেয়াল ? এরকম ছবি দেবে কেন ?”
শ্রীমতী ক বললেন , “এটি এ সময়ের প্রতীক I এই ছবি তুলে আমি সমাজের প্রতি একটি বার্তা দিতে চাইছি আর করোনা যুদ্ধের সৈনিকদের প্রতি সহমর্মীতা দেখতে চাইছি I “

ক -বাবু ভাবলেন , কথা বাড়িয়ে কাজ নেই , ড্রয়িং রুমে যেদিকে ছবি তুললে বেশি আলো আসে , সেদিকে বসতে বললেন I
স্ত্রী বললেন ,” আমি উল্টোদিকের সোফাটাতেই বসব I”
ক বাবু বললেন , “সেদিকে আলো কম হবে না ?”
স্ত্রী বললেন , “আসলে এখন তো খুব আলোকোজ্জ্বল সময় নয় ! আর এদিকে বসলে , আমার পেছনে রবীন্দ্রনাথের ছবিটা দেখা যাবে I এই কঠিন সময়ে উনিই আমাদের বল , ভরসা I

ক-বাবু আরেকটা কারণ আবিষ্কার করলেন। যেদিকটাতে আলো বেশি , সেখানে পেছনের দেয়ালে বাবা লোকনাথের ছবি। আর যেদিকে শ্রীমতী ক বসতে চাইছেন ,তার পেছনে রবীন্দ্রনাথের ছবি I বাবা লোকনাথ রণে বনে জঙ্গলে স্মরণীয় হলেও , ফেসবুক আপলোডের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ শ্রেয়তর I

তবে শ্রীমতী ক যে রবীন্দ্রনাথ নিবেদিত , বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গান তার প্রাণের জিনিস , সেকথা সত্যি I একেক সময়ে একেকটা গান ওঁকে ভর করে। একবার যেমন প্রচণ্ড দাবদাহে উনি গেয়ে উঠেছিলেন ,: “আজ জোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে !” এই সেদিনও ,ঘর অন্ধকার করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রদীপ জ্বালাতে জ্বালাতে উনি গেয়ে উঠেছিলেন , “হিমের রাতে ওই গগনের দীপগুলিরে …”

সে যাই হোক , ফটো সেশন ভালোই হল I শ্রীমতী ক এমনিতেই সুন্দরী , তার উপরে কালচারাল টাইপ , সুতরাং একঘন্টার মধ্যে প্রচুর লাইক পরে গেল , এক একটি মন্তব্য ক-বাবুকে শুনতেও হল Iতবে যে জিনিসটা ক -বাবুকে ভাবাচ্ছে সেটা হল , ওঁর স্ত্রী নিজের মাস্কে সুন্দর করে সূতোর কাজ করে লিখে রেখেছেন ,” আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল “- এই অব্দি ঠিক আছে I কিন্তু ক -বাবুর মাস্কে উনি সেলাই করে কিছু লিখেছেন ? লিখলে , কী লিখেছেন ?

আপনার মতামত:-