করোনা ষড়যন্ত্রঃ তর্ক ও তথ্য

ডাঃ অনুপম ব্রহ্ম

যত দোষ নন্দ ঘোষ প্রবাদটা তো এমনি এমনি তৈরি হয় নি | না-চাওয়া কিছু একটা ঘটনা ঘটে গেলে কাউকে একটা খুঁজে বের করে দোষ চাপানো আমাদের হাড়ে-মজ্জায় ঢুকে গেছে | নতুন নন্দ ঘোষ আপাতত হয়েছে চীন |

৬২-র যুদ্ধের জন্য চীনকে যত খুশি গালি দিন,আমি সাথে আছি | গণতন্ত্র না-থাকার জন্য চীনকে বকুন, আমায় সাথে পাবেন, কিন্তু এখনকার বিপদটা চীনের ইচ্ছে করে তৈরি করা- একথা বলে নিজেকে চ্যাম্পিয়ন দেখাতে গেলে অনেক দোষ ধামাচাপা পড়ে যায়, তার উপর জনস্বাস্থ্যের অনেক শিক্ষা না-নেওয়া থেকে যায় – এতে আমার আপত্তি আছে |

প্রথমে তর্ক | তারপর তথ্য |

প্রথম তর্ক, রোগটা চীনের একটা জায়গায় কীভাবে সীমাবদ্ধ থেকে গেল? বেজিং এ ছড়ালো না কেন? বিষয়টা হল এই তর্কের তথ্যটাই ভুল | ভাইরাস মোটামুটি সারা চীনেই ছড়িয়েছে | একটা ম্যাপ দিলাম | দেখে নেওয়া যাবে |

দ্বিতীয় তর্ক, চীন কীভাবে এত তাড়াতাড়ি সেরে উঠছে? কুযুক্তি, ওদের কাছে ভ্যাকসিন আছে | প্রথম কথা, ভ্যাকসিন দিতে হয় কোনো জীবাণু শরীরে ঢোকার আগে বা ঢোকার সাথে সাথে | ভ্যাকসিন চিকিৎসা নয় | এই তর্কের উত্তর যা, তা থেকে জনস্বাস্থ্যের বিরাট শিক্ষা নেওয়ার আছে | এপিসেন্টার হুবেই প্রদেশকে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে “কর্ডন স্যানিটেয়ার” করা হয়েছিল | মানে ওইখান থেকে কেউ বেরোতে পারবে না এবং অন্য কোনো প্রদেশে ঢুকতে পারবে না | এর ফল মোটামুটি দু-মাস পরে চীন পাচ্ছে | “এত তাড়াতাড়ি” নয় | চিকিৎসা চলছে WHO-র নজরদারিতে | তাদের লুকিয়ে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করা এত সহজ নয় |

তৃতীয় তর্ক, চীন ইচ্ছে করে সারা পৃথিবীতে ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়েছে | ঘটনা হল, মানুষের শরীরে নতুন এই ভাইরাসের জেনেটিক সিকোয়েন্স চীন ৭ ই জানুয়ারি নির্ণয় করে ফেলে এবং ১২ ই জানুয়ারি WHO-কে সেই তথ্য দিয়ে দেয় | এটা যদি চীনের তৈরি করা Biological Weapon হত, তাহলে তার মূল গঠনটা কি ওরা ‘পাবলিক করে শেয়ার দিত’? এই জেনেটিক সিকোয়েন্সের উপর ভিত্তি করেই কিন্তু বিভিন্ন দেশ টেস্ট কিট আর ভ্যাকসিন তৈরি করার চেষ্টা করছে | আর ভাইরাস ছড়ালো বেশি করে ইতালি, স্পেন আর ইরানে? চীনের Biological Weapon হলে ইজরায়েলে আগে ছড়াতো না কি? ওই সময়টা কিন্তু ইরান-আমেরিকার যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব চলছিল। যাঁরা জানেন না, তাঁদের জন্য বলে রাখি ইজরায়েল আমেরিকার বন্ধু-দেশ | আর ইজরায়েল আর ইরান হল আমাদের ভারত-পাকিস্তানের মত | আমেরিকাকে টাইট দেওয়ার থাকলে ইজরায়েলে ভাইরাস ছড়ানো হত | চীন তা না-করে ইরানে ভাইরাস বোম ফেলে আমেরিকার সুবিধে করে দিল?

এবার তথ্য |

WHO ৩০শে জানুয়ারি Public Health Emergency of International Concern ঘোষণা করে | এরপরেই রাশিয়া তাদের বিরাট চীন বর্ডার সিল করে দেয় | ইতালি ৩১শে জানুয়ারি চীন থেকে ফ্লাইট আসা নিষিদ্ধ করে দেয়, কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয় | কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে দেখেছেন চীনে যে ইতালীয় পর্যটকরা ছিলেন, তারা অন্য দেশ ঘুরে দেশে ফিরতে থাকেন, আর সেই তথ্য লুকিয়ে ফেলেন, ঠিক আমাদের দেশের মতোই, যাতে কোয়ারান্টিন না থাকতে হয় | এতে ভাইরাস ছড়ায় | অন্যান্য দেশে এই ব্যান না থাকায় চীন থেকে আসা ফ্লাইটের যাত্রীদের কোয়ারান্টিন করা সম্ভব হয়েছিল | এরপর ইতালি ইউরোপের করোনা এপিসেন্টার হয়ে যায় | মনে রাখতে হবে ইউরোপের মুক্ত বাণিজ্য এবং পর্যটনের ফলে ওখানে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত অনেক সহজ |

তাহলে স্পেনে এত বাড়াবাড়ি হল কেন? বিশেষজ্ঞরা একটা ফুটবল ম্যাচকে দায়ী করছেন | চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেই খেলা দেখতে ইতালির ব্যার্গামো প্রদেশের মোটামুটি এক তৃতীয়াংশ মানুষ এসেছিলেন | তাদের ক্লাব চার-এক গোলে জেতে | অর্থাৎ অন্ততপক্ষে পাঁচবার ব্যার্গামোর মানুষরা নিজেদের মধ্যে চুম্বন-আলিঙ্গন করেছেন | এটা ঘটনা যে এর পরে-পরেই ব্যার্গামো ইতালির করোনা-এপিসেন্টার হয়ে যায় | সেখানে প্রায় আড়াই হাজার স্পেনীয় দর্শকও ছিলেন | এটা সবার চোখের সামনেই যে ইতালি আর স্পেনেই ইউরোপের মধ্যে করোনার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি |

ইতালিতে করোনা-ঘটিত মৃত্যুও সবচেয়ে বেশি | তার কারণটা Lancet এবং Journal of American Medical Association-এ বিশ্লেষণ করা হয়েছে | কোনো ভাইরাস শরীরে ঢুকল,আর মানুষটাকে মেরে ফেলল ব্যাপারটা এরকম নয় | শরীর নিজের Immune System দিয়ে যুদ্ধ চালাবে | এই Immunity বয়সের সাথে সাথে কমতে থাকে | করোনা থেকে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি সবচেয়ে বেশি ৮০ বছরের বেশি মানুষদের | ২০ শতাংশ | তার চেয়ে কম ৭০-৭৯ বছর বয়সে | ১২ শতাংশ | ৩০-৩৯ বছরে মাত্র ০.৩ শতাংশ (তা বলে কালই আমার কিছু হবে না বলে বেরিয়ে পড়বেন না, আপনার থেকে অন্য মানুষের হতে পারে) | ইতালির বয়স্ক জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি | তাই ইতালিতে মৃত্যুও বেশি | Immunity কমে যাওয়ার আরেকটা কারণ হল Diabetes | ইউরোপ এবং আমেরিকায় Diabetes রোগীর সংখ্যা বেশি | তাই সেখানে রোগটা বেশি খারাপের দিকে যাচ্ছে | তার উপর রয়েছে ধূমপান | ধূমপান করে আগের থেকেই ফুসফুসটাকে ঝাঁঝরা করে ফেললে করোনা কেন, যে কোনো শ্বাসনালীরর সংক্রমণই খারাপ হবে |

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, COVID19 রোগের পেছনে থাকা SARS-CoV-2 ভাইরাস যে পূর্বসূরী SARS-CoV থেকে প্রাকৃতিক মিউটেশনের ফলে তৈরি হয়েছে তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত | “Nature Medicine” জার্নালে “The Proximal Origin of SARS CoV-2” নামে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে | এরপরে চীনের ল্যাবরেটরিতে Biological Weapon তৈরির গল্প ধোপে টেকে না | স্পাই থ্রিলার হিসেবে জমবে ভালই, কিন্তু বিজ্ঞান মানবে না |

তো কেন বেছে-বেছে ইতালি-স্পেন, কেন আমেরিকা, কেন রাশিয়ায় নয়, কেন বেজিঙে নয়-এর পেছনে এত এত কারণ রয়েছে | ওতো চীনের শয়তানি বলে চালালে নিজের খামতিগুলো ঢাকা পড়ে ঠিকই, কিন্তু বিজ্ঞানও চাপা পড়ে যায় | আজ থেকে দশ বছর পরে যদি প্রমাণিত হয় SARS CoV2 চীনের Biological Weapon ছিল, আমি মেনে নেব | কিন্তু আপাতত যে প্রতিযুক্তিগুলি রয়েছে তা বেশি গ্রহণযোগ্য | বিজ্ঞান সবসময় শেখে | নৈর্ব্যক্তিক ভাবে | আর মানুষ নিজেকে অতি-চালাক ভেবে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনে |

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: