সময় অসময় দুঃসময়

অগ্নিভ সেনগুপ্ত

‘সম​য়’​-এর সকল পাঠককে জানাই নতুন বছরের অনেক শুভেচ্ছা। আশা রাখি নতুন বছর আপনাদের সবার জীবনে নতুন আনন্দ নিয়ে আসুক​।

প্রথমে ঠিক করেছিলাম, নতুন বছরের প্রথম প্রবন্ধটা বেশ একটা ফিল​-গুড বিষ​য় দিয়ে শুরু করব​। কিন্তু, নাগরিকত্ব পঞ্জিকরণ এবং সংশোধন আইন নিয়ে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে অন্য কোন লঘু বিষ​য় নিয়ে লেখা অর্থাৎ নিজের বিবেকের সাথে সমঝোতা করা। তাই, আজকের বিষ​য় – এন​-আর​-সি ও সি-এ-এ সম্বন্ধে আমার মতামত​, এবং তার সাথে নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্বের তুলনামূলক আলোচনা।

যাঁরা ফেসবুকে আমার বন্ধুতালিকায় আছেন​, তাঁরা নিশ্চ​য়ই এই বিষ​য়ে আমার কিছু পোস্ট দেখেছেন​। এবং সেই পোস্টে এই বিষ​য়ে আমার অবস্থান যথাসম্ভব স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি। অনেকেই দেখলাম শুধুমাত্র সি-এ-এ-র পক্ষে তাঁদের অবস্থান জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য পরিষ্কার​, আপনি যদি দেশের নাগরিক হন​, তাহলে নাগরিকত্ব সংশোধনে আপনার অসুবিধা কোথায়​? আর​, প্রতিবেশী দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের যদি ভারতবর্ষে আশ্র​য় দেওয়া হ​য়​, আপনার কি ক্ষতি হবে? এক বিখ্যাত ধর্মগুরু তো বলেই দিলেন​, “Too little compassion coming too late”। সেই বক্তব্যের রেশ ধরে যাঁরা এই আইনের বিরোধীতা করছেন​, তাঁদেরকে বিভিন্ন উপায়ে হেয় করার চেষ্টায় সক্রীয় অনেকেই। হিন্দু-বিরোধী কিংবা সরাসরি দেশ​-বিরোধী তকমা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু, ধর্মীয়ভাবে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে বলতে গিয়ে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে আপনি কিছু উপেক্ষা করে যাচ্ছেন না তো? আসুন​, একটু পরিসংখ্যানের সাথে আলোচনা করে নেওয়া যাক​।

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন​, দেশে প্রথমে সি-এ-এ আসবে, তারপর দেশজুড়ে এন​-আর​-সি আনা হবে (১)। সি-এ-এ কি? না, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (বা, সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট​)। অর্থাৎ, বর্তমান ভারতীয় নাগরিকত্ব আইনে কিছু সংশোধন আনা হবে। বর্তমান নাগরিকত্ব আইন (২) বলে, ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব আপনি চারটি উপায়ে পেতে পারেন​:

১. জন্মসূত্রে (by birth), অর্থাৎ আপনি যদি ২৬ জানুয়ারী ১৯৫০-এর পরে (অর্থাৎ, সংবিধান গঠনের পরে) এবং ১ জুলাই ১৯৮৭-এর আগে ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করে থাকেন​, তাহলে আপনি জন্মসূত্রে ভারতীয়​।

২. বংশানুক্রমে (by descent), অর্থাৎ আপনি যদি ১ জুলাই ১৯৮৭-এর পরে জন্মগ্রহণ করেন​, কিন্তু আপনার বাবা আপনার জন্মের সম​য়ে ভারতীয় নাগরিক হন​, তাহলে আপনি বংশানুক্রমে ভারতীয় নাগরিক​।

৩. নিবন্ধীকরণ (by registration), অর্থাৎ আপনি ভারতবর্ষে অভিবাসী, কিন্তু আপনি ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ​, অথবা আপনার আদিপুরুষ ভারতীয় ছিলেন​, অথবা আপনার পিতামাতা নিবন্ধীকরণে ভারতীয় নাগরিক​। সেই ক্ষেত্রে ১৯৫৫-এর নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী সরকার আপনাকে নাগরিকত্ব প্রদান করতে পারে।

৪. স্বাভাবিককরণ (by naturalization), অর্থাৎ আপনি উপরোক্ত কোন বিভাগেই নাগরিকত্বের দাবীদার নন​, কিন্তু আপনি ১২ বছর বা তার বেশী সম​য়ে ভারতীয় অভিবাসী এবং আপনার কাছে স্বাভাবিককরণ সনদপত্র আছে। সেই ক্ষেত্রে আপনি ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন ১৯৫১ অনুযায়ী নাগরিক অধিকার পেতে পারেন​।

এইবার আসা যাক ২০১৯-এর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে (৩)। সেই আইন অনুযায়ী, আপনি যদি পাকিস্তান​, বাংলাদেশ বা আফগানিস্থান থেকে ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত হ​য়ে ভারতবর্ষে আশ্র​য় নেন​, এবং যদি হিন্দু, শিখ​, বৌদ্ধ​, জৈন​, পার্শি বা খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বী হন​, তাহলে স্বাভাবিককরণ পদ্ধতিতে আপনি ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে পারেন​। এবং, সেক্ষেত্রে আপনি ১২ বছরের জায়গায় ৫ বছর ভারতবর্ষে থাকলেই নাগরিক হওয়ার যোগ্য​।

কিভাবে প্রমাণ করবেন যে আপনি ধর্মীয় কারণে উক্ত দেশগুলি থেকে নিপীড়িত​? খুব সহজ​, আপনার লিখিত বয়ানই প্রমাণ হিসাবে গ্রাহ্য হবে।

আর​, নাগরিকত্ব পঞ্জিকরণ (বা, ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস​) ব্যাপারটা কি? ভারতীয় নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী যে চারটি বিভাগ আছে, তার একটির সূত্রে আপনি যে ভারতীয় নাগরিক​, তা প্রমাণ করা এবং লিপিবদ্ধ করা।

সেই সূত্রে বলে রাখা ভালো, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক টি-ভি ইন্টারভিউতে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে পাসপোর্ট​, ভোটার আইডি বা আধার কার্ডকে এন​-আর​-সিতে নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসাবে গ্রাহ্য করা হবেনা (৪)। কিন্তু, কি কি প্রমাণ গ্রহণযোগ্য হবে, তার কোন দিকনির্দেশ এখনো দেওয়া হ​য়নি।

সদ্য অসমে নাগরিকত্ব পঞ্জিকরণ বিধি সম্পন্ন হলো। তার ভিত্তি ছিল ১৯৮৬ সালে সাক্ষরিত অসম অ্যাকর্ড। সেই নিষ্পত্তিপত্র অনুযায়ী আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনি অথবা আপনার পূর্বপুরুষ ১৯৭১-এর আগে ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব পেয়েছেন​। সেই পঞ্জিকরণে ভারতে থাকার অধিকার হারিয়েছেন ১৯ লক্ষ মানুষ​, যার মধ্যে ১৩ লক্ষ হিন্দু-ধর্মাবলম্বী (৫)

এই মুহূর্তে ৪১০০০ শরণার্থী ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্যে আবেদন করেছেন (৬)​। তার সাথে যোগ করুন অসম এন​-আর​-সিতে নাগরিকত্ব হারানো ১৯ লক্ষ মানুষকে। এই হচ্ছে বর্তমানে ভারতের সি-এ-এ বা নাগরিকত্ব প্রদানের ব্যপ্তি। অর্থাৎ, আমার​-আপনার উদ্বেগের কারণ খুব-একটা নেই। অবশ্য​, এই কারণে অসম অ্যাকর্ডের চুক্তিভঙ্গ হচ্ছে, এবং অসমে সি-এ-এর বিরূদ্ধে বিক্ষোভের কারণ হ​য়ে উঠেছে। তবে সেটা এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষ​য় ন​য়​।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ক্রনোলজি অনুযায়ী সি-এ-এর পরে আসবে দেশব্যপী এন​-আর​-সি। অবশ্য​, ইদানীং তিনি ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে বলছেন যে এন​-আর​-সি নিয়ে কোন আলোচনাই হ​য়নি (৭), যদিও ওনার বক্তব্যের ভিডিও প্রমাণ বর্তমান​। যদি উনি ওনার এখনকার বক্তব্যে অন​ড় থাকেন​, এবং দেশব্যপী নাগরিকত্ব পঞ্জিকরণ না হ​য়​, তাহলে আর কোন কথা নেই। কিন্তু, উনি যদি আবার ঘুরে বসেন​, তাহলে দুইখান কথা আছে।

একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক​। ধরুন, আপনার কাছে নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হলো। আপনার জন্ম ভারতবর্ষে, ১ জুলাই ১৯৮৭-এর আগে। আপনি কি প্রমাণ দেখাবেন​? মন্ত্রীমশায়ের পূর্ববর্তী বক্তব্য থেকে ধরে নিলাম পাসপোর্ট, ভোটার আই-ডি বা আধার কার্ড প্রামাণ্য ন​য়​। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য নথির তালিকা প্রকাশিত ন​য়​, তাও তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম আপনার জন্মপত্র (বার্থ সার্টিফিকেট) আপনার জন্মতারিখ ও জন্মস্থানের প্রমাণ​। বেশ​, আপনি প্রমাণ প্রস্তুত করলেন​। কিন্তু, আপনার বার্থ সার্টিফিকেটে তো আপনার ছবি নেই। তাহলে কিভাবে বোঝা যাবে যে ওই বার্থ সার্টিফিকেট আদতে আপনার​? তার জন্যে নিশ্চয়ই কিছু বিধান থাকবে, এবং আমার​-আপনার মতো প্রিভিলেজড মানুষ নিশ্চ​য়ই সেই প্রমাণ দাখিল করতে পারব​।

কিন্তু, আমার​-আপনার সাজানো দু-কামরার ফ্ল্যাটের বাইরেও একটা ভারতবর্ষ আছে, যেখানে ৩০ কোটি মানুষ গৃহহীন​, ৩৬% মানুষ নিরক্ষর (৮)​। তাদের মধ্যে অনেকেই হ​য়তো নিজের জন্ম তারিখটাও জানেন না, জন্মপত্র তো দূর অস্ত​। আপনি বলবেন​, নিশ্চ​য়ই তাদের জন্যেও কিছু-না-কিছু ব্যবস্থা থাকবে।

ফকরুদ্দিন আলি আহমেদের নাম শুনেছেন​? ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ অবধি ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন​।

কিংবা, নেতাজীর আই-এন​-এ বাহিনীর সৈনিক পূরণ বাহাদুর ছেত্রী, অথবা অসমের পূর্বতন ডেপুটি স্পিকার মোহাম্মদ আমীরুদ্দিন​? এনাদের মধ্যে মিল কোথায় বলুন তো?

এনাদের পরিবার অসম এন​-আর​-সিতে ভারতে থাকার অধিকার হারিয়েছেন​। এইরকম আরো অনেক উদাহরণ আছে।

এখন কোন ভরসায় বলি বলুন তো, যে আপনার বাড়ীর পাশের বস্তিতে বা ফ্লাইওভারের নীচে কোনমতে জীবনযাপন করা পরিবারগুলো সঠিক প্রমাণপত্র দেখিয়ে এন​-আর​-সিতে উত্তীর্ণ হবে?

আপনি বলবেন, অসমে এন​-আর​-সি আলাদা। ঠিক​, কিন্তু অসমের জনসংখ্যা ভারতের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩%। অর্থাৎ, বিন্যাসের বিস্তার অনেক কম​।

আর​, যদি আপনার জন্ম ১ জুলাই ১৯৮৬-এর পরে হ​য়​? সেক্ষেত্রে তো আপনার প্রমাণপত্র ইজ ইক্যুয়াল টু অসম এন​-আর​-সির প্র​য়োজনীয় প্রমাণপত্র। সেখানে দুটো ভাগ​। প্রথম ভাগে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে আপনার পূর্বপুরুষ (অর্থাৎ, বাবা, ঠাকুরদা, ঠাকুরদার বাবা) এক বিশেষ সম​য়ের আগে থেকে ভারতীয় নাগরিক​। দ্বিতীয় ভাগে আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে উনি আপনার বাবা অথবা ঠাকুরদা অথবা ঠাকুরদার ঠাকুরদা।মানে, কোয়েশ্চেন পেপারটা আরো শক্ত হ​য়ে গেল​।

এইবার​, ধরুন, আমার​-আপনার সাজানো বাগানের নাগালের বাইরে যে ভারতবর্ষ আছে, সেইখান থেকে রাম আর রহিম ভারতীয় হ​য়েও প্রমাণ করতে পারল না যে তারা ভারতীয়​। অর্থাৎ, তারা এখন উদ্বাস্তু। এখন​, ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব অর্জনের জন্যে তাদের কাছে একটাই রাস্তা খোলা থাকল​, ন্যাচারালাইজেশন। দুজনেই দরখাস্ত জমা করল​।

রাম হিন্দু-ধর্মাবলম্বী, কিন্তু পাকিস্তান​-বাংলাদেশ​-আফগানিস্থান থেকে নিপীড়িত ন​য়​, স্বাভাবিক কারণেই। কিন্তু, নাগরিকত্ব অর্জনের জন্যে রামের কাছে একটাই রাস্তা খোলা থাকল – মিথ্যা ব​য়ান​।

রহিম ইসলাম​-ধর্মাবলম্বী, কিন্তু আদতে উদ্বাস্তু ন​য়​। অর্থাৎ, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন অনুযায়ী সে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে পারেনা, আবার অন্য কোথাও যেতেও পারেনা। তার কি হবে? কোন উত্তর নেই, অন্ততঃ এই মুহূর্তে।

এইবার আসা যাক অর্থনৈতিক আলোচনায়​। অসমে এন​-আর​-সি করতে ১২২০ কোটি টাকা (৯), দশ বছর এবং পঞ্চাশ হাজার কেন্দ্রীয় সরকারী কর্মচারী লেগেছে (১০)। দেশের ৩% জনসংখ্যায় এই পরিসংখ্যান​। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন​, ২০২৪-এর মধ্যে সারা দেশে এন​-আর​-সি লাঘু হবে, অর্থাৎ আর চার বছর​।

এইবার ইউনিটারি মেথডে খুব সহজেই ধারণা করতে পারবেন সারা দেশে এন​-আর​-সি করতে কত টাকা আর কতজন কর্মচারী লাগবে। আর​, সেই টাকা আসবে কোথা থেকে? কেন​, আমার​-আপনার ট্যাক্সের থেকে!

অর্থাৎ, আমাকে-আপনাকে-সব্বাইকে নিজের টাকা খরচ করে, নিজের সম​য় খরচ করে লাইনে দাঁড়িয়ে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে। আর​, যদি প্রমাণ না করতে পারেন​? তাহলে, আপনার নাম রাম হলে মিথ্যা ব​য়ান দিয়ে নাগরিকত্ব অর্জন করুন​, আর রহিম হলে আল্লার দ​য়ায় ছেড়ে দিন​।

সর্বোপরি, বর্তমান সরকারের ডিমানিটাইজেশন এবং আধার কার্ডের বাস্তবায়নের নমুনা তো আমরা সবাই দেখেছি। উদোর পিন্ডি যে বুধোর ঘাড়ে চাপবে না, তার কোন গ্যারান্টি নেই।

বেশ ইন্টারেস্টিং, তাই না?

অনেকেই প্রশ্ন করেন​, পৃথিবীর সমস্ত দেশেই তো নাগরিক পঞ্জি আছে, তাহলে ভারতে হলে দোষ কোথায়​? পৃথিবীর সমস্ত দেশের তথ্য আমার জানা নেই, তবে নেদারল্যান্ডসের পঞ্জিকরণ পদ্ধতি নিয়ে দু-চার কথা বলতে পারি। আপনাদের তুলনা করতে সুবিধা হবে।

ভারতবর্ষের মতো নেদারল্যান্ডসেও আপনি জন্মসূত্রে অথবা বংশানুক্রমে নাগরিকত্ব লাভ করতে পারেন​। জন্মসূত্রে নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব লাভ তাঁরাই করবেন​, যাঁদের বাবা অথবা মায়ের মধ্যে কেউ একজন (বা, উভ​য়েই) নেদারল্যান্ডসের নাগরিক​। অথবা, নেদারল্যান্ডসের কোন নাগরিক যদি কাউকে দত্তক নেন​, সেক্ষেত্রে দত্তক​-সন্তানও নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারেন​।

যেহেতু নেদারল্যান্ডস ইয়োরোপীয়ান ইউনিয়নের সদস্য​, সেহেতু অন্যান্য সদস্য দেশের নাগরিকরাও নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারেন বিকল্প পদ্ধতি বা Option Procedure-এর মাধ্যমে।

আপনি যদি জন্মসূত্রে অথবা বংশানুক্রমে এই দেশের কিংবা ইয়োরোপীয়ান ইউনিয়নের কোন দেশের নাগরিক না হন​, তাহলে আপনি ন্যাচারালাইজেশনের মাধ্যমে নেদারল্যান্ডসের নাগরিক হতে পারেন​, কিংবা শরণার্থী হিসাবে নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন​।

সেক্ষেত্রে প্রথমে আপনাকে ক​য়েক বছর অনুমতিপত্র নিয়ে নেদারল্যান্ডসে বাস করতে হবে। সেই অনুমতিপত্র পেতে হলে আপনাকে আপনার নিকটবর্তী অভিবাসন দপ্তরে (শরণার্থীদের ক্ষেত্রে তের আপেলের আবেদন কেন্দ্রে) গিয়ে প্র​য়োজনীয় নথি দেখাতে হবে। আপনার আবেদনের ভিত্তিতে আপনাকে সাম​য়িক অনুমতিপত্র দেওয়া হবে, যাকে বলা হ​য় রেসিডেন্স পারমিট। ক্ষেত্রবিশেষে সেই অনুমতি এক বছর থেকে পাঁচ বছরের হতে পারে, এবং তারপর আপনি আবার আবেদন করতে পারেন।

শরণার্থী হিসাবে নেদারল্যান্ডসের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতায় কোন বিশেষ ধর্মের উল্লেখ নেই। শরণার্থী হওয়ার শর্ত কি? নিজেই প​ড়ে নিন​।

নেদারল্যান্ডসে স্বাভাবিককরণের মাধ্যমে নাগরিকত্ব লাভের জন্যে আপনাকে ডাচ সিভিক ইন্টিগ্রেশনের পরীক্ষায় সফল হতে হবে, এবং অন্ততঃ পাঁচ বছর একটানা নেদারল্যান্ডসে রেসিডেন্স পারমিট​-সহ​ আইনত বাস করতে হবে। বিস্তারে সেই পদ্ধতি আপনি নেদারল্যান্ডসের অভিবাসন দপ্তরের ওয়েবসাইটে পাবেন​। শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য​।

নেদারল্যান্ডসে নাগরিক পঞ্জিকরণ করা হ​য় পৌরসভায়​। তিন মাসের বেশী সম​য় ধরে যদি আপনি নেদারল্যান্ডসে থাকার পরিকল্পনা করেন​, তাহলে নিকটবর্তী পৌরসভায় আপনার নাম​-ঠিকানা লিপিবদ্ধ করা বাধ্যতামূলক​।

পৌরসভার সাথে অভিবাসনের সরাসরি যোগাযোগ আছে। পৌরসভায় নির্ধারিত সম​য়ের মধ্যে আপনি নিবন্ধিত না হলে আপনার রেসিডেন্স পারমিট বাতিল হ​য়ে যেতে পারে।

আপনি যদি নাগরিকত্বের আবেদন করেন​, তা করতে হ​য় পৌরসভার মাধ্যমেই। সুতরাং, নাগরিকত্বের অথবা অভিবাসনের নথি, পৌরসভার কাছে সমস্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকে।

তা ছাড়া, প্রত্যেক নেদারল্যান্ডবাসীর, নাগরিক অথবা অ-নাগরিক​, থাকে একটি সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার​, যাকে বলা হ​য় বার্জার সার্ভিস নাম্বার​। সংক্ষেপে, বি-এস​-এন​। আপনার যাবতীয় আবাসিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ থাকে এই নাম্বারের সাথে। অর্থাৎ, যেকোন মুহূর্তে যেকোন সরকারী কার্যাল​য়ে আপনার বি-এস​-এন খুঁজলেই আপনার প্র​য়োজনীয় তথ্য পাওয়া যাবে।

নেদারল্যান্ডসে কেন্দ্রে এক রাজনৈতিক দল এবং বিভিন্ন পৌরসভায় অন্যান্য রাজনৈতিক দল থাকলেও এই তথ্যের আদানপ্রদানে কোনদিন কোন অসুবিধা হ​য়েছে বলে শুনিনি।

আর​, নাগরিকত্বের প্রমাণস্বরূপ নেদারল্যান্ডসে পাসপোর্টই যথেষ্ট​। আপনি যদি নেদারল্যান্ডসের নাগরিক না হন​, তাহলে আপনার রেসিডেন্স পারমিট অথবা ড্রাইভিং লাইসেন্স আপনার পরিচয়পত্রের কাজ করবে।

এখন আপনারা অনেকেই বলবেন​, নেদারল্যান্ডস একটি প্রথম বিশ্বের দেশ​। জনসংখ্যাও ভারতের থেকে অনেক কম​। তাই, এখানে এমন সংগঠিত পদ্ধতি অবলম্বন করা সম্ভব​। যদিও আমার ব্যক্তিগত মত​, তবে আমার মনে হ​য় নেদারল্যান্ডসের সাফল্যে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান​​, তা হলো সদিচ্ছা। এখানেও ধর্ম বা জাতিভিত্তিক ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি হ​য়​, কিন্তু সেই রাজনীতি খুব​-একটা সাফল্য পায় না। মানুষ উন্ন​য়ন দেখে, দেশের উন্নতি কিভাবে হবে সেটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করে। আমার ধারণায় এই চিন্তাধারাকেই আদর্শ দেশপ্রেম বলে।

নেদারল্যান্ডসের প্রশাসনিক গঠন সম্বন্ধে দু-একটা কথা না বললেই ন​য়​। এখানে সরকার গঠন পদ্ধতিগতভাবে জোটভিত্তিক​। অর্থাৎ, কোন রাজনৈতিক দলই এখানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে পারবে না। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের ফল তো আমরা অনেকেই টের পাচ্ছি।

নেদারল্যান্ডসে সরকারী নীতি​, বিশেষতঃ অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি, নির্ধারিত হ​য় একটি ঐক্যমত্য​-ভিত্তিক মডেলে, যাকে বলা হ​য় পোল্ডার মডেল (১১) ​। এখানে প্রধানমন্ত্রী হঠাৎ করে রাত্রি আটটায় জনসভায় নীতি ঘোষণা করেন না, এবং যেকোন সরকারী নীতি নির্ধারণের​ আগে তা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা হ​য়​।

নেদারল্যান্ডসে সরকার জনমতকে প্রাধান্য দেয়​। ছাত্র আন্দোলন এখানেও হ​য়​, কিন্তু সেক্ষেত্রে সরকার লেঠেল​-বাহিনী লেলিয়ে দেয় না। বরং, আন্দোলনের বক্তব্য বুঝতে চেষ্টা করে, এবং প্র​য়োজনে সেই অনুযায়ী নীতি নির্ধারণ করার প্রচেষ্টাও করে। গণতন্ত্র তো এমনই হওয়া উচিত​, তাই না?

যাক​, যে প্রসঙ্গে শুরু করেছিলাম​, সেখানে ফিরে আসি। ভারতে নাগরিকত্ব পঞ্জিকরণ হওয়া কি উচিত ন​য়​? অবশ্যই হওয়া উচিত​। কিন্তু, আমার​-আপনার বা দেশের কোন মানুষের অসুবিধা করে ন​য়​।

ভারতীয় আইন বলে, আপনার দোষ প্রমাণ হওয়ার আগে পর্যন্ত আপনি নির্দোষ​। ভারতের এন​-আর​-সি তথাকথিত বাস্তবায়ন ঠিক এর বিপরীত – আপনি আদতে অ-নাগরিক​। এইবার, আপনার নাগরিকত্ব প্রমাণ করার দায় আপনার​।

যে পাসপোর্ট বানাতে গিয়ে আপনার রেশন কার্ড​, বার্থ সার্টিফিকেট​, এবং বিশেষ ক্ষেত্রে আরো ডকুমেন্ট লেগেছে, পুলিশ ভেরিফিকেশন হ​য়েছে – সেই পাসপোর্ট আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণ ন​য়​। যে ভোটার কার্ডে আপনি ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করলেন​, সেই সরকার বলছে যে ভোটার কার্ড আপনার নাগরিকত্বের প্রমাণ ন​য়​। নাগরিকত্বের পঞ্জিকরণ কি সত্যি সরকারী সদিচ্ছা, নাকি এর পিছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে?

ভাবুন​, ভাবা প্র্যাক্টিশ করুন​।

তথ্যসূত্র​

(১) – https://www.youtube.com/watch?v=Z__6E5hPbHg

(২) https://en.wikipedia.org/wiki/Indian_nationality_law

(৩) https://en.wikipedia.org/wiki/Citizenship_(Amendment)_Act,_2019

(৪) ­- https://www.youtube.com/watch?v=eNd792HSl_A

(৫) https://www.indiatoday.in/india/story/assam-final-nrc-list-out-over-19-lakh-people-excluded-1593769-2019-08-31

(৬)http://reporting.unhcr.org/node/10314?y=2019#year

(৭) https://www.youtube.com/watch?v=JToXGhOA8hk

(৮) https://economictimes.indiatimes.com/news/economy/policy/30-crore-landless-people-to-get-jobs-once-land-bill-is-passed-fm/articleshow/46848342.cms

(৯) https://pib.gov.in/newsite/PrintRelease.aspx?relid=178400

(১০) – https://www.asianage.com/india/all-india/310819/from-1947-to-2019-nrc-timeline-shows-milestones-in-assams-history.html

(১১) https://en.wikipedia.org/wiki/Polder_model

নেদারল্যান্ডসের অভিবাসন ও নাগরিকত্ব​https://ind.nl/en

(ফিচার ফটো উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া)

Agniv Sengupta

Agniv Sengupta

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অগ্নিভ সেনগুপ্ত লিখেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। সময়ে তার লেখা শুরু হল্যান্ডের হালহকিকত দিয়ে, এ ছাড়াও লিখেছেন আরও অন্যান্য সমকালীন বিষয়ে।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: