করোনা গুজবঃ মগজ ধোলাই

অরুনেষ রায়

কিছুদিন আগে থেকেই শুনছি যে কোন প্রানীবিশেষের বর্জ্য পদার্থ করোনা মুক্তিতে সবিশেষ কার্যকরী। কিছু ব্যক্তি সেটা পান বা অনুপান করে করোনার অনাবিষ্কৃত ভ্যাকসিন নিয়েই নিয়েছেন। আর গত কাল তো করোনা ভাইরাসের ইন্টারভিউটাই দেখে ফেললাম। না না সশরীরে করোনা ভাইরাসের নয়, ভায়া তারই অন্য এক অবতার। কি অসাধারণ তার বাচনভঙ্গী, দুর্দান্ত প্রোপ্যাগান্ডা। একেবারে চিন থেকে শুরু করে গোটা পৃথিবী ঘুরে হাজির হচ্ছে চিতপুরে, এবং তার অগ্রিম ম্যাপ দিয়ে গেছে সেই অবতারের হাতে। ও হ্যাঁ মুক্তির চাবিকাঠিও।

 হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়াতে এই ধরনের বহু লেখা, ভিডিও ও গুজব ছড়াচ্ছে ভাইরাসের থেকেও অনেক দ্রুতগতিতে। আর তাতে বিভ্রান্তি বাড়ছে, বাড়ছে ভুল জেনে আরও ভুল করার চান্স। তাই এই লেখায় কি করে করোনা আটকাবেন অথবা কিভাবে হাত ধোবেন এ নিয়ে কথা না বলে থাকল গুজবের গল্প, যে নীতিশিক্ষার লাইনটা না পড়লে মাটি হবে ইশপের মূল লেখা, হবে অনেক বড় কিছু ক্ষতি। আর সেই ক্ষতিটা চুপিসারে ছুরি মেরে চলেছে আমার আপনার আমাদের পিঠে, সকলের অজান্তে।

দেখে নিই সেই ভাইরাসের থেকেও ক্ষতিকারক গুজবগুলো কি কি? ও হ্যাঁ বলে রাখা ভালো এই গুজবেরও কিন্তু  কিছু স্তর আছে। তাই প্রথমে দেখে নেওয়া যাক আন্তর্জাতিক স্তরের প্রায় অলিম্পিক লেভেলের গুজবগুলো কি কি ? এবং কিভাবে সেগুলো ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক।

১) করোনা-১৯ ভাইরাস গরম ও আদ্র অঞ্চলে ছড়াতে পারে

২) ঠাণ্ডা পড়লে বা বরফ পড়লে করোনা ভাইরাস বাঁচবে না,

৩) উষ্ণ গরম জলে স্নান করলে ভাইরাস আপনাকে ছুঁতেও পারবেনা

৪) চিন বা অন্য আক্রান্ত দেশ থেকে আনা জিনিস থেকে এই ভাইরাস ছড়াবে,

৫) মশার কামড়েও হতে পারে এই করোনা,

৬) হ্যান্ড ড্রায়ার দিয়ে হাত শুকোলে আর ইনফেকশন হবে না

৭) থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে জ্বর মাপলেই সব ধরা পড়ে যাবে

৮) সারা শরীরে অ্যালকোহল বা ক্লোরিন ছড়িয়ে নিলেই আর কোন ভয় নেই

৯) পোষা কুকুর বা বেড়াল থেকে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে

১০) নিউমোনিয়া ভ্যাকসিন নিয়ে নিলেই হবে, তাহলে আর করোনা হবে না

১১) নাসাল ড্রপ ব্যাবহার করলেও অনেক উপকার

১২) রসুন খান, করোনা তাড়ান

১৩) করোনা ভাইরাস শুধু বয়স্কদেরই হতে পারে।

১৪) অ্যান্টিবায়োটিক খেলে করোনা মুক্ত হতে পারি।

১৫) কিছু ওষুধ এসেছে যা খেলেই সব সেরে যাবে।  

আচ্ছা তাহলে গুজব নিয়ে কথা হল। এবার যুক্তির ছাঁকনিতে ছেঁকে নেওয়া যাক। ভাইরাসকে গরম বা শীতকাতুরে ভেবে নেবার কোনও কারণ নেই। গরম বা আদ্রতার সঙ্গে এই ভাইরাসের বেঁচে থাকার কোন যোগাযোগই নেই, নেই ঠাণ্ডা বা বরফের সঙ্গে এই ভাইরাসের বেঁচে থাকা বা না থাকার কোন সম্পর্ক। ফ্রিজের ভিতরেও বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকতে পারে এই করোনা ভাইরাস। তবে এটা ঠিক যে কতক্ষণ কোন জায়গায় বাঁচবে সেটা বলা খুবই মুশকিল। তবে জানা যায় যে ভাইরাস মানব শরীরের বাইরে খুব বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে পারেনা।

আচ্ছা এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে যার প্রাণ নেই সে মরে না, মানে ভাইরাস জীব নয়, জীবন নেই। খুবই ক্ষুদ্র অর্থাৎ একটা চুলের আয়তনের ১০০০ ভাগের এক ভাগ আয়তনবিশিষ্ট ফ্যাট ও প্রোটিন কনা যার ভিতরে কিছু জিন রয়েছে, হ্যাঁ ইনিই ভাইরাস। প্রাণীশরীরের ভিতরে গিয়ে এই ভাইরাসই অ্যাক্টিভিটি শুরু করে, নিজেকে একদম কপির পর কপি করে প্রায় রাবনের বংশ গড়ে তোলে ( ইনকিউবেশন পিরিয়ড ) এবং আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করার চেষ্টা করতে থাকে।

আগেই বলেছি কোথায় কতক্ষণ ভাইরাস থাকবে সেটা কেহ না জানন্তি । কিন্তু মশার কামড় থেকে ইনফেকশন বা হ্যান্ড ড্রায়ার দিয়ে ভাইরাস মারার চেষ্টার কোন ফল জানা নেই। কারণ মশা এই জীবাণু (পড়ুন ভাইরাস) বহন করে না, তেমনি হ্যান্ড ড্রায়ারের উষ্ণতায় হাতের চামড়া শুকিয়ে হাতের ক্ষতি হতে পারে, জীবাণুর নয়।

থার্মাল স্ক্যানারে মাপলে জ্বর ধরা পড়ে এবং তার কারণ করোনা ভাইরাস হবে এই গ্যারান্টি কোন ডাক্তারই বিনা পরীক্ষায় আপনাকে দেবে না। তবে যদি জ্বর থাকে তাহলে সাবধান হয়ে পরীক্ষা করানোই ভালো, কারণ জ্বর এই ভাইরাসের অন্যতম উপসর্গ। অন্যদিকে সারা শরীরে অ্যালকোহল বা ক্লোরিন দিয়ে নিজের স্কিনের আদ্রতা হারাতে চান তাহলে …( সাইলেন্স ), পোষ্যদের নিয়ে চিন্তা করবেন না। ওরা অবলা জীব, আপনাকে ভালোবাসে, আপনিও বাসুন, তার পরে সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড হাত টা ধুয়ে নিন, ব্যাস।

করোনার কোনও ভ্যাকসিন এখনও বাজারে আসেনি । না প্রাণীবর্জ্য টা ঠিক হু সার্টিফাই করে না। তবে হাজার হাজার বিজ্ঞানী বিদ্যুৎবেগে কাজ করে চলেছেন। কিন্তু এক্সপার্টরা বলেছেন, মূল সমস্যা হল এই ভাইরাসের জিনের ভ্যারিয়েশন অনেক বেশী। তাই অন্য কোন ভ্যাকসিনই কাজ করবে না এক্ষেত্রে। তাই রসুনটা মাংসতেই কষান আর নাসাল ড্রপটা সর্দি হলেই নাহয় নিন। কিছু অ্যান্টি ভাইরাল ওষুধ দিয়ে চেষ্টা করে দেখা হচ্ছে বিভিন্ন হাসপাতালে, তবে তার কথা ডাক্তার জানবেন। রসুনের কিছু অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান আছে যা কিছু ক্ষেত্রে কিছু সাধারণ উপসর্গ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

যে কোন মানুষই আক্রান্ত হতে পারে করোনা ভাইরাসে, হ্যাঁ যে কেউই অবতার বা বর্জ্যপায়ী কেউই পাড় না পেতেই পারেন। অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের জন্য, ভাইরাল জ্বরে নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দুটো ইনফেকশনই হলে তখনই অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করতে পারে। তবে এখনই কোনও সঠিক ওষুধ বা ভ্যাক্সিন আবিষ্কৃত হয়নি। উপরোক্ত ১৫ টি গুজবই “হু” অর্থাৎ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইনে বলা আছে প্রচলিত গুজব হিসেবে। তাই সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে তবেই কোন লেখায় বিশ্বাস করুন।

আচ্ছা এ তো গেল আন্তর্জাতিক স্তরের করোনা রটনা, যা দেশে দেশে দিশে দিশে মানুষের জীবনের উপর থাবা দিয়েই চলেছে। এবার আসা যাক বাংলার গুজবে মানে দেশি আবহাওয়ায় উড়ন্ত গুজব। কারণ শুধু উপরের গুজবগুলি নয়, আমাদের বেশ ক্ষতি করছে কিছু বিশেষ ধরনের মিম। এই গুজবের বিশেষ বৈশিষ্ট্য যে এরা ধোঁয়াশা ছড়ানোর জন্য ব্যবহার করছে বিশেষ কিছু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নাম। উদাহরণস্বরূপ এরকমই একটা হেডলাইন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে মদ্যপানে পাবেন করোনা থেকে মুক্তি”। এর উদ্দেশ্য গুজব ব্যাপারটিকে আর একটু ওজনদার করে তোলা। আর আগের এক লেখাতেই নিশ্চয় পড়েছেন যে যা কিছু অবোধ্য বা দুর্বোধ্য​, তাই-ই সর্ব্বোৎকৃষ্ট। এবার এক ঝলকে ঝালিয়ে নিই কিছু লোকাল গুজব যা আপনার ফেসবুকের ওয়াল বা হোয়াটস্অ্যাপের মেসেজ হিসেবে আপনি পেয়ে থাকতেই পারেন বা পেয়েছেন —

১) মাছ ও মুরগীর মাংস থেকে করোনা ছড়াতে পারে।

২) মদ্যপান করলে আর করোনা নিয়ে কোন ভয় নেই।

৩) মাস্ক পড়তেই হবে।

৪) হোমিয়োপ্যাথি ওষুধে করোনা আটকাতে পারে।

৫) অমুক বাবার তাবিজ কবচ, তমুক বাবার মাদুলি পরলেই ভয় নেই।

৬) করোনা হাওয়ায় ছড়াচ্ছে।

মাছ ও মুরগীর মাংসে করোনা সংক্রমণের কোন ভয় নেই। কারণ এদের মধ্যে করোনা ছড়ায়ই না। সর্বোপরি আমরা যেভাবে বা যে তাপমাত্রায় ( প্রায় ১৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ) রান্না করি তাতে কোন ভাইরাসই বেঁচে থাকতে পারে না। মদ্যপান করার সঙ্গে করোনা মুক্তির কোন যোগাযোগ নেই, তবে অতিরিক্ত মদ্যপান অবশ্যই কিছু ক্ষতি করবেই তাতে করোনা থাকুক বা নাই থাকুক। হোমিয়োপ্যাথি ওষুধের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা একই কারণ হোমিওপ্যাথিতে ভ্যাকসিনের কোন কনসেপ্টই নেই। আর তাবিজ কবচ বা মাদুলি… সেই পূর্বপাঠের পুনরালোচনা। করোনা হাওয়ায় ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যাক্তির হাঁচি বা কাশি থেকে আসা জলের বিন্দুর দ্বারাই ছড়ায় বলেই জানা গেছে।

এই ধরনের গুজবের ভাইরাস আস্তে আস্তে মানুষের বিশ্বাসে আঘাত হানে। শুরু হয় আরও এক ধরনের মহামারী, যাতে আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতি বিশেষ ক্ষতি না দেখা গেলেও নড়বড়ে হয়ে ওঠে সমাজের যুক্তি ও বিচার। শুধু যুক্তি বুদ্ধির ক্ষতিতেই থেমে থাকে না লোকসানের পরিসংখ্যান, এই ক্ষতি সামাজিকও। করোনা আতঙ্কে মুর্গীর মাংসের কিলো নেমে আসে ২০০ টাকা কিলো থেকে ৭৫ টাকায় (পড়ুন সঙ্গে পেঁয়াজ ফ্রি এবং তাতেও প্রায় কেউই কিনছে না)। সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের উপর নেমে আসে এই গুজবের করাল কোপ।

তাই গুজব, তা আন্তর্জাতিক হোক বা জাতীয়, অর্ধেক জেনে বা না জেনে আমরা নিজেরাই তা ছড়িয়ে সমাজের ক্ষতি করে চলেছি। আর তাই গুজব ছড়াতে দেবেন না এবং গুজবে কানও দেবেন না। আরও কোনও ধরনের গুজব কানে এলে সময়ের এই পোস্ট এ কমেন্ট করে জানান। সুস্থ থাকুন, গুজব দূরে রাখুন। আর সত্যিটা শেয়ার করে নিন সবার সঙ্গে।

আপনার মতামত আমাদের প্রেরনাঃ-

%d bloggers like this: