ডাক্তার, আগে নিজের অসুখ সারান..

অগ্নিভ সেনগুপ্ত

কিছু মৃত্যু আমাদের অনেক কিছু নতুন করে শিখিয়ে দিয়ে যায়​। পরীক্ষার সকালে প​ড়া ঝালিয়ে নেওয়ার মতো, সাব-কনশাসকে গলার কাছে এনে দেয়​, উগ​ড়ে দেওয়ার প্রস্তুতিতে। তেমনই, সুশান্ত সিং রাজপুতের আকস্মিক এবং দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যু, এবং ত​ৎপরবর্তী নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়ায় আমারও একটা গল্প হঠাৎ মনে প​ড়ে গেল​। অনেক ছোটবেলায় প​ড়েছিলাম​, ঈশপের উপকথায় সম্ভবত​।

ভগবান মানুষ বানালেন​, এবং প্রত্যেকের গলায় দুটো থলি ঝুলিয়ে দিলেন​। একটা থলি রইল সামনের দিকে, সহজেই দৃশ্যমান​। আর​-একটা, পিঠের দিকে, যা কখনোই নিজের চোখে পরবে না। মানুষ জিজ্ঞাসা করল​, “প্রভু, এই সামনের থলিটায় কি আছে?”

ভগবান উত্তর দিলেন​, “অন্যের দোষ​। সবসম​য়েই তোমার চোখের সামনে থাকবে।”

“আর​, পিছনের থলিটায়​?”

“তোমার নিজের দোষ​, কোনদিনই নিজে দেখতে পাবে না।”

সুশান্তের আকস্মিক মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যা, তার তদন্ত এখনো চলছে। কিন্তু, আমাদের অত্যুৎসাহী নিউজ চ্যানেল​, মিডিয়া হাউজ​, এবং অতি অবশ্যই সোশ্যাল মিডিয়া ইতিমধ্যে নিজেদের বিদগ্ধ রায় শুনিয়ে দিয়েছে – নিঃসন্দেহে আত্মহত্যা। কারণ​? অতি অবশ্যই, মানসিক চাপ​। ‘আহারে, বেচারাকে একঘরে করে দিয়েছিল সবাই মিলে’। ‘এ বাবা, কোন ব​ড় প্রোডাকশন হাউজের সিনেমাতেই সুযোগ দিত না’।

যেকোন বিখ্যাত অভিনেতার মৃত্যুর পরেই একটা ঢেউ ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়। যাঁরা সেই অভিনেতার সিনেমা তেমনভাবে দেখেনও নি, তাঁরাও জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যে সোশ্যাল মিডিয়া ভরিয়ে তোলেন​। সুশান্তের মৃত্যুর পরে অনেকে সদ্য ‘ছিঁচোরে’ বা ‘সোনচিড়িয়া’ দেখে ফেলেছেন​, ভালো লাগুক কি না লাগুক​। সোশ্যাল মিডিয়াতে বক্তব্য রাখতে হবে যে!

আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, ২০১৩ থেকে ২০১৯ অবধি সুশান্তের রিলিজড​ সিনেমা-সংখ্যা দশ​, যার প্রযোজনা করেছেন যশরাজ ফিল্মস​, আর​-এস​-ভি-পি-র মতো নামী প্রোডাকশন হাউজ​। ওনার শেষ সিনেমা কি জানেন​? ‘ড্রাইভ’​। প্রযোজকের নাম কি বলুন তো? করণ জোহর​।

অনেকেই বলবেন​, ছ​য় বছরে মোটে তো দশটা সিনেমা করার সুযোগ পেয়েছে। সামান্য ফিল্মমেকিং-এর অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, অমানুষিক সিডিউল না হলে একটা ২০-২৫ মিনিটের শর্ট ফিল্ম বানাতে (মানে, প্রি-প্রোডাকশন​, প্রোডাকশন এবং পোষ্ট-প্রোডাকশন মিলিয়ে) অন্ততঃ দুই থেকে তিনমাস সময় লাগে। এইবার, ঐকিক নিয়মে একটা আড়াই-তিন ঘন্টার সিনেমা বানানোর সম​য়টা হিসাব করে নিন।

অবশ্যই, ‘কাই-পো-চে’, ‘ধোনি’, ‘ছিঁচোরে’ এবং কিছুটা ‘শুদ্ধ দেশী রোমান্স’ বাদে বক্স অফিস সাফল্য আকর্ষণীয় ন​য়​। (‘পিকে’-র নাম দিলাম না, কারণ সুশান্ত সেখানে লিড রোলে ছিলেন না​)। কিন্তু, পেশাগতভাবে চূড়ান্ত সফল না হলেও উঠতি স্টারদের মধ্যে সুশান্ত অন্যতম ছিলেন​। তাহলে, হঠাৎ কি হল​? জানিনা।

অবশ্য​, নেটিজেনরা খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে ফেলেছেন​। বিচারের রায়ও বেরিয়ে গেছে – বলিউডি স্বজনপোষণ​-নীতি দোষী। এবং, সেই নীতির কর্ণধার – করণ জোহর​। সাথে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন সলমন খান​, রণবীর সিং, দীপিকা পাড়ুকোন​, সোনম কাপুর, আলিয়া ভাটের মতো কিছু সোনার চামচ নিয়ে জন্মানো তারকারা। শুনলাম​, করণ জোহর ও সলমন খানের নামে নাকি এফ​-আই-আর করা হয়েছে। হইত্য হেলুকাস​, ব​ড় বিসিত্র এই দ্যাশ​!

সোশ্যাল মিডিয়ায় এইরকম হুজুগে ঝ​ড় অবশ্য নতুন কিছু ন​য়​। তার সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত দেয় আমাদের মিডিয়া হাউজগুলো। প্রাইম টাইমে কিছু সবজান্তা মানুষ বিদগ্ধ​ বক্তব্য রাখেন​। যাঁদের সেই সুযোগ হয়না, তাঁরা বইয়ের তাকের সামনে চেয়ার পেতে বসে ফেসবুক লাইভে আসেন​। আর​, যাঁরা আর​-একটু ব্যস্ত​, ওইসব লাইভ​-টাইভের সম​য় নেই হাতে, তাঁরা মব​-জাজমেন্টে সাব্যস্ত হওয়া দোষীর প্রোফাইলে গিয়ে বাছা-বাছা দু-অক্ষর চার​-অক্ষর ছেড়ে আসেন​। হো গ্যায়া জাস্টিস​!

তারপর​, কিছুদিন যায়​, নতুন ইস্যু আসে, নতুন দোষী সাব্যস্ত করা হ​য়​, আবার ফলো দ্য প্রসেস​।

অথচ​, জ্ঞানত বা অজ্ঞানত​, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে আমরা প্রতিনিয়ত সেই দোষগুলোর অনুশীলনই করে চলি। যেমন​, বেশ কিছুদিন ধরেই বলিউডি স্বজনপোষণের বিরূদ্ধে এক অভিনেত্রী সরব হ​য়েছেন​। অথচ​, ওনার প্রোডাকশন হাউজের ফাইনান্সের দায়িত্ব দিয়েছেন নিজের ভাইকে। ওনার পি-আরের দায়িত্ব দিয়েছেন নিজের বোনকে। ওনার অভিনীত কোন চলচ্চিত্রে আনকোরা নতুন মুখও খুব​-একটা দেখা যায়না।

অনেকেই যুক্তি দেবেন​, যখন উনি বিখ্যাত হননি, সেই সম​য়ে ওনার পরিবার বা বন্ধুবান্ধব ওনার পাশে ছিল​। এখন বিখ্যাত হ​য়ে গেছেন বলে তো তিনি তাঁদের ভুলে যেতে পারেন না! ঠিক​, এবং এই যুক্তি সকলের জন্যেই প্রযোজ্য​।

এটাই মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, আগে নিজের ঘরটা সামলে নিয়ে তারপর সমাজের চিন্তা। আপনার পাড়ার মুদির দোকানীও তাঁর ক্লাশ ফাইভ ফেল ছেলেকে দোকানের দায়িত্ব দেয়​, পাশের বাড়ির মাধ্যমিক পাশ বেকার ছেলেটাকে ন​য়​। যোগ্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করে বাবা-কাকার সুপারিশে চাকরি পেয়েছেন​, এমন উদাহরণ আমাদের সমাজে খুব​-একটা বিরল ন​য়​। এহেন​ আমরাই যখন নেপোটিজ্ম নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় করি, তখন সেই থুতুটা ঘুরে হ​য়তো কোনভাবে আমাদেরই মুখেই এসে পরে।

কিন্তু, অতশত চিন্তা করার সম​য় কারই বা আছে? কোন ঘটনার পাঁচ পার্সেন্টও না জেনে পাঁচশো পার্সেন্ট কন্ফিডেন্স নিয়ে জনতার আদালতে বিচক্ষণ কমেন্ট অথবা খিস্তির ঝুড়ি উজাড় করতে তো আর মূল্য দিতে হয়না! তা ছাড়া, বেশ খবরের কাগজ, চাদর বিছিয়ে মুড়ি-চানাচুর​-চা সহযোগে জোট বেঁধে পরনিন্দা করতে কার না ভালো লাগে?

তালিবানী শাসনের সময়ে নাকি মব-জাজমেন্টে দোষী সাব্যস্ত হলে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলার নিয়ম ছিল। অ্যাড্রেনালিন-ক্ষরণ, মুমূর্ষুর বীভৎস চিৎকার, আর প্যারালালি বেশ-একটা রথের মেলার মতো পরিবেশ। আমরা তো সভ্য সমাজে বাস করি, তাই দুম করে মুগুর তুলে বসের মাথায় বসিয়ে দিতে পারিনা, পাথর ছুঁড়ে কারোর মাথাটা থেঁৎলে দিতে পারিনা। অগত্যা, সোশ্যাল মিডিয়া। সেখানে দায়ভার নেই, পরিণামের তোয়াক্কা নেই, শুধুই অফুরন্ত এন্টারটেইনমেন্ট। এই তো জীবন, কালিদা!

আর​, যদি সেই কাঠগ​ড়ায় কোন পাব্লিক ফিগার থাকেন​, তাহলে তো কথাই নেই! পাথর ছোঁড়ার আমেজটা বহুগুণ বেড়ে যায় তাহলে।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে স্বজনপোষণ​, উৎপীড়ন​, উপেক্ষার উদাহরণ তো খুব​-একটা কম নেই। ক্লাশের কালো ছেলেটার অপমানজনক নামকরণ করত তার যে সহপাঠী, সেই আজকে হ্যাসট্যাগিয়ে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার​-এর পোস্ট ছাড়ছে। গুণী অথচ অন্তর্মূখী সহকর্মীকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র অফিস পলিটিক্সের জোরে বছরের পর বছর প্রোমোশন পাওয়া ব​ড়বাবু আজকে সুশান্তের প্রতি অবিচার নিয়ে সরব হ​য়েছেন​। কলেজে যে দাদা সবচেয়ে বেশী ragging করেছিল​, সে আজ উৎপীড়ন নিয়ে প্রবন্ধ লিখছে।

আমরা তো জানি না যে আমরা মার্জারিন খাচ্ছি। যেসব সোশ্যাল ইস্যু নিয়ে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া ফিড ভরিয়ে তুলছি প্রতিনিয়ত​, সেই মার্জারিন তো আমরাও কম​-বেশী খেয়ে চলেছি। মাৎস্যন্যায় – ছোট মাছকে খাচ্ছে মাঝারি মাছ​, আর মাঝারিকে খাচ্ছে ব​ড়। আজকে আপনি করণ জোহরকে তুলোধোনা করছেন​, সুশান্তের উপরে অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন​। গতকাল আপনি ছিলেন করণ জোহর​, অন্য কেউ ছিল সুশান্ত​। তার আগের দিন হ​য়তো সে করণ ছিল​, অন্য কেউ সুশান্ত সেজেছিল​।

আমাদের সামর্থ্য কম​, তাই প্রভাব কম​। কিন্তু, দিনের শেষে আমার-আপনার​-করণ জোহরের কাঠগড়াটা একই!

কিছুটা এই বিষ​য়ের ভিত্তিতে ক্রিস্টোফার নোলানের একটা শর্ট ফিল্ম কিছুদিন আগেই আমার ফেসবুক টাইমলাইনে পোস্ট করেছিলাম​। এই প্রবন্ধেও জুড়ে দিলাম আপনাদের জ্ঞাতার্থে।

এই সূত্রে মোল্লা নাসিরুদ্দিনের একটা গল্প মনে প​ড়ে গেল​। মোল্লাসাহেব তখন বিচারক​। এক মহিলা তাঁর কাছে এসে বললেন​, “মোল্লাসাহেব​, আমার ছেলে দিনে আধ সের চিনি খেয়ে নেয়​। ওকে আপনি বারণ করুন​, আপনার কথা ঠিক শুনবে।” নাসিরুদ্দিন কিছুক্ষণ ভেবে বললেন​, “আচ্ছা, এক সপ্তাহ পরে আসুন​।” সপ্তাহ শেষ হলো, মহিলা আবার উপস্থিত​। নাসিরুদ্দিন বললেন​, “এক কাজ করুন​, আর এক সপ্তাহ পরে আসুন​।” সপ্তাহ গেল​, মোল্লাসাহেব আরো এক সপ্তাহ সম​য় নিলেন​। চতুর্থ সপ্তাহে মহিলা এলে মোল্লাসাহেব বললেন​, “আচ্ছা, আপনার ছেলেকে ডাকুন​।” মহিলার ছেলে এল​। মোল্লাসাহেব নির্দেশ শোনালেন, “শোন হে, দিনে আধ ছটাকের বেশী চিনি খাবে না।”

মহিলা অবাক হ​য়ে নাসিরুদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করলেন​, “মোল্লাসাহেব​, এই নির্দেশ আপনি প্রথম সপ্তাহেই তো দিতে পারতেন​। এতোদিন ঘোরালেন কেন​?” নাসিরুদ্দিনের উত্তর​, “ওকে নির্দেশ দেওয়ার আগে আমাকে তো চিনি খাওয়ার অভ্যাসটা ছাড়তে হতো!”

আমি-আপনি সামাজিক সমস্যা নিয়ে পঞ্চায়েত বসাচ্ছি, একজন ভিকটিম আর একজন দোষী নিজেরাই নির্ধারণ করে চোখা-চোখা বিশেষণ-সমেত আমাদের রায় শোনাচ্ছি। কিন্তু, আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে সেই দোষ থেকে আমরা মুক্ত তো? তা না হলে, কালকে আমাদেরও কিন্তু ওই দোষীর আসনে বসতে হতে পারে।

ভাবুন​, একটু ভাবা প্র্যাক্টিশ করুন​!

Agniv Sengupta

Agniv Sengupta

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অগ্নিভ সেনগুপ্ত লিখেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। সময়ে তার লেখা শুরু হল্যান্ডের হালহকিকত দিয়ে, এ ছাড়াও লিখেছেন আরও অন্যান্য সমকালীন বিষয়ে।

One thought on “ডাক্তার, আগে নিজের অসুখ সারান..

  • Avatar
    June 23, 2020 at 12:22 pm
    Permalink

    ডাক্তারের নিজের অসুখ ছাড়ানোর বক্তব্য পড়লাম।মুদ্রার অপর পিঠের একটা নান্দনিক রচনা।কিন্তু সব ক্ষেত্রে সহমত প্রকাশ করতে পারলাম না।
    সুশান্ত সিং রাজপুতের মৃত্যুর সরলীকরণ কি এত সহজে করা যায়? সে এত্ত গুলো ঘন্টা বিগ প্রোডাকশন হাউসের প্লাটফর্মে দর্শক বৃন্দের সামনে আসার সুযোগ পেয়েছে বা শেষ ছবি করণ জোহরের সাথে বলেই তার মৃত্যু ডারউইনের ফিটেস্ট না হওয়ার পঙক্তি তে জুড়ে দেওয়া যায়?
    না।যায়না।গাড়ি মার্সিডিজ হলেও ক্রমাগত ব্যাক গিয়ারে চাপ গাড়িকে পিছিয়ে দেবেই।চারটে চাকার সামনে না এগোনোর অবসাদ কিন্তু তার মহার্ঘতা কাটাতে পারেনা।
    রাজপুতের মৃত্যুর হয়ত অনেক কারণ বিদ্যমান কিন্তু তন্মধ্যে বলিউডের নোংরা পরিবেশটিও কিন্তু একটা ফ্যাক্টর।এটা ভুলে যাওয়া মোটেই ঠিক হবেনা।
    তবে এই যুবকের আত্মহননের ঘটনা তার মানসিক চাপ কাটিয়ে ব্যালান্স না রাখতে পারার মর্মান্তিক পরিণতি স্বরূপ অনুকরণ যোগ্য নয় কিন্তু এই মৃত্যুর সরলীকরণ করতে গিয়ে তার সুযোগ পেয়েও বেঁচে না থাকার অযোগ্যতাকে ইঙ্গিত করাটা বোধহয় মোটেই ঠিক হবেনা।

    Reply

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: