ট্র্যাপের ট্রাপিজ

মিহিররঞ্জন মন্ডল

রেলওয়ের পারচেজ অফিসার বুধাদিত্য সেনকে দেখলেই মনে হয় কেমন একবগ্গা। পেটানো চেহারা। নিখুঁত কামানো গাল। ছোট করে ছাঁটা ক্লোজ ক্রপট্ মাথার চুল। নাকের ডগাটা সামান্য থেবড়া। এককালে সে বক্সিং লড়ত। ম্যাক্ বলে এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান বক্সারের একটা স্ট্রেট জ্যাবে নাকটা একবার ভেঙে গিয়েছিল। ভাল ভাবে গার্ড নেয়নি। তারই খেসারত দিতে হয়েছিল। তাতে অবশ্য ওকে খুব একটা খারাপ দেখায় না। নাকটা মুখের সঙ্গে বেশ মানিয়ে গেছে।

বুধাদিত্যকে আড়ালে ওর সহকর্মীরা বলে হার্ড নাট, কেউ বলে ধর্মপুত্তর যুধিষ্টির, কেউ বা বলে ডুবেডুবে জল খায়। লোকটার মস্তবড় দোষ ও ঘুষটুস নেয় না। কাউকে কোন বাড়তি সুযোগ দেয় না। মাইনে ভালই পায়। খুব একটা ওর চাহিদা নেই। মেয়ে আর বউকে নিয়ে সে ভালই আছে।

টেবিলে রাখা স্মার্টফোনে আলো জ্বলে উঠতেই স্ক্রিনে সে চোখ রাখল। মেয়ের মেসেজ। পার্কস্টিটের ক্যাথলীন থেকে ব্ল্যাকফরেষ্ট কেকের ফরমাশ। কয়েকদিন আগে বলেছিল বটে। হ্যাঁ, যাবার সময় পার্কস্ট্রিট ঘুরে ওটা নিয়ে যেতে হবে। মেয়েটা দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল। এখন ক্লাস নাইনে পড়ছে। যা কিছু আবদার সব বাবার কাছে। অদিতি বলে বাপ সোহাগী। পড়াশোনার সঙ্গে মেয়ের গ্রুমিং- এর দিকেও অদিতির নজর আছে। ফোনটা খুলে মা ও মেয়ের ছবিটা ওর একবার দেখার ইচ্ছে হল। কিন্তু তার আগেই বেয়ারা চন্দ্রনাথ ঘরে ঢুকল।

” স্যার, একজন মহিলা এসেছেন, আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।”
‘ মহিলা!’ ভ্রূ কুঁচকে গেল বুধাদিত্যের। এখনই উঠবে বলে সে ভাবছিল।
” ঠিক আছে, আসতে বল। ‘

একটু পরেই মহিলা ঘরে ঢুকলেন। সারাঘর বিদেশি পারফিউমের গন্ধে ভরে গেল। রীতিমত সুন্দরী। সাজপোশাকও দেখার মত। উদ্ধত বুকের ক্লিভেজের দিকে নজর পড়ল বুধাদিত্যের।
‘ বসুন’
মহিলা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়লেন। মধুরভাবে হাসলেন বুধাদিত্যের মুখের দিকে তাকিয়ে।
” বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি? “
” স্যার, একটু অসময়েই এসে পড়লাম। এখন তো আপনার ওঠার সময়, তাই না? আসলে একটা দরকারে আপনার কাছে এসেছি। “

ঘরের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে মহিলা বলতে লাগলেন, ” আপনার ঘরটা বেশ কোজি অ্যান্ড কমফোর্টেবেল। আরে, টেবিলের এই পেপারওয়েটটা তো দারুণ! বরফ পড়ছে। রেনডিয়ার টেনে নিয়ে যাচ্ছে স্লেজটা। মাথায় টুপি পরে বসে সান্তা। লাভলি! “
কোন কথা না বলে মহিলার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে বুধাদিত্য।
মহিলা সেটা লক্ষ্য করে আরও যেন উচ্ছ্বল হয়ে উঠে বললেন, ” স্যার, ইজ ইট আন্ডার দি সারভিলেন্স অফ সিসিটিভি?
” ওহ্ নো! কিন্তু কেন বলুন তো?”

” না, এমনি বলছিলাম আর কী!”

মহিলা মনে হয় কিছু যেন বলতে চান। বুধাদিত্য সময় দিল। টেবিলের উপর থেকে একটা কলম তুলে নিয়ে প্যাডে কী যেন সে খসখস করে লিখতে লাগল। কলমটা ওর ভীষণ প্রিয়। অনেকটা পুরানো দিনের শেফার্স লাইফটাইমের মত দেখতে।

একটু পরেই সে মুখ তুলল। মহিলার বেশবাস আরও যেন অসংবৃত। ঠোঁটে কলমটা ঠেকিয়ে সে বলল, ” হ্যাঁ, এবার বলুন। “
” স্যার, আমাদের কনসাইনমেন্টটা ওভাবে বাতিল করে দেবেন না। আমাদের প্রচুর ক্ষতি হয়ে যাবে।”
” কোন কনসাইনমেন্টের কথা বলছেন? আপনি কোথা থেকে আসছেন? ” ভ্রূ কুঁচকে বুধাদিত্য জানতে চায়।”
” স্যার, শিপকো থেকে আসছি। মিঃ ভার্গব আমাকে পাঠিয়েছেন। আমি ওনার পি. এ।”
” আমরা তো জানিয়ে দিয়েছি ওই মাল চলবে না। স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী হয়নি। অনেক গলতি আছে। কোয়ালিটি কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্টের রিপোর্টও খুব খারাপ। আর এ ব্যাপারে আমি আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই না। মিঃ ভার্গবের কিছু বলার থাকলে উনি নিজে এসে আমার সঙ্গে দেখা করুন।”
” প্রায় এককোটি টাকার উপরে আমাদের ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা যে কোন ডিলে রাজি আছি। প্লিজ স্যার, ওটা এবারের মত করে দিন।”
” কীসের ডিল? আপনি কী বলতে চান বলুন তো? এ ব্যাপারে আপনার সঙ্গে কোন কথা বলব না। আচ্ছা, আমাকে এখন উঠতে হবে।” কলমটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বুধাদিত্য বলে ওঠে।
” এখন আপনি কোথায় যাবেন স্যার? “
” কেন বলুন তো? ” অবাক হয়ে বুধাদিত্য জানতে চায়।
” না, এমনি বলছি আর কী!”
” যাব পার্কস্ট্রিটে। কেন?”
” পার্কস্ট্রিটে! ” মহিলার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ” কিছু যদি মনে না করেন আমাকে একটু লিফট্ দেবেন? আমিও ওই দিকে যাব। আমাদের কোম্পানির একটা গেস্ট হাউস আছে। চলুন না স্যার ওখানে। মিঃ ভার্গবকে ডেকে নেব। ওখানে একটু রিলাক্স করবেন আর এ ব্যাপারে আমাদের কথা হবে।”
” বুঝেছি। ভার্গব আপনাকে আমার পিছনে লাগিয়েছে। ওর হয়ে আপনি কাজ করছেন মানে ভাড়া খাটছেন, তাই না? আমাকে ওখানে নিয়ে তুলতে চান? ওসবে কোন ফল হবে না। ” বুধাদিত্য বলে ওঠে।
” হোয়াট ডু ইউ মিন? মাইন্ড ইয়োর ওন ল্যাঙ্গুয়েজ। হাউ ডেয়ার ইউ আটার সাচ ননসেন্স?” রাগে মুখ লাল হয়ে ওঠে মহিলার।
” আই মিন হোয়াট আই সে ” নির্বিকারভাবে বুধাদিত্য বলে ওঠে।
” আমাদের প্রস্তাবে আপনি তাহলে রাজি নন?” রাগে গরগর করতে করতে মহিলা জিজ্ঞেস করেন।
” না, আপনার সঙ্গে আমার কোন কথা হবে না। কোন ভাড়াটে মহিলার সঙ্গে আমি কথা বলতে রাজি নই।”

” নাউ, ইউ উইল সি, হোয়াট লিডস্ টু হোয়াট এফেক্ট। আমি এবার চ্যাঁচাব। অফিসের মধ্যে সিন ক্রিয়েট করব। বলব আপনি একা পেয়ে আমাকে মোলেস্ট করেছেন। দেখবেন?
বলে মহিলা চেয়ার থেকে উঠে পড়ে মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে কামিজের দুটো বোতাম পটপট করে খুলে দিলেন। ভিতরের ব্রা টা দেখা যাচ্ছে। অমন সুন্দরী মহিলার মুখের ভাব নিমেষে পাল্টে গেল। এখন একটা ভ্যাম্পায়ারের মত দেখতে লাগছে।
গার্ড নিয়ে নিয়েছে বুধাদিত্য। প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতিটি স্টেপ সে লক্ষ্য করছে। বক্সার মহম্মদ আলির সেই বিখ্যাত ছড়াটা মনে পড়ে গেল।
” ফ্লোট লাইক এ বাটারফ্লাই অ্যান্ড স্টিং লাইক এ বী
ইয়োর হ্যান্ডস্ কান্ট হিট হোয়াট ইয়োর আইজ কান্ট সি”

” আরে বসুন, বসুন। প্লিজ ডোন্ট গেট সো এক্সাইটেড। আমার সম্মানহানি করে চ্যাঁচামেচি করে কোন লাভ নেই। তাতে আপনার ওই ভার্গবের কোন সুরাহা হবে না। তার চেয়ে আমি যা বলি মাথা ঠান্ডা করে শুনুন। ভার্গব আমার জন্য আপনাকে দিয়ে হানি ট্রাপ পেতেছে। আর আমি আপনার জন্য কী ট্রাপ পেতে রেখেছি সেটা জানেন? বুবি ট্রাপ। অজান্তেই তাতে পা দিয়ে ফেলেছেন ম্যাডাম। এবার আপনাকে দেখাব ট্রাপিজের খেলা। ট্রাপের ট্রাপিজ।

” তার মানে?” এবার মহিলার অবাক হওয়ার পালা।
” এই যে হাতের পেনটা দেখছেন এটা একটা স্পাই ক্যামেরা। যা দিয়ে ওইসব স্টিং অপারেশন হয়। দারুণ জিনিস।আপনার হাবভাব, চালচলন, কথাবার্তা সব এখানে ভালভাবে রেকর্ড হয়ে আছে। আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না। পুলিসে আমিই খবর দেব। আর ডিসিডিডি নীলেশ সরকার আমার বন্ধু। এটা পুলিসের হাতে গেলে কী হবে জানেন? “
শুনে কেমন হতভম্ব হয়ে গেলেন। এমন যে হতে পারে এটা ওঁর ধারণার বাইরে।
মহিলা পুরোপুরি নকআউট। কী বলবেন কী করবেন বুঝতে পারছেন না। থপ করে বসে পড়লেন চেয়ারে।

” নাউ দি গেম ইজ ওভার। জাস্ট গো, গেট লস্ট” গমগমে গলায় বুধাদিত্য বলে ওঠে।
বেশবাস সামলে নিয়ে মাথা নিচু করে মহিলা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

না, বুধাদিত্যকে এবার উঠতে হবে। মেয়ের ফরমাশ মত ক্যাথেলীনে এখন যেতে হবে। না, আজ আর পার্ক স্ট্রিটে গিয়ে কাজ নেই। নিউমার্কেটের দিকেই যাওয়া যাক। ওখানে নাহুমের দোকান। ওদের প্লামকেক উইথ আমন্ড আইসিং আর ফ্রুটস্ কেক দুটোই নিয়ে যাবে আজ মেয়ের জন্য।
গাড়িতে উঠে বুধাদিত্য ড্রাইভারকে বলে, ” চল, নিউমার্কেট।”

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: