প্লাস্টিকের ঘর

শতরুপা বোস রায়

মায়াবিনী নিশীথিনী দ্বিগন্তরেখায় অপেক্ষারত। রক্তিম আবিরের বাকি যেটুকু অবশিষ্ট, মুকুলিকা সেইটুকুই তার বুকের মধ্যে জড়িয়ে বসে আছে দক্ষিণের জানলার পাশে। এমনি করেই তো সে তার সারাটা জীবন লাল রঙ কে  ভালোবেসেছে।  নিস্তব্ধ অন্ধকারে একাকী সে বসে থাকে। চারকোনা আকাশের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আগামী সূর্যোদয়ের অপেক্ষা করে সে । বালারুনের নবীন স্নিগ্ধ কিরণে প্রস্ফুটিত দিনটার অপেক্ষায়, তার ঘ্রাণ সে বুকের মধ্যে ভালোবেসে জড়িয়ে রাখে। কিন্তু মুকুলিকার জীবনটাই তো অন্ধকারে নিমজ্জিত। সে জন্মান্ধ। সে কেবল আলোর শব্দ শুনেছে, আলোর গন্ধ পেয়েছে। তাই তার সারা জীবনের নিশ্ছিদ্র কালো দিয়ে সে জ্বালিয়েছে হাজার আলোর মালা। 

এ গল্প তাকে ঘিরেই। তার সাধারণ জীবনকে নিয়ে এ এক নিছক কল্পনা আমার। কলকাতার হাজার হাজার মানুষের ভীড়ে অনাদরে, অবহেলায় এক রাশ উচ্ছিস্ট আর আবর্জনার মাঝে মুকুলিকার জন্ম হয়. রাসবিহারী আর কালীঘাট যাওয়ার রাস্তায় কেওড়াতলা মহাশ্মশানের ধারে, যেখানে সব মানুষের জীবনের অবসান ঘটে, সেই খানেই জন্মেছিল মুকুলিকা। শুরু করেছিল অন্ধকারে পথ চলা.

জন্ম সময় ওর নাম ছিল, না: কোনো নাম ছিল না, সত্যি কোনো নামকরণ হয়নি ওর তখনও। কলনাদিনী কলকাতার বুকে শত সহস্র নামহীন, অনাথ শিশুদের তালিকায় এই অন্ধ মেয়ের উপাখ্যান হয়ত লেখা থাকতো কোন এক কানা মেয়ের পরিচয়ে। কিন্তু এ গল্পের নায়িকা শুধুই তো কানা মেয়ে নয়. তাই আমার গল্পের এগিয়ে চলার তাগিদে সেই কানা মেয়ের নামকরণ আমি করলাম। এই নামহীন শিশুকে দিলাম আমার লেখনীর পরিচয়। 

মুকুলিকা তখন ভূমিষ্ঠ হয়নি। রাস্তার ধারে একটা নীল রঙের প্লাস্টিকের তাঁবু মত গড়া। কলকাতা এখন বর্ষার বারিধারায় সিক্ত। মেঘের নিনাদ, বৃষ্টির টাপুর টুপুর শব্দ, জানলার কাঁচ ঘেঁষে দুফোটা জল গায়ে মেখে বর্ষা সুন্দরীর রোমাঞ্চ উপভোগ করা – এই সংসারগুলোর মানুষগুলো তেমন ভাগ্য করে জন্মায়নি। তাই বৃষ্টির জল থেকে বাঁচবার জন্য নাভিশ্বাস বন্ধ করা এই এক চিলতে প্লাস্টিকের ঘরেই তাদের দিনগত পাপস্খলন।

প্লাস্টিকের দুটো দিক শক্ত করে নারকোল দড়ি দিয়ে শ্মশানের গেটের সঙ্গে বাঁধা আর বাকি দুটো দিক রাস্তার ওপরে ইঁট চাপা দেওয়া। সেই প্লাস্টিকের ঘরেই প্রসব যন্ত্রনায় ছটফট করছে একটি মেয়ে। বছর ২৫ বয়েস হবে।  রাস্তার ধারে একটু এগিয়ে কাঠের উনুনে গরম জল চাপানো। কতগুলো শাপলা, আরও কত নাম না জানা শাক পাতা কাটা রয়েছে পাশেই। একটা শিশু অদূরে বসে কাঁদছে। পরণে কাপড় নেই, হাতে পায়ে সারা সংসারের ছাই মাখা। ঘরের মধ্যে আর্তনাদ ক্রমশ বাড়ছে।

লুঙ্গি পরা কতগুলো লোক প্লাস্টিকের ঘরের কিছু দূরে বসেই জুয়া খেলছে। তাদের কেউ বা রিক্সা চালায়, ভাড়ার রিক্সা, কেউ বা অন্ধ সেজে কালীঘাটে ভিখ্যা করে. আবার কেউ মাঝে মাঝে শ্মশানের বড়ো বাবুকে ধরে ডোমের কাজ করে. তাতে একটু বেশি টাকা পাওয়া যায়। এদের মধ্যে কেউ কেউ চুরি বিদ্যাও জানে। পচা হলো এদের নেতা। আজ পচাই পঞ্চমবার বাবা হবার আনন্দে সকলকে ডেকে এই জুয়ার ঠেক বসিয়েছে। পচার বাবা হাঁপের রুগী। শ্মশানের ধোঁয়ায়, মানুষ পোড়া ছাই ঢুকে ওর ভেতরের কল কব্জা অকেজো করে দিয়েছে। পচার মাই এখন পুরো সংসারটা দেখাশুনা করে. পচার বৌ ভেতরে যন্ত্রনায় কাঁদছে।

“ওরে ও পচা ! পোড়ার মুখো মিনসে। আঃ মোলো যা! বৌটা যে কেঁদে কেঁদে মোলো, দ্যাখ না গিয়ে, ওরে ও পোড়ার মুখো, দ্যাখ বুঝি হয়েই গেলো, যা ব্যাথা উঠেছে? আজই এখন ই বেরোবে বলে মনে হচ্ছে।” পচার মা ভাত নামিয়ে ফুটপাতের পারে বসে ফ্যান গালতে গালতে বলে ওঠে। “ব্যাথা বেড়েছে তো আমি কি করবো? তুমি যাও না ?” জুয়ার থেকে বৌয়ের জীবন পচার কাছে কখনই দামী নয়।  “দেখছো তো আমি খেলছি, বলে পচা আবার তার হাতের তাসের দিকে মনোনিবেশ করে.

বর্ষার দুপুরে মেঘাতুর আচ্ছন্ন আবছায়া আলোয় পচার দল জুয়ার মারপ্যাঁচে মশগুল। ঠিক সেই সময় একটা মৃতদেহ এসে নামে শ্মশানের দোরগোড়ায়। বল হরি, হরি বোল..! আর তার সঙ্গে কান্নার রোল সমস্ত শ্মশান চত্বরে মেঘলা দিনের বিষাদকে যেন আরও ঘনীভূত করে। পচার দল সে কান্নায় ক্ষনিকের জন্য বিচলিত হয়না। জীবনের পরিসমাপ্তির এই রূপ তারা দেখে এসেছে আজন্ম। অন্যদিকে বিদায় ব্যাথার হাহাকারের সঙ্গে মিশে যায় পচার বৌয়ের আর তার সদ্য ভূমিষ্ঠ বাচ্চার বেঁচে থাকবার আর্তনাদ। 

জীবনের এই অমোঘ সত্যটি, জীবন আর মরণের এই লুকোচুরি খেলার জটিলতা অনুধাবন করবার মতো ক্ষমতা পচা বা তার সঙ্গীদের নেই।  শ্মশান পারের বাসিন্দা তারা, তাই মৃত্যুর অর্থ শুধুই ছাই, কুড়িয়ে পাওয়া কিছু পয়সা, নতুন তোষক, নতুন বালিশ, ধুতি জামা শাড়ি ছাড়া আর কিছুই নয়. তাই হয়তো নতুন জীবনের আগমনেও পচা উদাসীন।  হঠাৎ পচার মা ছুটে এসে বলে, ‘হারামজাদা, ওঠ ওঠ বলছি, বৌটাকে নিয়ে হাসপাতালে যা, মরতে বসলো যে।  বলতেই বলতেই সদ্যজাতের কান্নায় আবার মুখর হয়ে ওঠে শ্মশান চত্বর। মৃত্যুর এ পারে জন্ম হয় আর একটি প্রাণের।

পচা কান্না শুনে প্লাস্টিকের মধ্যে মুখ ঢুকিয়ে একবার উঁকি মেরে দেখে । বৌ চোখ বুজে পরে আছে অচেতন অবস্থায় আর পাশে একটা রক্ত মাখা বাচ্চা পরে চিৎকার করে তার আবাহন গীতি রচনা করছে। “শালা আবার মেয়ে হলো রে! ” পচা জুয়ার দলে ফিরে এসে মাথা চুলকিয়ে বলে ওঠে।  লুঙ্গিটাকে ভাঁজ করে হাঁটুর ওপরে তুলে একটা বিড়িতে টান দিয়ে আবার বলে ওঠে, “ইচ্ছে করছে সবকটাকে নিয়ে গিয়ে কিলোদরে বেচে দিয়ে  আসি. পাঁচটা মেয়ে নাহলে আমার গলায় ঝুলতো?” পচার মা তরকারি নামিয়ে রেখে এক বালতি জলে হাত চুবিয়ে কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে বৌয়ের নাড়ি কেটে বাচ্চাকে কোলে করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে.

পাশের ঘরের একটি বৌ এসে পচার বৌকে পরিষ্কার করিয়ে একটা চাদর চাপা দিয়ে দেয়।  এক গ্লাস দুধ, কে জানে কোথা থেকে খুচরো পয়সা দিয়ে জোগাড় করে এনেছে পচার মা, এনে বৌয়ের হাতে দিয়ে বলে, এই নাও, খেয়ে নাও, এখনও অনেক লড়াই বাকি।” 
সেদিন সমস্ত ঘটনার সাক্ষী ছিলাম আমি. দাঁড়িয়ে দেখেছিলাম কেমন করে মৃত্যু এসে ছিনিয়ে নিয়ে যায় জীবন আবার সেই একই জায়গায় জীবন কিভাবে ফিরেও আসে. আজ যখন লিখতে বসেছি তখন ওই সদ্যজাতের মুখটাই বার বার মনে পরছে।

সমাজের খুব নীচু তলার মানুষ পচা. পচার মা, পচার বাবা ওর পাঁচ সন্তান সমাজের ছাই. কিন্তু তবুও মনুষ্য জন্মের অধিকারী তারা। সেদিন পারিনি সদ্য ফোটা মুকুলিকাকে ওদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আমার করে নিতে, আমার পরিচয় দিতে। নিয়ে আসতে এমন একটি সমাজে যেখানে দারিদ্র নেই, নিষ্ঠুর ভাগ্যের পরিহাস নেই, আবর্জনা নেই, চিতা ভস্ম নেই. কিন্তু আজ এই লেখণীর ভাষায় কত সহজে কত স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে নামহীন ওই শিশুটির নামকরণ করলাম আমি. কল্পনার রঙে রসে গন্ধে পারি দিলাম আবার আমারই গড়া মুকুলিকার জীবন তরঙ্গে। 

মিউনিপ্যালিসিটি ইলেকশন আসন্ন। তাই এই পাড়ার কাউন্সিলর ঘন ঘন এ পথে পায়ে হেঁটে চলা ফেরা করছেন। দরিদ্র সেবায় আর উৎসর্গীকৃত প্রাণ। মহানুভ, পরোপকারী নেতা তিনি। সেদিন যখন শ্মশানের চৌমাথায় বিশাল এক মাচা করে জনসভার আয়োজন হচ্ছিল, তখন পচা আর তার লোকজনকে ৫০ টাকা বকশিস দেওয়া হয়েছিল লোক জোগাড় করবার জন্য। সুযোগ বুঝে সেদিন পচার মাও কাউন্সিলরের থেকে পারমিশন করিয়ে নেয় সদ্যজাত ওই বাচ্চাটিকে একবার ডাক্তার দেখানোর জন্য।

উদয়ন ডাক্তার এই পাড়াতেই থাকে। ডাক্তারি পাশ করে এই পাড়াতেই সে একটা চেম্বার খুলে বসে রুগী দেখে আজকাল। মুকুলিকাকে প্রথম দেখেই উদয়ন ডাক্তার বলে দেয়, সব ঠিক আছে, তবে মেয়েটি চোখে দেখতে পায়না। “সে কি অন্ধ? বৌটা নেহাৎই অপয়া। এই মেয়েকে তো জন্ম সময়েই শেষ করে ফেলা উচিত ছিল”! অন্ধ মেয়ে শুধু তো ভিক্ষা ছাড়া আর কিছুই উপার্জন করতে পারবে না।  এই দারিদ্রের মধ্যে কেমন করে অন্ধ মেয়ের দায়িত্ব নেবে পচা? তাই একদিন ভোর না হতেই বৌ বাজারের কাছে এক হাসপাতালে গিয়ে মাত্র ১০০০ টাকার বিনিময়ে পচা তার সন্তানকে বিক্রি করে দিয়ে আসে. 

কলকাতা সেদিনও তেমনি করে এগিয়ে চলছিল সভ্যতার হাত ধরে, সভ্যতার অহংকারকে বুকে নিয়ে। দু বেলা দু মুঠো ভালো খাবে বলে সেদিনও মানুষ ছুটছিল মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। প্রকৃতিও তার নিয়ম মেনে বর্ষা শেষে উষ্ণ সবুজ আলোয় ভরিয়ে রেখেছিলো চারিদিক।  ঠান্ডা ঘরে  ফ্ল্যাট স্ক্রিনের সামনে বসে অন দা রক্স উৎসব হচ্ছিলো কাউন্সিলরের বাড়িতে। আর অন্যদিকে শুধু মাত্র অন্ধ গরীব কন্যা সন্তান হবার জন্য বিক্রি হয়েছিল মুকুলিকা। জানি না আজ সে কোথায় কোন পরিস্থিতির মধ্যে জীবন যাপন করছে। অন্ধকার এই পরিসমাপ্তির শেষ কোথায়? সভ্যতার কোন অতলে। অন্ধ মেয়ের লেনদেন তো অন্ধকারেই হয়, বাকি সমাজের ঔদাসীন্যে, সমাজের কোন গভীরে, নিগূঢ় কালোর অন্তরালে। 

তাই কল্পনা করি মুকুলিকা হয়তো কোন নিরাপদ আশ্রয়ে সুখে দিন যাপন করছে। আমার এই দক্ষিণের বারান্দায় যেখানে বসে আমি সুখের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আকাশ দেখি, সেখানে আমার পাশে বই মুখে করে বসে আছে সে।  আমার কল্পনায় আমি তাকে আমার পাশে এসে বসালাম। বাস্তবে যা পারিনি, ক্ষতি কি যদি কল্পনায় তাকে নিয়ে আসি আমার ঘরে? আমার আকাশের নীচে আমার স্বাধীন কলমের কালি দিয়ে রচনা করি মুকুলিকার এক নতুন জীবন? অন্ধকারে আলো জ্বালাই? পচা আজও ওখানে বসে জুয়া খেলে। ওই এক জায়গায়। পচার মা এখনও পাতা সেদ্ধ রান্না করে. পচার বৌ বাচ্চা কাঁখে কালীঘাটের মন্দিরে সারাদিন ভিক্ষা করে. ৫০/১০০ টাকা ঘরে আনে দিনের শেষে। পচা সেই টাকায়  মদ খায়. তারপর রাত্রে প্লাস্টিকের ঘরে বৌকে জড়িয়ে ধরে ঘুমোয়। রাস্তায় পচার মা তার ৪ নাতনিকে নিয়ে শুয়ে কল্পনার জাল বোনে। বেশি কিছু না. শুধু দুবেলা দু মুঠো ভালো খাবার। কলকাতার সব আলো নিভে যায়. আবার আরেকটা দিনের অপেক্ষা।  

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: