রবীন্দ্রনাথের স্বদেশভাবনা ও মানবতাবোধ

শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার

রবীন্দ্রনাথের স্বদেশভাবনা নিয়ে ভাবতে বসলে অনেকগুলি স্তরকে একসাথে নিয়ে বিচার করতে বসতে হবে।বিষয়টি   বহুমাত্রিক ভাবনার মিশ্রণে জারিত বলে তাতে স্ববিরোধিতারও অভাব নেই। তাঁর স্বদেশভাবনা যেমন রাজনৈতিক চিন্তা, তেমনি সমাজভাবনা-নির্ভর। আবার আবাল‍্যের সামন্ততান্ত্রিক পঠভূমি আর তার সাথে ঔপনিষদিক নির্লিপ্তি রবীন্দ্রনাথের মনোজগতে এক বিরাট পরিধি রচনা করেছে।  প্রথাগত কলোনিয়াল পাঠাভ‍্যাসের বাইরে তিনি ভারতবর্ষীয় ইতিহাসের উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন  যা আসলে প্রাচীন ভারত, সনাতন ভারত। বর্ণাশ্রমকে তিনি অস্বীকার করতে পারেননি যেমন আবার একথাও তিনি স্পষ্টভাবে লিখে দেখান যে সেই ভারতের মূল চরিত্র সমাজপ্রধান, রাষ্ট্রপ্রধান নয়। তাই হয়তো বিশ্বভারতীর পাশাপাশি শ্রীনিকেতনের মধ‍্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন পল্লিপুনর্গঠন ও উন্নয়ন বিষয়ক আধুনিক চেতনাকেই।

ভারতে ইংরেজ শাসনের সদর্থক ভূমিকায়  রামমোহন -বিদ্যাসাগর থেকে ব্রাহ্মসমাজের শীর্ষস্থানীয় এলিটদের চোখে এদেশে ইংরেজের  শিল্প-সাংস্কৃতিক ও আধুনিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতা-রূপটিই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছিল জালিয়নওয়ালাবাগের আগে পর্যন্ত।  প্রসঙ্গত উল্লেখ‍্য সমাজতন্ত্রের পুরোধা কার্ল মার্কস ভারতে ইংরেজ-প্রবর্তিত আধুনিক ব্যবস্থার পত্তন, স্থবির সনাতন সমাজ ভাঙা ইত্যাদি প্রসঙ্গে সাধুবাদ জানিয়েও ভারতে উপনিবেশবাদী ইংরেজ শাসন-শোষণের ভয়ংকর রূপটির সমালোচনা করতে ভোলেননি এবং এ-অবস্থা থেকে ভারতীয়দের সংগ্রাম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছিলেন।

ভারতে নবজাগরণের প্রাথমিক পর্বে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করা,  বিধবা বিবাহ প্রবর্তন থেকে শিক্ষা বিস্তারের প্রচেষ্টা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য (অবশ্য এসবই ছিল হিন্দু সমাজের সংস্কার প্রচেষ্টা); এগুলোই মূখ‍্য ছিল। অপরদিকে আগ্রাসী বিদেশি  শাসক-শোষকের বিরুদ্ধে, পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকায় বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া (নীলবিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ  প্রভৃতি) গণচেতনার উন্মেষ ঘটেনি। এই পটভূমিতেই  রবীন্দ্রনাথের জন্ম ও বেড়ে ওঠা।

রবীন্দ্রনাথ বিলেতে অবস্থানরত বড়ো ইংরেজের ভারত বিষয়ক হিতব্রতা রূপকে সম্মান জানিয়েছেন আগে  ঔপনিবেশিক শোষক ইংরেজকে চিনতে পেরেছেন পরে, পরিণত বয়সে এসে। রবীন্দ্রনাথকে সমণ্বয়সাধনার তত্ত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উপনিবেশবাদী শোষক প্রমাণ করেছে যে কখনো উপনিবেশকে স্বদেশ হিসেবে ভাবে না।বাল‍্যের শিক্ষার কারণে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের ভক্ত রবীন্দ্রনাথ দেখতে শিখেছেন  ‘য়ুরোপের প্রদীপের মুখে শিখা জ্বলিতেছে। সেই শিখা হইতে আমাদের প্রদীপ জ্বালাইয়া লইয়া আমাদিগকে কালের পথে আর একবার যাত্রা করিয়া বাহির হইতে হইবে।

’কিন্তু তখনো রবীন্দ্রনাথ ভেবে দেখেননি যে, পাশ্চাত্য সভ্যতার জ্ঞান-বিজ্ঞান সমৃদ্ধ সংস্কৃতি থেকে আধুনিক চেতনা গ্রহণ আর উপনিবেশবাদী শাসককে শোষকের আসনে বসিয়ে রেখে তাদের সাংস্কৃতিক সম্পদ গ্রহণ এক বিষয় নয়। জনগণমনঅধিনায়ক আসলে সেই  ‘ছোটো ইংরেজ’ অর্থাৎ ভারতে অবস্থানকারী শাসক ইংরেজ যে ভারতের সম্পদ লুন্ঠন করে বাজারে মুনাফা করে এসেছে এতদিন। রবীন্দ্রনাথ অনেক পরে ইংরেজদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে  লিখে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন ঠিকই কিন্তু তা উনিশ শতকের শেষদিক থেকে। 

বস্তুত রবীন্দ্রনাথের স্বদেশভাবনায় স্বাদেশিকতার সুচিন্তিত রূপ প্রকাশ পেয়েছে বঙ্গভঙ্গের সময়ে  এসে।  এখানে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা সমাজভাবনার রূপ নিয়ে প্রতিফলিত। তাঁর ভাষায় ‘মধ্যযুগে পড়ে থাকা’ গ্রামের সর্বতোমুখী উন্নয়ন ও পল্লিপুনর্গঠন প্রধান বিবেচ্য বিষয়। স্বদেশবন্দনায় তিনি  রচনা করেছেন   ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘ও আমার দেশের মাটি’, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’, ‘সার্থক জনম আমার’, ‘বাধা দিলে বাধবে লড়াই’ ইত্যাদি। তবুও সামগ্রিকভাবে এই সব রচনাগুলিকে  উন্নততর প্রাদেশিকতা বলা গেলেও সম্পূর্ণ ভারতীয়করণের অভাব রয়েই গেছে।

আসলেএ আন্দোলন উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমান বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। সাম্প্রদায়িক ঐক্য রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক ভাবনায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল বলে তিনি সেই ঐক্য বাস্তবায়িত করতে চেয়েছেন জাতীয় জীবনের নানা খাতে। চেষ্টাও কম করেননি তাঁর লেখায় ও কাজে। গ্রামীণ ভারত ও প্রগতিশীল ভারতের মধ‍্যে ব্যবধান দূর করতে রবীন্দ্রনাথ যে-পথ অবলম্বন করেন অর্থাৎ অর্থনৈতিক দিক থেকে স্বনির্ভর পল্লিসমাজ গঠন তা ছিল সীমাবদ্ধ বৃত্তে, কবির ভাষায় সমগ্র দেশের জন্য ছোট একটি মডেল হিসেবে পরীক্ষা।

এর মূল ভিত্তি ছিল জীবিকাভিত্তিক সমবায়নীতি, কুটিরশিল্প ও ক্ষুদ্রঋণ সহায়তা (কৃষি ব্যাংক বা ‘সামাজিক ব্যবসা’ ছিল না)। চরিত্র বিচারে এটা সংস্কারবাদী ব্যবস্থা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন, এ পন্থায় গ্রামীণ অর্থনীতির পুরুজ্জীবন সম্ভব। সম্ভব গ্রামের আধুনিকায়ন এবং আদর্শ পল্লিসমাজ গড়ে তোলা।বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে  ‘বিলেতি বর্জন’ উপলক্ষে পরবর্তীকালে গরিব মুসলমান জনতার ওপর অসহযোগীদের জবরদস্তির সমালোচনা করে, যে-জবরদস্তি শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সংঘাতে পরিণত হয়। ঘরে বাইরে উপন্যাসে এ-ঘটনার কিছুটা পরিচয় মিলবে। কিন্তু অসহায় রবীন্দ্রনাথ সন্দীপ চরিত্রটির মাধ‍্যমে স্বদেশীনেতার আসল চেহারাটাও সাথে সাথে দেখতে পান ও আমাদেরও দেখান।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মানবতাবাদী চেতনার রবীন্দ্রনাথকে  তাড়িত করেছিল। এরপর আমরা দেখি পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডে রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদ, নাইটহুড খেতাব বর্জন, গান্ধী-চিত্তরঞ্জনকে দিয়ে প্রতিবাদ সভা আহবানের ব্যর্থচেষ্টার মতো ঘটনাবলি।রবীন্দ্রনাথের ‘বড়ো ইংরেজ ছোট ইংরেজ’ ধারণা সত্ত্বেও স্বদেশি আন্দোলনের পক্ষে শব্দধ্বনির দামামা বাজাতে রবীন্দ্রনাথ যে কার্পণ্য, করেননি তার প্রমাণ ধরা রয়েছে তাঁর কবিতায়, প্রবন্ধে, চিঠিপত্রে।  চিন্মোহন সেহানবীশ প্রণীত ‘রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবীসমাজ’ গ্রন্থেআমরা দেখি রবীন্দ্রনাথ রাজনীতি ক্ষেত্রে সহিংসতা তথা গুপ্ত হত্যাকান্ডের পক্ষপাতী ছিলেন না।

কিন্তু শাসক শ্রেণির চরম নির্যাতন, অন্যায় ও দমননীতির বিরুদ্ধে ঠিকই সোচ্চার হয়েছেন, যা বিপ্লবীদের প্রেরণা জুগিয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর মতো করে বিপ্লবীদের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন তাঁর রচনায়। কিন্তু হত্যার রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন না। শাসকবিরোধী রবীন্দ্রনাথকে আমরা যখন পাই তখন তিনি প্রবীণতম। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ শাসকের উদ্দেশে তখন  স্পষ্টভাষায় বলেন : ‘দন্ড প্রয়োগের অতিকৃত রূপকে আমি বর্বরতা বলি।’ শাসক শ্রেণিকে ‘বর্বর’ আখ্যা দিয়ে বলেন যে, এ হিংস্রতার অবসান না ঘটলে তিনি ‘নিচে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করবেন’।

স্বভাবতই এ রবীন্দ্রনাথের পক্ষেই সম্ভব ‘দানবের সাথে সংগ্রামের জন্য ডাক পাঠানো’ কিংবা ঘোষণার মতো উচ্চারণ ‘দামামা ঐ বাজে/ দিন বদলের পালা এল গোড়োযুগের মাঝে।’ এ-প্রসঙ্গে শুধু কবিতা নয়, পাঠ অপরিহার্য কালান্তরে সংকলিত অসাধারণ প্রবন্ধগুলো। বিষয় শাসকবিরোধতা, হিন্দু-মুসলমান ঐক্য, সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন ও উদ্ধত ধনগরিমা।

রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ ভাবনা পাই তাঁর তাসের দেশ নাটিকার বক্তব্যে। রবীন্দ্রনাথ যে সাম্রাজ্যবাদী শাসক শক্তির নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা ও শাসন-শোষণ সম্বন্ধে সচেতন থেকেই প্রতিবাদী হয়ে উঠে একদিন স্বীকার করে নিলেন যে- ‘য়ুরোপের বাইরে য়ুরোপীয় সভ্যতার মশালটি আলো দেখাবার জন্যে নয়, আগুন লাগাবার জন্যে।’ তবে রাশিয়ার চিঠি’র রবীন্দ্রনাথ যতটা আন্তর্জাতিক মননে ঋদ্ধ হয়ে উঠে সাম্রাজ‍্যবাদের কদর্য রূপটাকে প্রত‍্যক্ষ করতে পারেন ততটা দেশীয় নেতৃত্বের অসারতা তাঁকে রাজনীতি বিমুখ করে তোলে একইসময়ে।

জীবনের শেষ দশকের রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বদেশভাবনার রাজনৈতিক পর্যালোচনায় আশ্চর্য এক মানবতাবাদী যার পক্ষে বলা সম্ভব ‘মানুষকে মানুষ বলে দেখতে না পারার মতো সর্বনেশে অন্ধতা আর নেই। এই বন্ধন এই অন্ধতা নিয়ে কোনো মুক্তিই আমরা পাব না’ (নবযুগ, ১৯৩৩)। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশভাবনার মূল সুরটি হল মানবতাবোধ। সংকীর্ণ দেশকালপাত্রের অনেক উর্দ্ধে উঠে এর সুর বাঁধা। 

Shyamaprasad Sarkar

Shyamaprasad Sarkar

শ‍্যামাপ্রসাদ সরকারের জন্ম কলকাতায়। পাঠভবন স্কুলের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে সাহিত‍্য সৃজনে উৎসাহ সেই ছাত্রাবস্থা থেকেই। পরবর্তী কালে সেন্ট জেভিয়ার্স সহ অন‍্যান‍্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ছোট বড় বিভিন্ন পত্রিকায় মূলতঃ কবি হিসাবে আত্মপ্রকাশ। সম্পাদনা করেছেন 'স্ফূলিঙ্গ' ও 'প্রত‍্যূষ' এর মত দু একটি ছোট পত্রিকাও। বর্তমানে মধ‍্যপ্রদেশে বেসরকারী ব‍্যাঙ্কে কর্মরত অবস্থায়ও সাহিত‍্যসাধনার ধারাটি বহমান। 'ঋতবাক', 'সব‍্যসাচী', 'বেদান্ত', 'প্রতিলিপি', 'বিবর্তন', 'সময়' প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিতভাবে সাহিত‍্যরচনায় রত। ব‍্যক্তিগতভাবে কবি পরিচয়টিই দিতে ভালোবাসলেও সাহিত‍্যের সবকটি ধারায় যেমন ছোটগল্প ও উপন‍্যাস ( মূলতঃ ঐতিহাসিক কাহিনী ও জীবনীমূলক উপন‍্যাস) রচনার জন‍্য পাঠকমহলে ইতিমধ‍্যেই সমাদৃত। সম্প্রতি কলকাতা বইমেলা ২০২০ তে প্রকাশিত হয়েছে শরৎচন্দ্রের জীবনী আশ্রিত একক উপন‍্যাস 'নিঠুর দরদী'। এছাড়াও 'রাই এর জন‍্য একাকী' নামে একটি উপন‍্যাস ও কবিতা সংকলনের ' ই- বুক' প্রকাশিত হয়েছে পয়লা বৈশাখ ১৪২৭ এ। বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন ' বিবর্তন পত্রিকা - সাহিত‍্য সম্মাননা ২০২০' তে 'নির্বাচিত কবিতা' সংগ্রহের জন‍্য ও প্রাঙ্গণ সাহিত‍্য পত্রিকা আয়োজিত শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলনের জন‍্য।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: