চাঁদের আলো বাঁধ ভেঙ্গেছে

অগ্নিভ সেনগুপ্ত

যেমন বলেছিলাম​, ‘হল্যান্ডের হাল-হকিকত’ সিরিজ থেকে আপাতত বিরতি নিলেও ‘সম​য়’​-এর সাথে পথচলা চলতে থাকবে। তাই, আবার আসিয়াছি আমি ফিরিয়া!

ইতিমধ্যে অনেকেই আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন হল্যান্ডের হাল​-হকিকত সিরিজ বন্ধ হওয়ার জন্যে। আপনাদের ভালোবাসার জন্যে শুকনো ধন্যবাদ জানিয়ে আপনাদের খাটো করব না। আর​-একটু ভালোবাসার জোগান পেলে হ​য়তো আগামী দিনে সিরিজটা নতুন করে শুরু করার ভাবনা-চিন্তা করা যেতে পারে।

যাক​, আজকের বিষ​য় তা ন​য়​। আচ্ছা, আপনারা কেউ সুকুমার রায়ের ‘চালিয়াৎ’ গল্পটা প​ড়েছেন​? সেখানে শ্যামচাঁদের চরিত্র সম্বন্ধে বলা হচ্ছে:

“পাছে কেহ তাকে ছেলেমানুষ ভাবে, এবং যথোপযুক্ত খাতির না করে, এই জন্য সর্বদাই সে অত্যন্ত বেশী রকম গম্ভীর হইয়া থাকিত এবং কথাবার্তায় নানা রকম বোলচাল দিয়া এমন বিজ্ঞের মতো ভাব প্রকাশ করিত যে স্কুলের দারোয়ান হইতে নীচের ক্লাশের ছাত্র পর্যন্ত সকলেই ভাবিত​, নাঃ, লোকটা কিছু জানে!”

সুকুমার রায়ের মতো প্রাঞ্জল ভাষায় দূরদর্শী লেখনী বাংলা সাহিত্যে বিরল​। ওনার রচিত আরো অনেক চরিত্রের মতোই এই শ্যামচাঁদ চরিত্র আজকালকার সমাজে ঘাড় ঘোরালেই খুঁজে পাওয়া যায়​।

যে প্রসঙ্গে এতো ভণিতা – কিছুদিন আগে আনন্দবাজার পত্রিকার রবিবাসরীয় ক্রোড়পত্রে চন্দ্রিল ভট্টাচার্য্যের ‘কি করে বেস্টসেলার লিখতে হ​য়’ নামক প্রতিবেদন প​ড়লাম​।

ব্যক্তিগতভাবে, আমি চন্দ্রিল ভট্টাচার্য্যের লেখা এবং বক্তৃতার বেশ ব​ড় ফ্যান​। প​ড়াশুনা আছে, পাবলিক মেন্টালিটি বোঝেন​, অভিন​য়​-ক্ষমতা আছে, ভাষার ব্যবহার বেশ মনোগ্রাহী – এক কথায় সুবক্তা এবং সুলেখক হওয়ার যা-যা গুণ থাকা প্র​য়োজন​, মোটামুটি ওনার মধ্যে বিদ্যমান​। ওনার লেখা প​ড়লে বা বক্তব্য শুনলে মনে হ​য়​, “নাঃ, লোকটা কিছু জানে”!

তবে, ইদানীং ওনার বেশীরভাগ পরিবেশনেই শ্রোতা বা পাঠককে যেন উনি ঘাড় ধরে বোঝাতে চাইছেন, “শোন হে! তুমি গণ​, তোমার মতামতের খুব​-একটা দাম নেই।” আর​, এখন যা সিনেমা, সাহিত্য ইত্যাদি হচ্ছে, বেশীরভাগ পাতে দেওয়ার যোগ্য ন​য়​।

ওনার আচরণ​ কিছু ক্ষেত্রে পাড়ার কুচুটে জ্যাঠামশায়ের মতো মনে হ​য়​। ওনাদের সম​য়ে ফুলে গন্ধ বেশী ছিল​, কুলে মিষ্টি বেশী ছিল​, এমনকি পাড়ার মতি গোয়ালা দুধে জলও কম মেশাত​। এখনকার সময়ে সেই রামও নেই, সেই অযোধ্যাও নেই, ব্যাকগ্রাউন্ডে ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস​।

তবে, পার্থক্য আছে, বস​! যেমন আগেও লিখলাম​, চন্দ্রিলের বক্তব্যে বা লেখায় জ্ঞানের প্রভাব সুস্পষ্ট​। তা ছাড়া, ওনার প্রত্যেক প্রদর্শনে শোপেন​আওয়ার​-কাফকা-দালির তেল​-ঝাল​-মশলা এমন সুন্দরভাবে মিশিয়ে দেন​, আপামর জনগণ ভেবেই আকুল – খাব কি? ঝাঁঝেই মরে যাব​!

ছোটবেলায় দূরদর্শন চ্যানেলে একটা সিরিয়াল আসত​, শ্রীমান​-শ্রীমতি নামে। তার টাইটেল সং-এর দুটো লাইন ছিল​, “লাগতি হ্যায় ভাই সবকো ভালি, আপনি অকল আউর বিবি আউর কি”। খুব সত্যি কথা। কিছু বিশেষ শ্রেণীর বাঙালী আছেন​, যাঁদের আপনি একটু আলাদা কিছু পরিবেশন করলেই চেটেপুটে খেয়ে নেন​। কিন্তু, উনি জানেনই না যে উনি কি খাচ্ছেন​। আপনার পাড়ার চায়ের ঠেকে যে মেনস্ট্রীম কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে আলোচনা করেন​, তাঁদের সঙ্গে নিয়ে কফি হাউজের টেবিলে বসা যায় নাকি? টিম্বাকটুর বিখ্যাত কবি কি ভাবে বাংলার উঠতি সাহিত্যিকদের বলে-বলে দশগোল দেবে, সেই বিতর্কে যোগদান করতে হবে তো!

এ সেই কর্পোরেট জগতে ম্যানেজমেন্ট বাজ​-ওয়ার্ডের মতো, বলতে হ​য়​, নাহলে পিছিয়ে প​ড়তে হ​য়​। যেমন​, অ্যাপ্রাইজাল ডিসকাশনে ম্যানেজার প্রশ্ন করলেন​, “হোয়াট ইজ ইয়োর রোনাল্ডো মোমেন্ট​?” আমি হতবাক​, কোন রোনাল্ডোর কথা হচ্ছে? জিজ্ঞাসা করলাম​, “ফ্রম ব্রাজিল​, অর ফ্রম পোর্তুগাল​?” বুঝলাম​, ক্রিশ্চিয়ানোকে নিয়ে কথা হচ্ছে। উনি তখন সদ্য রিয়াল ছেড়ে জুভেন্তাসে গেছেন​। আমি তাই ভ​য়ে-ভ​য়েই বললাম, “নো স্যার​, আই হ্যাভ নো প্ল্যান টু লিভ দ্য কোম্পানী রাইট নাউ।” এক তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ম্যানেজার বুঝিয়ে বললেন – না রে পাগলা, তোর ইন্ডিভিজ্যুয়াল কন্ট্রিবিউশনের কথা জিজ্ঞাসা করছি!

যা কিছু অবোধ্য বা দুর্বোধ্য​, তাই-ই সর্ব্বোৎকৃষ্ট – আমাদের অবচেতনে গভীরভাবে এই ধারণা পদ্ধতিগতভাবে প্রোথিত করা হ​য়েছে। নাহলে, আমার​-আপনার মতো গণ​-র সাথে চিন্তাবিদদের পার্থক্য থাকবে কোথায়​? পৌরাণিক যুগে যেমন জ্ঞানের একচ্ছত্র আধিপত্য ব্রাহ্মণদের ছিল​, এখন তার দায়ভার সানন্দে মাথায় তুলে নিয়েছেন নব্য​-বুদ্ধিজীবিরা। আর​, ফলের বাগানের চারপাশে বেড়ার কাজ করে ভারী-ভারী জার্গন এবং তত্ত্ব​। গোদার্দ​-ফেলিনি না দেখে থাকলে আপনি ফিল্মের কিছুই বোঝেন না, কোয়েলহো-নিৎসে না প​ড়লে আপনার দার্শনিক তত্ত্বের মুখেভাতই হ​য়নি, আর ব্রেটন না বুঝলে সুররিয়েলিজমের বানানটাও করার আপনি যোগ্য নন​।

 হ্যাঁ, কিছু মানুষ ক্ষণজন্মা হন। তাঁরা ডিলান না শুনেও লোকগীতিতে দিকপাল হ​য়ে ওঠেন​, কিংবা নোলান-তারান্তিনো না বুঝেও নন-লিনিয়ার ফিল্ম বানিয়ে ফেলেন​। কিন্তু, সে তো লাখে এক​, আর সেই স্বীকৃতি অতি-অবশ্যই আসতে হবে এলিট ক্লাব থেকে। নাহলে, আপনার কপালে নাচছে স্টিরিওটাইপের কটাক্ষ​। চন্দ্রিলের প্রবন্ধ সেই কটাক্ষের এক সুন্দর উদাহরণ​।

এই প্রবন্ধে চন্দ্রিল সিদ্ধান্তে উপনীত হ​য়েছেন​, বেস্ট-সেলার লেখক হতে গেলে ভালো লেখার প্র​য়োজন গৌণ​। মুখ্য হচ্ছে প্রচার​, মূলতঃ সামাজিক মাধ্যমে। অবশ্যই, সাম্প্রতিক লেখকদের কটাক্ষ করার উদ্দেশ্যেই এই লেখা। যদিও অস্বীকার করার উপায় নেই, এই বিজ্ঞাপনের চটকের যুগে কিছু নিম্নমানের গল্প​-উপন্যাসের ভালোই কাটতি হ​য়েছে। কিন্তু, সেই দু-চারটে বাজে গল্প​-উপন্যাস​-সিনেমার উদাহরণ টেনে সর্বজনীনভাবে সবই খারাপ বলাটা বোধহ​য় অনেক ভালো সাহিত্যের প্রতি অবিচার করা হবে। আমি জানিনা, চন্দ্রিল প্রত্যেকটা বেস্ট​-সেলার বই প​ড়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন কি না। তবে, প্রবন্ধটা পড়ে আমার মনে হ​য়েছে, কোথাও যেন উনি সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগছেন​। এই প্রবন্ধে তো বটেই, ওনার সাম্প্রতিক কিছু বক্তৃতাতেও এই কমপ্লেক্স উগ্রভাবে প্রকট হয়েছে।

আমার ব্যক্তিগত মত – ওনার মতো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব​, যাঁকে অনেক মানুষ অনুসরণ করেন​, তাঁর আর​-একটু দায়িত্ববান হওয়া উচিৎ। কারণ​, ওনার এই ধারণা ব্যক্ত করে উনি আখেরে বাংলা সংস্কৃতির ক্ষতি করছেন​। কিভাবে? একটু বুঝিয়ে বলি।

মূলতঃ, যেকোন শিল্পের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হচ্ছে দর্শকের বা পাঠকের​ বা শ্রোতার মনোরঞ্জন​। আপনি একটা দুর্দান্ত সিনেমা বানালেন​, বা একটা মর্মস্পর্শী কবিতা লিখলেন – ততক্ষণ সফল ন​য় যতক্ষণ না তা দু-পাঁচজনের মনোরঞ্জন করতে পারছে। অবশ্যই আপনি কোন শ্রেণীর দর্শকের জন্যে আপনার শিল্প তৈরী করছেন​, অর্থাৎ আপনার টার্গেট অডিয়েন্স​, সেটা আপনার ব্যক্তিগত নির্ণ​য়​।

আবশ্যক ন​য়​, আপনার দর্শক বা পাঠক নেরুদা-কাফকা-কামু গুলে খেয়েছে, অথবা বার্গম্যান​-শোপেন​আওয়ার​-কুরোশাওয়া ছাড়া রবিবাসরীয় দ্বিপ্রাহরিক কাউচ​-কর্ত্তন করে না।

এখন​, আপনি চন্দ্রিলের অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত​। আপনার মাথায় ঘুরছে, কি ভাবে এলিট ক্লাবের মন জ​য় করতে পারবেন​। তাই, আপনি ‘বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না’-কে নন-লিনিয়ার ফর্ম্যাটে বানালেন​, মাঝেমাঝে জাম্পকাট লাগালেন​। কিংবা, ‘পান্ডব গোয়েন্দা’-তে সুররিয়ালিজম গুঁজে দিলেন​। তাতে লাভের লাভ কি হল​? না, আপনি প্রাথমিক সারল্যটাও হারালেন​, আবার উচ্চমার্গের মাস্টারপিস তৈরী করতেও ব্যর্থ হলেন​। অর্থাৎ, আপনার শ্যামও গেল​, আবার কুলও গেল​।

চন্দ্রিলের লেখার প্রসঙ্গে কিছু বলার নেই, ওই জঁরে ওনার মতো শক্তিশালী লেখনী বিরল​। কিন্তু, ওনার সিনেমা দেখলেও মনে হ​য় উনি ওই প্রবন্ধ লেখার জগ​ৎ থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেন নি। চরিত্রগুলোর মনোভাব এবং বাচনভঙ্গি একই ধরণের​, ডায়ালগেও খুব​-একটা বৈচিত্র নেই। সবাই যেন ছাঁচে-ঢালা পুতুল​, একই ভাষায় কথা বলছে।

এইবার ধরুন​, আপনার বিদেশী সিনেমার মাস্টারপিসগুলো দেখার মতো ধৈর্য্য বা সময়, কোনটাই নেই। আপনি ভাবলেন​, চন্দ্রিল তো এতো জানে, ওর দু-একটা সিনেমা দেখে নেব​। নিশ্চ​য়ই ছায়া প্রকাশনীর ছাত্র​-সহায়িকার কাজ করবে। তারপর​, দুটো শর্টফিল্ম দেখার পরে আপনি কি শিখলেন​? না, মাস্টারপিস সিনেমায় সমস্ত চরিত্র একই রকম হাঁটে, একই রকম কথা বলে, একই রকম গ্রাস বানায়​। এইটাই হ​য়তো কুরোশাওয়া-স্টাইল​, আর এলিটদের নজর কাড়ার একমাত্র মূলমন্ত্র​।

তাহলে, আপনার দর্শকদের বা পাঠকদের সামনে আপনি কি প্রস্তুত করলেন​? এইটা..

আপনার সাহিত্য​-কবিতা-সিনেমা তো আপনার চোখে সমাজের প্রতিফলন হতে হবে। সেটা আপনি সত্যজিৎ রায়ের মতো বানালে তো হবেনা। আর​, আপনি যেটা বানালেন​, সেটা তো দর্শকের কাছে, বা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আপনার জন্যে কোন আনন্দ পাব্লিশার্স বা এস​-ভি-এফ প্রচার করে দেবে না। তাই, আপনার হাতের পাঁচ​, সোশ্যাল মিডিয়া।

আপনার মনের মতো করে গল্প​-উপন্যাস​-সাহিত্য​-কবিতা-সিনেমা, মায় পুতুলনাচ তৈরী করুন​, আর অবশ্যই দর্শক​-শ্রোতা-পাঠকের কাছে পৌঁছে দিন​। হোক না দু-একটা খারাপ লেখা, বা বাজে সিনেমা, আখেরে তো শিল্পের লাভ বৈ ক্ষতি হচ্ছে না!

আর​, ধরুন​, আপনি একটা মাস্টারপিস লিখে ফেললেন​, বা বানিয়ে ফেললেন​। আপনার কি মনে হ​য়​, চন্দ্রিল তার পরবর্তী প্রবন্ধে আপনার শিল্পের ভূয়সী প্রশংসা করে আপনার প্রচার করবে? বললাম না, উনি সেই পাড়ার জ্যাঠামশায়ের মতো, যে শুধু নতুনের নিন্দাটুকুই করতে পারেন​!

The following two tabs change content below.
Agniv Sengupta

Agniv Sengupta

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অগ্নিভ সেনগুপ্ত লিখেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। সময়ে তার লেখা শুরু হল্যান্ডের হালহকিকত দিয়ে, এ ছাড়াও লিখেছেন আরও অন্যান্য সমকালীন বিষয়ে।
Agniv Sengupta

Agniv Sengupta

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অগ্নিভ সেনগুপ্ত লিখেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। সময়ে তার লেখা শুরু হল্যান্ডের হালহকিকত দিয়ে, এ ছাড়াও লিখেছেন আরও অন্যান্য সমকালীন বিষয়ে।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: