মনে পড়ার বেলায়

শ্যামাপ্রসাদ সরকার

” বন্ধ ঘরে চাঁদের আলো দেখিয়েছিলাম // প্রবৃত্তি নেই। বাতাস বইতে দিয়েছিলাম //প্রবৃত্তি নেই। চতুর্দিকের কিছুই কি নয় স্মরণীয়..”                                                     

শক্তি চট্টোপাধ্যায়

লাল রঙের মেঝে বাড়িটার।বড় টানা বারান্দা। চোখ বুজলে একটা চেহারা ভাসে। সবুজ ডুরে শাড়ি আর খোলা চুল থেকে সদ্য স্নানের গন্ধ মাখানো। এখন দুপুরবেলা, চুল শোকানোর সময়। শীতের দুপুরে রোদ পড়ে আসছে। ছায়ারা দীর্ঘতর। খোলা চুলের এক নারী অতি সূক্ষ্ম গলায় গাইছে ‘ অমলধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া…’

এ বাড়িতে গানের সেরকম পাট নেই। দু এক কলি অবশ্য অনেকেই গুনগুন করে যদিও। সে এই বাড়ির নতুন বউ। বাপের বাড়ি থেকে সে এনেছে গীতবিতানের দুটি খন্ড। সে দুটি বই তার প্রিয়। যত্ন করে মলাট দিয়েছে সে। কাগজ কেটে বসিয়েছে তার নিজের নাম। তার কাছে রবীন্দ্রনাথ গীতিকার নাকি কবি?

সে যাই হোক তিনি অবশ্য তার মনের মানুষ। সে নিশ্চিত যে ওরা দুজনে আসলে সমবয়সী। নইলে এমন করে তার কমবয়সী মনের কথা লেখেন কেমন করে। একশো বছর পার করা কবিটি আসলে তার অনেক দিনের মিতা।  নিভৃতির অনেক কথা বলা বাকি রয়ে গেল ওই মানুষটাকে। সদ্য উন্মীলনেরই সময় হঠাৎই বিয়ে হয়ে গেল তার!

বাপের বাড়ির কথা তার মনে পড়ে মাঝে মাঝে। সে যে বহু দূরের পথ। একলা চানঘরে সে লুকিয়ে কাঁদে । স্নানের পর নাকের ডগা লাল হয়ে থাকে, চোখ ছলছল করে। শ্বশুরবাড়ির সবাই ভুল বোঝে তার মনের ঝড়কে । তখন তার মনের মধ্যে কে বলে ওঠে “কাঁদার সময় অল্প  ওরে ভোলার সময় বড়”। 

তার হাত পায়ের গড়ন লম্বাটে। ভীষণ নমনীয়, শিল্পীদের মতন। চেহারাটা রোগার ওপর।কাচা কাপড় মেলার সময় হাতের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো সোনা হয়ে গলে পড়ে। দেখতেও সে চলনসই। মনে হয় গানের ওই গলাটির জন্য শ্বশুরমশাই বোধহয় নির্বাচন করেছিলেন তাঁকে পাত্রী দেখতে গিয়ে। সেদিনও ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সে শুনিয়েছিল ” রূপ সাগরে ডুব দিয়েছি অরূপরতন আশা করি..”

এই কয়েক বছরে বোঝা গেছে তার রান্নার হাতটিও মন্দ নয়। শ্বশুর মশাই এখন তার হাতে ছাড়া খেতে চান না আর। সবার খাওয়ার শেষে দিনান্তে সে বসে। মস্ত সংসারটা আস্তে আস্তে ওর ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আবার তার খোকাটিও মা ন্যাওটা বড়। সবকিছুতেই সে সংসারে বড় জড়িয়ে গেছে। বড় বড় দীঘল চোখদুটি তার মায়াময়।

এ চোখে বর্ষা নামে গোপনে, মনখারাপের অন্দরের চাবিকাঠির খোঁজ অবশ্য কেউ রাখেনা। গীতবিতানের তৃতীয় খন্ডটিও এখন তার হাতে এসে গেছে। ওই বই এর ছত্রে ছত্রে তার সঘন নিঃশ্বাস বয়। এ পৃথিবীতে এই একজন মানুষ তাকে সম্পূর্ণরূপে বোঝে। তার কাছেই মেলে দেওয়া যায় তার অজানা আখরগুলি। তার সব পথ শেষে এসে মেশে তার মিতার নয়ন দুটিতেই।

এর মধ্যে পুরী বেড়াতে যাওয়া হয় হঠাৎই।দৈনন্দিনতার বাইরে গিয়ে একটুকরো মুক্তির নোনা বাতাস।  গেস্টহাউসে সে নিজেই রাঁধলো এই দুদিন। সমুদ্রকে সে চোখে লুকিয়ে রাখতে সে এখন শিখে গেছে। যদিও বালির তাপে ফোস্কা পড়ে তার আলতারাঙা পায়ে।
এতদিনে আসল কথাটাই সে বলেনি কাউকে।

এসংসারে আসলে অল্পদিনের অতিথি সে। নির্দিষ্ট আয়ুর হাসি কান্নায় ভরিয়ে রেখে একদিন মাটির পুতুলের খেলাঘর ছেড়ে সে হঠাৎই  চলে যাবে। সমস্ত জীবন ভরে আকাশের গহীন ঠিকানায় তাকে খুঁজে যাবে এক উদাসী সদ্য কিশোর। বড় হয়ে উঠতে উঠতে সে  ধবধবে কুন্দ ফুল আর বুনো ছাতিম ফুলের গন্ধে খুঁজবে তাকে রাত্রিভোর। জ্বরতপ্ত শিয়রে কাতর হয়ে থাকবে তারই ঠান্ডা করস্পর্শটির জন্য। 

তার এই অনুপস্থিতি এতদিনের উপস্হিতিকে ছাপিয়ে উঠবে একদিন। বিস্মরণের অবহেলা তার সইবে না। ছবির মানুষ হয়ে তাই সে রয়ে যাবে অজরা। তার সন্তানটিও একদিন ওই ছবির বয়সটাকে ছুঁয়ে পার হয়ে যাবে। 
সেই মেঘলা দুপুরের পর ফুলের আগুনে ভেসে ভেসে সে ফিরে যাবে এক অলক্ষ্যের দিগন্তে। যাবার বেলায় তার সেই প্রিয় কবির কথায়  মন ভোলাতে সুচিত্রা মিত্র বাজবেন তার প্রিয় ক্যাসেট প্লেয়ারে,

” আর কত দূরে আছে সে আনন্দধাম। আমি শ্রান্ত, আমি অন্ধ, আমি পথ নাহি জানি ॥”

The following two tabs change content below.
Avatar

Shyamaprasad Sarkar

Avatar

Latest posts by Shyamaprasad Sarkar (see all)

আপনার মতামত আমাদের প্রেরনাঃ-

%d bloggers like this: