দাবাং ৩ : শুরু ও শেষের বিশ্লেষণ

সুদীপ্ত নাগ

দাবাং ছবিটি ২০১০ সালে বক্স অফিসে এতটা সফল হবে সেটা কি সলমান খান ভেবেছিলেন নাকি ছবির পরিচালক অভিনব কশ্যপ ভেবেছিলেন । দাবাংয়ের আগে ‘ওয়ান্টেড’ র মত ছবি করেছেন সলমান । তাহলে ‘দাবাং ‘ নিয়ে এত বেশি মাতামাতি হল কেন ? শুধু দর্শক নয় ক্রিটিক সার্কেলেও আলোচনার বিষয়ে হয়ে উঠেছে ‘দাবাং’ । আসুন দেখে নিই কি কি বিশেষত্ব আছে এই ছবিতে ।

প্রথমত ছবিটি সাউথের রিমেক নয় তাঁর অ্যাকশান জনারা-র দ্বারা প্রভাবিত । এই ছবির পটভূমি কোন আরবান সিটি নয় বরঞ্চ একটি অখ্যাত মফস্বলকে বেছে নিয়েছেন পরিচালক । অধিকাংশ হিন্দি বাণিজ্যিক ছবির পটভূমি হয় দেশের বড় শহর বা বিদেশ তাই ইচ্ছে করেই পরিচালক ডাইভার্সিটির কথা মাথায় রেখে এমন পটভূমি তে ‘চুলবুল পাণ্ডে’ কে প্রিতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন । মনে রাখা প্রয়োজন যে ‘গ্যাংগস অব ওয়াসিপুর’ কিন্তু তখনও বানাননি অনুরাগ কশ্যপ । তাই এই ছবি পটভূমি নির্বাচনে এবং শহরের সাথে সাথে মফস্বলের লোকালাইটদের দর্শক হিসাবে ভেবে বানানো।

ছবিটির মধ্যে একটা কারনিভ্যালিস্কিউ অ্যাপ্রচ লক্ষ্য করা যায় । অর্থাৎ কিনা সোজা কোথায় ছবিটি তে অদ্ভুত হাস্যরস এবং প্যারডি হিউমারের সংমিশ্রণ ঘটেছে এবং তাঁর সাথে সাথে ন্যারটিভে বা ছবির গল্পে আমরা ক্যারেক্টার কে জাজ করছিনা কারণ চরিত্রটি একটি ‘গ্রে’ ক্যারেক্টার এবং সেই জন্যই  স্টিরিওটিপিকাল ক্যারেক্টারদের থেকে ‘চুলবুল পাণ্ডে’ আলাদা ।

প্রথমেই বলে দেওয়া হচ্ছে তিনি ‘রবিন হুড ‘ অর্থাৎ তিনি মানবিক কিন্তু তিনি কোরাপটেড ও বটে । অভিনব পুরোন  ‘অ্যাংরি ইয়াংম্যান ’ ফর্মূলাকে বেসে রেখে গল্পটা ফেঁদেছেন । এই কনসেপ্ট সেলিম- জাভেদ ভাবেন ইন্দিরা গান্ধি ইমারজেন্সি পিরিয়েডে । যেখানে নায়কের সব সময় ফাদার ফিগার মিসিং এবং এই ফাদার ফিগার আসলে স্টেট-র অবস্থাকে ইঙ্গিত করছে ।

দাবাংয়েও কিন্তু আমরা দেখি প্রথমেই যে সলমানের বাবা নেই এবং তিনি সৎ বাবার কাছে মানুষ তাই বাড়িতে তাঁর স্থানটা শক্তপক্ত নয় । অয়ায়রনিকালি তিনি পরে পুলিশ অফিসার হয়েছেন বা ষ্টেটের রক্ষাকর্তা আর তাই তিনি নিজের সৎ  বাপ কেও না মেনে বাপের বাপ হয়ে উঠেছেন । ডাকাতদের পিটিয়ে ছেড়ে দিতে বলে তিনি ডাকাতদের থেকে পয়সা লুট করেন আর প্রমোশান চাওয়া পুলিশ অফিসারকে হাতে গুলি মেরে তিনি এনকাউন্টারে জখম দেখিয়ে প্রমোশানের সুযোগ করে দেন ।

সেই একই ব্যক্তি কিন্তু পণ নয় প্রেমে বিশ্বাসী কিম্বা ফ্যামিলির প্রতি তাঁর কতটা ভালবাসা তা সিনেমার শেষে গিয়ে প্রকট হয়ে উঠছে । এই কারণেই চরিত্রটি অস্বচ্ছ এবং ইউনিক । ‘চুলবুল পাণ্ডে’ ক্যারিজম্যাটিক এবং লার্জার দ্যান লাইফ হোয়েও এথিকালি রাইটের তকমা থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ মানুষের সাথে নিজেকে রিলেট করার জায়গা করে দিচ্ছেন । যেহেতু দাবাং ৩ দাবাং ছবির প্রিকুয়েল তাই আগে দাবাং নিয়ে আলোচনা করে নিলাম ।

দাবাংয়ের সাকসেসের পর দাবাং ২ র অফার ফিরিয়ে দেন অভিনব আর তাঁকে ছাড়াই দাবাং সিরিজ এগিয়ে চলে । মুশকিলটা হচ্ছে ওয়েব সিরিজের মতই সিনেমার সিরিজে ডিরেক্টার বদলে গেলেই অনেক সময়ই সিনেমার ক্রাফট বদলে যায় বা ক্যারেক্টার প্রগ্রেশানে সমস্যা দেখা যায় ।

দাবাং ৩ তে প্রভু দেবা চেষ্টা করে গেছেন যতটা সম্ভব দাবাং ১-র সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলা যায় কিন্তু অন্যদিকে তিনি এমন কিছু এলিমেন্টস ঢুকিয়েছেন যে গুলোর জন্য চুলবুল পাণ্ডে অনেকটাই বদলে যাচ্ছেন মানুষের চোখে আর তাঁর সাথে সাথে দাবাংয়ের ফান্ডাটা ও । প্রভু দেবার চুলবুল অনেক বেশি সোশ্যালিস্ট । তিনি সমাজ সংস্কার টাইপ কথা বলেন । পণ নেবনা আর পণ দেবে ছেলেরাই এর মধ্যে তফাত বিস্তর । এখানে চুলবুল অনেক বেশি মহান , শুধু পণই নয় চুলবুল ফোনে তাঁর সাথে সম্বন্ধ করা পাত্রীকে বলেন বিয়ের পর সারনেম চেঞ্জ করার দরকার নেই ।

মুন্নি বদনাম হুয়ি-র মত সেক্সিট গান বদলে এখানে হয়ে যায় মুন্না বদনাম হুয়া । দাবাং ৩ তে পুরন পাঞ্চ লাইনের অরিজিন নিয়ে ভাবা হয়েছে । আমার মতে যেটা ক্যারেক্টারের মিথটাকে নষ্ট করা ছাড়া কিছু নয় এবং কিছু ক্ষেত্রে বোকা বোকা । ‘হাম তুমহারা ইতনা ছেদ করেঙ্গে কে কনফিউজ হো জাওগে…’ এই পাঞ্চ লাইনে একটা পান আছে কারণ কথাটা সিনেমার অ্যানটিগোনিস্ট ছেদি সিং কে বলা ।

সেই ডায়লগ চুলবুল একটি গ্যাংয়ের থেকে ধার করেছে এটা যেমন পানটা র হত্যা করা তেমনই ক্যারেক্টারের রসবোধ এবং ইনস্ট্যান্ট ডায়লগ তৈরি করার ক্ষমতাকেও প্রশ্ন তোলে । প্রভু দেবা চুলবুলের এথিক্স বা ফেমিনিজম এসব দেখালেও আবার তাঁর হর্নি সাইডটাকে এত প্রকট ভাবে দেখিয়েছেন কিছু ডাল হিউমার প্রভাইড করতে যে সেখানে একটা কন্ট্র্যাডিকশান হয়ে গেছে । রেপ নিয়ে চুলবুলের ডায়লগ অন্যদিকে তাঁর ফেমিনিজিমের চেতনার কথাই জানান দেয় । 

ফাইনাল ফাইটের  শেষ দৃশ্যে যেভাবে হিরো ভিলেনকে পরাজিত করছে সেখানে একটা দেব শক্তির অসুর নিধনের ছায়া রাখতে চেয়েছেন । যেটা চুলবুলের ‘গ্রে’ ক্যারেক্টার টাকে পুরোই সরিয়ে দেওয়া । সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার যে একদম সিনেমার শেষে নোটবন্দির উল্লেখ এবং চুলবুল রাজনীতি তে জয়েন করার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন । এবার চলে আসি আসল প্রসঙ্গে যে কেন দাবাং থ্রি-র এই আমূল পরিবর্তন ।

শুধু কি পরিচালক বদলে গেছে তাই নাকি আর গল্প আছে ? লক্ষ্য করার বিষয়ে যে দাবাং-য়ের সাকসেসের পর থেকেই আবার সলমন একটা নতুন গুড বয় টাইপ ক্যারেক্টারে ঢুকে পরেন আর বজরঙ্গি ভাইজানের মত সিনেমা করা শুরু করেন । এক কথায় হিন্দুত্ববাদ এবং গেরুয়া শিবির ঘেঁষা প্রপাগণ্ডা । দাবাং ৩ ও কি শেষের দিকে সেই শিবিরের দিকে ঝুঁকে গেলনা কিছুটা ? আমরা কিন্তু দাবাং ১ র সেই শেষ দৃশ্যে সলমনের শার্ট খুলে সেলফ মকারিকে মিস করব আর তার সাথে চুলবুলের রবিনহুড পার্সনালিটিকেও ।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: