Home » মজার গল্প » ঠাকুরমশাই হাইজ্যাকিং

ঠাকুরমশাই হাইজ্যাকিং

অর্চনা পাল

মার জোর ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেল। “কি রে, উঠবি না? সবাই যে উঠে রেডি হয়ে নিল।” চোখ ডলতে ডলতে রুমির মনে পরল – ও আজ তো সরস্বতী পূজা!
বাসি মুখে উঠেই দৌড়ে নিচে গেল সে। দেখল নাহ্। মা মোটেও সব সত্যি বলে নি, এখনো খালি ঠাকুমা একাই উঠে গোছাচ্ছে ঠাকুর। তার মানে তার এখনোও চান্স্ আছে আলপোনাটা দেয়ার। দিদিরা উঠে পরলে আর পাবে না। দৌড়ে উপরে গিয়ে রেডি হতে থাকলো রুমি। মায়ের হাতে কাঁচা হলুদ বাটা মেখে স্নান সেরে নিল সে। মায়ের দূর্গা পূজার হলুদ শাড়ীটা কোনো রকমে পেঁচিয়ে পড়ে, কোমরে আঁচল গুজে দৌড়ে সে এল ঠাকুর ঘরে।
যাক বাবা, ওরা এখনও কেউ নেই। “ও ঠাকুমা চাল বাটা হয়ে গেছে কি? আলপনাটা…..” কথাটা তার শেষ হল না। দেখে ঘট বসবে যেখানে সেখানে আলপনা দেওয়া হয়ে গেছে। কলাবউ এর আড়াল থেকে বড়দি ঘাড় ঘুড়িয়ে ফিক্ করে বিজেতার হাসি হাসছে আর ওদিকটায় আলপনা দিচ্ছে।
খুব দুঃখ হল তার। যাগ্গে, আর কি করা!  ফল কাটা, ফুল সাজানো, মালা গাথা,চন্দন বাটা, নৈবিদ‍্যর জোগাড় এসব ঠাকুমার সাথে থেকে করল সে । এতক্ষণে একটু ভালো লাগছে তার। এখন খালি বাকি লুচি আর বেগুনভাজা বানাতে। ঠাকুরের ভোগ হবে।
সব আয়োজন যখন শেষ হল বাড়ির সবাই প্রায় উপস্তিত পূজার ঘরে। কিন্তু ঠাকুর মশাই এর দেখা নেই যে। নারু কাকা তাদের বাড়ির অনেক দিনের পুরনো পূজারী। গতকালও কথা হয়েছে ঠিক সকাল ৬:৩০-৭:০০ র মধ্যে আসবেন। এখন সকাল ৮:৩০ বাজে, তবু তার দেখা নেই। কাকা ঝ্ট করে সাইকেলটা নিয়ে নারু কাকার খোঁজ আনতে গেল, দুটো পাড়ার পরেই।
মিনিট পনেরো পরে ফিরে এসে কাকা জানাল যে নারু কাকার বউ বলেছে তার ধুম জ্বর কাল রাত থেকে, বিছানা ছেড়ে সে উঠতে পারছে না, এবার যেন অন্য পুরুতমশাই দিয়ে পূজার কাজটা সেরে নেন তারা। শোনা মাত্র রুমিরা সবাই যে যার ঘরের জানলা, দরজা দিয়ে রাস্তায় চোখ রাখল। চলন্ত ঠাকুরমশাই ধরতে হবে তো! না হলে পুজো কি করে হবে? 
কিন্তু আজকের দিনে ঠাকুরমশাই ধরা কি চাট্টিখানি কাজ! সব ঠাকুরমশাইরা সাইকেল নিয়ে সা্করে, বা হনহন করে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। পেছনে এক ঝা্ক বাচ্চা চিৎকার করে ডাকছে, “ওওও ঠাকুরমশাই দাঁড়ান একটুউউউ” আর ঠাকুরমশাইও চিৎকার করে বলছেন,” হবে না , হবে না এখনও দশটা বাড়ি বাকি আছে।”
মহা মুশকিলে পড়ল রুমি, এদিকে ক্ষিদে পাচ্ছে আবার স্কুল যেতেও দেরী হয়ে যাচ্ছে তার। হঠাৎ দেখল কাকা প্রায় বোগলদাবা করে ঠ্যা্ংরা কাঠীর মতন, নামাবলী পেচানো, খাটো ধুতি পরা এক পুরুতঠাকুরকে প্রায় টানতে টানতে বাড়ির ভেতর ঢোকাচ্ছে। উনি পূজায় একরকম জোর করে বসলেন, না বসে উপায় কি! চারিদিকে এতগুলো বাচ্চা, বাড়ির তিন বউ, এক পূজা বিসারদ্ ঠাকুমা আর বাড়ির তিনজন থুরি্ দাদু নিয়ে চারজন জাদরেল পুরুষ এর নজরদারি, এত বড় চক্রবূহ কি ভেদ করা যায়! পূজা শুরু হল‌।
ঠাকুরমশাইর গঠন দেখে ধারণাই করা যাই না তার স্বরযণ্ত্রের ওজন। ১০ মিনিটের মধ্যে তারোস্বরে মন্ত্র্ পরে, অন্জলী দিয়ে পূজা শেষ হল। প্রাপ‍্য দক্ষিণা আর ভুজ্জি্ নিয়ে পরের দিন এসে ঘট নাড়িয়ে দেওয়া আর বেল পাতায় তিন বার “সরস্বতী” লেখানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে উনি যেন বেগে হাওয়ায় মিলিয়ে গেলেন। ঠাকুর ঘরের দরজা বন্ধ করে ঠাকুমা কিছুক্ষণ সবাইকে বাইরে আসতে বললেন।রুমী আর ওর দিদিরা এই ফাঁকে পরিপাটি হয়ে নিল যাতে প্রসাদ খেয়ে নিয়েই স্কুল এর উদ্যেশে বেরোতে পারে। 
স্কুলে পৌছালো তখন প্রায় বেলা ১১:০০ বেজে গেছে। পূজা চলছে তখনও। মাইকে ঠাকুরমশাই সুন্দর মন্ত্র্ পড়ছেন। রুমী আর ওর দিদিরা গিয়ে দাঁড়াল প্রতিমার সামনে। কি সুন্দর মূর্তি! ওরা জোর হাতে নমো্ করে দাঁড়ালো আর ঠাকুরমশাইও সেই সময় শান্তির জল দিতে সামনে ফিরেছেন। কিন্তু একি দেখছে ওরা!!!রুমিরা তিন বোন চোখ চাওয়া-চায়ই করে বিষ্ময়ে! এ যে নারু কাকা, তাদের বাড়ির বাঁধা ঠাকুরমশাই।
বড় স্কুলের, বড় ডাক পেয়ে নারু কাকা দিব্যি গুল দিয়ে তাদের বাড়ির পূজাটা ভন্ডুল করে দিচ্ছিল! এবার তারা তিনজনে অপলক শেন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল নারু কাকার দিকে। কাকার সাথে চোখে-চোখ হতেই তার যে দ্বিতীয়, তৃতীয় দফার অন্জলীর মন্ত্র সব গুলিয়ে যাচ্ছে। ” জয় জয় দেবী চরাচর সারে,(ঢোক গিলে)কুচকুচ….আহা! কুচযুগ শোভিত মুক্তাহারেবীণা হস্তে ..বীণা হস্তে…না না.. বীণা পুস্তক রজ্ঞিত হস্তেভগবতী ভারতী দেবী নমস্তে।?

আপনার মতামত:-