সত্যজিৎ রায় : সৃষ্টিতে স্রষ্টার প্রতিচ্ছবি

সুদীপ্ত নাগ

ছ’ফুট চার ইঞ্চি লম্বা , অমনি একটা জাঁদরেল বারিটোন ভয়েস , যার সামনে অনায়াসে বড় বড় ব্যক্তিত্ব ম্লান হয়ে যায়, আজকে সেই মানুষটা কিভাবে তাঁর নিজের সৃষ্টির মধ্যেই বারবার ঢুকে পড়েছেন তাই নিয়ে একটু ভাবছি । সত্যজিৎ রায় যতই ইউনিক একজন ব্যক্তিত্ব হন না কেন তাঁর নানা রকম ছায়া দেখতে পাই আমরা তাঁর কাজে ।

প্রথমত চলে আসি একটা সবার খুব প্রিয় ক্যারেক্টারে । ফেলু মিত্তির বা প্রদোষ মিত্রর নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই ? কখন কি খুব ভাল করে স্কেচ গুলো লক্ষ্য করেছেন ফেলুদার ? যতই আমরা ফেলুদা-র পাশে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কে বসানোর চেষ্টা করি না কেন , ওই স্মার্ট , বুদ্ধিদীপ্ত , জ্ঞানী মানুষটার সাথে সহজেই সত্যজিৎ রায়ের আদলের মিল মনে হয় অনেকটাই । ফেলুদা গোয়েন্দাগিরি ছাড়া কিছুই করেনা কিন্তু তবু ফেলুদার এমন একটা ওয়েট আছে যে ফেলুদাকে সামনে পেলে লোকজন একটু নড়েচড়ে বসে । ফেলুদার কথায় কথায় চারমিনার ধরানো বা সূক্ষ্ম রসবোধ সবই মিলে যেতে পারে অল্প বয়সের মাণিকদার সাথে ।

রায়বাবুর  যেমন একজন লিভিং অ্যান্ড ব্রিদিং একজন এনসাইক্লোপিডিয়া ছিলেন নীরদ সি চৌধুরী (যার কাছে পাশ্চাত্য সঙ্গীত  নিয়ে চর্চা করতে যেতেন তিনি ) , তেমনি ফেলুদার ক্ষেত্রে আমরা সিধু জ্যাঠাকে পেয়েছি ।

ফেলুদা নিয়ে আলোচনা হল, এবার একটু শঙ্কুতে চলে আসি । ভাবছেন হয়ত যে প্রফেসার শঙ্কুর সাথে সত্যজিৎ রায়ের আবার মিলটা কোথায় ?  শঙ্কু তো একজন বৈজ্ঞানিক ছিলেন ! মজাটা হল সত্যজিৎ রায়ের সাথে আমি শঙ্কুর মিলটা ফেলুদার চেয়েও বেশি দেখি ।

প্রথমেই দেখুন শঙ্কুর ল্যাবরেটরি হল গিরিডিতে আর মনে করে দেখুন সত্যজিৎ রায়ের ছোটবেলাও কেটেছে গিরিডিতে । শঙ্কুর মতই খুব অল্প বয়সে জ্ঞানী হয়ে উঠেছিলেন তিনি । তারপর শঙ্কুর মতই ভারতে বসে অসাধ্য সাধন করেছেন তিনি । শঙ্কুর আবিষ্কার যেমন শঙ্কুকে একটা গ্লোবাল ফিগার বানিয়ে দিয়েছে তেমনিই সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা তাকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্ব সিনেমার সবচেয়ে বড় মহলগুলিতে । শঙ্কুর স্যান্ডার্সের মতই বন্ধু হিসাবে পেয়েছেন কুরশাওয়াদের মত মানুষদের যারা তাকে আরও  সুযোগ করে দিয়েছেন বড় বড় জায়গায় নিঃস্বার্থ ভাবে ।

যারা মাণিকদাকে কাছ থেকে চিনেছিলেন তারা জানতেন যে অত গুরুগম্ভীর ব্যক্তিটি নিজেকে নিয়ে গর্বিত হলেও অহংকারী ছিলেননা । বড়সড় গ্যাদারিং থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করতেন লাজুক মানুষটা । তেমনি শঙ্কুও আপনমনে গিরিডিতে নিজের কাজ করে গেছেন আর খুব আবদার ছাড়া বেশি হইচই তাঁরও অপছন্দ ছিল । শঙ্কুর চিঠি লেখার অভ্যাসের মতই সত্যজিৎ রায়ও চিঠি লিখতে খুব ভালবাসতেন । তাঁর পত্রবন্ধুও ছিল অনেকে । শঙ্কু যেমন পেটেন্ট বিদেশে বিক্রিতে আগ্রহী ছিলেননা তেমনই তিনিও ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ ছাড়া কোন সিনেমা করার কথা ভাবেননি বিদেশে গিয়ে কোলাবোরেশান করে ।

এবার চলে আসি একটু সত্যজিৎ রায়ের সিনেমাতে । ‘নায়ক’ সিনেমাতে উত্তম কুমার কে নিশ্চয়ই সবার মনে পড়ে আপনাদের ? এই নায়কের গ্ল্যামারাস চরিত্রটা যেমন উত্তম কুমারের সাথে খুব বেশি ভাবে রিলেট করা যায় তেমনি সত্যজিৎ রায়ের ক্ষেত্রেও । নায়কের বীরেশ চরিত্রটি যেমন একজন শ্রমিক ইউনিয়নের লিডার তিনি ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে লড়াই করছেন তেমনি বাংলা সিনেমার জগতে ওয়ার্কিং ক্লাস হিরো হিসাবে চিরজীবন সিনেমা নিয়ে লড়ে গেছেন মৃণাল সেন

সত্যজিৎ যখন তাঁর নিজের গাড়ির ভেতর মাস্টারপিস বানাতে ব্যাস্ত তখন হয়ত গাড়ির দরজাটা মৃণাল খুলে বলেছেন – এস, সবাই তোমার জন্য ওয়েট করছে । তখন হয়ত সত্যজিৎ অসহায়ের মত বলেছেন যে এভাবে তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বরং অন্য কোন ভাবে সম্ভব হলে তিনি করবেন । সোজা কথায় হীরক রাজার মত পলিটিকাল ছবি করলেও সত্যজিৎ কখন ডিরেক্ট ছবি করেননি পলিটিক্স নিয়ে ।

নায়কের মতই হয়ত একটা সময় এসেছে যখন নিজের খ্যাতি এবং এক্সপেকটেশানের বিড়ম্বনায় নিজের কাজ নিয়ে একটু আধটু ফ্রাস্ট্রেশানে ভুগেছেন । ছবি বিশ্বাসের মত প্রবীণ অভিনেতাদের সাথে কাজ করতে গিয়ে মত মেলেনি তাঁর । তেমনি নায়ক ছবির অরিন্দমেরও অসুবিধা হয়েছে মুকুন্দ লাহিড়ীকে নিয়ে । কিন্তু অরিন্দম তখনই জানতেন যে মুকুন্দ লাহিড়ীর অভিনয় শৈলী আজকের দিনে অচল । আর রায়বাবুও জানতেন কানু ব্যানার্জী বা ছবি বিশ্বাসের মেকআপ নিয়ে মাতামাতি কখনই রিয়ালিস্টিক ছবিতে চলবেনা আর ।

তাই অরিন্দমের মতই ইন্ডাস্ট্রির লোকেদের তোয়াক্কা না করে টেবিল ঠুকে  ‘ I will go to the top…to the top …to the top’  বলার মত আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়ে গেছিল তাঁর । সত্যজিৎ রায়ের নিজের ছায়া সব থেকে বেশি এসে পড়েছে তাঁর একদম শেষে বানানো দুটো ছবিতে । মনে রাখা দরকার  ‘শাখা প্রশাখা’ বানানোর আগেই হার্ট অ্যাটাক হয় তাঁর । এই সিনেমাতে ফ্যামিলির হেড,  যিনি সিনেমার প্রটাগোনিস্ট তাঁরও হার্ট অ্যাটাক দেখান এবং অ্যাটাকের পরে একটি  বৃদ্ধ মানুষের  দুর্বল মানসিকতায় নিজের ফ্যামিলির মধ্যে থেকে সামাজিক অধঃপতন খুঁজে বের করে মর্মাহত হওয়া আমরা যেন সত্যজিৎ রায়ের পয়েন্ট অব ভিউ থেকেই দেখি ।

শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করার সাথে সাথে দূরদর্শী মানুষটা ছিলেন আদর্শবাদের প্রতিমূর্তি । শুধু একজন পরিচালক নন , সম্ভ্রান্ত পরিবারের সত্যজিৎ রায়ের ভাল মানুষ হিসাবেও একটা সুনাম ছিল । তাই বৃদ্ধ বয়সে এসে তিনি নেক্সট জেনারেশান নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন । সৎ পথে সারা জীবন শিল্পের জন্য সংগ্রাম করে মানুষটা সমাজ সচেতন ছবি বানিয়ে গেছেন –  জন অরণ্য , অরণ্যের দিনরাত্রি বা মহানগরের মত । শেষ জীবনে এসে কালোবাজারী আর স্বার্থান্বেষী ইউথ কালচার দেখে নিজের কষ্টটাই প্রকাশ করতে চেয়েছেন তাঁর আদর্শবাদী প্রটাগোনিস্টের মাধ্যমে ।

প্রসঙ্গত সত্যজিৎ এই ছবি করার আগেই ঠাকুর্দা হয়েছেন , তাই হয়ত এই ছবিতে বাচ্চা গুলির সাথে তাদের দাদুর এমন একটা  সুন্দর সম্পর্ক আমরা দেখতে পাই । ‘শাখা প্রশাখা’ র পর মিঃ রায় তাঁর শেষ ছবি আগন্তুক করে নাকি বলেছিলেন যে তাঁর যা বলার ছিল সব ফুরিয়ে গেছে । কি এমন ছিল এই সিনেমাটাতে ? আমার পার্সনালি মনে হয় শাখা প্রশাখা এবং আগন্তুক দুটো ছবির খুব বড় দুর্বলতা হল এই সিনেমা গুলো বড্ড বেশি পার্সনাল এবং যেন নিজেরই একটা অতৃপ্ত সত্তা উঠে এসেছে এই দুটো ফিল্মে ।

আগন্তুকে আমরা দেখতে পাই উৎপল দত্তকে যিনি একজন ভ্যাগাবণ্ড । অসাধারণ মেধাবী ছাত্রটি বাড়ি থেকে পালিয়ে বিদেশে বিদেশে ভ্রমণ করা শুরু করেন । আলতামিরা গুহায় আঁকা বাইসন দেখেই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলেন শিল্পী না হবার । সারাটা জীবন বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করেও তিনি আদিবাসীদের সাথে কাটিয়েছেন জীবন । কে সভ্য আর কে অসভ্য তার মর্মার্থ বুঝতে চেয়েছেন আদিবাসীদের সাথে মিশে ।

আচ্ছা কখন কি ভেবেছেন যে এই চরিত্রটা যদি সত্যজিৎ রায়েরই অল্টার ইগো হয় ? সারাটা জীবন সত্যজিৎ রায় সভ্য সমাজের জন্য সিনেমা বানিয়ে কাটিয়ে গেলেন একজন বিশাল ফিগার হয়ে কিন্তু হয়ত তাঁর মন পড়ে ছিল সেই জঙ্গলে । তোমার খুরে দণ্ডবৎ বাইসন ভায়া জেনেও কিছু সৃষ্টি করার আনান্দ থেকে বঞ্চিত থাকতে পারেননি সারাটা জীবন । বিবিসি অ্যাকসেন্টে  ইংলিশ বলে মার্জিত রুচির পোশাক এবং খাবার খেয়ে জীবন কাটালেও শঙ্কুদের নিয়ে গেছেন আদিম মানুষদের গুহাতে ।

হয়ত একটা সময় তাঁর ইচ্ছে ছিল ওরকমই একটা ঝোলা নিয়ে বেরিয়ে পরবেন কিন্তু সিনেমা , লেখালেখি , সংসার এইসব নিয়ে তা আর হয়ে ওঠেনি । আবার এটাও হতেই পারে যে বৃদ্ধ বয়সে এসে এই পরিশীলিত জীবনের নোংরামি দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে সবই মিথ্যা মনে হয়েছে তাঁর । তাই হিরোসিমা বা নাগাসাকির বোম বিস্ফোরণের মত নিষ্ঠুর সভ্য সমাজ থেকে বেরিয়ে এসে তাঁর আদিমতায় ফিরে যাবার শেষ ইচ্ছা হয়েছে ।

মনে রাখা দরকার যে এই সিনেমার প্রটাগনিস্ট যতই বিচ্ছিন্ন হননা কেন তিনি বয়স হবার কারণে আত্মীয়দের কাছে ফিরে এসে মানসিক ভাবে বেশ দুর্বল আর একরকম অভিমান করে চলে এসেই চুপচাপ শান্তিনিকেতনে বসে ছিলেন আদিবাসীদের কাছে । হয়ত ফাইন আর্ট নিয়ে পড়ার সময় সত্যজিৎও শান্তিনিকেতনে থাকার সময় এইসব আদিবাসীদের সংস্পর্শে এসেছিলেন আর কিছুটা উপলব্ধি সমাজ সম্বন্ধে তখনই তাঁর হয়েছিল ।

এই সভ্য অসভ্যের থিম কিন্তু একেবারে আগন্তুকে নয় অরণ্যের দিনরাত্রিতেও অনেকটাই উঠে এসেছিল । এত গল্পের মধ্যে সুনীল গাঙ্গুলির এই উপন্যাসটাই কেন বেছে নিয়েছিলেন তিনি ? যাই হোক সত্যজিৎ রায়ের কাজ নিয়ে অলরেডি প্রচুর লেখালেখি হয়েছে তাই আজকে ভাবলাম তাঁর কাজে তিনি কিভাবে মাঝেমাঝে এসে পড়েছেন সেটা নিয়েই বরং একটু বলা যাক ।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: