অস্কার উইনার ‘প্যারাসাইট’: কেন ?

সুদীপ্ত নাগ

রোজকার মত আমার বাড়িতে আড্ডা বসেছে । কয়েকদিন হল কিছু পাড়ার কলেজ পড়ুয়ার সাথে আমি আর বাবু  সিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকেছি । আর আমার বাড়িতে এসে অবাধ পাগলামো করা ছাড়া ও এদের আরেকটা ইন্ট্যারেস্ট হল সিনেমা নিয়ে একটু আধটু আলোচনা হয়েই থাকে । যাই হোক তুতান আজ বেশ জোর গলায় বলছিল – ভাই ‘প্যারাসাইট’ বলে একটা হেবি বই হয়েছে সবাইকে বলছি দেখতে ।

শুনেই সায়ন উত্তেজিত হয়ে উঠল এবারের অস্কার উইনার ? বাবু মাথা নাড়ল – শুধু বেস্ট ফিল্মই নয় , বেস্ট ডিরেক্টার , বেস্ট অরিজিনাল স্ক্রিন প্লে এই ক্যাটাগরিগুলোতেও পুরষ্কার পেয়েছে ‘প্যারাসাইট’ । এই প্রথম কোন ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ সিনেমা অস্কার পেল বেস্ট ফিল্ম ক্যাটগোরিতে । জিতু বলে উঠল – আরে আজকে এই সিনেমাটা নিয়ে একটু আলোচনা হোক কি বল গাল্লুদা ? আমি গম্ভীর মুখ করে বললাম – বেশ , তাহলে আজ বরং ‘গি সুং চুং’ নিয়েই আলোচনা করা হোক । তুতান একটা খাবি খেল -সে আবার কি ? কি খটমট নাম !

আমি হাসলাম – আরে এটাই তোদের ‘প্যারাসাইট’ র কোরিয়ান নাম । প্যারাসাইটের আলোচনার আগে একটা জিনিস নিয়ে ভাব যে দুম করে কোরিয়ান সিনেমা কি পপুলার হয়ে উঠেছে আজকাল । ১৯৯০ সালের আগে সাউথ কোরিয়ান সরকার সেন্সারশিপে জোর দিয়েছিলেন যার ফলে  পলিটিক্যালি কারেক্ট ছবিকে সেন্সর বোর্ড প্রাধান্য দিচ্ছিল আর নর্থ কোরিয়াকে নিয়ে পজিটিভ ছবি বা কমিউনিজমকে গুরুত্ব দিয়ে বানানো ছবি সেন্সর বোর্ড আক্রমণ করেছিল।

বিট্টু চেঁচিয়ে উঠল – ইয়ার্কি নাকি ? আর্টিস্টদের কোন ফ্রীডম নেই ?

আমি ওকে শান্ত করলাম আরে তার পরে শোন কি হল । অন্য দিকে বিদেশি ছবির থেকে ডোমেস্টিক ছবির বেশি স্ক্রিনিং হত সাউথ কোরিয়াতে। ১৯৮৮ তে প্রেসিডেন্ট রোহ তাইউ এই নীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হলেন মোশান পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশানের চাপে পরে । অ্যার অমনি টোয়েনটিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্স বা ওয়াল্ট ডিজনিরা খুলে ফেলল তাদের ডিস্ট্রিবিউশান অফিস সাউথ কোরিয়াতে ।

ফলে কোরিয়ার ছবি গুলো লস করতে শুরু করল । কিছুদিনের মধ্যে সরকার থেকে জোর দেওয়া হল কোরিয়ার কালচারাল এবং ইকনমিক ডেভেলাপমেন্টের দিকে । কোরিয়াতে আগেও আন্ডারগ্রাউন্ড ফিল্ম কালচার ছিল আর বিদেশি ছবি ঢোকার পর সিনেমা কালচার আরও  ডাইনামিক হল । সেন্সারশিপের চাপ কমল বলে পরিচালকদের স্বাধীনতা আর ক্রিয়েটিভিটি বাড়তে লাগল । এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল যাকে আমরা কোরিয়ান নিউ ওয়েভ বা ‘হ্যালু’ বলে জানি ।

এই কোরিয়ান নিউ ওয়েভ গ্লোবাল সিনেমার ছাতার তলায় কোরিয়ার ট্র্যাডিশানাল আর মডার্ন পপ কালচার নিয়ে হলিউড বিপরীত ছবি বানাতে লাগল । এই মুভমেন্টের পরিচালকদের কাজের ধরন খুব একটা এক ধাঁচের নয় তবে কিভাবে সাপ্রেশানে থাকা কোরিয়ান মানুষেরা সময়ের সাথে বদলাচ্ছে তা অনেক ছবিতেই উঠে এসেছে । ‘গ্যাং নাম স্টাইল’ ভিডিওটি প্রথম কোরিয়ার একটা প্রোডাক্ট যেটার একটা বিশাল গ্লোবাল ক্রেজ তৈরি হয় ।

সায়ন পাশ থেকে বলে উঠল সিনেমার ক্ষেত্রে কি পার্ক চ্যান উকের ‘ওল্ড বয়’ কে ফার্স্ট বড় গ্লোবাল হিট বলা যায় ?  আমি সায় দিলাম -একদম ঠিক ধরেছিস । এই সাউথ কোরিয়ান সিনেমা এরপর ধীরে ধীরে এশিয়া- ইউরোপ-আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল । আর আজকে বন জুন  হো -র মত পরিচালকের সিনেমা কানে ‘পাম ডি ওর’ বা ‘অস্কার’ জিতে ফেলল ।

তুতান মাথা নাড়ল – মানে তুমি বলতে চাইছ যে এই হ্যালু না হলে এসব সিনেমা নিয়ে ইন্টারন্যাশেনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল গুলো পাত্তাই দিত না কোরিয়ান সিনেমাকে ?

আমি হাসলাম – তাই নয় কি ? বিদেশি ছবি ভাল তো কম হয়নি আর তবু বেস্ট ফিল্ম ক্যাটাগরিতে কে অস্কার পেল ভাই ! আমার মনে হয় কোরিয়ান সিনেমার পপুলারিটি আর জনারা (genre) সিনেমা নিয়ে গ্লোবাল দর্শকের মাতামাতি একটা বড় কারণ অস্কারের এই দিকে ঝোঁকার । কই লাভ ডিয়াজ, আলমোদোভার বা পেদ্রা কোস্তার সিনেমা কে তো অস্কার কমিটি কখন বিচার করে দেখেনি !

আসল কথা হল বং জুন হো শুধু একজন কোরিয়ান পরিচালক নন তিনি ‘ওকজা’ ইংলিশ এবং কোরিয়ানে রিলিজ করেন নেটফ্লিক্সের মত পপুলার সাইটে । তার আগে  ‘স্নো পাইরেশার’ ছবিটি বানান ইংরাজিতে । তো এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে তিনি তারান্তিনো বা মার্টিন স্করসিজের দৌলতে চেনা নাম হয়ে উঠেছিলেন আর তার সাথে সাথে কোরিয়ার বাইরে ছবি তৈরি করার জন্যও তার পরিচিতি বাড়ছিল পশ্চিমে ।

বিট্টু বলল -তা হলে তুমি বলছ যে সিনেমাটা ফালতু , লবি করে উঠেছে ? আমি একটা সিগারেটে টান মারলাম ( বিধিমত সতর্কীকরণ – ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর ) – দ্যাখ লবিবাজি থাকে তা অনেকদিন আগেই ফেলিনি-র মত পরিচালক বলে গেছেন,  কিন্তু লবি থাকলেও সিনেমাটা আমার মন্দ লাগেনি । আমি শুধু তোদের এটাই বলতে চাইছিলাম যে এখন ফেস্টিভ্যালে অফবিট ছবির চেয়ে কমার্শিয়াল ভাল ছবিও স্থান পাচ্ছে । আর তাই ভেনিসে ‘জোকার’ গোল্ডেন লায়ন বা কানে ‘প্যারাসাইট’ পাল্ম ডি ওর’ পাচ্ছে ।

তুতান বিরক্ত হয়ে বলল – এত ইতিহাস ভাল লাগছেনা,  এবার সিনেমাটা নিয়ে কিছু বল । আমি ওর দিকে তাকালাম – দেখেছিস ? তুতান কাঁচুমাচু মুখে  না বলল । আমি হাসলাম – না দেখলে আর কি আলোচনা করব, যাই হোক তোরা বলছিস যখন স্পয়েলার না দিয়েই একটু বলি ।

প্যারাসাইটের গল্প হল এমন একটা বিষয় নিয়ে যেটা একটা চিরন্তন সমস্যা । আর সেই সমস্যাটা হল ক্লাস কনফ্লিক্ট । দুটো পরিবারের গল্প নিয়ে এই সিনেমা যেখানে একটা পরিবার দরিদ্র ও আরেকটি ধনী । পরিচালক বলেছেন যে তিনি ফ্রেঞ্চ ফাইন আর্ট টেকনিক ‘Decalomanie’ র দ্বারা অনুপ্রানিত হয়ে ছবিটি বানান । এই টেকনিকে কালি দিয়ে কাগজে ছবি এঁকে সেটাকে ফোল্ড করলে ছবিটি অন্য সাইডেও প্রতিফলিত হবে ।

আর কাগজের দুটো সাইড একই রকম দেখালেও ভাল করে দেখলে বোঝা যাবে দুটো সাইড কখনই এক নয় । পরিচালক এই ভাবেই দুটো ফ্যামিলি-র তফাত দেখাতে চেয়েছেন যদিও বেসিক মোটিভ এক হলেও আমার মতে প্রথম থেকেই কালচারাল পয়েন্ট অব ভিউ থেকে আমরা ফ্যামিলি গুলিকে অবশ্যই আলাদা করতে পারব । ছবিটিতে রিয়ালিজিমের থেকেও সিম্বলিক দিকটাতে জোর দেওয়া হয়েছে । তাই বন্ধুর দেওয়া স্কলার রকটা আঁকড়ে থাকে গরিব ছেলেটা, কারণ এই রকটা বন্ধুরই সিম্বল ।

এই রকটা আঁকড়ে সে বন্ধুর মতই সফল হয়ে উঠতে চায় জীবনে । অন্যদিকে ধনী পরিবারের বেসমেন্টটাও একটি সিম্বল পরজীবীদের আস্তানার । বড়লোক মালিকটির দুর্গন্ধ সহ্য না করতে পারা ইঙ্গিত করে যে তিনি ওই সফিসটিকেটেড আরামপ্রিয় কাঁচ তোলা গাড়ি বা বিশাল লনযুক্ত বাড়ির ভেতরেই নিজেকে আবদ্ধ রেখে নিজের ক্লাস মেনটেন করতে চান । এই ছবিতে সিঁড়ির ধাপ গুলো খুব তাৎপর্যপূর্ন হয়ে উঠেছে,  কারণ এই সিঁড়ির ধাপ ইনফ্লিটারেশানকে ইঙ্গিত করছে ।

এই বেসমেন্টের সিঁড়ির ধাপের মাধ্যমে অবশ্যই পরিচালক কিম কি ইয়াংয়ের  ‘দ্য হাউজ ম্যাড ‘ ছবিটিকে সূক্ষ্মভাবে কোট করেছেন । যে ছবিতেও সিঁড়ির ধাপ এই একই পারপাসে ব্যবহার হয়েছিল । ছবির পরিচালক শুধু একজন স্কিলড ডিরেক্টার নন তিনি কিন্তু সেই পরিচালকদের মধ্যে পড়েন যারা নিজেদের সিনেমা সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন ।

তাই বং একটা খুব সুন্দর কথা বলেছেন প্যারাসাইট নিয়ে – এই ছবি হল ভিলেন ছাড়া ক্রাইম আর জোকার ছাড়া কমেডি । অর্থাৎ তাঁর মতে ক্যারেক্টারগুলি ইনোসেন্ট এবং নাইভ । সমাজের পরিস্থিতি অনুযায়ী তারা কাজ গুলি করছে , তারা সমাজের ভিক্টিম তাই তাদের কাজ গুলি উদ্দেশ্য প্রনোদিত খারাপ কাজ নয় । অন্য দিকে চরিত্রগুলি বোকা নয়, তারা সহজ সরল ।

তাই ধনী পরিবারের স্ত্রী হয়ত পড়াশোনায় ভালই ছিলেন কিন্তু তবু তিনি জীবনে কম হার্ডশিপ ফেস করেছেন বলে সহজেই তিনি সবাইকে বিশ্বাস করে ফেলেন । তবে পরিচালকের সাথে আমি পুরোপুরি সহমত নই এই ব্যাপারে । আমার মনে হয় কন্টেমপোরারি কালচারের ছায়া এখানে বেশি । তাই মা মেয়ের টিউটারকে সামনে বসে পরখ করতে চান কিন্তু আসলে তিনি তাঁর কর্তব্য পালন করছেন মাত্র ।

বিশেষত তাঁর শিশুর এলোমেলো ছবি আঁকা কে আর্টের তকমা দেওয়া অনেকটাই আমাদের বাবা মা দের নিজেদের ছেলে-মেয়েদের বিশেষ ক্ষমতাশালী প্রমাণের চেষ্টা করে বাহবা নেওয়ার ট্রেন্ডের দিকে ইঙ্গিত করে । এবার চলে আসি সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং দিকটায় । সেটা হল ছবির জনারা । ছবিটা শুরু হয়  কমেডির দিক থেকে তারপর আস্তে আস্তে একটা ডিস্টোপিয়ান ন্যারেটিভের দিকে এবং তারপর কিছুটা থ্রিলার এবং অবশেষে মনস্টার ফিল্মের জনারাতে (genre) ঢুকে পড়ছে ।

বাবু বলল – আমার তো মনে হয় ‘স্যাটায়ার’ ও বলা যায় । আমি সায় দিলাম – হ্যাঁ , অবশ্যই সেটার মধ্যেও ধরাই যায় । সায়ন আড়মোড়া ভাঙল – এবার একটু টেকনিক নিয়েও আলোচনা হোক । আচ্ছা প্যারাসাইটে দেখলাম শট কাউন্টার শটের বদলে প্যান ইউজ হয়েছে বা ক্যারেক্টারদের সাথে সাথে ক্যামেরা ফলো করছে । এরম টেকনিক কেন ইউজ করেছে ? আমি একটু ভেবে বললাম – আমার মনে হয় এক নম্বর তো হল এটা হলিউড এডিটিংয়ের থেকে একটু আলাদা আর প্যান আর ফলোইং  শটস ইউজ করার পারপাসটা হল দর্শককে বেশি করে ড্রামার মধ্যে ইনভলভ করা আর স্টাইলিশ কন্সট্রাকটেড এডিটিংয়ের বদলে একটা অরগ্যানিক ফিল দেওয়া । এছাড়া প্যান শটের মাধ্যমে স্পেসটাকে খুব ভাল ভাবে দেখানো যায় ।

যেমন ধর ঘরে কেউ কথা বলছে আর দরজার কোনায় দাঁড়িয়ে কেউ শুনছে এটা কখনই একটা আলাদা শটে চমক দেবেনা যেভাবে দুম করে ক্যামেরা মুভ করতে করতে একটা সারপ্রাইজ দেবে । তাই সাসপেন্স বা স্পেস এক্সপ্লোর করাতে ব্যবহার হয়েছে কিন্তু বেশিটাই ধনী পরিবারের ঘরে আর দরিদ্র পরিবারের ঘরে আমরা এত প্যান দেখিনা কারণ তাদের ঘর এবং মনের স্পেস ছোট । লক্ষ্য করে দ্যাখ যখন থেকে সবাই ধনী পরিবারের কাছে এন্ট্রি পেল তখন থেকে তাদের সঙ্কীর্ন বাড়ির ভেতর একটু একটু ক্যামেরা মুভ করতে শুরু করল,  কারণ তখন অলরেডি তাদের স্বপ্নের স্পেস বাড়তে শুরু করেছে ।

আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করেছিস কিনা জানিনা । সেটা হল পরিচালক একটা বিশেষ টেকনিক ইউজ করেছে প্রথম দিকে । ক্যামেরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে ক্রমশ ক্যারেক্টার গুলির কাছে । এর মাধ্যমে একটা অস্থির এবং অনিশ্চিত  অবস্থা হয়ত তুলে ধরতে চেয়েছেন পরিচালক কারণ যখন থেকে কিমের পরিবার স্ট্যাটাস পেল ধনীদের ঘরে তবে থেকে ক্যামেরা মুভমেন্ট স্লো এবং অনেকটাই স্ট্যাটিক হয়ে গেল ।

সিনেমার শুরুর ফ্রেম গুলিতে আমরা দেখি হাই অ্যাঙ্গেল শটে গরিব ছেলেটিকে এবং ধনীর বাড়ি ঢুকবার সময় তাঁকে লো অ্যাঙ্গেল শটের মাধ্যমে দ্যাখান হয় ।

লো অ্যাঙ্গেল

মানে প্রথমে নিচুতে এবং পরে ওপরে অনেকটাই তাঁর স্ট্যাটাস পরিবর্তনের ওপর ইঙ্গিত দেয় ।

অর্নব বলল – আর সানলাইটের ব্যবহারটা নিয়েও কিছু বল । আমি ঘাড় নাড়লাম – নিশ্চয়ই , লক্ষ্য করার বিষয়ে যে বেসমেন্টে অর্ধেক আলোও ঢোকেনা তাই দিনেরবেলাতে আলো জ্বালাতে হয় ।  কিন্তু উপরের ঘর গুলোতে আলোর ছড়াছড়ি । আর অন্যদিকে গরিব পরিবারের বাড়ির কাছে স্ট্রীট ল্যাম্পের নিভু নিভু আলো । এই আলোর ব্যবহারও স্ট্যাটাসের হাইয়ারারকি বোঝাচ্ছে। 

আলোর ব্যবহারও স্ট্যাটাসের হাইয়ারারকি বোঝাচ্ছে (হাই অ্যাঙ্গেল)

আচ্ছা অনেক বকলাম এবার তোরা বল দেখি এই সিনেমার ফ্রেমিংয়ে কিভাবে লাইন সাজানো হয়েছে ? লাইন ? সবার মাথায় হাত পড়ে গেল । সায়ন আমতা আমতা করল – আসলে অত খুঁটিয়ে তো দেখিনি । বাবু মুচকি হাসল- তুই কি বলতে চাইছিস আমি বুঝতে পারছি । আমি ইশারা করলাম – তাহলে আর কি বলে ফেলুন ।

বাবু গলা ঝেড়ে শুরু করল – আরে কিছুই না দেখবি যে একটা লাইনের মাধ্যমে অনেক জায়গায় ক্লাস ডিফারেন্সটা বোঝানো হয়েছে । কখনো দুটি ক্যারেক্টারের মাঝে পিলারের কোনা দিয়ে কখনো বা জানলার দুটো পাল্লার মাঝখানের লাইন দিয়ে । জানলারটা খুবই চোখে পড়ার মত কারণ একটা পাল্লার সাইডে গরিব ছেলেটি আর সেই পাল্লার ভেতর থেকেই দেখা যাচ্ছে পরিচারিকাকে আর অপর পাল্লায় দেখা যাচ্ছে ধনী মহিলাটিকে ।

লাইনের মাধ্যমে ক্লাস ডিফারেন্স

এই সিনেমার এডিটারের মতে বং জুন হো-র স্টোরি বোর্ড এতটাই গোছানো এবং প্যান শটস ছাড়াও এত এক্সট্রা শটস ছিল যে সাজানোর  নির্বাচনে খুব একটা সমস্যা হয়নি । স্ক্রিপ্ট পরিকল্পিত ভাবেই সম্পাদনা এগিয়েছে শুধু কিছু অল্টারনেটিভ ক্রস কাটিং শটস  ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন পরিচালক এডিটিং টেবিলে । ছটফটে বিট্টু আর পারছিলনা, বলে ফেলল – অনেক এসব শুনলাম এবার ঝেড়ে কাশো তো যে সিনেমাটা পলিটিক্যাল কিনা ? আমি হাসলাম – দ্যাখ , ক্লাস কনফ্লিক্ট নিয়ে তার ওপর আবার ক্যাপিটালিজম কে সেন্টারে রেখে । তাই বলতেই পারিস । আমার যেটা ভাল লেগেছে সেটা হল সাম্প্রতিক সমাজ কে সামনে রেখে একটা রূপক গল্পের মাধ্যমে একটা চিরন্তন সমস্যা তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছে কিন্তু খুবই সহজ ঢঙে একটা ব্ল্যাক কমেডির মাধ্যমে ।

তাই সিনেমাটার ইউনিক কনটেন্ট আর ট্রিটমেন্টের জন্য একটা বড় অ্যাপিল তো আছেই যদিও সারা পৃথিবীতেই অনেক ইন্টারেস্টিং কাজ হচ্ছে কিন্তু সেগুলি মার্কেটিংয়ের অভাবে ব্যবসা বা রেকগনাইজেশান পাচ্ছেনা । এই কারণেই আমাদের সত্যজিৎ রায় যা পেয়েছিল তা হয়ত ঋত্বিক ঘটক পেলনা । তুতান বলল – থাক থাক এত কিছু বলে টলে এখন আবার তোমার বড় বড় পরিচালকদের দুঃখের কাহিনী না শুনিয়ে চল একটু ‘প্যারাসাইট’ দেখাও আমাদের । তুতানের কথা শুনে আমি ল্যাপটপ আনতে উঠলাম আর আপনারাও এই ফাঁকে চট করে চালিয়ে দেখে নিন আমি কতটা ঠিক বা ভুল বললাম ।

আপনার মতামত আমাদের প্রেরনাঃ-

%d bloggers like this: