দ্বিতীয় পুরুষ এবং বাংলা সিনেমার দর্শকের প্রতি

সুদীপ্ত নাগ

প্রথমে সিনেমায় নয় আসুন চলে আসি একটা গরম ডায়লগে যেখানে পরমব্রত বলছে অনির্বানকে – এই শোন আমি হলাম এই সিনেমার ডিরেক্টার আর তুই হলি দর্শক । যা বলব চুপচাপ শুনবি । অজান্তেই কি সিনেমার ডিরেক্টার তার আজকের এত সাফল্যের আসল ফর্মুলাটা ফাঁস করে ফেললেননা ?

আমরা ম্যাজিক বুলেট থিওরি বা হাইপোডারমিক নিডিল থিওরি পড়ে থাকি মাস কমিউনিকেশানে । থিওরিটা সহজ ভাবে বললে সত্যজিৎ রায়ের ভাষায় মগজ ধোলাই । অর্থাৎ আপনাকে ইঞ্জেকশান মেরে ম্যানিপুলেট করা হচ্ছে আর আপনি ভেবে যাচ্ছেন আপনার ভাবনা তো স্বতন্ত্র । এখন বাংলা সো কল্ড আঁতেল ছবির বক্স অফিস গরম করার কিছু কায়দা আছে । যারে আমরা কই মার্কেটিং ।

মানে প্রমোশানের জন্য কয়েকটা ভিডিও ছেড়ে দিন আর এই ভাবেই সিনেমাতে ক্যারেক্টারটা দেখার আগেই তাকে নিয়ে বিশাল হাইপ হয়ে যায় । তাই বাণিজ্যিক ছবি হাতে হাত মিলিয়ে চলে ইয়ালো জার্নালিজিমের সাথে । কিছু ওপেনিয়ন লিডার আছেন যারা দর্শককে গাইড করে দিচ্ছেন কোনটা ভাল আর কোনটা খারাপ । এদের মধ্যে কেউ কেউ স্বার্থে করছেন কেউ বা নিজেই একজন স্যুডো ইন্টালেকচুয়াল । সবচেয়ে বড় ট্রাস্টেড ওপেনিয়ন লিডার হল সিনেমার ক্ষেত্রে আই এম ডি বি , রটেন টম্যাটোস আর অবশ্যই উইকিপিডীয়া ।

ইনফরমেশান সংগ্রহ করা আর ইনফরমেশানের মাধ্যম থাকা খুবই ভাল জিনিস কিন্তু আমি যদি কাল নিজের বুদ্ধি এবং বিচার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে শুধুই তথ্যের দ্বারা প্রবাভিত হই তাহলে আমার সাথে একটা রোবটের তফাত কি ভাই ? বাকি আলোচনায় পরে আসছি চলে আসি সিনেমা প্রসঙ্গে ।

সৃজিত মুখার্জ্জী সিনেমার চেয়ে এখন বেশি ভাবেন ব্যবসাটা নিয়ে হয়ত যদিও আমার ব্যক্তিগত মতামত । গোটা সিনেমার ন্যারেটিভ অগোছাল । বারবার যেন মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে এটা একটা সিনেমার সিকোয়েল । অথচ এই সিকয়েল করতে গিয়ে ক্যারেক্টার ডেভেলাপমেন্টে যে কত বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে সেটার দিকে কেন ডিরেক্টারের নজর নেই ? পরমব্রতকে আমরা যেভাবে পাই বাইশে শ্রাবণে তার সাথে এই গল্পের ক্লাইম্যাক্সে এসে চরিত্রটাই বদলে দিতে চেয়েছেন পরিচালক কিন্তু বোধহয় তিনি ভুলে গেছিলেন যে এটা সিকোয়েল আর আগের ছবিটার সময় বোধহয় তিনি এত কিছু ভাবেনইনি ।

মানে আমি ব্যাটম্যান বানাচ্ছি যেখানে আমার কাছে আগেই চরিত্র বা তার গল্প আছে আর সেই অনুযায়ী আমি সিকোয়েলে ক্যারেক্টার ডেভেলাপমেন্ট করছি বা সামান্য মডিফাই করছি । কিন্তু আমার কাছে কোন কাঠামই নেই আর আমি ক্লাইম্যাক্সে দারুণ চমক দেব বলে ‘চল পালাটাই ‘ বলে দিলাম সেটা অনেকটা গরুর গাছে ওঠা হয়ে যায় ।

চলে আসি শুটিং স্পট নির্বাচনের দিকে । বোঝাই যাচ্ছে বানানো একটি গপ্প আর টারান্টিনোর মত খুনির মাথায় অটগ্রাফ এইসবের জন্য কে আবার এত লোকেশান খোঁজে কারণ ডিরেক্টার তো বলেই দিয়েছেন – যা দেখাব চুপচাপ দ্যাখ । তাই আপনাদের প্রিয় চেনা চায়না টাউন ‘সিটি অব গড’ হয়ে উঠতে কতক্ষণ । এর সাথে যদি একটু বাইশে শ্রাবণের নস্টালজিয়া ফ্রি তে দেওয়া যায় তাহলে তো আর কথাই নেই । আফটার অল ক্লাইম্যাক্স অবধি টানতে হবে তো ।

অন্যদিকে রাজা যা চাল দেয় মন্ত্রী তার থেকেও ভুল চাল দেয় । মানে পরমব্রতকে বুদ্ধিমান প্রমাণ করতে তার সহকারী যাকে নাকি বুদ্ধিমান বলেই নিয়োগ করা হয়েছে তাকে যতটা বেশি ডাম্ব দেখান যায় । আরে সৃজিতবাবু আপনার পুলিশ অফিসার যা পয়েন্ট আউট করতে পাঁচ মিনিট লাগায় তা আপনার অনেক দর্শক যে ৫ সেকেন্ডেই বুঝে ফেলছে । মানছি আপনি পরিচালক তাই বলে সব দর্শকই কি বোকা ? যে জিনিসটা প্রথমে করলেই আপনার টার্গেটকে আপনি পাবেন সেটা না করে কেন পেছনে প্যামফ্লেট গোঁজা নিয়ে জ্ঞান দেয় আপনার পুলিশ অফিসার ? সব আগে থেকে জেনেও কেনই বা তাকে অপরাধীকে খুঁজতে খুঁজতে তার আড্ডায় এসে পৌঁছতে হবে ? এসব প্রশ্নে আপনি বলবেন তাহলে তো সিনেমাটা ৫ মিনিটেই শেষ হয়ে যাবে ।

আসল কথা এত ভেবে আপনি করবেন কি ? ক্লাইম্যাক্সে টুইস্ট আছে , খোকা আছে আর এতেই চলবে সিনেমা । যেখানে অপরাধী আর তার কাজ নিয়ে আপনি খেলা করতে পারেন সেটা এড়িয়ে বাংলা উচ্চারণ , ওয়ার্ড গেম , খাবারের মেটাফার এইসব নিয়ে আপনি সময় কাটিয়ে দিলেন দিব্যি । আর গল্পের শেষে পল্টন , পুলিশ অফিসার ,খোকা সব ঘেঁটে ঘ হয়ে গেল বাট তাতে কি ? ক্লাইম্যাক্সে শক ইলিমেন্ট তো আছেই । আর তাই বই হিট হবেই । মনে আছে তপন সিনহার ‘গল্প হলেও সত্যি ‘? একটি সিনে যেখানে অ্যাডভারটাইজিং এজেন্সির বস ছোটবাবুকে বলেন – এখন এইসব মুভমেন্ট নয় বাজারে একটাই জিনিস চলছে সেটা হল শক দিতে হবে । সেই ফর্মূলা যে এখন চলছে তার প্রমাণ পাওয়া গেল যখন হল শুদ্ধু লোক হাততালি দিল । পাশ থেকে কেউ একজন বলে ফেলল ১০ এ ৭.৫ । আর হ্যাঁ ক্লাইম্যাক্সে সামান্য ‘রমন রাঘবের ‘ ছাপ আছে অবশ্যই যদিও সরাসরি ভাবে নয় ।

ফিরে আসি দর্শক প্রসঙ্গে । আজকাল সব কিছুই খুব সহজলভ্য । তাই আন্দ্রেই তারকোভস্কি বা বার্গম্যানরা ও পরিচিত নাম । এবার কিছু লোক পাবেন যারা এদের নিয়ে আহাউহু করছে কিন্তু এদের কাজটাই দেখেনি সেভাবে । কেন এদের কাজ ভাল লাগে জিজ্ঞেস করলে সঠিক ভাবে উত্তর দিতে পারেনা । আসলে প্রবাদ বাক্যটা ঘুরে গেছে – অধম চলে উত্তমের সাথে নিশ্চিন্তে । ‘স্পাইরাল অব সাইলেন্স ‘ এমন ছড়িয়ে পড়েছে যে গ্রুপ থেকে বেরিয়ে যাব বা সাধারণ হয়ে যাব এই আশঙ্কায় মেনে নিচ্ছে অনেকেই যা তারা নিজেদের দিক থেকে উপভোগ করতে পারেনি হয়ত কিম্বা গভীরে গিয়ে জানার বা বোঝার চেষ্টা করেনি ।

আমার মতে এই ধারণা গুলো বেশি ভয়ঙ্কর ডেস্পাইট অব যার যেটা পার্সনাল টেস্ট । ঋত্বিক ঘটক বলেছিলেন বার্গম্যান একজন ভণ্ড, রায়বাবু ইন্ডিয়ান সিনেমা নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি । তাই বলছি যে একবার সিনেমা হলে যাওয়ার আগে আই এম ডি বি , বড় বড় নাম , এসব থেকে সরে এসে একটু নিজেরা চেষ্টা করুননা ভাবার । হয়ত আপনি খুব ছেলেমানুষি বক্তব্য দেবেন কিন্তু সেটা আপানার অনেস্ট স্টেটমেন্ট হবে । মনে রাখা দরকার সিনেমা কিন্তু দর্শক ছাড়া চলেনা । একবার জাস্ট উল্টোদিকের চেয়ারটা টেনে নিন আর ডিরেক্টারকে পাল্টা বলুন – তোদের এখানে ডিরেক্টার কে আছে ? বল দর্শক এসেছে । (ডিরেক্টার এলে ) – শোন , এই সিনেমায় আমি দর্শক আর তুই ডিরেক্টার । যা যা ক্রিটিসাইজ করব সব বসে চুপচাপ শুনবি না তো বক্স অফিস খালি করে দেব ।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: