মাটি

তানবীরা তালুকদার

পাওলি দাম ও আদিল হুসেন অভিনীত “মাটি” (২০১৮) দেখলাম। শৈবাল ব্যানার্জী আর লীলা গঙ্গোপাধ্যায় এর পরিচালনায় অসাধারণ এক কাহিনী, অঢেল ভালবাসা দিয়ে বানানো সিনেমা। দেশপ্রেম, বাংলাদেশকে আঁকা হয়েছে গভীর মমতায়। দেশ ছেড়ে না এলে জানতেই পারতাম না, দেশহীন থাকার কি বেদনা। অসাধারণ অভিনয় করেছেন সবাই।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মেঘলা চৌধুরী, ইতিহাসে মার্স্টাস, দেশভাগ নিয়ে পি-এইচ-ডি করছেন, এসব যদি নাও দেখাতো তাও গল্পটা সমান উপভোগ্য হত। প্রত্যেকটা মানুষ তার নাড়ী জানতে চায়। এখানে (পড়ুন প্রবাসে) জন্ম হওয়া-বড় হওয়া আমাদের বাচ্চারা, দেশের জন্যে ব্যাকুল থাকে। আমরা একটা ইনফরমেশান দেয়ার আগে তারা সোশ্যাল মিডিয়া, নিউজ সব থেকে পঞ্চাশটা ইনফরমেশান আগেই জেনে বসে থাকে, কারণ একটাই, নাড়ীর প্রতি টান। তার জন্যে ইতিহাসবিদ হওয়াটা তত জরুরী কিছু না।

নিজেদের দখল হয়ে যাওয়া বাড়ি-ঘর দেখে, সেখানে বাস করা মানুষদের দেখে কি রকম প্রতিক্রিয়া হতে পারে সেই রূপটি বেশ বাস্তবসম্মত ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তবে বিরাট জমিদার না দেখিয়ে সাধারণ মানুষ দেখালে, গল্পটায় দ্যা নেক্সট ডোর ভাবটা আরও বেশি আসতো। শুধু জমিদারি ছেড়ে গেলেই বুঝি মন কাঁদে, কুঁড়েঘরের জন্যে কি মন আকুল হয় না? কত সহজে মানুষের পতাকা বদলে যায়, পাসপোর্ট বদলে যায়, পরিচয় বদলে যায়। একদিন যেখানে নিজের বসবাস ছিলো, সেখানে ঢুকতে ভিসা/পারমিশানের দরকার পড়ে!

তবে, শ্রুতিকটু কিছু জিনিস উল্লেখ না করলেই নয়। সামহাও কোলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চাশ বছরেও এই জিনিসগুলো আপডেট করে উঠতে পারে নি। এই গ্লোবালাইজেশেনের যুগে সময় এসেছে তাদের ডাটা হালনাগাত করার। “বাংলাদেশ” এখনও তাদের অনেকের কাছে হরহামেশাই পূর্ববঙ্গ। একদিন এক বন্ধুকে জিজ্ঞেসও করলাম, আচ্ছা, এই “পূর্ববঙ্গ” দেশটা কোথায় গো? গুগল ম্যাপে দেখাতে পারো? কোথাও তো খুঁজে পাই না। ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশে যারা জন্মেছি, আমাদের পুরো ছোটবেলাটা কেটেছে বাড়ির লোকদের মুখে, মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা, তাদের প্রাণ নিয়ে দৌড়াদৌড়ির গল্প শুনে, তাদের কাছে এই জিনিসগুলো বড্ড সেনসিটিভ, লাগে অনেক।

ছবির সংলাপ নিয়ে আরও একটু গবেষনা করার প্রয়োজন ছিলো, যত্ন নেয়ার দরকার ছিলো তো বটেই। ছবির বাংলাদেশি চরিত্রদের দিয়ে যে সংলাপ গুলো বলানো হয়েছে তাতে ইচ্ছে করে এমফেসিস দিয়ে যেভাবে আঞ্চলিক বাংলা বলানো হয়েছে, ঢাকা কিংবা বাংলাদেশের কথ্য ভাষা মোটেও সেটা নয়। বিশেষ করে একজন ডেপুটি কমিশনার (কূটনীতিক) কখনোই তার ডিউটিতে, আইছেন, গেছেন এধরনের কথা বলেন বলে আমার জানা নেই। বাংলাদেশ মানেই, খাইছেন, বইছেন নয়। বরং খাইয়া যাও বা বইয়া যাও বললে রিয়েলিটির কাছাকাছি শোনাতো হয়ত। তাছাড়া তারা যে ধরনের ধনী পরিবারের গল্প দেখিয়েছেন সেখানে এই ধরনের ভাষায় কথা বলা খানিকটা এবসার্ড তো বটেই তাও সব বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মানুষদের মুখ দিয়ে।

ভাষা একটা চলমান প্রক্রিয়া, এটা বির্বতিত হয়, যেখানে ঠাকুর্দা বাংলা ভাষা রেখে গেছেন, আজও সেটা সেখানেই দাঁড়িয়ে নেই। যেটা পশ্চিমবাংলার লোকদের ভাষায় “বাঙাল” ভাষা তার অস্তিত্ব শহরে তেমন নেই বললেই চলে। তবে বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায় তার নিজস্ব ভাষা আছে, আর সেটা পৃথিবীর কোথায় নেই? আমাদের দেশের প্রচুর আর্টিস্ট কোলকাতায় কাজ করছেন তাদের ভাষা ও কথা এরকম হবার কথা নয়। সেটা যদি তারা না’ও ধরে থাকেন অন্তত ইউটিউবে বাংলাদেশের কয়টা নাটক দেখে নিতে পারতেন।

হিন্দী সিরিয়ালের বিয়ের মত, সোনার গয়না পরে বিয়েতে মেহেন্দী লাগায় না। ফুলের গয়না পরার রীতি। সাধারণতঃ বিয়েকে বাংলাদেশে বিয়ে/বিয়া বলে, শাদী বলে না। এরকম একটা টপিকে সিনেমা বানানোর জন্যে চোখ কটকট করার মত দুর্বল গ্রাউন্ড ওয়ার্ক। জামিল ভাইরা কি করে এই বাড়ির অধিকারী হলেন সেই রহস্যও অজানাই রইলো।

সিনেমার গান গুলো অপূর্ব।

হৈচৈ’তে আছে, ইচ্ছে হলে দেখে নিতে পারেন, ওয়ার্থ অফ ওয়াচিং।

( মতামত সম্পূর্ণভাবেই লেখকের নিজস্ব )

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: