লক ডাউনে “ক” বাবু পর্ব – ১

নিলয় বরণ সোম

ক -বাবু , কলকাতার একটি কেন্দ্রীয় আধা সরকরি অফিসের সিনিয়র অফিসার। রবীন্দ্রসংগীত প্রেমী শ্রীমতি কএক ছেলে নিয়ে তার সংসার। তার অফিসেও অনেক ক’টি চরিত্র আছে. সবার আগে সেকশন অফিসার আদিনাথ ঘোষালের কথা বলতে হয়। এছাড়াও অফিসের না চরিত্র , ব্যক্তিগত বন্ধু , পাড়ার লোকেরা অনেকেই ভিড় করেন তার দৈনন্দিন জীবনে। লক ডাউন ও আনলক ওয়ান চলা কালীন ক -বাবুর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা লিপিবদ্ধ করা আছে এই লেখায় । বলা বাহুল্য, এ লেখায় সব চরিত্র কাল্পনিক।

28.03.2020.

‘ক’ বাবু ওয়ার্ক ফ্রম হোমের অছিলায় অফিস থেকে নিয়ে আসা ফাইল গুলোর উপর চোখ বুলাচ্ছিলেন। ওঁর স্ত্রী চোখ পাকিয়ে ওঁকে ওয়ার্ক এট হোমে লাগিয়ে দিলেন। টাস্ক নাম্বার ওয়ান – ডুমো ডুমো করে ঢ্যাঁড়স কাটা। উদাহরণ হিসাবে একটি স্ট্যান্ডার্ড সাইজ , চপিং বোর্ডের উপর রেখে দিলেন I কিছুক্ষন বাদে তদারকি করতে দেখেন টুকরোগুলো অসমান , কোনটি বড় , কোনটি ছোট। অসন্তোষ ব্যক্ত করতেই ‘ক’ বাবুর জবাব – ” হাতের পাঁচটা আঙ্গুল সমান নয় না , আর এতো লেডিজ ফিঙ্গার !”

03.04.2020

লকডাউনের বাজারে ‘ক ‘ বাবু সারাদিন মোবাইল নিয়ে বসে থাকেন, স্নান ইত্যাদি করার সময় ছাড়া I ডাইনিং টেবিলের উপরে মোবাইলটি রেখে উনি স্নানে যাবার তোড়জোড় করছেন। ওঁর বিংশতি বর্ষীয় পুত্রর মাঝে মাঝে অভিভাকত্বের সাধ জাগে। পুত্র ডেকে বলল , ” মোবাইল কেউ টেবিলের এত ধারে রাখে ? পড়ে গেলে ?
‘ক’ বাবুর জবাব , ” এতে তো ‘Samsung Edge’ লেখা আছে দেখছি !”

06.04.2020

‘ক’বাবু একটা আধা সরকারী সংস্থার ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন। এখন ওয়ার্ক টু হোম চলছে, আজকাল বেশিরভাগ কাজ অনলাইন, তাই অসুবিধে নেই। উনি রোজ সকাল দশটার মধ্যে স্নান করে, জলখাবার খেয়ে চুল আঁচড়ে, ফুল শার্ট , ফুলপ্যান্ট পরে কাজে বসে যান । জিজ্ঞাসা করলে বলেন,অফিসের পোশাকে না বসলে মেজাজটা আসে না। আজ তার ব্যতিক্রম দেখে শ্রীমতী ‘ক’কারণ জানতে চান। উদাস মুখে উনি উত্তর দেন, আজ তো মহাবীর জয়ন্তী, অফিস ছুটি।

07.04.2020

ক ‘ বাবু দেখলেন শ্রীমতী ‘ক’ কেমন অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন I জিজ্ঞাসা করলে বললেন , ওঁর নাকি প্রিয় বান্ধবী অম্বালিকার জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে I বিশদ জানতে চাইলে বললেন , ” অম্বালিকা , আমাদের স্কুলের মায়েদের গ্রূপের অ্যাডমিন , তাছাড়াও ও সব খোঁজ খবর রাখে I ভারত পাকিস্তান ঝামেলার সময় সৈন্যদের পজিশন অব্দি বলতে পারে , ক্রিকেট খেলার সময় ড্রেসিং রুমের গল্পগুলোও ঠিক জানে, এমন কানেকশান ওর ! আর এখন তো করোনা এক্সপার্ট ! ওর থেকেই সারা পৃথিবীর খবর গুলো পাই I “
ক বাবু বললেন ,” তোমার বন্ধুর এত গুণ তো জানতাম না , একটু আলাপ করিয়ে দিও, ভদ্রমহিলাকে কাল্টিভেট করতে হবে !”
শ্রীমতী ক বললেন , ” ও মা কী অসভ্য কথা !”
ক বললেন , ” এর মধ্যে বাজে কথা কী বললাম, কিন্তু তোমার উদ্বেগের কী আছে ?”
শ্রীমতী বললেন , ” কাল রাতেই ও হোয়াটসাপে জানালো , সরকার নাকি এমন আইন করেছে যে সরকারী অথরিটি ছাড়া কেউ করোনার আপডেট দেবে না ! খবর পেলে পুলিশ এরকম লোককে গ্রেফতার করতে পারে I কিন্তু ও তো আপডেট দিয়েই চলেছে !”
আমি বললাম , ” তোমার বন্ধু নিশ্চয়ই ফুটবল খেলত, ফরওয়ার্ড ছিল কিন্তু স্ট্রাইকার ছিল না , শুধু পাস্ বাড়িয়ে দিত , ওই অভ্যেসটা রয়ে গেছে I “
শ্রীমতী ক বললেন, ” তোমাকে কোনো কিছু বলে লাভ নেই , দেখি ওকে আমি ফোন করে ওয়ার্নিং দিয়ে দেই !”
শ্রীমতী ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই ‘ক’ বাবু আবার চায়ের কাপে চুমুক দিলেন I

08.04.2020

ক’ বাবু আজ অনেকদিন পরে বাজারে গেলেন। ভিড় আছে মোটামুটি, সবাই মাস্ক পরা।। এক ভদ্রলোক দেখলেন মাস্ক ও মাঙ্কি টুপি পরে বেরিয়েছেন। ভদ্রলোক বেশি সাবধানী, ক বাবু ভাবলেন।। ঠিক সেই মুহূর্তে, ভদ্রলোক মাস্কটি সরিয়ে রাস্তার মাঝখানে থুতু ফেললেন। কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। উল্টো দিকে থেকে আরেকটি ছেলে দেখলেন মোবাইল কানে কথা বলছে। মাস্ক টি কায়দা করে গলার কাছে নামানো, হাতে সিগারেট। এসব দেখে বিরক্ত হতেই এক তরুনীকে দেখে ভাল লাগল। বাড়িতে তৈরি কাপড়ের মাস্ক, সেটা বড় কথা নয়। জিন্স ও টপ পরা, মুখের মাস্ক ও কপালের টিপটি ম্যাচ করা। বৈচিত্রের সন্ধানে আরেকটু ঘোরার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সুবুদ্ধি জয়ী হল, বাজার নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন।

Nilay Baran Som

Nilay Baran Som

নিলয় বরণ সোমের জন্ম ১৯৬৫ সালে উত্তর পূর্ব ভারতের ত্রিপুরার সালেমায়I স্থায়ী বাসস্থান কলকাতায়I প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কর্মস্থল ত্রিপুরার বিভিন্ন মফস্বলে,উচ্চতর শিক্ষা কলকাতার দীনবন্ধু এন্ড্রুজ কলেজ ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে I কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরI ভারত সরকারের আয়কর বিভাগে ১৯৯০সাল থেকে কর্মরতI জীবিকাসূত্রে কলকাতা ছাড়াও চেন্নাই ও ডেপুটেশন সার্ভিসে আফ্রিকার দক্ষিণে বতসোয়ানায় কাজ করেছেনI লেখালেখি ছাড়া পড়াশুনা , আড্ডা, গান শোনা ও ভ্রমণে আগ্রহী। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকও লেখকের পছন্দের জায়গাI শৈশবে লেখালেখি শুরু করলেও কলেজ জীবনে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে বঙ্গ সাহিত্য সমিতির সভানেত্রী , বাংলার অধ্যাপিকা প্রয়াত মৈত্রেয়ী সরকারের উৎসাহে ও অভিভাবকত্বে ছোট গল্প লেখা শুরু হয়। বর্তমানে মুক্তগদ্য ও রম্যরচনায় ব্যাপৃতI ছাত্রজীবন ও পরবর্তীকালে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও বিভাগীয় সাময়িকী ও প্রবাসকালে পূজা সংকলনে লেখকের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে 'কলেজ স্ট্রিট পত্রিকায়, ২০০১ সালেI দীর্ঘ বিরতির লেখালেখি ২০১৬-১৭ সালে শুরু I২০১৮ ও ২০১৯ এ অনুস্টুপ পত্রিকার শারদ সংকলনে লেখকের দুটি মুক্তগদ্য ও ২০১৯ সালে ফেসবুক গ্রূপ ' শনিবারের আসরের' ২০১৯ পূজা সংকলনে একটি রম্যারচনা প্রকাশ পায় I ওয়েবজিন 'সময়.ইন ' এর কয়েকটি সংখ্যায় লেখকের রম্য রচনা স্থান পেয়েছেI সৃজনাত্মক সাহিত্যের পাশাপাশি আয়কর আইন সংক্রান্ত বিষয়ে লেখক লেখালেখি করেন।২০১৩ সালে বিভাগের 'ট্যাক্সপেয়ার ইনফরমেশন সিরিজে' যুগ্মলেখক হিসেবে 'Royalty and Fees for Technical Services' শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ পায়I ২০১৯ সাল থেকে বিভাগীয় ওয়েবজিন 'ট্যাক্সলোগ'-এ লেখকের লেখা প্রকাশিত হয়েছেI

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: