আগন্তুক স্পুফ : করোনা এপিসোড

সুদীপ্ত নাগ

যবে থেকে লকডাউন হয়েছে বিভিন্ন মজার স্পুফ তৈরি হওয়া শুরু হয়েছে । এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে চা কাকুর স্পুফ । ‘আমরা কি চা খাবনা ‘ ? এখন এই ডায়লগ লোকের মুখে মুখে ঘুরছে । এছাড়া বিখ্যাত উত্তম কুমারের একটি দৃশ্য নিয়ে অনেকদিন আগে একটা নটরিয়াস স্পুফ তৈরি হয়েছিল । সেই দৃশ্য আবার লকডাউন স্পুফের মাধ্যমে ফিরে এসেছে । এখন কথাটা হচ্ছে উত্তমের স্পুফ জনপ্রিয় হবে এতে আর সন্দেহ কি ?

কিন্তু চা কাকুর স্পুফ জনপ্রিয় হবার একটা বিশেষ কারণ হল লক ডাউনের ঠিক প্রথম দিনেই এই স্পুফ ছাড়া হয় এবং নিশ্চয়ই ডিস্ট্রিবিউটও হয়ে সেই ভাবে , তাই কন্টেন্টে তেমন কিছু উপাদান না থাকা সত্ত্বেও চা কাকু সবার ফেভারিট হয়ে ওঠেন । এই জনপ্রিয়তা কে কাজে লাগিয়ে চা কাকু দিব্যি সৌরভের বাগানেও ঢুকে পড়লেন কাজ নিয়ে ।

যাই হোক , কথাটা হচ্ছে লক ডাউন এবং করনা নিয়ে মিমস বা স্পুফ তো হামেশাই হচ্ছে কিন্তু কটা কাজ দেখে হাস্যরসের মাপকাঠি নির্ধারন করা যায় ? মানে পাতি কথায় কোয়ালিটি প্রডাক্ট কটা ? আসল কথা এইসব হালকা জিনিসে আবার কোয়ালিটি কি ? এসব তো কিছু লঘু বিনোদনের উদ্দেশ্য বানানো জিনিসপত্র । একটা কিছু চমকদার করে ছেড়ে দিলেই হল , তাই না ? না না , ভুল ভাবছেন হয়ত ।

একটা জনপ্রিয় দৃশ্যে ডাবিং করে মেলানো , অ্যাপ্ট ডায়লগ বসানো যথেষ্ট পরিশ্রম এবং বুদ্ধির কাজ । সব স্পুফই সাকুলেশান আর শেয়ারের মাধ্যমেই শুধু জনপ্রিয় হয়না , অনেক স্পুফ তার কোয়ালিটির জন্যও সমাদর পায় । স্টার আনন্দে যেমন হীরক রাজার দরবার অনুষ্ঠানটি বেশ সাফল্য পেয়েছে রসবোধ সম্পন্ন প্রেসেন্টেশানের জন্য ।

আনন্দ বড় প্রতিষ্ঠান কিন্তু কিছু ইন্ডিভিজুয়াল মানুষ বা ছোট ছোট গ্রুপও ভাল কাজ করছে । দুখের বিষয় আমরা এইসব গ্রুপ বা মানুষের নাম খুব একটা জানিনা । আমরা শুধু তাদের কাজ গুলির সাথেই পরিচিত । আফটার অল বাঙালীদের আবার ট্র্যাশ কালচার কী ? বাঙালীদের কালচার মানেই শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ , সত্যজিৎ রায় , ঋত্বিক ঘটক , বঙ্কিমচন্দ্রর মত রাশভারী জিনিসপত্র দিয়ে ।

তারা নামতে নামতে অঞ্জন দত্ত অবধি যেতে রাজি হয় , ঢুকে পরে সৃজিতের ড্রয়িংরুমে কিন্তু কিউ দের মত ডিরেক্টারদের অবাঞ্ছিতই করে রেখে দেয় , নবারুণের মত আধুনিক লেখককে  গ্রহণ করবার আগে আরেকটু জীবনানন্দ ঝালিয়ে নেয় । স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি করা আমরা শুরু করি কাউন্টার কালচার পারসপেকটিভ থেকে ।

বলা বাহুল্য , আমি পুরোনপন্থী না হওয়ার কারণে অনেক সমালোচনা এবং বিতর্কের শিকার হয়েছি বারবার । আর অনেকের মতই প্রচার এবং প্ল্যাটফর্মের অভাবে আমরাও কোথায় লুকিয়ে আছি কেউ জানেনা । এইসব নিয়ে ফালতু দুঃখ করার জন্য আজ লিখতে আসিনি । কারণ বরাবরের মতই জনপ্রিয়তার চেয়েও বেশি আমরা কেমন কাজ করছি আর নিজেদের কতটা ভাঙছি এইটাই আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে এসেছে ।

সিনেমার মত স্পুফেরও যে একটা আলাদা মজা আছে , একটা আলাদা রসবোধের আবেদন আছে তা আমার বরাবর মনে হয়েছে । শর্ট ফিল্ম বানাই বলে স্পুফ বানিয়ে নিজেদের খাটো করব এরম মানসিকতা আমার নয় । বরং স্পুফ বানানো চ্যালেঞ্জিং এবং সেটা করার ইচ্ছে বরাবরই আমার ছিল কারণ স্পুফের যে একটা নির্ভ্যাজাল আনান্দ আছে সেটা আমি স্বীকার করি একশবার ।

তাই এবারে লকডাউনের মধ্যে শুধু পায়ের ওপর পা তুলে বসে না থেকে আমরা আগন্তুকের ওপর একটা স্পুফ ট্রাই করলাম । এবারে মামা আসছেন চায়না থেকে । একটা অদ্ভুত টেনশানের মধ্যে মামাকে ভাগ্নিরা পাচ্ছেন । সত্যজিৎ রায় কে নিয়ে মজা করছি এতে লোকজন জানি ঢিল টিল ছুঁড়বে । আর তাতেই আসল মজা । আমি যতই মজা করি না কেন আমি কিন্তু এই সিনেমা চুজ করছি কারণ এটা আমার গুলে খাওয়া ।

এখানে এই যে একটা মজার লাভ হেট ব্যাপার লুকিয়ে আছে এটা সবচেয়ে ভাল বোঝা যায় গোদারের সিনেমা দেখে কারণ তিনি হলিউড বিদ্বেষী আবার হলিউড নিয়েই তিনি অবসেসড । আমাদের এই ছোট্ট স্পুফটা আশা করি সবার ভাল লাগবে । স্পুফের গুণগত মান করনা ইস্যু নিয়ে খুব একটা বেশি চোখে পড়লনা তাই এই প্রচেষ্টা । সব শেষে বলি যতই রাগ উঠুক পুত্র পিতার গল্প নিয়ে যে লেভেলের ট্র্যাশ বানান সেই তুলনায় আমাদের এই ছ্যাবলামো বোধহয় সত্যিই মাফ করার যোগ্য । স্পুফের মজা সকলে নিন আর ভাল লাগলে অবশ্যই শেয়ার করুন ।

স্পুফের সার্থকতা কিন্তু স্রষ্টার মাধ্যমে হয়না বরং দর্শকের উৎসাহেই হয় । তাই এইটুকু অনুরোধ রইল । লকডাউন আর করনার আতঙ্কের মধ্যে আপনাদের একটু মন খুলে হাসানোর উদ্দেশ্যেই আমাদের এই প্রচেষ্টা কারণ সতর্কতার সাথে সাথে মেন্টাল হেলথ ভাল রাখাটাও এখন খুব প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে । সবাই দেখে ফেলুন এবং নিঃসংকোচে খিস্তি মারুন বা প্রশংসা করুন । ভাল বলুন বা খারাপ এই যে বলবার প্রয়োজনটুকু ফিল করেন এখানেই পিওর ট্র্যাশের সার্থকতা ।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: