Home » বিনোদন » থাপ্পড় :পুরুষতন্ত্রের গালে নাকি উগ্র নারীবাদের সমর্থনে ?

থাপ্পড় :পুরুষতন্ত্রের গালে নাকি উগ্র নারীবাদের সমর্থনে ?

সুদীপ্ত নাগ

আমাকে সময় ডট ইন থেকে বিশেষ অনুরোধ করা হয় এই ছবিটির রিভিউ করার জন্য । তাই চলে গেলাম কাছের পিভি আর এ । ঝাঁ চকচকে সিনেমা হল আজ বেশ ফাঁকা । সিনেমার সাথে খাবার বিক্রি করার এমন একটা ব্যবসা শুরু হয়েছে যে সিনেমা দেখতে এসছি না খেতে এসছি সেটাই বুঝতে টাইম লেগে যায় । মাল্টিপ্লেক্স মানেই একটা অন্য এক্সপিরিয়েন্স যেটা আজকালকার সিনেমার ক্ষেত্রেও খাটে ।

বিশেষ কিছু বিষয়কে কেন্দ্র করে সিনেমা তৈরি করার একটা অদ্ভুত প্রবণতা হয়েছে । এমনই কিছু সেনসিটিভ বিষয় যেগুলো মানুষের সাম্প্রতিক জীবনের সাথে খুব বেশি যুক্ত  আর তাই মানুষ অজান্তেই খায় । ‘ফেমিনিজম’ নিয়ে সিনেমাও তার মধ্যে একটা । কিছু দিন আগেই ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা ‘ হল । আমার এইসব ছবি থেকে একটু সমস্যা হয় কারণ ফেমিনিজিমের মূল বক্তব্য থেকে অধিকাংশ বলিউডি ছবিই বেশ দূরে ।

এবার শুনলাম অনেকের মুখে ‘থাপ্পড়’ র কথা । তাই ভাবলাম দেখে আসি এই ছবিতে একটু আলাদা কিছু পাওয়া যায় কিনা । বিশেষ করে ‘ তুম বিন’ র মত রোম্যান্টিক ছবি যে ডিরেক্টার বানিয়েছে তার কাছ থেকে কি অন্য রকম কিছু পাব আমরা ? এবারে সোজা সিনেমা তে ঢুকে যাই । একটি বিবাহিত হাউজ ওয়াইফ আর একজন কর্পোরেট গাইয়ের গল্প ।

একটা পার্টিতে অফিসের কিছু  ব্যাপারের জন্য মাথা গরম করে টানাটানির সময় বউকে চড় কষিয়ে ফেলেন বর । এবার এই চড়টা একটা ঘটনা যেটা বউটার কাছে একটা ‘bolt of lightning’ হয়ে তার চিন্তা ভাবনার বিকাশ ঘটায় । একটা বিবাহিত জীবনে সে একটা হেল্পিং হ্যান্ড ছাড়া কিছুই নয় তার স্বামীর কাছে । এই গল্পের সাথে আমরা প্রচুর সাব প্লটস পাই যেগুলোর বিষয়ও সেই নারীর অধিকার নিয়েই । উঁচু থেকে নিচু সব শ্রেণীর লোকেদেরই পরিচালক সাব প্লটে রেখেছেন ।

আমার কথা হল আমি একটা গুরুত্বপূর্ন বিষয়ে নিয়ে সিনেমা করছি মানে কি আমার গোটা সিনেমাতে একই জিনিস চলতে থাকবে ? মানে এটা কি খুব সরাসরি বলে দেওয়া নয় যে নারীর অধিকার নিয়েই সিনেমা আর তার সব চরিত্র , সব ঘটনা , সব ডায়লগ সেটা নিয়েই এগবে !  হাউজ ওয়াইফের চরিত্রে তাপসী পান্নু বেশ সাবলীল । বাকি অভিনেতাদের অভিনয়ও খুব খারাপ নয় । কম আলোতে ইন্টিরিয়ার শ্যুট করার আইডিয়াটা বেশ ন্যাচেরাল লাগল যা অনেক বলিউড ছবিই করেনা কিন্তু ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল বা অন্য টেকনিকাল বিষয় গুলিতে তেমন কিছু অভিনবত্ব চোখে পড়লনা ।

সিনেমার শেষে কোন কনভেনশানাল হ্যাপি এন্ডিং নেই । এইসব সত্ত্বেও অনেক বিষয়ে প্রশ্ন থেকে গেল । নায়িকা নায়ককে একটা দৃশ্যে বলেন – আমি চাকরী করলে কি তুমি রান্না করতে ? আচ্ছা এটা মানা গেল একটা ভাল পয়েন্ট কিন্তু ‘কি অ্যান্ড কা’ সিনেমার অর্জুন কাপূরের মত কজন ছেলে বাস্তবে এটা করবে ? আসল কথাটা কিন্তু কে রান্না করছে সেটা নিয়েই নয় । মেসে এরকম অনেক ছেলেই পাবেন যারা দারুণ রান্না জানে কিন্তু তারা কি রান্না বা বাড়ির কাজ করে জীবন কাটাতে রাজী হবে যদি তার বউ ব্রেড আর্নার হয় ?

দেখুন , একজন হাউজ ওয়াইফ হয়ে আমাদের দেশে অনেকেই জীবন কাটায় কিন্তু ছেলেরা সেটা করলে কজন মেয়ে রাজী হবে তাকে বাস্তবে বিয়ে করতে আর সোসাইটি বা মানবে সেটা  ? একজন ছেলেকে ছোট থেকে শেখান হয় তুই রোজগার কর এটাই একমাত্র উপায় ।  ছেলেরা বউয়ের পয়সায় খেতে অস্বস্তি ফিল করবেই (লোয়ার ক্লাস বাদে )  কিন্তু সেটা আজকের যুগে মেয়েরা কেন করেনা ? রান্না জিনিসটা তো ভাগ করেও করা যায় তাইনা ? যতদিন মেয়েরা সাহসী হবেনা ততদিন কিভাবে ইকুয়ালিটি আসবে মশাই ?

দেখুননা কর্পোরেট সেকটারে কত মহিলা জব করছেন কিন্তু তাদেরও সিকিউরিটি (ফাইনানশিয়াল বা ফিজিকাল ) দরকার হয় । আরে ভাই সিকিউরিটি দরকার তো সিকিউরিটি গার্ডকে বিয়ে করুন , আপনি জীবন সঙ্গী কেন বলছেন ? একটা ভালবাসার সম্পর্কে কি প্রাথমিক ইমোশানাল অ্যাটাচমেন্টটা সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট নয় ? আপনার আত্মসম্মান থাকলে আপনি হাউজ ওয়াইফ না হয়ে আপনি তো নিজের ড্রিম ফুল ফিল করতেও বেরিয়ে পড়তে পারেন । এই সিনেমার নায়িকার মত আপনি অন্যের স্বপ্নের ভাগীদার শুধু কেন হবেন ? নিজের স্বপ্ন কেও একটু চান্স দিয়ে দেখুন ?

অন্যদিকে একটা ছেলের কাছে তার পার্টনার কি শুধুই একটা পণ্যদ্রব্য ? তার ইগোর জন্যই কি তিনি পার্টনার কে লাইফে চান ? এইসব পুরুষ আছেন সমাজে সেটা একবারও ভুল নয় কিন্তু এছাড়া নায়িকার বাবার মত উদার মনেরও মানুষ আছেন । আমার যেটা মনে হয়েছে যে সিনেমাটা উগ্রনারীবাদের দিকে গেছে বেশ কিছুটা কারণ এই সিনেমাতে অধিকাংশ নারীই ভিক্টিম আর পুরুষদের সমস্যা গুলো তুলে ধরা হয়নি ।

আচ্ছা যে লোকটা বউ চাকরী করেনা তাই একটা লাইফস্টাইল মেনটেন করতে কর্পোরেট লাইফের শিকার হচ্ছেন তিনিও তো আধুনিক টেকনো সোসাইটির একজন ভিক্টিম । কারণ সারাদিন ওই অফিস আর অফিসের প্রলোভন ছাড়া তার লাইফে আর আছেটাই বা কি ? তার অবশ্যই দোষ আছে আর সে কথাটা একবারও অস্বীকার করছিনা ।

সিনেমার শেষে কিন্তু মনে হয়েছে অনেকটাই জেদের বশে নায়িকা বিচ্ছেদ চাইছেন কারণ তার হাজব্যান্ড ক্ষমা চাইলে তিনি কিন্তু ইমোশানাল হয়েছিলেন আর তার দিক থেকে এটা স্পষ্ট যে তিনি বিচ্ছেদ চাইলেও স্বামীর ফ্যামিলির সাথে যোগাযোগ রাখবেন । আমার প্রশ্ন হল কেন ? আপনি এতটা অপমানিত ফিল করেছেন কেন আপনি নতুন ভাবে জীবন শুরু করছেননা ?

আপনি তো মুক্ত মনের কোন পুরুষ খুঁজেও বাচ্চাকে সঠিক ভাবে মানুষ করতে পারেন । কালকে আপনার বাচ্চাও যদি তার বাবার ছায়ায় একটা মেশিন হয়ে উঠতে চায় ? তার মানে কি ইমোশানাল কানেকশান আছে এখন ? আর তাই আপনি জেদের বশে বিচ্ছেদ চাইছেন ? নায়কের আমূল পরিবর্তন আর দুম করে চাকরী ছেড়ে দেওয়াটাও একটু বেশিই মেলোড্রামাটিক নয় কী ? 

সিনেমায় কেন শুধু পুরুষদেরই বেশি দোষী দেখান হয়েছে (এক দুটো চরিত্র ছাড়া ) । একটাও তো এমন পুরুষ  চরিত্র নেই যার ভুল দেখান হয়নি । এমনকি এত লিবারাল একজন বাবাও তার স্ত্রীকে গানের কেরিয়ারে এগোতে উৎসাহ দেয়নি । এগুলো কি একটু বেশি একপেশে নয় ?  এমন নারী চরিত্রই বা নেই কেন যে এই প্যাট্রিয়ারকাল সোসাইটিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভরপুর জীবনের আনন্দ উপভোগ করছে ।

গোটা সিনেমাতে সব ক্যারেক্টারই যেন কেমন একটা ধুঁকে ধুঁকে আছে । এটাই কি আমাদের বাস্তব ? আচ্ছা বিয়ে বা সংসার বা চাকরী ছাড়া কি আর লাইফে কিছু নেই ? এইসব দিক কেন এই সিনেমায় উঠে এলনা ? পরিচালক তার সিনেমাতে একটা প্রপাগণ্ডা তৈরি করতে খুব বেশি তৎপর বলেই কি ?

হতেই পারে এই সিনেমা অনেক নারীকে সচেতন করবে বা তাদের চোখ খুলে দেবে কিন্তু তবু বলব যে লার্জার দ্যান লাইফ কনসেপ্টে এখনও যদি কিছু মানুষ বিশ্বাস রাখেন তবে তাদের জন্য এই সিনেমা নয় । সিনেমার কাজ তো শুধু বার্তা দেওয়া নয় , সিনেমা তো দর্পন । যদি গল্পের শেষে কোন কনক্লিউশানই না রেখে একটা ওপেন এন্ডিং রাখা হত তাহলে হয়ত আমরা নিজেদের মত বাকিটা ভেবে নিতাম । আফটার অল একই পরিস্থিতিতে থেকেও অনেকের গল্প গুলোই কিন্তু সামান্য আলাদা হয় । আর এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই জীবনের সার্থকতা নয় কি ?

আপনার মতামত:-