শিরোনামে রতন কাহার : কিন্তু বাকিরা?

সুদীপ্ত নাগ

কে রতন কাহার ? রতন কাহার যে ‘বড়লোকের বিটি’ গানটার স্রষ্টা তা কি ক’দিন আগেও কেউ জানত ? কপিরাইটের জন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়ে গেছে বিড়ি শ্রমিক রতন কাহার । সময়ের সাথে সাথে চুল পেকে গেছে তার । আগের মত গলার জোর নেই তবু তিনি পেটের দায়ে এদিক- ওদিক শো করে বেড়ান । আর পাঁচ জনের মতই স্বপ্ন দেখেছিলেন কাহার যে শিল্পী হিসাবে তার নামডাক হবে । তার বাড়ির লোকজন তার কথায় কথায় গান বেঁধে ফেলার ক্ষমতাতে এখন মুগ্ধ কিন্তু তারা এটাও বোঝেন যে শিল্পী হতে গিয়ে রতন পরিবারকে চরম দারিদ্র্যের মাঝে ঠেলে দিয়েছেন ।

স্বপ্না চক্রবর্তী তার গানকে পপুলার করে তুলেছেন সারা বাংলায় কিন্তু তার নাম কেউ জানেনা । এইরকম ভাবেই জীবন চলছিল । শিলাজিৎ ছাড়া কেউ তাকে এক পয়সাও দেয়নি তার গান ব্যবহার করবার জন্য । কিন্তু জীবন সব সময় এক রকম চলেনা । বাদশার মত একজন পপুলার মেইনস্ট্রিম গায়ক তার গানের দু- লাইন ইউজ করলেন আর যে বিতর্ক এতদিন হয়নি সেটাই মাথা চাড়া দিয়ে উঠল । কাহারের ইন্টারভিউ নিতে লোকজন ছুটল । কাহার বলার সুযোগ পেলেন যে এই গানের ব্যবহারে তার পারমিশান না চাওয়া বা গানটায় তার নাম বাদ রাখা এগুলো সবই সমর্থনযোগ্য নয় ।কাহারের পাশে দাঁড়াতে পিটিশান শুরু হল ।

বাদশার ‘গান্দা ফুল’ গানটার কমেন্ট সেকশান ভরে উঠল রতন কাহারের জাস্টিসের জন্য । নিরুপায় বাদশা অবশেষে দর্শকদের শান্ত করতে বললেন যে কপিরাইটে রতনের নাম নেই কোথাও তাই তার নাম ক্রেডিটসে দেওয়া অসম্ভব । তবে কাহারের মত দরিদ্র শিল্পীর পাশে বাদশা দাঁড়াতেই পারেন পার্সোনালি । এরপর রতন খুব খুশি মনেই মেনে নিলেন এই প্রস্তাব । রতনের কাছে হয়ত এখন টাকাটা তার শিল্পের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ন । এখন ‘বাদশা কন্ট্রভার্সি’র পর তিনি রীতিমত কাজ টাজেরও অফার পাচ্ছেন । নাই বা পেলেন তার বিখ্যাত গানের কপিরাইট কিন্তু তিনি এই বয়সে একটা রেকগনাইজেশান পেলেন অবশ্যই ।

এতক্ষণ যা বললাম তা আপনারা অনেকেই জানেন এতে নতুন কিছুই নেই । ভূমিকাটা করলাম এই কারণেই যে মনে হল কিছু একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলার আছে । এইখানেই কিন্তু কাহারের গল্পটার খুব সুন্দর একটা এন্ডিং হতে পারত । আসলে এই গল্পটা বোধহয় শুধু ব্যক্তি কাহার কে নিয়েই নয় । রতন কাহার ছিলেন সেই সব আঞ্চলিক শিল্পীদের প্রতীক যারা সারা জীবন প্যাশানের জন্যই নিজেদের জীবন থেকে উঠে আসা জিনিসকে শিল্পের মাধ্যমে প্রকাশ করে গেছেন । এক বেশ্যার পিতৃপরিচয়হীন মেয়ের চুল বেঁধে দেয়া নিয়ে এই সহজ কথার গানটা ।

একইভাবে কাহার নিজের জীবনেও সমাজের কাছে এক্সপ্লয়েটেড হয়েছেন । রতনের মত এরকম আর অনেক গুণী শিল্পী হয়ত পরে আছে এদিক ওদিক । এদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার । কতজনেরই বা রতনের মত ভাগ্য হবে ? আজ এতদিনের পর রতন অভিমানী হতেই পারতেন কিন্তু এত বিলাসিতা করার মত তার সত্যিই অবস্থা নয় । যারা তাকে সরিয়ে রেখেছিল তারাই হয়ত এখন ডাকবে আর রতন সব ভুলে খুশি মনে যাবে । এই প্রসঙ্গে আরেকটি আঞ্চলিক গান মনে পরে যায় – ‘ জমি নিলি , বাড়ি নিলি , সাধের আমার বিটি নিলি , জমিদারবাবু , মন আমার ভাল নাই দুটা টাকার মদ খাতে দে ।’ 

তাহলে বাকি কাহারদের কি হবে ?? দরিদ্র শিল্পীদের কি আদেও কোন হিল্লে হবে ? সুন্দর গানের লিরিক্স সেক্সিস্ট ভিডিওতে দেখা ছাড়াও মানুষ কি এই মাটির গন্ধের গান গুলিকে যথাযোগ্য সম্মান দিতে শিখবে ? এসব প্রশ্ন দেয়ালের কানে কানে করলে আবার দেয়ালের ভেতরেই হারিয়ে যায় । ওং কার ওয়াইয়ের ‘ ইন দ্য মুড ফর লাভ ‘ ছবির শেষ দৃশ্যের মত কোন প্রাচীন অট্টালিকার খাঁজেই ফিসফিস করে রেখে দিলুম এই আফসোসটুকু । যদি আজ থেকে কয়েকশো বছর পরে  ভুল করে গুনগুন করে ওঠে কোন এক নতুন আকাশে ।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: