কমরেড

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

শ্রাদ্ধশান্তিতে মোটেও মত ছিল না বাবার। আজীবন শ্রমিক আন্দোলন করে এসেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার গেটে হাতদুটো শূন‍্যে উঠিয়ে বাবা নাকি খুব ভাল বক্তৃতা করতে পারত। আমি এসব দেখিনি। সুধাময়কাকা বলত। মা তখন প্রায় চল্লিশ। শুকিয়ে আসা পদ্মের মত বলিরেখা একটু একটু করে মা’র গায়ের চামড়ার ওপর আল্পনা দিচ্ছিল। মা ছিলেন স্বনির্ভর মহিলা। একটা সেলাইমেশিন কিনে এলাকায় মেয়েদের ফ্রক, টুকটাক সেলাই, ব্লাউজ বানানো এসবের ফাঁকে বিকেলে একঘন্টা করে গান শেখাত। বাবা আর মা একসময় আই পি টি ও  করেছে। ওখানেই ওদের আলাপ, বন্ধুত্ব আর তারপর বিয়ে।

 পার্টীর নির্দেশে বাবা বেশ কিছুদিন আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিল। আমি তখন মা এর পেটে। তখন যে কজন সহযোদ্ধা বা কমরেডকাকুরা এসে খবর নিয়ে যেত মা এর তার মধ‍্যে সর্বাগ্রে আসে সুধাকাকার নাম। বাবার একমাত্র ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাবা চলে যাওয়ার পরও এই ব‍্যাচেলর মানুষটা আমাদের সংস্রব ছাড়েনি। লোকেরা খারাপ কথা বললেও মাথা উঁচু করেই সুধাকাকা আমাদের বাড়িতে আসত। মা’কে আপনি বলে কথা বললেও সখ‍্যতার ওজনে তা ছিল তুমির কাছাকাছিই। আমাকে নিয়ে প্রথম বইমেলায় নিয়ে গিয়ে বই কিনে দেওয়া  বা সার্কাস দেখানোটা সুধাকাকাই করেছিল।

বাবা যখন ছাড়া পায় তখন বাবার  টি বি হয়ে গেছিল জেলে থাকতে থাকতে। সেইসব দিনগুলো ছোটবেলায়  আমিও দেখেছি। খুব কাশি উঠত রাত্রিবেলায় আর সকালে মা নিয়ে যেত যাদবপুরে ডাক্তার দেখাতে। সুস্থ থাকলে বাবা লোকাল ট্রেনে কখনো লজেন্স, আমসত্ত্ব বা ধূপকাঠি বিক্রি করত। বাবার আসলে  সেরকম খুব একটা  লেখাপড়া ছিলনা যে একটা সাধারণ চাকরী জুটবে। সব নকশালরাই যে আদতে হীরের টুকরো ছাত্র ছিল বলে যে ধারণাটা বাজারে প্রচলিত আছে সেটা বোধহয় সর্বাংশে সত‍্যি নয়।

সেদিনও বাবা ধূপকাঠির থলি দুহাতে নিয়ে বেরিয়েছিল। বাইরে ভীষণ রোদ আর দূর্বল শরীরে সামলাতে না পেরে রাস্তায় মাথা ঘুরে পড়ে যায়। স্ট্রোকের মত কিছু একটা হয়েছিল। পাড়ার লোকে বাবাকে ধরে ধরে ঘরে এনে দেয়। বাড়ি আসতে আসতে ততক্ষণে বাবা আর নেই। 

বাবার থলিতে থাকা বাকি  ধূপগুলো সব সে রাত্রে  জ্বালিয়ে দিতে বলেছিল মা। বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে  একলা চলার রবিটাকুরের গানটা, যেটা মা মাঝেমাঝেই গাইত ঠিক সেরকম মনে হচ্ছিল তখন। মা ছিল অদ্ভুত ভাবে  চুপ। গোটা ঘটনাটা মা কে নাড়া দিলেও তার প্রকাশ মা’ করেনি সেদিন। স্থিরভাবে নিজের কর্তব‍্যগুলো শুধু করে যাচ্ছিল।

পাড়ার সবাই চাঁদা তুলে বাবার  শ্রাদ্ধ করতে জোরাজুরি করছিল বলে মা শেষে রাজি হল। সুধাকাকা আপত্তি করে বলল -“যোগেশের শ্রাদ্ধ কেন হবে? ওসব তো আমরা কোনকালেই..” মা অবাক করা দৃঢ়তার সুরে বলল ” সুধাদা…সবাই বলছে..এক পাড়ায় থাকি..না করলে কোথায় হুট করে উঠে যাই বলুন তো..”সুধাকাকা আর কথা বাড়ায়নি তারপর।

“অদ্যেতাদি—জৈষ্ঠ‍্য মাসি কৃষ্ণে পক্ষে অষ্টম্যান্তিগে অষ্টকায়াং ভরদ্বাজঋষিগোত্রস্ত পিতুরমুকদেবশৰ্ম্মণঃ পাৰ্ব্বণশ্রাদ্ধে কৰ্ত্তব্যে ওঁ পুরূরবোমাদ্রবসোর্বিশ্বেষাং দেবানাং পার্বণশ্রাদ্ধং দর্ভময়ব্রাহ্মণে সহং করিস্যে…..”অর্থহীন মন্ত্র উচ্চারণ করতে বিরক্ত লাগছিল।যে লোকটা আমার জন্মদাতা বাবা, যে লোকটার আপাত ব‍্যর্থজীবন আমার অহঙ্কার তাকে এই তেরোদিনের মধ‍্যে বাবার বদলে ‘প্রেত’ বলে সম্বোধন করতে হবে? একটা কাক হয়ে এসে বাবা ওই তিলাঞ্জলির পিন্ডিগুলো খাবে? মা এর ওপর তখন খুব রাগ হচ্ছিল। কি দরকার ছিল এসব করার। সুধাকাকা তো বারণই করেছিল।মা তারপর থেকে রঙীন শাড়ির বদলে সাদা খোলের শাড়ি পড়ত। তাতে কখনো হাল্কা নীল বা সবুজ পাড় মা নিজেই বসিয়ে নিত। বাড়িতেও বাবাকে নিয়ে আমাদের মধ‍্যে খুব বেশী আলোচনা হতনা। আমি বুঝতাম বাবাদের লড়াইটা আস্তে আস্তে আর্টফিল্মের বিষয় হয়ে গেলেও সাধারণ মানুষ এখন বাবাদের বোকাই ভাবে।

এরমধ‍্যে বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। আমি আর কলেজে যাইনি। পিজি’র কাছে একটা ওষুধের দোকানে কাজ নিয়েছিলাম। মোটামুটি চলে যাচ্ছিল। একদিন দেখি দোকানে সুধাকাকা। সেই স্বাস্থ‍্য আর নেই। চেহারাটাতে একটা পাতা ঝরে যাওয়ার ডাক। আমায় দেখে প্রেসক্রিপশান এগিয়ে দিল। সবকটা ওষুধ কেনবার টাকা সঙ্গে ছিলনা বলে কয়েকটা ওষুধ বাকি রেখে গেল। আমি বললাম পরের সপ্তাহে আমার মাইনে হয়ে গেলে একেবারে বাড়িতে পৌঁছে দেব। একটা ক্ষীণ হাসি ঠোঁটের ডগায় ঝুলে রইল সুধাকাকার। প্রেসক্রিপশান পড়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম আসলে রোগটা কি। সুধাকাকার ক‍্যানসার হয়েছে। একেবারে লাস্ট স্টেজ। 

মা কে বলিনি ইচ্ছে করেই। ভাবলাম শুনলে মা কষ্ট পাবে নিশ্চয়ই। তবে হাজার টাকা মা’র থেকে ধার করে দিন তিনেক পরেই এন্টালীতে সুধাকাকাদের বাড়িতে গেলাম ওষুধগুলো নিয়ে।
নাঃ, ওষুধগুলো আর কাজে লাগেনি। দুদিন আগেই নাকি রাত্তিরে বাথরুম যেতে গিয়ে সুধাকাকা পড়ে যান আর সেখানেই সব শেষ।বাড়ি ফিরে এবার বাধ‍্য হয়ে মা’কে ঘটনাটা বলতে হল। মা খুব একটা নিজের মনের অবস্থা প্রকাশ করল না। খুব নিস্পৃহ গলায় বলল –  ” ও দিনই যদি ওষুধগুলো….যাক গে কি আর করবি!

রাত তখন বারোটা প্রায়, দেখি মা বিছানায় নেই। পা টিপে টিপে গিয়ে দেখি মা রান্নাঘরের সামনেটায় দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসে আছে। আর বিগলিত জ‍্যোৎস্না মিশে যাচ্ছে মায়ের চোখের জলে। মা কে ডেকে ধরে ধরে এনে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। মা’ও দেখলাম নিজেকে তাড়াতাড়ি সামলে নিল।

পরদিন সকালে চা বানাতে গিয়ে দেখি একটা বই পরে আছে  রান্নাঘরের সামনেটায় ।  মা তখন কলঘরে স্নান করতে গেছে। হাতে নিয়ে দেখলাম বইটাকে উল্টে পাল্টে। বাষট্টিসালের এডিশনের  একটা মাও সে তুং এর ‘রেড বুক’ । অবহেলা আর অযত্ন তাতে কামড় বসালেও প্রথম পাতাটায় একটা সুন্দর হাতের লেখা জ্বলজ্বল করছে-
” মিনু’কে 
বাঁকানো চাঁদের সাদা ফালিটি

তুমি বুঝি খুব ভালবাসতে?

চাঁদের শতক আজ নহে তো,

এ-যুগের চাঁদ হ’ল কাস্তে!

– সুধা “০৬/০৭/৬৩মায়ের জন্মদিন ৬ই জুলাই আর  আসল নামটা যে মিনতি সেটা এতদিনে ভুলেই গেছিলাম ও নামের আর কেউ ডাকার ছিলনা বলে।

Shyamaprasad Sarkar

Shyamaprasad Sarkar

শ‍্যামাপ্রসাদ সরকারের জন্ম কলকাতায়। পাঠভবন স্কুলের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে সাহিত‍্য সৃজনে উৎসাহ সেই ছাত্রাবস্থা থেকেই। পরবর্তী কালে সেন্ট জেভিয়ার্স সহ অন‍্যান‍্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ছোট বড় বিভিন্ন পত্রিকায় মূলতঃ কবি হিসাবে আত্মপ্রকাশ। সম্পাদনা করেছেন 'স্ফূলিঙ্গ' ও 'প্রত‍্যূষ' এর মত দু একটি ছোট পত্রিকাও। বর্তমানে মধ‍্যপ্রদেশে বেসরকারী ব‍্যাঙ্কে কর্মরত অবস্থায়ও সাহিত‍্যসাধনার ধারাটি বহমান। 'ঋতবাক', 'সব‍্যসাচী', 'বেদান্ত', 'প্রতিলিপি', 'বিবর্তন', 'সময়' প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিতভাবে সাহিত‍্যরচনায় রত। ব‍্যক্তিগতভাবে কবি পরিচয়টিই দিতে ভালোবাসলেও সাহিত‍্যের সবকটি ধারায় যেমন ছোটগল্প ও উপন‍্যাস ( মূলতঃ ঐতিহাসিক কাহিনী ও জীবনীমূলক উপন‍্যাস) রচনার জন‍্য পাঠকমহলে ইতিমধ‍্যেই সমাদৃত। সম্প্রতি কলকাতা বইমেলা ২০২০ তে প্রকাশিত হয়েছে শরৎচন্দ্রের জীবনী আশ্রিত একক উপন‍্যাস 'নিঠুর দরদী'। এছাড়াও 'রাই এর জন‍্য একাকী' নামে একটি উপন‍্যাস ও কবিতা সংকলনের ' ই- বুক' প্রকাশিত হয়েছে পয়লা বৈশাখ ১৪২৭ এ। বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন ' বিবর্তন পত্রিকা - সাহিত‍্য সম্মাননা ২০২০' তে 'নির্বাচিত কবিতা' সংগ্রহের জন‍্য ও প্রাঙ্গণ সাহিত‍্য পত্রিকা আয়োজিত শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলনের জন‍্য।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: