আপ্যায়নের সাত সতের

নিলয় বরণ সোম

[গড় বাঙালী আতিথেয়তা বলতে যা বোঝে , তার বড় অংশ জুড়ে আছে খাবারদাবার।সুতরাং, আপ্যায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়, যেমন গৃহস্বামী বা স্বামীনীর বাচিক শিষ্টাচার , বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ইত্যাদি গূঢ় বিষয় ব্যতিরেকেই নিম্নের আলোচনা চলিবেক ]

এখন বললে তেমাথা বুড়োর গল্পের মত শোনাবে -কিন্তু একটা সময় ছিল যখন মোবাইল তো দূরস্থান , মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে ল্যান্ড ফোনও থাকত না। কুশল সংবাদের জন্য, বা এমনি গল্প করতে , লোকে লোকের বাড়ি যেত, নিমন্ত্রণ ছাড়াই I আত্মীয়স্বজন , পাড়া পড়শি ,সহকর্মী আসত যেত তো বটেই ,জ্ঞাতি -গোষ্ঠীও বাদ যেত না I

আপ্যায়নের অঙ্গ খাবারদাবার , ভূষণও বটেI বাঙালী রীতিতে চা বিস্কুট বা শরবত পর্বের পর সাধারণত সাদা প্লেটে আসত রসগোল্লা , সন্দেশ বা চমচম এবং সিঙ্গারা -সামোসা নয়। একটু বেশি ঘরোয়া হলে সুজির হালুয়া , চিঁড়েভাজা , ঘুগনি অথবা ডিমের ওমলেট ,মতান্তরে মামলেটের মধ্যে কোন একটি আসত আপ্যায়নে।সলিল চৌধুরী শুনেছি পরিচিত বাড়িতে তেল মুড়ি অব্দি খেতেন ,তবে একটু বিখ্যাত না হলে এসব গল্প চালু হয় না , মিথও চালু হয় না এমনি করে।
আহার্যে মিষ্টি থাকলে , অনেক অতিথি তার এক কোন ভেঙে প্লেটের কিনারে রেখে দিতেন ,বাড়ির শিশুদের ভক্ষ হত সেটি I নিদারুন অস্বাস্থ্যকর বলে এই প্রথা আমার অভিভাবকদের অনুমোদন পায় নি, সুতরাং সেই মিষ্টির ভগ্নাংশ প্লেটে লেগে থাকা রসে মেখে খাওয়ার সুযোগ আর হয় নি আমার I

কালেক্কে , মিষ্টিকে বাদ দিলে , এই সব আতিথেয়তার উপকরণ হুশ হয়ে যায় ,তার বদলে আসে নাগরিক বাঙালীর জাতীয় খাদ্য এগ রোল , বা অতিথিবিশেষে পেস্ট্র্রি -প্যাটি , মোমো অথবা ইডলি দই -বড়ার মত দক্ষিণী কোন খাবার I
বছর কয়েক আগেও আপ্যায়নের অঙ্গ হিসেবে কোল্ড ড্রিঙ্কসের একটা চল হয়েছিল , তারপর ভয়ানক ভয়ানক মিডিয়া রিপোর্টের পর তাদের সমাদর গেল ঘুচে । এমনকী ছোট বেলার মত ডিপি ‘স বা কিষানের অরেঞ্জ স্কোয়াশও গৃহিনীদের ট্রেতে আর শোভা পায় না , একটু বড় বেলার রসনাও না , তার কারণ কি বাঙালীর মধুমেহ ভয় ? আর হার্ড ড্রিংকসের কথা বললে, আগে শুধু অভিজাত পরিমন্ডলে তার দেখা মিলত এখন বিশ্বায়িত বাঙালীর ড্রয়িং রুমে এমনকি নব্য ধনীদের আসরেও তার আগমন ঘটেছে , শ্রেনীভেদে সাথী খাদ্যের চরিত্র বদল হয় মাত্র I

তবে সর্ব যুগে সর্বকালে শুধু চা বিস্কুট খাইয়ে বিদায় করলে বাঙালী গৃহস্থের বদনাম হত বা এখনো হয় , কৃপণ বলে I
চা বিস্কুট সম্বন্ধে অবশ্য একটি কালজয়ী সংলাপ আছে, তারাশঙ্করের গণদেবতা উপন্যাসে।
উপন্যাসের ভাষ্যকার খুব সম্ভবত জগন ডাক্তারের বাড়িতেই গেছেন ,অতিথি হিসেবে I
জগন ডাক্তারের জিজ্ঞাসা , ” আপনি চা খান তো ?”
– “হ্যাঁ , ভাষ্যকারের উত্তর I “
-” আর বিস্কুট ?”
লজ্জার মাথা খেয়ে ভাষ্যকারের উত্তর , “তা -ও খাই !”

আমার জীবনে এরকম একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলাম , সেটি না হয় পরে বলব , কিন্তু আমার শিশুপুত্র একবার প্রায় সমতুল পরিস্থিতিতে অতিথি হিসেবে নিজের হক বেশ জোরদার ভাবে উত্থাপন করেছিল , তার গল্প বলি I

ঘটনাটি আমার প্রবাস কালে , বতসোয়ানায়। এক সিংহলি তামিল ভদ্রলোক একা থাকতেন ,অনেকবার ছেলেকে নিয়ে ওঁর কোয়ার্টার্সে যেতে অনুরোধ করতেন I
কোনো এক শুভ সকালে সপুত্র সেই ভদ্রলোকের সমীপে গেলাম I যেতেই সাদর সম্ভাষণ করলেন , ছেলের সঙ্গে আলাপও হল তার I সস্নেহে ছেলের হাতে একটি থিন এরারুট জাতীয় কোন বিস্কুট তুলে দিতেই ছেলের ঘোষণা , “I have got two hands”! ধরণী দ্বিধা হও না হলেও সেটি আমার ঠিক আদর্শ অভিভাবক -মুহূর্ত ছিল না I

আতিথেয়তার মূল কথায় ফিরে এসে বলি , আতিথেয়তায় আন্তরিকতার অনুপানটি মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে বেশি I ত্রিপুরা বা আসামে বসবাসকারী বাঙালীদের ক্ষেত্রে এটা প্রত্যক্ষ করেছি I নেহাত কোন কাজে সাড়ে দশটা এগারোটায় কোন গৃহস্থ বাড়িতে গেলেই মোটামুটি মধ্যাহ্ন ভোজনের একটা নিমন্ত্রন বাঁধা থাকত বাড়ির বড়দের তরফ থেকে I একটু সম্পন্ন গৃহস্থ হলে টপাটপ গাছ থেকে ডাব পাড়ানো বা পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরার ব্যবস্থা করা এ বঙ্গের মফস্বলেও নজরে এসেছে। তেমনি স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে শীতকালে ঘাটশিলায় সহকর্মীর বাড়িতে , মাসিমার অফুরন্ত পিঠে পায়েসের সাপ্লাই।

তবে নোয়াখালি বা সিলেট থেকে চলে আসা বাঙালী গৃহকর্তা বা কর্ত্রী , এই একটি কথা আপনাকে শোনাবেনই , সেটি হল, ‘কষ্ট দিলাম’ ! অর্থাৎ অতিথি মহামান্য , আয়োজিত ভোজ তার মনোমত নাও হতে পারে,সে জন্য টুক করে একটি ক্ষমাপ্রার্থনা I ছোটবেলায় , ত্রিপুরা থাকার সময় , আমরা ভাই বোনরা এই কথাটা নিয়ে খুব হাসাহাসি করতাম Iতার কয়েক যুগ পরে ,বতসোয়ানায় একাধিক বাংলাদেশি বন্ধুর বাড়িতে এই কথাটি আবার কানে যেন মধু ঢেলে দিয়েছিল। ইহারেই পার্সপেক্টিভ কয় বোধকরি I

বাঙালীদের আজ অব্দি অতিথি আপ্যায়নের যে ঘনঘটা আছে ,উত্তর ভারতীয়দের সঙ্গে তার একটি প্রধান পার্থক্য কিন্তু একটি ব্যাপারে। খাবার হিসেবে যাই আসুক না কেন , উত্তর ভারতীয় পরিবারের অতি ছোট ছেলে বা মেয়েও জানে , অতিথি এলে প্রথমে এক গ্লাস জল দিতে হয় I আমরা কিন্তু এ ব্যাপারে বেশ বেখেয়াল I অতিথি নিজে না চাইলে জলের আগমন খাবার প্লেটের সঙ্গেই ঘটে -তার আগে নয়। ডাক খোঁজের রীতি নীতি , বিয়ের ধুম ধাম, সব কিছুতেই যখন আমরা আর্যাবর্তের অনুকরণ করছি ,তখন এই সুন্দর প্রথাটি নিয়ে নিতে ক্ষতি কী !

তবে অতিথি অভ্যাগতদের সৎকারে বোধহয় লখনৌবাসীদের জুড়ি নেই। আমার আশঙ্কা, ওদের আপ পহেলের চক্করে , হয়ত বা হোস্ট বা গেস্ট, কারোরই কিছু মুখে তোলা হয় না। ওদের সঙ্গে খাতিরদারিতে পাল্লা দিতে হয়ত পাঠানরাই পারে । পাঠানমুলুকে যাওয়ার সময় ট্রেনে মুজতবা আলী সাহেবের কীরকম আদর যত্ন হয়েছিল ,তার সরস বর্ণনা ‘দেশে বিদেশে”র প্রথম অধ্যায়য়েই আছে। ওঁর ভাষায় , “প্রতি স্টেশনে আড্ডার কেউ না কেউ কিছু না কিছু কিনবেই I চা , শরবত , বরফজল ,কাবাব , রুটি, কোনো জিনিসই বাদ পড়ল না। ….আমি দু’ একবার আমার হিস্যা দেবার চেষ্টা করে হার মানলাম।….”

বিন্ধ্য পেরিয়ে দক্ষিণে গেলে চিত্রটি একটু আলাদা। তবে বিন্ধ্যও পেরোতে হয় না বোধকরি – এমনকি কলকাতায় জন্ম কর্ম এমন এক দক্ষিণী বন্ধু আমাকে একবার বলেছিল , “তোদের যেমন বাড়িতে গেলেই মিষ্টি খাওয়ানোর একটা চল আছে ,আমাদের মধ্যে তা’নেই I আমরা শুধু কফি অফার করি, এবং শুধুই কফি !”
আপ্যায়নের এই প্রথাগত অপ্রাচুর্য সম্বন্ধে জ্ঞান না থাকার জন্য আমার এক দঙ্গল বন্ধু একবার অসুবিধায় পড়েছিল। ওরা কোন ট্রেনিং বা সেমিনার উপলক্ষে চেন্নাই গিয়েছিল, থাকার ব্যবস্থা ছিল হোটেলে। ওদের ট্রেনিং কোর্ডিনেটর মহিলা বেশ আলাপী ও বন্ধুবৎসল ছিলেন।উনি ওদের সকলকে, সাত আট জনের দলটিকে , নিজের বাড়িতে ডাকলেন সন্ধ্যা বেলা। একঘেয়ে হোটেলের খাবার খেতে খেতে ক্লান্ত বন্ধুর দল সোৎসাহে হোটেলে ‘নো মিল ‘ করে গেল ভদ্রমহিলার বাড়িতে। গল্পগুজব, হাসি ঠাট্টার পর খাদ্যবস্তু কিন্তু এল – কফি এবং savories, অর্থাৎ চানাচুর, কলা ভাজা এইসব।

অবশ্য খাবার আয়োজন ভাল থাকলেও অনেকসময় ঠিক খাওয়া হয় না , এক মালায়লাম সহকর্মীর বাড়িতে সযত্নে ভাজা লুচি এই সর্বভুক আমিও ঠিক সুবিধা করতে পারি নি -ভরপুর নারকেল তেলের গন্ধে !

উত্তর পূর্বের জানালাতে আবার উঁকি দেই I এই কাহিনীটা বাবার কাছে শোনা। আমি তখন খুব ছোট ,আমরা থাকি আগরতলায়।বাবা ট্যুরে গেলেন , জম্পুই বা জম্পুইটাং অঞ্চলে,অফিসের কাজে। পরে জেনেছি , মিজোরামের সীমান্তে ওই এলাকাটিতে বৈরী মিজোরা সক্রিয় ছিল ও বাবার আগে কোন ইঞ্জিনিয়ার সেখানে যেতে খুব একটা সাহস করেন নি।

বাবা যাওয়ার পর সন্ধ্যাবেলা ওখানকার পার্বত্য অধিবাসীরা বাবার সঙ্গে দেখা করতে এল, ওদের মোড়ল বা সর্দারের নেতৃত্বেI ওদের আপ্যায়নের বিশেষত্ব ছিল, একটি কলাপাতায় ওরা একখন্ড গুড় রেখেছিল -সেই গুড় প্রথমে সর্দার , অতপর অন্যেরা ,সবশেষে অতিথি সেই গুড় হাতে নিয়ে চেটে চেটে খাবেন , এটাই রীতি।
মোগল নয়, মগও নয়, মিজোদের হাতে পড়ে পিতৃদেবকে একসাথে খানা খেতে হয়েছিল, সেও কিনা গুড়! এরকম সাংঘাতিক আপ্যায়নের কাছে, আসামে গুয়া পান, অর্থাৎ একরকম বিশেষ সুপারী দেওয়া পান তো নস্যি !
গোটা অনুষ্ঠানটির মধ্যে একটা প্রতীকি তাৎপর্য থাকা সম্ভব , অর্থাৎ অতিথি আর বহিরাগত রইলেন না, ওদেরই হয়ে গেলেন , সেরকম কিছু একটা, কিন্তু গোটা ব্যাপারটা একটু সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং রেখে করা গেলে মন্দ হত না !

এরকম বাড়াবাড়ি রকমের ভাল আতিথেয়তার বিপরীতে শুধু কথামালার শিয়াল আর সারসের গল্পে সারসের অভিজ্ঞতা নয় , স্বয়ং কবিগুরু এক করুণ কাহিনী বিধৃত করেছেন ‘জীবনস্মৃতির ‘বিলাত’ অধ্যায়ে।

কাহিনীটি আমার অপটু ভাষ্যে এরকম , যুবক বয়সে লন্ডন প্রবাসকালে স্বর্গত এক উচ্চপদস্থ ইংরেজ রাজকর্মচারীর বিধবা পত্নী, ‘রুবি’. অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথকে ওঁর বাড়িতে যাওয়ায় জন্য ঝুলোঝুলি করতেন। উদ্দেশ্য ,ওঁর পরলোকগত স্বামীর উদ্দেশ্যে তাঁর এক ভারতব’র্ষীয় বন্ধু একটি গাঁথা রচনা করেছেন, সেটি, সেই বন্ধুর ফরমান মত ‘বেহাগ রাগে’ পরিবেশন করা!

একদিন ভদ্রমহিলার আমন্ত্রণে ওঁর মফস্বলের বাড়ির উদ্দেশ্যে
কবি রওয়ানা তো হলেন ,কিন্তু ট্রেন ভুল করার দরুন পৌঁছলেন রাত্রি সাড়ে ন’টায়। তখন ডিনারের সময় অতিক্রান্ত , গৃহকর্ত্রী সমাদরে কবিকে এক পেয়ালা চা আর বিস্কুট খাইয়ে নাচের আসরে নিয়ে গেলেন I কবির কথায় , “দশঘন্টা উপবাসের পর দুইখন্ড বিস্কুট খাইয়া তিনকাল – উত্তীর্ণ প্রাচীন রমণীদের সঙ্গে নৃত্য করিলাম I “
সেদিন রাত্রে সরাইখানাতেও কবি কোন খাবার পান নি। পরের দিন ওই মহিলার বাড়িতে প্রাতঃরাশের আগের দিন রাত্রের লেফট ওভার্স , ঠান্ডা অবস্থায় খেতে খেতে ওঁর , মনে হয়েছিল এর কিয়দংশও যদি আগের দিন রাতে উষ্ণ বা কবোষ্ণ অবস্থায় পাওয়া যেত !

মুজতবা আলী ও কবিগুরুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এই অধমের কিছু অভিজ্ঞতা বলি।

আমার স্বল্পকালীন প্রবাসে স্থানীয় আফ্রিকানদের এক আধটি পারিবারিক পার্টিতে আমন্ত্রিত হিসেবে গেলেও এমনিতে ওদের বাড়িতে যাকে বলে সোশ্যাল ভিজিটে যাই নি আমি I অভিজ্ঞ বন্ধুরা বলে , দেশ বিদেশ ঘোরা লোকেদের বাদ দিলে, আফ্রিকানদের মধ্যে অতিথিদের খাওয়ানোর চল নেই তেমন।
আমি একটি দরকারে গিয়েছিলাম প্রতিবেশী মিঃ পেটোর বাড়ি I হ্যাবরণী , মারুয়াপুলা কোয়াটার্স চত্বরে উনি ছিলেন আমার নিকটতম প্রতিবেশী Iওরা অবশ্য ঠিক স্থানীয় নন,আদতে জিম্বাবুয়ের বাসিন্দা I
আমাকে বসতে বলে ওঁর স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী জানালেন ,মিঃ পেটো গাড়ি ধুয়ে শিগগিরই আসছেন।
একথা সেকথা বলার পর মিসেস পেটো বললেন , “ডু ইউ ওয়ান্ট টু টেক ম্যাংগো ?”
আমার দু একটি বদমায়েশ বন্ধুদের জন্য পরিষ্কার করেই বলি, উনি ডাইনিং টেবিলের উপর রাখা রসাল ফলটির কথাই বলছিলেন। যাই হোক , আমার সদিচ্ছার অভাবে সেই ফল উপভোগ করা হয় নি।

দ্বিতীয় ঘটনা দেশেই, শিলং-এ।তখন আমার বাবা জীবিত। উনি বলেছিলেন , “আমার কাকা ওখানকার মেটেরোলজিল্যাল ডিপার্টমেন্টে কাজ করতেন, পারলে অফিসটা দেখে এস I” ওখানকার স্থানীয় এক ইন্সপেক্টরকে বলতেই উনি আমাকে সে অফিসে নিয়ে গেলেন I ওঁর এক ভাই নাকি ওই ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন I

দেখলাম, ইন্সপেক্টর মি : আমাওকে সেই অফিসে সবাই প্রায় চেনে I উনি হৈ চৈ জুড়ে দিলেন ,”সাহেব কলকাতা থেকে এসেছেন , ওঁর দাদু এই অফিসে কাজ করতেন, উনি যেই চেয়ারটিতে বসতেন, সাহেব সেই চেয়ারটি দেখতে এসেছেন !”
দেখা গেল , আমাওয়ের ভাই সেদিন অনুপস্থিত। কিন্তু তাতে খাতির যত্নের কিছু কম হল না I দু কাপ ধুমায়মান চা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এসে হাজির। আমাও দেখি ভাইয়ের সহ কর্মীদের উপর ‘দিল মাঙ্গে মোর’ স্টাইলে আরো হুকুম ফলাচ্ছে , জিলিপি নিয়ে এস, মিঠাই নিয়ে এস!
খিদে নেই এই অজুহাতে সেদিন এই ‘ এন্টারটেনমেন্ট ট্যাক্স আদায়’ থেকে পালিয়েছিলাম ।

রাজকর্মচারী হয়ে ঘোরাঘুরি করলে বাড়তি আদর যত্ন পাওয়া যায় , ভয় ভক্তি বা মোসাহেবিপানার জন্য। একবার সরকারি সফরে গুজরাটের ভাবনগরে একটি ডায়মন্ড প্রসেসিং ইউনিটে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল।
মালিক অল্পবয়সী , শুধু ইংরেজি কেন, হিন্দীতেও অতটা স্বচ্ছন্দ নন , যতটা গুজরাটিতে। আমার সঙ্গে লিয়াজোঁ অফিসার দোভাষী হিসেবে উপস্থিত থাকায় অসুবিধা হয় নি তেমন I যাই হোক , কি দেখলাম না দেখলাম তার গল্প এ নয়। ব্যাপার হল , প্রাথমিক পরিচয় আদানপ্রদানের পর মস্ত এক কাপে চা এল। সাধারণ সৌজন্যে সেটা পান হলI দশমিনিটের মধ্যে বিশাল এক ট্রে করে এক গ্লাস স্প্রাইটও চলে এল !
না , ব্লোয়িং হট এন্ড কোল্ড জাতীয় কোন বার্তা উনি দিতে চান নি I
আসলে ক্ষুরধার ব্যবসা বুদ্ধি সম্পন্ন কিন্তু কেতাবী শিক্ষায় অপ্রতুল এই মানুষগুলো কিছুদিন আগে পর্যন্ত সরকারী বাবুদের দেখে কুঁকড়ে থাকতেন, দিশাহারা হয়ে বাড়াবাড়ি রকমের কান্ডকারখানা করতেন I ইদানিং যদি ক চিত্রটা একটু অন্যরকমের হয় ,তার পেছনে আমলাদের দীর্ঘদিনের কারণ অকারণ দুর্ব্যবহারের ইতিহাস আছে

পরবর্তী স্টপ , লখনৌ I প্রায় এক কুড়ি বছর আগের কথা I অনেকটাই জুনিয়র আমি তখন । আমি ও আমার এক সিনিয়র লখনৌতে আমাদের বিভাগেই ট্রেনিং সংস্থায় অতিথি বক্তা হিসেবে গিয়েছি। তখন ওখানে ট্রেনিং বিভাগের কমিশনার ছিলেন মিস খেরোয়ালা ,অকৃতদার পার্শি এই অফিসার ট্রেনিং অন্ত প্রাণ ছিলেন I যে আন্তরিকতা ও সম্মান দিয়ে উনি , লাঞ্চের সময় নিজের হাতে বিরিয়ানি আর চিকেন চাপ পরিবেশন করে খাইয়েছিলেন , তার তুলনা বেশি নেই। কিছুদিন আগে তাঁর প্রয়াণসংবাদে পাওয়ার পর তার সেই স্নেহময়ী রূপটি চোখের সামনে ভেসে আসছিল I
শেষ ঘটনাও বিদেশে , সিঙ্গাপুরে I
এক অফিসি ভিজিটের সময় রথ দেখা কলা দেখার মত , প্রবাসী বন্ধু সাম্যজিতের বাড়ি যাওয়া ঠিক হল.I জুরান বার্ড পার্কের কাছেই তার বাড়ি।
গিয়ে দেখলাম, বন্ধু আছে কিন্তু স্ত্রী বাড়ি তে নেই। একটু কেমন বোধ হল, আমি তো জানিয়েই এসেছি !
মিনিট কুড়ি বাদে শ্রীমতী চৌধুরী , যিনি পেশায় চিকিৎসকও বটে , প্রবেশ করলেন , হাতে কেক , মোমবাতি ইত্যদি।
সেদিন যে আমার জন্মদিন , ফেসবুকের পাতায় চোখ বুলিয়ে এটি তাঁর নজরে আসে।
আমার এতখানি বয়সে এটি হয়ত অন্যতম শ্রেষ্ঠ জন্মদিন পালন , আর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আতিথেয়তা হিসেবে ঘটনাটি স্মরণীয় ।

শেষ কথা
মানুষের আতিথেয়তায় , আন্তরিকতার , যান্ত্রিক হাসির , এমনকী শীতল অভ্যর্থনার গল্পগুলি লেখা হয়ে গেছে অনেককাল I এখন চিন্তা একটাই। করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে যদি মানুষের মুখোমুখি মোলাকাত সামাজিক অভিধান থেকে উঠে যায় , প্রতিটি মানুষ তার প্রতিবেশীকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে , সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং যদি সোশ্যাল নর্ম হয়ে যায়, , আতিথেয়তা ও তার আনুষঙ্গিক সব কিছু অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে না তো ? সবথেকে বড় কথা , ভালোবাসা বেঁচে থাকবে তো ?

ঋণ স্বীকার ও অন্যান্য
১. জীবনস্মৃতি : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ,বিশ্বভারতী প্রকাশন
২ দেশে বিদেশে :সৈয়দ মুজতবা আলী ,নিউ এজ পাবলিকেশন্স
৩ আতিথিয়তা সংক্রান্ত অনেক ঘটনা পাওয়া যায় প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর মহাস্থবির জাতক গ্রন্থে , শিবরাম চক্রবর্তী ও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিভিন্ন লেখায়। লেখা আর ভারাক্রান্ত করলাম না , সেগুলোর অবতারনায়।
৪ বিভিন্ন প্রদেশের বা জাতির অতিথি আপ্যায়নের কথা এখানে হালকা চালে আলোচনা করা হয়েছে , কারো প্রতি কটাক্ষ করা এই লেখার উদ্দেশ্য বিধেয় কোনটাই নয়।
৫ ভোজনরসিক আমাকে আরো অনেকে নানাভাবে আপ্যায়িত করেছেন ,তাদের নাম পৃথকভাবে উল্লেখ না করায় তারা যেন অতিথি লিস্টি থেকে আমাকে বাদ না দেন I

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: