অতিপ্রাকৃত

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

বুড়ো জর্জের মেজাজ সকাল থেকেই খিঁচড়ে আছে। প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে থানার বড়বাবু তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে এসে জেরা টেরা করে, জলখাবার ধ্বংস করে আজকের দিনটা একেবারে মাটি করে দিয়ে গেল। জর্জের কাপড়জামার দোকানটা পুরনো নিউমার্কেটের ভেতরে। এককালে বূয়োর যুদ্ধে ব‍্যবহার করা কামানটা ঠিক তার দোকানে ঢোকার মুখটায় থাকত। এখন আর সেটা নেই। অবশ‍্য চিরকাল সব একইরকম  যে থাকবে এমন কথাও কেউ বলেনি। জর্জের বয়স এখন  প্রায় পঁচাত্তর। নিজের শরীরে আর মনে জোরটা টিকে আছে বলেই তো ‘ এলিজা স্ এ‍্যাপারেল’ টিও এখনো টিকে আছে।

একদিন ওর পূর্বপুরুষরা সাগর পেরিয়ে এদেশে ব‍্যবসা করতে এসেছিল সেই উনিশ শতকের মাঝামাঝি। জর্জের  ঠাকুর্দা জেমস্  পেশায় ছিলেন নামকরা  সার্জন। মির্জাপুরে থাকার সময় তিনি এক মুসলমান নর্তকীর প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে  করে ভারতবর্ষেই থেকে যান। আর তাদের বাবার পেশাগত কারণে ভারতের অনেক প্রত‍্যন্ত এলাকায় জর্জের বাবা কাকাদের শৈশব -কৈশোর  কেটেছে । জর্জের বাবা পিটার এই কাপড়ের দোকানটা কোলকাতায় এসে  খোলেন। সেও এখন একশো বছর হতে চললো। এলিজা ছিল জর্জের মা এর নাম। পুরনো কোলকাতার ফিরিঙ্গিরা আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে সবদিক থেকেই। কবরে ঘুমিয়ে পড়ার পর হয়তো জর্জকেও মনে রাখবে না তার জন্মভূমি। হ‍্যাঁ! জর্জ, কোলকাতাকেই তার জন্মভূমি বলে মানে। স্পেনীয় রক্ত গা’য় বইলেই তো আর হিস্পানিওলা হওয়া যায়না। কোলকাতার আকাশ বাতাস মাটিতে বেড়ে ওঠা জর্জ  নিজে বাংলাটা যদিও ভাঙা ভাঙাই বলে, কিন্তু হিন্দী আর ইংরেজীতে সে চোস্ত।

তিনদিন আগে ওদের দোকানের ছেলেটা, ইরফান , ওদের পাড়ার কাছেই মল্লিকবাজারে থাকে সে হঠাৎ নিখোঁজ। ওকে শেষবার এই দোকানেই সকালে আসতে দেখা গেছিল। তারপর আর কেউ দেখেনি। জর্জ এই নিখোঁজ হবার ব‍্যাপারটা নিজেও জানতো না। ভেবেছিল কামাই টামাই করছে বা শরীর খারাপ হয়তো।

আজ ওর বাড়ির লোকে পুলিশে ডায়রী করায় ব‍্যাপারটা সবার সামনে এল। দোকানে একজন  নেপালী সেলস্ গার্ল আছে। নাম তার জুলিয়া, পুলিশের জেরার ঠেলায় সে বেচারীও অতিষ্ঠ। ইরফান জর্জের  দোকানটা দেখাশোনা করতো, ঝাড়মোছ করতো, এমনকি জর্জের অনুপস্থিতিতে কখনো কখনো ক‍্যাশেও বসতো। চালচলন ছিল স্বাভাবিক আর স্মার্ট। মাসছয়েক আগে বহাল হয়েছিল সে। আজ অবধি ওর মধ‍্যে কোন গন্ডোগোল দেখেনি জর্জ। ইরফানের রহস‍্যজনক ভাবে উবে যাওয়ায় জর্জ নিজেও বিস্মিত।

জর্জ ঠিক করলো রাত নটা’য় দোকানের ঝাঁপ বন্ধ করে দেবে। আজ জুলিয়ার বিবাহ বার্ষিকী। সাতটার সময় সে ছুটি চেয়ে রেখেছে। নইলে সাড়ে আটটায় সে চলে যায় রোজ। গাউটের ব‍্যথাটা হাঁটুতে চাগাড় দিচ্ছে কদিন ধরে। দোকানের শাটারে তালা লাগাতে হাঁটু মুড়ে বসতে হবে ভাবতেই বিরক্তি লাগছে।

*************

একটা মনোরম মিলনের পরে যেমন ঝিমঝিমে আলগা আদরের আমেজ  থাকে, ঠিক সেরকমই একটা হাল্কা আমেজের ঘোরটা  এখনো রয়ে গেছে। ণণ্ড
সাদা ধবধবে  বিছানায় লিন্ডা এখন  নিস্পন্দ হয়ে শুয়ে আছে, মুখটা একটু হাঁ করা, ভুরু কোঁচকানো। একটু বাতাসের জন‍্য ছটফট করতে করতেই সব শেষ হয়ে গেল।
ও ভাবতেই পারেনি এমনটা হবে। আদরের পর লিন্ডার গলাটা সজোরে টিপে ধরার সময় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজএর  শেষের দিনগুলো মনে পড়ে যাচ্ছিল।  সত্তরের গোড়ায় লিন্ডার সাথে আলাপ। তখন লিন্ডাও একুশ বছরের।  টেনিস খেলে, মডেলিং করে, জর্জও লাউডন স্ট্রীটের      ‘ স্টার বয়েজ’  ক্লাবের বক্সিং কম্পিটিশনে ডিস্ট্রিক্ট চ‍্যাম্পিয়ন !  সেসময় বো ব‍্যারাকস্ এর  কত হ‍্যান্ডসাম ছোকরা অ‍্যাডমায়ারার যে লিন্ডার  চারপাশে ঘুরঘুর করত! তখনকার  নামী কিউরিও মার্চেন্ট  রামলালদাস সুখানিয়ার পঁচিশতম বিবাহ বার্ষিকীর একটা পার্টী হয়েছিল গ্রেট ইস্টার্নের বলরুমে । সেখানেই লিন্ডাকে সবার  সামনে একশোটা তাজা রক্তগোলাপ দিয়ে সেই প্রপোজ করা! অনেক প্রত‍্যাশীদের বুক ভেঙে  লিন্ডাও ঠিক জর্জের ডাকেই সাড়া দিল। ওই রকম একটা সুন্দর লাস‍্যময়ী অপরূপ গ্রীবার  যুবতী নারীটিকে টগবগে সাতাশ বছরের জর্জও নিজের করেই সত‍্যি একদিন পেতে চেয়েছিল।

************
বিয়ের সাতবছর পরেও জর্জ- লিন্ডার কোনও সন্তান হলনা। ততোদিনে বাবার ম‍ৃত‍্যুর পরে দোকানটাকেও সামলাতে হচ্ছে। এরমধ‍্যেই শনিবারে টার্ফক্লাবে গিয়ে একটু আধটু রেসে বাজি ধরা, হার জিৎ, ট্রিঙ্কাস্ এ ঊষার গান, দুপাত্তর জনি ওয়াকার…..এসব নিয়েই জীবন কাটছিল একরকম ভাবে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঘূণপোকা ধরে  যাচ্ছিল ওদের দাম্পত‍্যে।
লিন্ডা খুব স্বেচ্ছাচারি হয়ে গেছিল। দিনরাত ক্লাব, পার্টী, মদ…জর্জের থেকে ও দূরে সরে যাচ্ছিল ক্রমশ।

এইসময় জ‍্যেকব এ‍্যারাকিন  বলে এক বড়লোকের বখে যাওয়া জাহাজী ছোকরার সাথে জড়িয়ে পড়ল লিন্ডা অ‍্যাফায়ার্সে। সে ছোকরা প্রতি ছ’মাসে জল থেকে উঠে এসেই লিন্ডাকে সঙ্গে নিয়ে খোলামকূচির মত টাকা ওড়াত। জর্জও টের পেত তার দোকানের ক‍্যাশবাক্সের গরমিল। তাও কখনো সামনাসামনি কখনো কিছু লিন্ডাকে বলেনি। কারণ জর্জ তখনো বিশ্বাস করত লিন্ডা নিশ্চয়ই তার কাছে কখনো এসে একদিন ক্ষমা চাইবে। কিন্তু একদিন অসময়ে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরে এসে অবিন‍্যস্ত অবস্থায় লিন্ডা জর্জের সামনে ধরা পড়ে গেল। জর্জের আগুনজ্বলা নীলচে  চোখের সামনে মাথা নীচু করে লিন্ডা বেডরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করতে যেতেই জর্জ ঝাঁপিয়ে পড়ল সেদিন লিন্ডার ওপর। আটবছরের দাম্পত‍্য জীবনে  প্রথমবার  লিন্ডাকে জোর করে ভোগ করতে করতে, একসময় গলাটা টিপে ধরতেই জর্জের জিঘাংসাটা সে সময় পশুর মণত করে বেরিয়ে আসছিল। মরবার আগে শেষ আওয়াজটুকুও করার সুযোগ পায়নি লিন্ডা।

*******************

জর্জের ঠাকুর্দা ডাক্তারির পাশাপাশি ভাল শিকারীও ছিলেন। এ দেশের জলে জঙ্গলে  নিজের হাতে সম্বর, চিতা, ভালুক, কুমীর  এসব মেরে বাড়িতেই একটা ট্রফিরুম বানিয়েছিলেন। দুএকটা বাঘ মারা বন্দুকও এখনো সে ট্রফিঘরে সাজানো আছে।  মৃতদেহ  সংরক্ষণের অনেক বিলেতি বইও ছিল বাড়ীতে। বায়োকেমিস্ট্রীর ছাত্র  জর্জ ওসব বইগুলো সেই কলেজের  সময় থেকেই ঘাঁটত। কাজেই লিন্ডার দেহটাকে পলিইউরিথিন দিয়ে মাউন্ট  করে একটা ম‍্যানিকুইনে পরিণত  করতে তার  মোটামুটি দিনসাতেক লাগল। লিন্ডার কোমল স্বচ্ছ  দেহত্বককে  বদলে  দিয়ে বিলিতি কটন আর ঊল দিয়ে ভরাট করে আজীবনের জন‍্য তার গতি স্তব্ধ করে দোকানে এনে সাজিয়ে রাখল। সে সময়ে দোকানে আর কর্মচারী কেউ ছিলনা। ওরা দুজনে মিলেই দোকান সামলাত। সবাই জানল, জর্জের ওপর রাগ করে সেপারেশন স‍্যুট করে লিন্ডা গোয়া চলে গেছে।

আস্তে আস্তে লোকেও একদিন এসব ঘটনা ভুলতে লাগল। জর্জেরও বয়স বাড়তে বাড়তে এখন পঁচাত্তর প্রায়। কেবল জোড়া গির্জার চ‍্যাপেলে গিয়ে মরবার আগে এই পাপটুকু তার স্বীকার করে নিতে খুব ইচ্ছে করে!

**************

আজ রাত করে দোকান বন্ধ করতে যাওয়ার সময় যেন পোশাকের খসখস শব্দ শুনতে পেল জর্জ। কিন্তু এখন তো দোকান ফাঁকা! তবে?

দোকানঘরটা কেমন নীলচে মায়ায় অচেনা দেখাচ্ছে। ডিসপ্লে উইন্ডোটা ফাঁকা! আবছা জমাট ধোঁয়ার মধ‍্যে সাদা ওয়েডিং গাউন পড়া ম‍্যানিকুইনটা যেন ধীরে ধীরে জর্জের দিকে এগিয়ে আসছে। তার  দু চোখে কাতর করুণ আচ্ছন্ন দৃষ্টি। ঠোটদুটো ঈষৎ ফাঁক করে কিছু অব‍্যক্ত কথা বলতে চাইছে লিন্ডা। সেই ভাষা অগম‍্য  ইথার তরঙ্গের পথ  পেরিয়ে জর্জের কানে এসে পৌঁছচ্ছে না একেবারে।

জর্জ স্নায়ু টানটান করে উঠে বসে। তার দুচোখেও দু ফোঁটা জল টলটল করে।
‘মাই লিন্ডা! ডার্লিং! ফরগিভ টু মি অলসো’……
লিন্ডার ছায়ামূর্তি ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসে।
খুব দূর থেকে আগত অথচ রিনরিনে শব্দ জর্জের কানে আসে – ‘ প্লিজ বিহোওওওওল্ড মী…..’
জর্জ যন্ত্রচালিতের মত এগিয়ে যায়। হাওয়ার মত একটা শূন‍্য অবয়বকে আন্দাজ করে পাতলা কাগজের মত খসখসে ঠোঁটে একটা চুমু খেতে যায় সে।

মুহূর্তে একটা তীব্র ইলেকট্রিক শকে জর্জ ছিটকে যায়। চেয়ারের পায়ায় মাথাটা ঠুকে রক্ত বেরোচ্ছে। লিন্ডা………!  জর্জ যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠে।
” নো মোর টাচ্! নো মোর টাচ্…..ইওর লাস্ট টাচ টুক মি টু দ‍্য হেইল……..” কৃত্রিম পলেস্তারা খসে ম‍্যানিকুউনের মুখটা বিকৃত, বীভৎস হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে। লিন্ডার আর্তনাদ মেশানো গোঙানীটা এবার স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে যেন!

জর্জ সভয়ে পিছিয়ে আসে। দোকানঘরে এখন নীলচে মৃত‍্যুর অপার্থিব আলোছায়া ঘুরপাক খাচ্ছে। কাঁপা গলায় এবার লিন্ডা বলে ওঠে –  “দ‍্যাট বাস্টার্ড টাচড্ মি ব‍্যাডলি জাস্ট  ফিউ ডেইস ব‍্যাক! হি ইজ নো মোর…..”

কার কথা বলছে লিন্ডা? জর্জের মনে পড়ে গেল ইরফানকে সবকিছু ঝাড়মোছ করতে বললেও ম‍্যানিকুইনে ওকে হাত না দিতেই বারণ করা উচিত ছিল। তাহলে ইরফানকেও কি….?

খসখসে চামড়া দিয়ে মোড়া লিন্ডার হাতের মুঠোয় একফালি সবুজ কাপড়ের টুকরো!

আরে ওই রঙের জামাটাই তো ইরফান পড়তো তাই  না?

জর্জ   এবারে টের পায় ক্রমশ তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে যেন। কোন এক অদৃশ‍্য শীতল স্পর্শের দশটা আঙুল তীব্র বেষ্টনীতে তার  শ্বাসনালীতে চাপ দিচ্ছে………আর কিছুক্ষণ পরে জর্জের নিষ্প্রাণ দেহটা দোকান ঘরের মাটিতেই লুটিয়ে পড়ে।

******************

পুলিশ এসে ‘এলিজা স্ এ‍্যাপারেল’ দোকানটা আপাতত তালা লাগিয়ে দিয়ে গেছে। জর্জের কোনও ওয়ারিশ বা নমিনি নেই। পুরসভা এসে হয়ত একদিন দোকানটা দখল নিয়ে নেবে বা অন‍্য কেউ কিনে নেবে কোনওদিন।

তবে ইরফানের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার মতোই আরও দুটো ঘটনার কথা এখানে  না বললেই নয়। ডাক্তারি পরীক্ষায় জর্জের মৃত‍্যুর কারণ হিসাবে বলা হয়েছে ম‍্যাসিভ কার্ডিয়াক এ‍্যারেস্ট। আর দ্বিতীয় ঘটনাটি হল দোকানের আর সব জিনিস অক্ষত থাকলেও ওই ম‍্যানিকুইনটাকে কিন্তু কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় নি।

The following two tabs change content below.
Avatar

Shyamaprasad Sarkar

Avatar

Latest posts by Shyamaprasad Sarkar (see all)

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: