Home » ছোটোগল্প » সুখস্বপ্ন

সুখস্বপ্ন

শেলী নন্দী

—ঠাণ্ডা পাদুটো আমার পায়ে দিবি না একদম।

—ওমা, দ্যাখো না ভাই খুব ইরিটেট করছে।

তিয়াসা রান্নাঘরের কাজ সারার শেষ পথে প্রায়। ফুলকপি বশ বড় করে কেটে রাখছে আজই, কাল একটা নতুন রান্না ট্রাই করবে। আজকাল ইউটিউব চষে বেশ এটা ওটায় পারদর্শী হয়ে উঠেছে তিয়াসা।

পিহু আর পিকাই নিজেদের ঘরে একটা কম্বল আর ঠাণ্ডা পায়ের গরম যুদ্ধে মশগুল। একজন ক্লাস টু আর একজন ফাইভ। বনিবনার রাস্তায় দুজন দুমুখো। শুতে যাবার আগের এই চিত্র রোজকার।

জলের গ্লাসে একটু গরম জল ঢেলে খেয়ে নিল তিয়াসা। শীত এক্কেবারে জাঁকিয়ে বসেছে। সোয়েটার খুলতে খুলতে আলো নিভিয়ে বেডরুমে আসে সংসারের যুদ্ধ শেষে।

ফাটা পাদুটোয় গরম বোরোলীন আজও মাখা হল না তিয়াষার। একসময় পেডিকিউর করা ফর্সা পাদুখানার হাল দেখলে তিয়াষার একটা অদ্ভুত আবেগ তাড়া করে। অনেক ‘হতে পারার’ সাবলীল আক্রমণ সহ্য করতে হয় মনটাকে।

কেজো সংসার আঁকড়ে বেঁচে থাকা এক গৃহবধূর ফেলে আসা বেলাগুলো অনেক রঙিন ছিল। নিয়ম করে শ্যাম্পু কন্ডিশনার অার রূপচর্চার আতিশয্যে সাজিয়ে রাখা সৌন্দর্যটা আজ ধুয়ে গেছে অনেকটা। একটা অযত্নর পলি এসে ভিড় জমিয়েছে তিয়াষার বুকে।

ছবিরা পাল্টে যায় এইভাবেই সময়ের হাতের তুলিতে।

—চুলটা কি দারুন রে তোর!

—থ্যাংকু।

—তোর স্কিনটায় খুব গ্লো করছে। শীতে কী মাখিস বলতো? কোল্ড ক্রীম মাখলেই কেমন তেল চুকচুকে আর কালচে লাগে। বাট তোর!

হলুদ দুধ আর মধুর প্যাক টমেটোর রস শশার রস কত কি!

একটা ভাললাগা কাজ করতো তখন নিজেকে ভালরাখাটায়। কলেজেও বেশ কিছু পা পিছলিয়েছে ছেলেদের। উপভোগ করতো তিয়াসা তখন এগুলো।

চটকের আবরণে একটা অহমিকা ঢাকা থাকতো সেই সময়। প্রেমের প্রস্তাবগুলোকে নাক উঁচু করে তোয়াক্কা না করাটায় একটি আনন্দ ছিল তার।

নাক উঁচু একটা ভাব ছিল রূপের গরিমার কোল জুড়ে। তারপর একটা গোটা রদবদল। জীবনের জ্যান্ত মৃত্যুটা উল্টেপাল্টে দিয়েছিল সব। একটা মারাত্মক বাস অ্যাক্সিডেন্ট। মৃত্যুকে ভীষণ কাছ থেকে দেখা আর প্রিয় দুটো মানুষকে হারিয়ে ফেলার এক গভীর শোক। বিবশ হয় যাওয়া জীবনটা রঙ হারিয়েছিল। তারপর পৃষ্ঠা ওলটাতে ওলটাতে নতুন মানুষ নতুন সম্পর্ক আর নতুন মোড়।

ততদিনে একটা রঙচটা আস্তরণে ঢেকে গেছে তিয়াষা। আয়নার সমনে নিজেকে দেখলেই কপালের বাদিকের সেই দাগটা। একেবারে রগড়ে দেওয়া একটা চিহ্ন। বাবা আর মা কেউ নেউ ভাবতেই গা গোলানো সেই স্মৃতিটা।

—বাবা প্লিজ চলো না তুমিও।

—নারে তোরা যা। ফাঁকা বাড়ী রেখে সবাই মিলে যাওয়াটা ঠিক হবে না মোট্টেও।

—থাকো তুমি এই রাজপ্রাসাদ নিয়ে।

মামাতো বোনের বিয়ে উপলক্ষে আলিপুরদুয়ার। ফেরার পথেই সব শেষ। আজও মনে হয় বাবা হয়তো ঠিক বেঁচে যেতো। একটা বিষের কাঁটা তীব্রভাবে ফোটে তিয়াষার বুকে আজও।

কাল ছেলে মেয়ে দুজনেরই পিটিএম। কালই বাইশে জানুয়ারী। অভিশপ্ত দিনটা ক্যালেন্ডার বেয়ে ঠিক এসে হাজির হয়। নানা কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকলেও তিয়াষা আজও মনে করে সবটুকু। চোখ বুজে ভেবে নেয় বাবা আর মাকে।

ঘড়ির পেণ্ডুলামটা জানান দিলো রাত বারোটা।
পাশের ঘরে মানুষটা এখনো কাজ করে চলেছে। তিয়াষা খোলা বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। হুহু করে হিমেল বাতাস বইছে। দূরের আকাশে নেভা নেভা জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাচ্ছে শীতশীত রাতটা।

একটা স্পর্শে চমকে ওঠে তিয়া।

–এমন ভাবে চমকাও না তুমি!

–ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো।

–লাগুক। ভাললাগছে না গো।

–জানি।

–তোমার মনে আছে?

–হুমম। আছে। আমার সুন্দরী স্ত্রীর সবই তো আমার জানা। শূন্যস্থান গুলো বাদ দিলে চলে!

এই মানুষটা না থাকলে তিয়াষা আজ হয়তো হারিয়ে যেতো অন্যখানে। এই মানুষটার উপলব্ধি গুলো আজও বাঁচার রসদ তিয়াষার কাছে। আর্থিক ভাবে তেমন শক্তপোক্ত না হলেও জীবনসঙ্গী হিসেবে মানুষটার জন্য গর্ব হয় তিয়াষার।

—তোমার জন্য একটা প্রোপোজাল আছে।

—আমার জন্য?

—ইয়েস ম্যাম।

—নীচের ঘরটা আর ভাড়া দেবো না। তোমার একটা সময় ইচ্ছের বলতে পারো স্বপ্নের সাধপূরণ।

—কিছুই বুঝছি না।

—পার্লার।

—আমার?

—হ্যাঁ তোমার। তুমিই তো বলতে কিছু একটা করতে চাও। তোমার ভাললাগার জিনিস।

—কিন্তু সেতো অনেক টাকার ব্যাপার। এখন !

—সব হবে। আমি আছিতো।

—সত্যিই?

—একদম সত্যি।

তিয়ার ঠাণ্ডা হাতটা ভরসা আর বন্ধুত্বের হাতে রাখা। কিছু কিছু মুহূর্ত এমন করেইখুব সাধারণ হয়েও দামী গন্ধ ছড়ায়। শোক মাপা মনটায় আরেকটা আবেগ এসে খেলা করে সেটা হল প্রশয়।

মনে মনে পার্লারর নামটাও ঠিক করে নেয় তিয়াষা- ‘সুখস্বপ্ন’। সুখরঞ্জন বোস আর স্বপ্না বোস এর নাম দুটোই একটা আকার পাক তাহলে।

—চলো এবার শুয়ে পড়ি।
—হুমম।

দূরের চাঁদ তখনো মিটিমিটি হাসি ছড়ানো প্রেম বিকোচ্ছে হিমেল রাতের নিস্তব্ধতাকে।

সমাপ্ত।

আপনার মতামত:-