করোনা, বর্ণ-বিদ্বেষ ও বিরল প্রধানমন্ত্রী

তানবীরা তালুকদার

সফল ব্যবসায়ী ছিলেন তারপর দুই হাজার দুই থেকে সরকারের বিভিন্ন উচ্চপদে আসীন, প্রভূত ক্ষমতা, ডুবে যাওয়া দলকে নেতৃত্ব দিয় সরাসরি সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা, তারপর দুই হাজার দশ থেকে একটানা “প্রাইম মিনিস্টার” অফ দ্যা রয়্যাল নেদারল্যান্ডস, ডাচ ভাষায় “প্রিমিয়ে কিংবা প্রিমেই”। থাকেন একটি ফ্ল্যাটে, আমি জানি না, কোন দেশের ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যক্তি ফ্ল্যাটে থাকেন কি না। নেদারল্যান্ডসে মুম্বাইয়ের মত পাঁচ হাজার স্কোয়ার ফিট বা মিটারের ফ্ল্যাট আছে বলে শুনি নি কখনো। ডাচ সংবাদ মাধ্যমের ভাষায়, মডেস্ট এপার্টমেন্টে থাকেন প্রিমেই।

নিজেও টিভিতে বলেছেন, আমার ফ্ল্যাট খুব বড় নয়। কোন রকম সরকারী প্রটোকল তিনি তার ব্যক্তিগত জীবনে ব্যবহার করেন না। নিজের কফির দাম নিজেই দেন। দায়িত্ব পালনের সময় খরচ হওয়া যেকোন এমাউন্টের রিইমবার্স তিনি বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। নাচতে ভালবাসেন আর যেকোন কনসার্টে কিংবা পাব্লিক ইভেন্টে আর সকলের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন, নিজের টার্নের অপেক্ষা করেন। তিপান্ন বছর বয়সী মার্ক রুতে, ইউরোপীয়ান নেতাদের মধ্যে বলতে গেলে জনপ্রিয় ও সবচেয়ে বেশীদিন ধরে দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে নিয়মানুবর্তীতা ও আইনের প্রতি আস্থা রাখেন এবং তা প্রতিদিন তার কর্ম ও ব্যক্তিগত জীবনে মেনে চলেন।

মার্ক রুতে

সারা বিশ্ব অবাক তাকিয়ে রয়, দুই হাজার বিশেও গায়ের রঙের কারণে কেউ তাকে পিষে মেরে ফেলছে!। তাও যারা সারা পৃথিবীকে নেতৃত্ব দেয়ার কথা বলে খোদ তাদের দেশেই, তাদের শাসক বাহিনীর হাতে! জর্জ ফ্লইয়েড নর্থ ক্যারোলিনা, এমেরিকাতে জন্মগ্রহন করা একজন আফ্রিকান এমেরিকান যাকে পঁচিশে মে, দুই হাজার বিশে, বিশ ডলারের একটা জরিমানার জন্যে ঘাড় ভেঙে হত্যা করেছে।

জর্জ ফ্লইয়েডের মৃত্যুর প্রতিবাদে আমস্টার্ডামের ডাম স্কোয়ারে বিক্ষোভে পুলিশের বাঁধা দেয়া নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রিমেই বলেন, বিক্ষোভ, প্রতিবাদ গনতান্ত্রিক দেশের মানুষের গনতান্ত্রিক অধিকার। সেটা দেড় মিটার সোশ্যাল ডিসটেন্স মেইনটেইন করেও করা যায়। সোমবারে যা হয়েছে আমস্টার্ডামে তা মেনে নেয়া যায় না। এখন আমস্টার্ডাম আর রটারডামে প্রটেস্ট চলছে জর্জ ফ্লইয়েডের মৃত্যু আর ডাচ পুলিশের বিরুদ্ধে।

জর্জ ফ্লইয়েডের মৃত্যু নিয়ে মার্কিন সরকারের সাথে কোন যোগাযোগ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে রুতে বলেন, না, তিনি যোগাযোগ করেন নি। আর এমন ঘটনা নেদারল্যান্ডসেও ঘটে, তিনি নিজেই জানেন। মানুষকে তার ভবিষ্যত দিয়ে বিবেচনা না করে, তার অতীত দিয়ে বিবেচনা করা হয়, মানুষকে তার সামনে থাকা জায়গা দিয়ে না দেখে ফেলে আসা দেশ, ধর্ম, বর্ণ, লিংগ ও অন্যান্য ক্রাইটেরিয়াতে ফেলে এই দেশেও বিবেচনা করা হয়।

সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেন, তিনি এই প্রটেস্টের মোর‍্যাল অনুভব করেছেন কি না? পুলিশ কেন তবে বাঁধা দিলো? জবাবে রুতে বলেছেন, তিনি মোর‍্যাল অনুভব করছেন কি না কিংবা তিনি একমত কি না, তিনি কি ভাবছেন, সেটা দিয়ে তো প্রটেস্ট চলতে পারে না। প্রটেস্ট হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, এখানে তার মতামত কেন জরুরী? তাহলে কি জনগন তার দল ভিভিডি কিংবা ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে না? কিন্তু তিনি অবশ্যই করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রটেস্ট চান, এই ব্যাপারে কোন নিগোশিয়েশান হবে না। খ্রোনিংগেন (Groningen), মালিফিল্ডে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রটেস্ট এর উদাহরণ রয়েছে। এখন প্যান্ডেমিক চলছে, সবাইকে সেটা অনুধাবন করতে হবে।

কেন এমেরিকাতে কোন প্রতিবাদলিপি পাঠানো হলো না তার জবাবে রুতে বলেন, তার কাছে নেদারল্যান্ডস অনেক জরুরী। নেদারল্যান্ডস এখনো রেসিসিজম, ডিস্ক্রিমিনেশানের উর্ধ্বে উঠতে পারে নি। এখানে মানুষকে আজও এই কারনগুলো নিয়ে সাফার করতে হচ্ছে। এই ঘটনা তো শুধু এমেরিকাতেই ঘটছে না, তাই না? তিনি জর্জ ফ্লইয়েডের মৃত্যুকে আনএক্সেপ্টবল বলেছেন কিন্তু তিনি এমেরিকার সরকারকে কি করে তার দেশ পরিচালনা করতে হবে এই নিয়ে কোন উপদেশ দেবেন না কারণ নেদারল্যান্ডস নিজে এই সমস্যাগুলোর উর্ধ্বে এখনও উঠতে পারে নি। নেদারল্যান্ডসের নিজের সিস্টেমে অনেক গলদ রয়ে গেছে আর তাই এখানেও মানুষ এসমস্ত কারণে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছে। মানুষকে তাদের সম অধিকারের জন্যে রেসিজিমের বিরুদ্ধে আজও এই নেদারল্যান্ডসেই সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসের মানুষের প্রতিবাদে তার হাজার ভাগ সমর্থণ আছে কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি ভাঙা তিনি মেনে নেবেন না।

সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেন, তাহলে নেদারল্যান্ডসের এই সিস্টেম শোধরানোর ব্যাপারে তিনি বা তার সরকার কি করছেন? জবাবে রুতে বলেন, সর‍্যি, তাহলে আপনারা আমার কাজ ঠিক করে অনুসরণ করছেন না। আমি কত বার কত জায়গায় এই নিয়ে কথা বলেছি, তার ইয়ত্তা নেই। আমি আইনের পর আইন শোধরাতে পারি, জরিমানার ওপর জরিমানা দিতে পারি, নিয়ম কঠিন থেকে কঠিন করতে পারি কিন্তু দ্ব্যার্থ কন্ঠে বলতে চাই, নেদারল্যান্ডসে এই মনোভাব আনএক্সেপ্টবেল আর এই ধরনের মনোবৃত্তির মানুষ এই রাস্ট্রে কঠিন থেকে কঠিন সমস্যায় পরবে। কোন শুধরে যাওয়া পরিকল্পনায় এসব পরিবর্তন হয় না। দিনের পর দিন চর্চার মধ্যে দিয়ে পরিবর্তনের শুদ্ধতা আনতে হবে, আনতে হয়।

তবে এর মধ্যে অন্য কথাও আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এমেরিকা নেদারল্যান্ডসে বন্ধুর মত সাহায্য করেছে। এরপর থেকে নেদারল্যান্ডস আর এমেরিকার অটুট বন্ধুত্ব। নেদারল্যান্ডস সরকার এমেরিকার কোন আচরণের বিরুদ্ধে কখনোও টু শব্দটি করে না। যতই আভ্যন্তরীন প্রতিবাদ হোক, সরকারী পর্যায়ে অসীম নীরবতা মেইনটেইন করা হয়।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: