সামাজিক পরিবর্তনে শিল্প ও শিল্পী

শতরূপা বোস রায়

পৃথিবী আজ ধুঁকছে। মানুষ একলা হয়ে হাত বাড়াচ্ছে অন্ধকারে, সম্পর্ক বাঁধতে। সবুজ যে ফিকে হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ । সময় বলছে আর কবিতা নয়. কিন্তু স্রষ্টার কলম, শিল্পীর কণ্ঠের গান যে ঋদ্ধ হয় দুঃখে, শোকে মৃত্যুতেই । ঠিক তেমনটাই বললেন শ্রীকান্ত আচার্য। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর শিল্পকে তাঁর গানকে কেমন করে বাঁচিয়ে রেখেছেন তিনি। বললেন অনুভূতির কথা। দিলেন বুক ভরা আশ্বাস। পরিবর্তনের সময়কালে অনেক ভালো না লাগা আর হতাশা নিয়েও তার গান কি ভাবে তিনি পৌঁছে দিচ্ছেন শ্রোতা বন্ধুদের কাছে। শতরূপা বোস রায়ের সঙ্গে একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে শ্রীকান্ত আচার্য।

১) যুগটা সম্পূর্ণ আলাদা। বিশেষ করে, পেশাদারী শিল্পীদের জন্য এটি একটি দুর্যোগের সময় বলা যেতে পারে। এমন দুর্দিনে যে পসিটিভিটি নিয়ে আপনি সোশ্যাল মিডিয়ায় গানবাজনা করে চলেছেন, সেই মনোবলের কথা একটু বলুন। আলাদা তো বটেই প্রেক্ষাগৃহের থেকে, তাই মেনে নেওয়া কতটা কঠিন হয়েছে?

উত্তরঃ গানবাজনা আমরা করি বা শুনি আনন্দ পাওয়ার জন্য, আনন্দ দেওয়ার জন্য। কিন্তু যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে এই মুহূর্তে আমরা সবাই কমবেশি যাচ্ছি, সেটা মনের ওপর একটা অসম্ভব চাপ তৈরি করে রেখেছে। চারপাশে তাকিয়ে অসংখ্য মানুষের নিদারুণ দুর্দশার যে ছবিটা দেখতে পাচ্ছি, তাতে গান নিয়ে থাকার বা চর্চা করার মোটিভেশানটাই হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থা হয়েছে। তবু, এই আবহাওয়ার মধ্যেও আমার গান যদি কোথাও কাউকে একটু শান্তি আর আনন্দ দেয়, তাহলে সেটুকু ভেবেই ভালো লাগবে। শ্রোতাবন্ধুর ওই শুনতে চাওয়ার ইচ্ছেটুকুই আমাদের কাছে বিরাট উৎসাহ। তবে ছোট-বড় বহু কন্ঠশিল্পী ও যন্ত্রশিল্পী আছেন, যাদের অনেকের জীবন আর জীবিকার সবটাই গানবাজনার ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। তাদের অনেকেই কিন্তু ইতিমধ্যেই ভয়ঙ্কর সংকটে পড়েছেন, আগামী দিনে আরও অনেকে পড়বেন। সবাইকে নিয়েই আমাদের সঙ্গীতের জগত। এদের প্রত্যেকের জন্যে সব সময় মনের মধ্যে একটা উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

অনিবার্য কারণেই কোন ধরণের মঞ্চে অনুষ্ঠান যেহেতু এখন সম্ভব নয়, তাই আমরা কিছুটা বাধ্য হয়েই অনেক সময় সোশ্যা্ল মিডিয়ায় গানবাজনা করছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই পরিসরে লাইভ অনুষ্ঠান খুব যে একটা উপভোগ করি, তা নয়। মঞ্চের অনুষ্ঠানে যে সুরের বাতাবরণ বা যে সুরেলা পরিবেশ তৈরি হয়, বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার লাইভ অনুষ্ঠানে তার অভাব থাকে।

২) এই ডিজিটাল লাইভ কতটা অন্য ভাবে ভাবতে শিখিয়েছে আপনাকে? এই অন্য ভাবনাটা কি কোথাও অনুপ্রাণিত করে আপনাকে? না কি, আরও হতাশ করে?

উত্তরঃ ষ্টুডিও আর মঞ্চ … গানবাজনার পরিবেশনার এই দুটো পরিসরকেই এখন বাধ্য হয়ে নিজের ঘরের মধ্যে এনে ফেলতে হচ্ছে। ঘরেই ছোটখাটো ব্যবস্থা পরিকাঠামো তৈরি করতে হচ্ছে, যাতে প্রয়োজন মতো নিজের কাজকর্মের প্রযুক্তির গুণগত মান বজায় রেখে সেটা শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। এসব আগে কোন দিন করি নি, এখন করতে হচ্ছে। এখনকার প্রজন্মের মতো আমি একেবারেই যাকে বলে ‘tech-savvy’ নই, তাই আপাতত একটু ধস্তাধস্তি করতে হচ্ছে।

যত দ্রুত সম্ভব মঞ্চের অনুষ্ঠানে ফিরতে চাই। মঞ্চে উঠলে সঙ্গে থাকবে আমার নিজের সব যন্ত্রশিল্পীভাইরা, সামনে থাকবেন শ্রোতাবন্ধুরা, তাদের সবাইকে আমি দেখতে পাবো, তাদের স্বশরীরে উপস্থিতি আর তাদের প্রতিটি তারিফ আমাকে উদ্বুদ্ধ করবে … এই ভালো লাগার আস্বাদ কোনো ডিজিটাল লাইভ আমাকে অন্তত দিতে পারবে না।

৩) আমাদের মন খারাপ লাগলে আমরা শ্রীকান্ত আচার্যের গান শুনি। শ্রীকান্ত আচার্যের মন খারাপ করা বিকেলগুলো এখন কেমন কাটে? আগামী দিনে নতুন উদ্দীপনায় নতুন ভাবনায় ঘুরে দাঁড়াতেই হবে আমাদের। এই প্রতিকূলতার মধ্যে কী ভাবে ভবিষ্যতের স্টেজ তৈরি করছেন?

উত্তরঃ বিকেল বা সন্ধ্যেবেলা এমনিতে আমি একদমই বাড়িতে বসে থাকতে পারি না। অন্য কোনো বিশেষ কাজ না থাকলে অধিকাংশ দিনই আমি লেক মার্কেটের কাছে রাদুবাবুর চায়ের দোকানে চা খেতে যাই। মুড যদি সারাদিন ভাল নাও থাকে, ওই চা-টা খেলেই মেজাজ একদম ফুরফুরে হয়ে যায়। এটা আমার একটা চরম বিলাসিতা বলা চলে।

ঠিক এই মুহূর্তে আমি যে সামনের রাস্তাটা অনেকখানি খুব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তা নয়। মনঃসংযোগেরও কোথায় যেন অভাব হচ্ছে মাঝে মাঝে। এ এক অদ্ভুত মানসিক অবস্থা। তবু, আরো অনেকের মতো আমিও চাইছি খুব তাড়াতাড়ি সব কিছু আবার আগের ছন্দে ফিরে আসুক, এই অনিশ্চয়তার শেষ হোক। পরস্পরের সান্নিধ্য আর সাহচর্য না পেলে আমরা কেউই যে আগের সেই আনন্দ ফিরে পাবো না, এই দুঃসময়ে একে অন্যের থেকে দূরে থেকে সেটা আমরা হয়তো অনেকেই নতুন করে অনুভব করলাম। বন্ধুদের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যের উষ্ণতা কোনো সেলফোনের ভিডিও কলের আড্ডা আমাকে অন্তত কখনও দিতে পারে না, পারবেও না।

৪) এতো দীর্ঘদিনের জার্নি। শ্রোতাদের কতোটা পালটাতে দেখেছেন? নতুন প্রজন্মকে আপনি কী ভাবে এগিয়ে দিচ্ছেন?

উত্তরঃ আমার গানবাজনা খুব বেশি দিনের নয়, মাত্রই আড়াই দশকের। কিন্তু ছোটবেলা থেকে আজ অবধি পুরো সময়টা যদি ধরি, তবে শ্রোতাদের পছন্দ বা রুচি অনেকটাই বদলে যেতে দেখলাম। সেটা ভালোর দিকে গেছে না মন্দর দিকে, সে বিচার একেবারেই আপেক্ষিক। সময়ের সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন স্তরে এমন সব পরিবর্তন এসেছে, তার প্রভাব বা অভিঘাত গানবাজনা করা বা শোনা উভয়ের ওপরেই অনিবার্য ভাবেই পড়েছে। কিন্তু, শুধু একটি কথা বলবো। গণমাধ্যমের নিরন্তর আগ্রাসন এক বিরাট সংখ্যক শ্রোতাকে ক্রমশ এক ধরণের homogenised দর্শক বানিয়ে ফেলেছে এবং ফেলছে। নিখাদ গান শোনার দীক্ষিত শ্রোতা কমে যাচ্ছে। এটা লক্ষ করে একটু হতাশ লাগে বই কি।

নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে দিতে পারবো, এতখানি সাঙ্গীতিক বিদ্যেবুদ্ধি আমার নেই। ওদের গানবাজনার শিক্ষা বা ধারণা অল্প বয়েস থেকেই অনেক বড়ো জায়গা নিয়ে গড়ে উঠছে, কারণ খুব কম বয়েস থেকেই ওদের exposure এখন অনেকগুণ বেশি। নানা রকম নিরীক্ষা আর মিশেলের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে সঙ্গীতের শরীরের ভাষা এখন অনবরত বদলে দেবে ওরা। কোন্‌ সুর কোন্‌ ঘর থেকে এসেছে, তার আসল ঠিকানা হয়তো ক্রমশ আব্‌ছা হতে থাকবে। কিন্তু নতুন সঙ্গীতের ভাষা সৃষ্টি করতে করতে আমাদের চাইতেও আরও বড়ো কোন প্রান্তরে গিয়ে দাঁড়াবে আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম। এটাই আমার বিশ্বাস।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: