করোনা যুদ্ধঃ সম্মুখ সমরে কলকাতা পুলিশ

শতরূপা বোস রায়

“সবে মিলি করি কাজ”- করোনার বিরুদ্ধে যারা একেবারে সম্মুখ সমরে যারা, তাদের মধ্যে অন্যতম অবশ্যই পুলিশ প্রশাসন। দিন রাত এক করে যারা মানুষের সেবায় নিয়োজিত, যারা দিনের পর দিন এক অদৃশ্য বিপদের পরোয়া না করে তাদের কর্তব্য পালন করে চলেছে নির্ভীক মনে, তাদের সাধুবাদ জানানোর পথ একটাই। তাদের কথা শুনে চলা এবং তাদের তৈরি করা নিয়মাবলীতেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা। এই নিয়মগুলি মানলে করোনা মোকাবিলায় “আমরা করব জয়, নিশ্চয়”। আর তাই “সময়” আপনাদের কাছে নিয়ে এল করোনা যুদ্ধের নিয়ামক, কলকাতা পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মার এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ—

১। কলকাতা পুলিশ নানা প্রকারে সমাজের পাশে এই দু:সময় এসে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের এরকম কাজের নজির আগে আমাদের শহরবাসী হয়তবা দেখেনি। সমাজের পাশে এই ভাবে থাকার জন্য নগরবাসী আপনাদের কাছে ঋণী। টুকরো টুকরো ভাবে এই সমস্ত কাজের ছবি আমরা প্রায়ই সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখতে পাই। সমাজের পাশে থাকার এই বহুমুখী প্রচেষ্টার কথা বিস্তারিত ভাবে যদি আমাদের, বিশেষ করে প্রবাসীদের একটু জানান? 

প্রথমেই আমরা কলকাতাবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ যে সকলে আমাদের সঙ্গে থেকে এই কোভিড ১৯ এর মোকাবিলা করছেন। আমরা সকল স্তর সব কোয়াটার্স থেকে সাহায্য পেয়েছি। একটাই আবেদন সকলের কাছে আমাদের সাহায্য করুন এবং সরকারের নিৰ্দেশ মেনে চলুন। বাড়িতে থাকুন, সুস্থ থাকুন। এটা বলা বাহুল্য যে বাড়িতে থাকলে অনেকটা সময় ইন্টারনেট সার্ফ করে কেটে যায়। কিন্তু সঠিক খবর সংগ্রহ করুন। ফেক নিউজ থেকে বিরত থাকুন। ভুল বশত কোন ফেক নিউজ নিয়ে অযথা ভয় পাবেন না বা প্যানিক সৃষ্টি করবেন না. আপনার দেওয়া সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা পোস্ট জনগণের শান্তি ভঙ্গ করতে পারে এই দুর্দিনে। খুব বুঝে, চিন্তা ভাবনা করে সঠিক তথ্য সংগ্রহ হলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করুন, নচেৎ নয়। 

মানুষ যাতে বাড়ির বাইরে বেরোতে না পারে তার জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কলকাতা পুলিশের তরফ থেকে বিশেষ করে যখন বাজার খোলা তখন মানুষ যে রাস্তায় বেরোবে এ কথা বলা বাহুল্য। আমরা এর ব্যবস্থা নিয়েছি। পাড়ায় পাড়ায় কলকাতা পুলিশ মাইক নিয়ে সতর্কতা বার্তা প্রচার করছে। আপনারা নিশ্চয় ভিডিও দেখেছেন যেখানে আমাদের কিছু কলিগ গান গেয়ে তাদের মেসেজ পৌঁছে দিয়েছে পাড়ায় পাড়ায়। কলকাতা পুলিশ পাশে আছি সর্বক্ষণ এরকম একটা ফিলিংস যেন সবার হয়। সবাইকে আশ্বাস দেওয়ার জন্যই এরকম কাজ করা।

২। কলকাতার মানুষকে করোনা সম্পর্কে এবং লক ডাউন সম্পর্কে সচেতন করতে কলকাতা পুলিশের সতর্কবার্তা কি ? 

বাড়িতে থাকুন, সুস্থ থাকার চেষ্টা করুন আর ফেক নিউজ প্রচার থেকে বিরত থাকুন। নিজের বিচার বুদ্ধি দিয়ে বিচার করুন কোনটা ফেক কোনটা রিয়্যাল। এবং রেসপনসিবল আচরণ করুন।  বাড়িতে থাকুন যতটা সম্ভব। 

৩।  অনেক জায়গায় লক ডাউন সত্ত্বেও ভিড় হচ্ছে রাস্তায়। একটি উদাহরণ হলো বাজার। সেখানে ১.৫ মিটারের দূরত্ব রাখার জন্য পুলিশি ব্যবস্থ্যা কি নেওয়া হচ্ছে? যাঁরা শুনছেন না তাদের জন্য নজির হিসেবে কি শাস্তি দেওয়া হচ্ছে? ইউরোপে বাজারে একজনের বেশি যাওয়ার পারমিশন নেই. কলকাতায় কি এরকম কিছু চালু করা যেতে পারে? যদিও কলকাতার জনসংখ্যার সঙ্গে ইউরোপের জন সংখ্যার কোনো তুলনা হয়না। 

আমরা বাজারগুলো ঘুরে ঘুরে টহল দিচ্ছি, যাতে ১.৫ মিটার ডিস্টেনসিং মেন্টেন করে সবাই সেই দিকেও নজর দিচ্ছি। প্রচুর এলাকায় বাজার তার নির্ধারিত স্থান থেকে সরিয়ে দূরে দূরে স্প্রেড করা হয়েছে। তাতে এক জায়গায় বেশি মানুষ ভীড় করছে না. প্রতিনিয়ত কনটেন্ট শেয়ার করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায় যাতে তা সাধারণ মানুষ অবধি পৌঁছয় এবং মানুষ যাতে আরো সতর্কতা বজায় রাখে। বাজারে একজন যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। এবং যতটা সম্ভব কম যাওয়া আরও বেশি জরুরি। 

কলকাতায় লক ডাউন সাকসেসফুল কিনা সেটা মানুষ বিচার করবে, করোনা ডেথ রেট বিচার করবে। তবে আমরা আমাদের তরফ থেকে সতর্ক। আমরা রাস্তায় মানুষজনকে দেখলেই এরেস্ট করছি। গাড়ি নিয়ে অদরকারে বেরোলে সেই গাড়ি সিজও করে নেওয়া হচ্ছে । আমরা জরিমানাও করেছি। এখনো অবধি আমরা ১২৭০ টা কেস রেজিস্টার করেছি আন্ডার ১৮৮ আই পি সি  আর ৫১০১ জনকে এরেস্ট করেছি। তা ছাড়াও গত ২৩সে মার্চ থেকে ৬৯১৬ জনকে এরেস্ট করা হয়েছে আন্ডার পেটি কেসেস। আমরা থেমে থাকবো না. দরকার হলে মানুষ কথা না শুনলে এইভাবেই এরেস্টেড হবেন। 

৪। সমস্ত পুলিশ বাহিনী নিজেদের কথা ভুলে গিয়ে সমাজের কল্যানে পথে নেমেছেন। যে সব জায়গায় সংক্রামিত হবার সম্ভাবনা বেশি সেখানেই কলকাতা পুলিশ নিজেদের আগে এগিয়ে রেখেছেন । এর জন্য পুলিশ বাহিনী নিজেরা কতটা রোগ মুক্ত থাকতে পারবে বলে মনে হয় আপনার? আপনার টিম ও আপনি নিজে তো সব থেকে বেশি প্রোন। 

এখনো অবধি ৩০০০ পুলিশ পার্সোনেল প্রত্যেক শিফটে কাজ করছেন হেড কোয়াটার্স থেকে। ১৪০ স্পেশাল মোবাইল ভ্যান যেমন পি. সি. আর. ভি, এইচ. এবং  এফ এস, পেট্রোলিং জন্য রয়েছে। তাছাড়া লোকাল থানা, ট্রাফিক গার্ড এরা তো রয়েছেনই । লোকাল লেভেলে, লোকাল জুরিসডিকশন লেভেলেও পুলিশ নিযুক্ত করা হয়েছে।   

সবাইকে প্রটেকটিভ মাস্ক দেওয়া হয়েছে। হ্যান্ড স্যানিটাইজারও দেওয়া হয়েছে। পুলিশের ভ্যান প্রতিদিন স্যানিটাইজ করা হচ্ছে। পুলিশ হাউসিং কোয়াটার্সে এসেনশিয়াল সামগ্রীর হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। যদি কেউ কোনোরকম ফ্লু সিম্পটমস নিয়ে রিপোর্ট করছে সঙ্গে সঙ্গে তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হচ্ছে। 

৫। প্রণাম যেমন ৬০ উর্দ্ধ মানুষের জন্য, এই সময় প্রণাম কার্ড যাদের আছে তাদের কি কোনও বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে? যেমন বাজার করে দেওয়া, ওষুধ এনে দেওয়া ইত্যাদি? 

অনেকের জন্যই লোকাল থানা থেকে এর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কাজ এখনো চলছে। প্রণামের অন্তর্ভুক্ত এখনো অবধি ১৭০০০ এরও বেশি বেশি মানুষ। তাদের প্রতিনিয়ত ওষুধ পৌঁছনো দরকারি দ্রব্য পৌঁছনো এই জন্য কলকাতা পুলিশ আগেও তৎপর ছিল এখনও রয়েছে।  সকলকে আবারও একই কথা বলার। বাড়িতে থাকুন এবং সরকারি নির্দেশ মেনে চলুন। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি.

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: