নজর থাকুক জনস্বাস্থ্যে

ডাঃ অনুপম ব্রহ্ম

এমনিতে অন্য সময় আমরা অন্যের গায়ের উপর কেশে দিই, রাস্তায় পিচিক করে থুতু ফেলি, আবাসনের কোনায় জল জমিয়ে রাখি, সিগারেট ফুঁকে ফুঁকে ফুসফুসদুটো ঝাঁঝরা করে দিই- কিন্তু আপাতত আমরা স্বাস্থ্য-সচেতন হয়েছি |

বাঁচতে চাইলে ঘরে থাকুন-এর পোস্ট শেয়ার করছি, করোনা ভাইরাস স্টিলের উপর কতক্ষণ বেঁচে থাকে আর এসি বন্ধ করলে মরে যায় এসব তথ্য দিচ্ছি, পাশের বাড়ির কেউ ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে থাকলেই বেলেঘাটা আইডি-তে পরীক্ষা করানোর জন্য মাতব্বরি করছি-কাদের পরীক্ষা করাতে হবে-না করাতে হবে সেসব না-জেনেই | করোনার কল্যাণে অন্ততপক্ষে জনস্বাস্থ্য জিনিসটা একটু পাতে পড়েছে |

সাবধানে থাকুন, সচেতন থাকুন – আমি তাতে কোনো আপত্তি জানাচ্ছি না, কিন্তু আমার বক্তব্যটা হল সচেতনতাটা যেন করোনাতে আটকে না যায় | এমনিতে জনস্বাস্থ্য বলতে আমরা বুঝি ক’টা হাসপাতাল হল আর আয়ুষ্মান ভারত বা স্বাস্থ্যসাথীর মত বিমা প্রকল্পের ফিরিস্তি, কিন্তু জনস্বাস্থ্য ব্যাপারটা আরো ছড়ানো | জনস্বাস্থ্য বলতে বোঝায় রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন এবং জীবনের মান বাড়ানো, একজনের নয়, গোটা সমাজের |

সঠিক দেশটা মনে নেই, তবে স্ক্যান্ডেনিভিয়ার কোনো এক দেশের কোনো এক স্বাস্থ্যমন্ত্রী একবার বলেছিলেন – আমরা সমস্ত মন্ত্রকগুলোকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সম্প্রসারিত রূপ বলে মনে করি | প্রতিটা মন্ত্রক ঠিকমতো উন্নয়নের কাজ করলেই জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন হবে | কথাটার গুরুত্ব এতদিনে বোঝা যাচ্ছে |

জনস্বাস্থ্য ঠিক রাখতে গোটা দেশ বন্ধ – এর থেকে বেশি চোখে আঙুল দেওয়া উদাহরণ আর কী হতে পারে? আমাদের দেশে কোন কোন রোগে বেশি মানুষ মারা যান? প্রথম ছ’টা কারণ হল ১. Ischemic Heart Disease ২. Chronic Obstructive Pulmonary Disease (COPD) ৩. Stroke. ৪. Diarrhea ৫. Lower Respiratory Infection ৬. Tuberculosis এবার দেখুন এর মধ্যে কোনটা কোনটা সচেতনতার মাধ্যমে আটকানো সম্ভব |

Ischemic Heart Disease (সাধারণ ভাষায় যা হল হার্ট অ্যাটাক), Stroke – এই দুটোর মূল কারণ হল উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস | পরিমিত খাওয়া-দাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম – এর মাধ্যমে প্রেশার-সুগার দুইই হয় না অথবা নিয়ন্ত্রণে থাকে | আমরা জানি, তবু লোভে পড়ে আর ল্যাদ খেয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না |

COPD র মূল কারণ সিগারেট আর বায়ুদূষণ | সিগারেট আমরা তো খাবই, তার সাথে আরো পাঁচটা লোককে প্যাসিভ স্মোকিং করিয়ে বিপদে ফেলব | কিছু বলতে গেলে চা-কাকুর মত অকারণ তর্ক জুড়ব | দূষণ নিয়ে কোনো কথা বলব না, পরিবেশ নীতি না-মেনে জঙ্গল কেটে একের পর এক খনি, কারখানা তৈরি হয়েই যাবে- চুপ করে থাকব |

সামান্য Hand Washing নিয়ে এত হইচই | হাত ধোওয়া আর পরিচ্ছন্নতা – এই দিয়ে ডায়েরিয়া পুরোপুরি আটকানো সম্ভব | আমরা মানুষকে অশিক্ষিত করে রাখব, বস্তিগুলোর উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা বলব না, ডায়েরিয়া হয়ে যাবে |

আমরা Tuberculosis কে ট্যাবু করে রাখব, গরীব মানুষের রোগ বলে এড়িয়ে যাব, শিশুদের পুষ্টির ধার ধারব না, আর TB র ব্যাকটেরিয়া একটার পর একটা Antibiotic-এ resistant হতেই থাকবে |

জনস্বাস্থ্য বলতে বোঝায় শিক্ষা-সচেতনতা | জনস্বাস্থ্য মানে পরিষ্কার পানীয় জল, পরিচ্ছন্নতা | জনস্বাস্থ্য মানে পুষ্টি, মানুষের রোজগার | এসব নিয়ে মিডিয়াও হইচই করে না, আমরাও মিনিটে মিনিটে কতজনের ডায়েরিয়া হয়েছে, টিবি-তে কতজন মারা গেছে তা শেয়ার করি না | কারণ তাতে টি আর পি নেই, তাৎক্ষণিক উৎকন্ঠা বোঝানো নেই | জনমত নেই বলে সরকারেরও কোনো পাবলিসিটি স্টান্ট নেই | যেমন চলছে, চলুক | করোনার ধাক্কায় যদি জনস্বাস্থ্যের দিকে একটু সবার নজর ফেরে তাহলেই সবার মঙ্গল |

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: