চিত্রকলা বাস্তব আঁঙ্গিকে

পিয়ালী মিত্র

কলা রসিকদের রস আস্বাদের আঙ্গিক বিবেচনায় শিল্পকলার অন্যান্য অঙ্গসংস্থানের সাথে চিত্র্রঅঙ্কণ এর মধ্যে ফারাকটা মৌলিক । চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য তার ভাষা-গত সার্বজনীনতায়। যে দেশ ও স্থানের চিত্রকর হন  না কেন তার তুলিতে ও কালিতে ফুটিয়ে তোলে চারুকলার নান্দনিক মিষ্টি ভাষা। অবশ্য শিল্পকলা সৌন্দর্যবোধের বিকাশ ঘটায় শুধু তাই নয়, বৈষয়িক জীবন, মানব-শ্রম, সামাজিক জীবন প্রস্ফুটিত করে। প্লেটো মনে করতেন চিত্রকলা প্রকৃতির অনুকারক মাত্র। কিন্ত যুগের পরিবর্তনের সাথে দেখা যায় যে চিত্রকলা ফিকশেনাল বা কাল্পনিক status ধারণা থেকে সে বাস্তব প্রতিফলনের দিকে উত্তীর্ণ হয়েছে। যা পরে Realism বা বাস্তববাদী চিত্রধারা হিসেবে অভিহিত করা হয়ে। মধ্যযুগীয় চিত্রকলায় একটা প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলকতার অভিপ্রায় থাকত। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি বিশেষ মতামত ধারণ করতেন যে মানুষের চোখ হল আত্মার দুয়ার, তার মধ্যে দিয়ে অনেক ধারণা প্রস্ফুটিত হয়। তাই শিল্পের অনুকৃতি ও বাস্তবতা যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর সৃষ্টিতে।

উইকিপিডিয়া বাস্তবাদ শিল্পকলাকে বর্ণনা করেছেন সাধারণত বিষয়াদি কৃত্রিমতা ছাড়া সত্যভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা এবং তার সাথে শৈল্পিক রীতিনীতি অথবা অসম্ভাব্য; বহিরাগত এবং অতি প্রাকৃত উপাদানগুলি এড়িয়ে চলা। প্রকৃত শিল্পে, বাস্তবতাবাদ হল জীবন ধরণের সঠিক রুপায়ণ, দৃষ্টিকোণ এবং আলো ও রঙের বিশদ বর্ণনা করা। এই বিষয়ে বিশেষ উল্লেখ্য কি ভাবে ভেষজ রঙের প্রচলন বৃদ্ধি পায় এই বাস্তবাদ শিল্পীদের মধ্যে। যদিও এই রঙের ভেতর দিয়ে অনেক  সূক্ষ্ম টোণ পাওয়া যেত, রঙও ছিল অপূর্ব তবুও কিছু শিল্পী মনে করতেন আলোর সান্নিধ্যে এই রঙ তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। তাই লিওনার্দো দা ভিঞ্চি চিত্রকলায় সবরকম ভেষজ রঙ পরিহার করেছেন। তৈলচিত্রের প্রথম প্রলেপে হলুদ-সাদার সঙ্গে গাড়  বাদামি রঙ ব্যবহার করতেন। আর আঙুল দিয়ে সাদাকে বেশী ব্যবহার করে প্রতিরূপ আঁকতেন। বস্তুর নিজস্ব রং আলোর অংশ পুরো হয়ে ক্রমান্নয়ে মসৃণ ও কোমল রূপে পরিবেশিত হতো। সবুজ রঙ নীল রঙের উপর ব্যবহার করা হতো।

এই বাস্তববাদী শিল্পধারা বাংলার তথা পশ্চিমবঙ্গের শিল্পধারায় বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। ছবির জগতে এক নতুন আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ষাটের শেষে এবং সত্তর দশকের গোড়া থেকে পশ্চিমবঙ্গে এক পরিবর্তন দেখা যায় যা শৈল্পিক জগতে রেখাপাত করে। সময়টা ইংরেজি পরিভাষায় এক ট্র্যানজিশন পিরিয়ড। এক দিকে নকশাল আন্দোলন দানা বাঁধছে। কখনও ভেঙে যাচ্ছে, এ দিক-সে দিক নকশাল দমনে সিআরপি ক্যাম্প। রাতের বেলা পুলিশের গাড়ির শব্দ। কলেজ স্ট্রিট প্রতি দুপুরেই উত্তাল হচ্ছে বোমায় গুলিতে, কাঁদানে গ্যাসে। নেতারা কখনও আন্ডার গ্রাউন্ড থেকে, কখনও রণাঙ্গনে ভেসে উঠে নেতৃত্ব দিয়েছেন আন্দোলনের। সত্যি বড় আগুনের সেই সময়। সেই উত্তাল সত্তর দশকের মাঝে আমরা পাই শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যের ডল বা পুতুল সিরিজের ছবিগুলি।

images (64).jpeg
শিল্পী নিজে। আন্দবাজার পত্রিকা থেকে সংগৃহিত।।
ডল সিরিজের অন্যতম একটি চিত্র। শিল্পীঃ বিকাশ ভট্টাচার্য

এই পুতুলগুলি যেন মানুষের অভিব্যক্তি। এক গভীর দার্শনিক চিন্তা যেন অন্তর্নিহিত হয়ে আছে এই পুতুল ছবিগুলির মধ্যে। মানুষ যেন পুতুলের মতো। এক অদৃশ্য শক্তি নিয়ন্ত্রিত মনে হয়। কোনও পুতুল ঝুলছে একটি দড়ির মধ্যে যেন আমাদের জীবন এক অনিশ্চয়তার সুতোয় বাঁধা।

শিল্পীঃ বিকাশ ভট্টাচার্য

সত্তর দশকের হিংসা-জর্জরিত সময় এই ছবিগুলি অভিজ্ঞান। মানুষের বিপন্নতা, অসহয়তা ও বেঁচে থাকার আর্তিত  শিল্পরূপ। অজানা কালো দিনগুলি প্রতিফলিত হয়েছে আরেকটি ছবিতে যেখানে পুতুলগুলি যেন নিরবিচ্ছিন অন্ধকারে আবৃত  হয়ে আছে।

এই ছবিগুলি আরেকটি দিক উন্মোচন করে। ইতিহাস আশাবাদের বিপরীত হিসাবেই নৈরাশ্যবাদ গৃহীত হয়েছে। মানুষের জীবন শুধুই আনন্দের বা শুধুই হতাশা বা দুঃখের নয়। জয় পরাজয়, আশা-নিরাশা, পাওয়া-না-পাওয়া, আনন্দ-দুঃখ মানুষের জীবনে মিলেমিশে আছে। আসলে মানুষ অনেক আশা, অনেক চাহিদা নিয়ে জীবনপথে অগ্রসর হয়, এদিকে সকল আসা পূরণ হওয়ার নয় মানবজীবনে আর তার ফলে নেমে আসে নৈরাশ্য!

শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্যের এক স্বতন্ত্র ভিজুয়াল প্রকাশ পায় তাঁর চিত্রের মধ্যে। যদিও বিকাশ ভট্টাচার্যেকে prolific realist হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় তবে ওনার ক্ষেত্রে কোন শব্দটি একজন চিত্রশিল্পীর পক্ষে উপযুক্ত হতে পারে তা নিশ্চিত করা যায়নি। কোনও নির্দিষ্ট  ট্রেডমার্ক কখনও তাঁকে সীমাবদ্ধ করে রাখেনি। তাই তো আজও প্রশ্ন জাগে উনি কি পরাবাস্তববাদী, নিওরিয়েলিস্ট, ফটো-রিয়েললিস্ট, না হাইপাররিয়েলিস্ট ? শিল্পী বিকাশ তাঁর নিজস্ব স্টাইলে উন্নত হয়েছিলেন। দেখেছেন শিল্পীর চোখে বিবর্তন পরিবর্তন  তাঁর শহরে তাই প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর আঁকা ছবিতে। যেমন আগেই আলোচনা করেছি ওনার ডল বা পুতুল সিরিজ নিয়ে। তেমনি বিকাশের ‘পুজোর কলকাতা’-য এই পরিবর্তনের একটা ছবি পাই আমরা।

পূজোর সিন্দুর খেলা- শিল্পীঃ বিকাশ ভট্টাচার্য

ওনার ছোটবেলায় পূজো ফ্যাশনের স্মৃতি বলতে থান কিনে দর্জির দোকানে দিয়ে বানানো মাপসই সুতির জামাকাপড়। পরে রেডিমেড পোশাক বিপ্লব সেই পুরনো ফ্যাশন গ্রাস করে। মন্ডপ-সজ্জা, প্রতিমা-সজ্জা, শৈলী সকলেরই পরিবর্তন ঘটেছে। আর সেই সকল কিছু শিল্পীর ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। তার ব্যক্তি জীবন ও শিল্পী জীবন, সব মিলিয়ে যে আত্ম যাপন, শৈশব থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত তাঁর যে মানস যাপন, সেটাই হয়ে উঠেছে প্রতি লেপন ক্যানভাসে জীবনভর।

পরিশেষে বলি আমরা বর্তমানে এক অস্বস্তিকর পরিস্তিতর মধ্যে দিয়ে  যাচ্ছি যেখানে বেঁচে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমত ভীত, আতঙ্কিত পরিবেশে শিল্পীর সৃষ্টি আর এই লেখনী শিশির বিন্দুর মতো হলেও যদি উদ্বেগ-নিরসন করে তাহলে সেও পরম প্রাপ্তি।।

a-walk-by-the-shallow-beach-piyali-mitra.jpg
চিত্রায়ণেঃ পিয়ালী মিত্র
a-passionate-lady-piyali-mitra-1.jpg
চিত্রায়ণেঃ পিয়ালী মিত্র

ঋণস্বীকারঃ

১। শিল্পী  বিকাশ ভট্টাচার্যের অংকিত ছবির জন্য

http://www.artnet.com/artists/bikash-bhattacharjee/

২। শিল্পী  বিকাশ ভট্টাচার্যের নিজস্ব ছবির জন্য

‘রোজকার সংসারেই তাঁর বিকাশ’—আনন্দবাজার পত্রিকা

https://www.anandabazar.com/supplementary/patrika/some-unknown-facts-about-great-painter-bikash-bhattacharjee-1.663944

৩। Kalidas, S (2000, 14th February) ‘Calcutta celebrates painter Bikash Bhattacharjee’s current muse, recalls his past passions’

https://www.indiatoday.in/magazine/society-thearts/story/20000214-calcutta-celebrates-painter-bikash-bhattacharjees-current-muse-recalls-his-past-passion-779537-2000-02-14

৪। পিয়ালী মিত্রের ছবির জন্য

https://fineartamerica.com/profiles/piyali-mitra

The following two tabs change content below.
Avatar

Piyali Mitra

Avatar

Latest posts by Piyali Mitra (see all)

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: