মৌনব্রত

অঙ্কুশ

আমার সাইকেলের সিটের ওপর ফোনটা রেখে অপেক্ষা করে চলেছি তিনজনে। সময় যেনো কাটতেই চায়না। ফোনও আসছেনা৷ টেনশনে হার্টরেট ডবল হয়ে গেছে…

বিল্টু,শুভ আর আমি। ছোট্টবেলা থেকে বন্ধু। প্রথম স্কুল থেকে প্রথম **-সব একসাথে। তিনজনের মধ্যে মিলও অনেক। খেলতে তিনজনে ভালোবাসি,পাড়ায় তিনজনই পপুলার,যার যা বিপদ আপদ ফাইফরমাশ-আমাদের ডাক আসবেই।

শুধু একটাই ব্যাপারে আমাদের দুর্বলতা। পড়াশোনা। সব কাজে এতো এনার্জি আমাদের,পড়তে বসলেই কুম্ভকর্ণ কেনো ভর করে জানিনা। মা-বাবা যে চেষ্টা করেনি তা নয়,প্রথমে মারধর পরে শাকসবজী,ব্রেনোলিয়া। আমরা তো সেই কবেই হাল ছেড়ে দিয়েছি,ওরাও শেষে ক্ষান্ত দিয়েছেন।

তো টেনেটুনে কোনরকমে আমরা মাধ্যমিকটা পাশ করলাম। সমস্যা হলো ইলেভেন এ উঠে। ইলেভেনে উঠে বুঝলাম সিলেবাস পুরো সমুদ্র। সাঁতারও জানা ছিলোনা আমাদের। ফলে পড়লাম গাড্ডায়।

তিনবছর টানা ফেল করে আগেরবছর হ্যাট্রিক হয়ে গেছে।

এইবছরও টুকে-টাকে কিছু একটা পরীক্ষা দিয়েছি। এখন যাই হোক,কাল রেজাল্ট।

তো এই কমাস আগে নতুন হেডমাস্টার এসেছে কলকাতা থেকে। স্যারটা ভীষন দয়ালু। বলে সবার মধ্যে আলাদা আলাদা ট্যালেন্ট আছে,আমরা দেখতে পাইনা শুধু। আমরা ভাবতে বসেছিলাম কি ট্যালেন্ট আছে আমাদের মধ্যে। আতসকাঁচে নিজের ট্যালেন্টকে বড়ো করে খুঁজতে গিয়ে আতসকাঁচ ভেঙে গেছিলো,আমরা ট্যালেন্ট খুঁজে পাইনি।

তাও স্যার বলতো। আমরা মাথা নাড়াতাম। স্যার যখন বলছে আছে নিশ্চয়। সে তো আমরাও ভূত দেখতে পাইনা,তাবলে কি ভূত নাই? আছে আছে,ট্যালেন্ট নিশ্চয় আছে।

তো স্যার কাল তিনজনকে বললো,বাবুরা তোমরা যা পরীক্ষা দিয়েছো,নম্বর যে দেবো তার জায়গাটুকু পাওয়া যাচ্ছেনা। দিয়ে বিল্টুকে জিজ্ঞেস করলো,বাংলা ফার্স্ট পেপারে তুই খারাপ লিখিসনি,সেকেন্ড পেপারে কিছু তো লিখতে পারতিস? কটা লাইন যে লিখেছিলি সেটাও সুন্দর করে কেটে দিয়েছিস,মানেটা কি?

বিল্টু বললো,স্যার যা লিখছিলাম তার থেকে মনে হলো পরিষ্কার পরিচ্চন্নতার ৫ নম্বরটা পেলে বেশি লাভ হবে। তাই আবার যত্ন করে কেটে দিয়েছি।

স্যার চুপ করে ছিলো অনেকক্ষন। সেদিন অলোক যখন দারুন একটা গান শোনালো তখনও স্যার এরকম চুপ করেছিলো। তারপর বলেছিলো,তোর গানের ট্যালেন্ট আছেতো বেশ।

এটাও কি তবে কোনো ট্যালেন্ট? কতক্ষন হয়ে গেলো,স্যারের মুখে টুঁ শব্দ নেই।

স্যার আর কথাই বলতে পারেনি গতকাল। আজ আমাকে ফোন করেছিলো দুপুরে,বললো ত্রিমূর্তি একজায়গায় জড়ো হয়ে ফোন করতে,একসঙ্গে কথা বলবেন তিনজনের সাথে।

স্যারকে ফোন করায় স্যার বললো ১০ মিনিট পর কলব্যাক করছে। শুভ তো সাইলেন্ট মোডেই আছে,আমি আর বিল্টু কথা বলছিলাম।

ও,শুভর কেসটা বলা হয়নি। শুভর বাড়ির লোক প্রচন্ড ধার্মিক। সাতদিনে পাঁচদিন নিরামিষ হয়।

তো ওদের চেনা এক জ্যোতিষী আছে। তিনি নাকি যা বলেন তাই হয়। ওরা নাকি বহুদিন ধরে ওনার ভক্ত।

তো ফেলের হ্যাটট্রিক করার পর শুভর বাবা জ্যোতিষীর পায়ে লুটিয়ে ডুকরে কেঁদে বলেছিলো এবারটা অন্তত উতরে দিতে। রেজাল্টের তখন আর সাতদিন বাকি।

জ্যোতিষী একটা মাদুলি হাতে বাঁধতে দিয়েছিলো। আর বলেছিলো ৭ দিন মৌনব্রত পালন করতে!

কি! শুভ আর মৌনব্রত! শুভ সাতদিন খাবার ছাড়া বাঁচতে পারে,জল ছাড়া বাঁচতে পারে,অক্সিজেন ছাড়াও বেঁচে নেবে হয়তো,কিন্তু কথা না বলে?! নৈব নৈব চ!

আমার ফোনে ওর নম্বর সেভ করা ‘subho bokbokom’ বলে। একবার ও বকতে শুরু করলে সকাল পেরিয়ে যায়,দুপুর গড়িয়ে যায়,সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়,কিন্তু ওর কথা থামেনা। মানুষের হবি থাকে বাগান করা,গিটার বাজানো,গেম খেলা। ওর হবি কথা বলা। যার সঙ্গে পারা যায় তার সঙ্গে কথা বলা। যে বিষয় পাওয়া যায় সেই বিষয়ে কথা বলা। কথা বলা চাই,ব্যস।

সেই শুভ নাকি করবে মৌনব্রত! তাও আবার সাতদিনের জন্য!

শুভ মুখ লটকে গলা ঝেড়ে বলে,না ভাই করতে হবে এটা। পাশ করার জন্য সব করা যায়।

আমরা বললাম ভাই তুই সব কর কিন্তু এটা করিসনা। তুই চুপ করে বসে,এটা জাস্ট ভাবতে পারছিনা।

যাইহোক,দুর্গানাম নিয়ে শুভ ঝাঁপিয়ে পড়লো চুপ থাকার পরীক্ষায়। প্রথম দিন তাও ঠিক ছিলো,দ্বিতীয় দিন থেকে কথা বলার জন্য ছটফট করে ছেলেটা। মুখ দিয়ে কথা বেড়িয়েই যায় প্রায়। মুখে হাত চেপে ভসে থাকা। পাড়ার রথীনদা মদ ছাড়ার সময় এরকম করতো বটে।

আমরাও বেশ কষ্ট পেতাম। শুভ সামনে চুপচাপ বসে,এটা মেনে নিতে পারতামনা।

যাইহোক,আজই ওর শেষদিন। আর কঘন্টা পেরোলেই ১২ টা বাজবে,তারপরেই মুক্তি।

-এই এই ফোন ধর,স্যার ফোন করেছে…

ফোন ধরি।

-হ্যালো স্যার,বলুন…

-কি বলি বলতো? কাল তোরা যা বললি,আমি তো কঘন্টা পুরো চুপ করে গেছিলাম। না বাবা অনেক বড়ো ভুল হয়ে গেছে তোদের মধ্যে ট্যালেন্ট দেখে আমার,ক্ষ্যামা দে।

-কিন্তু স্যার…

-কিন্তু টিন্তু কিচ্ছু না। যা পরীক্ষা দিয়েছিস তাতে ৩ বার কেনো,১০ বার দিলেও পাশ করতে পারবিনা। কিন্তু তোদের কথাটাও ভাবা উচিত একবার।

শোন একটা শর্তে তোদের পাশ করানোর কথা ভাবতে পারি।

-স্যার,আপনি কিডনি চেয়ে দেখুন,সেটাও দিয়ে দেবো।

-হ্যাঁ রে,তারপরে জেলে যাই আরকি। আর আমার আইফোন কেনারও কোনো শখ নাই।

শোন,তিনজন প্রমিস কর যে টুয়েলভে গোড়া থেকে পড়বি। প্রত্যেকদিন পড়বি,পড়া দিবি…

আমার কিছু বলার আগে বিল্টু বলে ওঠে।

-স্যার,আমি প্রতিজ্ঞা করছি এবার পাশ করলেই টুয়েলভে জান-প্রাণ দিয়ে পড়বো। সকালে পড়বো,দুপুরে পড়বো,রাতে পড়বো,রবিবার পড়বো,পুজোয় পড়বো,জন্মদিনে পড়বো। কাল পাশ করলে এসেই পড়তে বসবো। প্রতিজ্ঞা স্যার।

আমি হ্যাঁ করে চেয়ে থাকি বিল্টুর দিকে। মোটামুটি এরকমই কিছু একটা ক্লাস নাইনে ফেল করার পরেও বলেছিলো না?

স্যার খুশি হয়। আমাকে ফোন দিতে বলে।

-এবার তুই বল

-স্যার আমিও প্রতিজ্ঞা করছি বিল্টু যতটা পড়বে,আমিও ততোটা পড়বো।

আমি মিথ্যা একদম বলতে পারিনা। যাইহোক,স্যার খুশি হয়। শুভকে ফোন দিতে বলে।

মেরেছে!

শুভর তো আজ মৌনব্রত!

শুভ ফোন হাতে নিয়ে চুপ করে থাকে।

-কিরে শুভ,ওরা তো বললো,তুই বল পড়বি তো? দেখ স্কুলের সম্মানের ব্যাপার আছে,এইচ এস এ ফেল করলে কি মুখ দেখাবো আমরা? তাই কথা দে পড়বি,আমি পাশ করানোর চেষ্টা করবো তবে।

শুভ অসহায় চোখে আমাদের দিকে তাকায়। এতো কষ্ট করে এতোদিন সহ্য করলো,আর মাত্র কঘন্টা বাকী! ধর্মসংকটে পড়ে যায়।

-কিরে কিছু বলছিসনা কেনো,পাস করার ইচ্ছা নাই নাকি?

শুভ প্রায় কেঁদেই ফেলে। আমরা ফোনটা হাতে নিই।

-স্যার স্যার আসলে ওর–

-থাম তোরা,পড়াশোনাও করবি না,আবার মিনিমাম রেসপেক্টটকু নাই,স্যার ফোন করে অপেক্ষা করছে,সময়ের দাম নাই না? প্রতিজ্ঞা পূরণ নাই বা করতি,চেষ্টা করতি,বলতে কি যাই আসে?

আমরা বোঝানোর চেষ্টা করি। স্যারের আঘাত লেগেছে মনে। ফোন কেটে দেয়।

শুভ প্রায় কেঁদেই ফেলবে। আবার আওয়াজও করতে পারেনা।

যাইহোক,কোনরকমে রাতটা কাটে। এক সেকেন্ড ঘুম হয়নি কারো। বারোটা বাজতেই শুভকে ফোন করি,কতদিন পর ওর আওয়াজ শুনলাম। ওর বাবা নাকি বলেছে কাল পাশ করলে গুরুজীকে ৫০০১ টাকা দক্ষিনা দেবে।

পরেরদিন রেজাল্টের পালা। দইয়ের টিকা লাগিয়ে তিনজন জড়ো হলাম।

আমার বাবা বলে দিয়েছে,হয় টুয়েলভে ওঠার লাইসেন্স আনবি,আর নাহলে টোটোর লাইসেন্স করে দেবো।

বিল্টু আরও হতাশ। বলে ফেল করলে সুইসাইড করতে হবে।

শুভ কতদিন পর নিজের ফর্মে।

-সুইসাইড? ফেল করার জন্য? এতো কাপুরুষ কেনো ভাই তুই? জীবন নিজেই একটা পরীক্ষা,একটা পরীক্ষায় ফেল করলে কি সব শেষ? জীবনে লড়াইটাই সব,বারবার পড়বি আবার উঠবি….

অন্যদিন হলে তাও শুনে নিতাম। আজ শুভর ডায়োলোগগুলো জাস্ট সহ্য হচ্ছিলোনা। একথা-ওকথা ভাবতে থাকি। কিন্তু রাস্তায় টোটো চলতে দেখলেই বুকটা কেমন করে উঠছে। থাক,শুভর ডায়োলোগই শুনি।

রেজাল্ট টাঙিয়েছে। সবার ভীড়। কেউ বেরিয়ে আনন্দে বাতাসে ঘুসি ছুড়ছে,কেউ হাসিমুখে বাড়িতে ফোন করছে। আমরা এগিয়ে গেলাম রেজাল্টের দিকে।

ধক ধক। ধক ধক। ধ-ক-ধ-ক!

বিল্টু…পাশ…আমি…পাশ…শুভ…ফেল!

থ্রি ইডিয়টসের কথা মনে পড়ে যাচ্চজিলো। পাশের আনন্দ টেরই পেলাম না। শুভ ফেল!

শুভ আবার মৌনব্রত শুরু করলো। রেজাল্ট দেখে পুরো গুম মেরে গেলো। আমি আর বিল্টু আলোচনা করলাম,হেডস্যারকে বুঝিয়ে বলবো কেনো শুভ কথা বলেনি। স্যার রেগে গিয়ে এমনটা করেছেন। বুঝালেই বুঝবেন। স্যার ভালো মানুষ। আর শুভ পাশ না করলে আমরাও পাশ করতাম না।

শুভ তাও একটা আশার আলো দেখে। হেডস্যারের রুমের দিকে পা বাড়াতেই সেই জ্যোতিষীর ফোন। পাশ করলেই ৫০০১ টাকা দক্ষিনা,তিনি ভোলেননি।

শুভ এবার মৌনব্রত ভাঙলো। সঙ্গে সাতদিনের খিদেটাও মিটিয়ে নিলো। আমরা হাঁ হয়ে শুনছিলাম শুধু। আর আমাদের গাল এর অভিধানে একের পর এক নতুন গাল বেড়ে যেতে থাকলো।

The following two tabs change content below.
Avatar

Ankush

Avatar

Latest posts by Ankush (see all)

আপনার মতামত আমাদের প্রেরনাঃ-

%d bloggers like this: