পোশাক আশাক : স্থান কাল ও পাত্র বিশেষে

নিলয় বরণ সোম

ঘটনাটি এক কুড়ি বছর আগের, তবু মনে আছে। দিল্লিতে একটা ট্রেনিং এ গেছিলাম , মেহরালি রোডে , ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সেক্টরেটরিয়েট ট্রেনিং এন্ড ম্যানেজমেন্ট, বা সংক্ষেপে আই এস টি ই এমএ। হরেক ডিপার্টমেন্টের অফিসাররা সেখানে, দিল্লির স্থানীয় অফিসারদেরবাদ দিলে , সকলকেই ইনস্টিটিউটের হোস্টেলে থাকতে হত I রাত্রিবেলা ডিনারান্তে আমাদের ছয় সাত জনের বাহিনী হোস্টেল বিল্ডিং টা কয়েক পাক খেতাম -দিল্লির গরমে মৃদু মন্দ বাতাসে এক তারা আকাশের নীচে হাঁটতে ভালোই লাগত I
আমাদের সঙ্গে এক পাণ্ডেজি ছিলেন, মীরাটে কোনো সরকারি দপ্তরে উনি চাকরি করতেন। একদিন আমাদের উনি প্রস্তাব দিলেন ,পরের দিন ট্রেনিং শেষ হলে ইনস্টিটিউটের কাছে একটা সিনেমা হল আছে , ওখানে আমাদের নিয়ে যাবেন। সেখানে নাকি এমন চমকপ্রদ কিছু দেখার আছে , তা দেখে আমরা তাজ্জব বনে যাব।

কথামত পরের দিন বিকেলে আমরা সিনেমা হলের কাছে হাজির সদলবলে। কিন্তু হা হতোস্মি ! এত ঘটা করে পাণ্ডেজি কি দেখাতে নিয়ে এসেছেন ? না, কিছু মহিলা একটু পশ্চিমি পোশাক পরে সিনেমা দেখতে এসেছেন বা এদিক ওদিক ঘুরছেন, তাদের মধ্যে কয়েক জন সিগারেট ফুঁকছেন। এখন একটি মেট্রোপলিটন শহরে যৌবন কাটিয়ে, গোটা কলেজ জীবন পার্ক স্ট্রিটের ফুটপাথ মাড়িয়ে, আমার কাছে এতো নতুন কিছু ছিল না ! শুধু পাণ্ডেজি আর ওঁর মত দু’ চারজন ‘আহা কী দেখিলাম’ করতে করতে হোস্টেল ফিরে এলেন।

মেয়েদের পোশাক বা না -পোশাক বহুল চর্চিত হলেও ব্যাপারটি খানিকটা আপেক্ষিক। যে আমি মীরাটবাসীর বিস্ফারিত নয়নকে ফুড়ুৎ করে দুরছাই করতে পেরেছিলাম, আমার স্বল্পকালীন প্রবাসে , পাশ্চাত্ত ফ্যাশনবহুল আফ্রিকার ছোট একটি দেশে মহিলাদের অনেকটাই খোলামেলা পোশাক দেখে খানিকটা কালচারাল শক ( কালচারাল শকের বাংলা হয় কি , সাংস্কৃতিক আঘাত বলে তো কোনো কথা হয় না,অন্য সংস্কৃতি দেখে বোমকে যাওয়া আবার বেশি প্রাকৃত মনে হয় ) পেয়েছিলাম বইকীI সেদেশে অফিসিয়াল মিটিঙে ড্রেসকোডের সঙ্গে আলাদা করে উল্লেখ থাকত , মিনি স্কার্ট চলবে না ! চোখ যখন এতে মোটামুটি সয়ে গেছিল , বছর তিনেক বাদে দেশে ফিরে একটু রিভার্স কালচারাল শকও হয়েছিল বোধহয়-এত ঢাকাঢুকির দরকার কী!

এরকম বিষয় নিয়ে বেশি বাক্যব্যয় করলে জনগণ আমাকে বুড়ো ভাম বলে দেগে দিতে পারে, একটু সেফ জোনে চলে যাই , সেটি হল বাঙালি পুরুষ নারীর পোশাক আশাক । নামটি গালভরা হলেও এখানে বাঙালী বলতে কোলকাত্তাই বা মফস্বলের মধ্যবিত্ত নাগরিক সামজের কথাই বলছি – অর্থাৎ পরিসংখ্যানের বিচারে স্যাম্পল সাইজ বেশ ছোট I

প্রথমে বাঙালী পুরুষদের কথায় আসি। আমাদের ,অর্থাৎ, যাদের ষাটের দশকে জন্ম,তাদের বাবা কাকারা, এমনকী দাদু ঠাকুর্দারাও ধুতি পাঞ্জাবি ছেড়ে শার্ট প্যান্টকে পরিধেয় করে নিয়েছিলেন। তবে আশি নব্বই দশকেও আপিস আদালতে মসিজীবী বা স্কুল কলেজের মাস্টার অধ্যাপক সম্প্রদায়ের এক আধজনকে ধুতি পাঞ্জাবি পরতে দেখা যেত , রাজনীতিক নেতারা তো পরতেনই। এখন বিয়ে বাড়িতে শখ করে এক আধজন ধুতি- পাঞ্জাবি পরেন , তবে সেখানেও চোস্ত আর শেরওয়ানি এখন থাবা বসিয়েছে।

শার্ট প্যান্টের ব্যাপারটিও ঠিক একমাত্রিক নয়। বাবা কাকারা, যাদের জন্ম স্বাধীনতার আগে,একটু ঢলঢলে প্যান্ট পরতেন, ঘরে পরতেন লুঙ্গি -গেঞ্জি। সত্তরের দশক মুক্তির দশকে, ট্রাউজারের ঘেরে পরপর বিবর্তন এলো – হিপি সংস্কৃতির কিছু প্রভাবও ছিল তাতে। বিবর্তনের পথে প্রথমে এল চোঙা বা পাইপড প্যান্ট, তারপর বেলবটম ও তার আরো সাহসী সংস্করণ এলিফ্যান্টা। এলিফ্যান্টার ঘের হত বিশাল ও লম্বা, রাস্তা ঝাঁট দিতে দিতে চলত সে ট্রাউজার , যে বাড়িতে ধোপাখানার বন্দোবস্ত ছিল না , সে বাড়িতে সেই ট্রাউজারের পায়ের দিকটা ধুতে মা দিদিদের গলদঘর্ম হয়ে হত ,অতি বড় বিপলবী বাঙালী পুরুষও কাপড় জামা ধোয়াতে খুব উৎসাহ দেখায় নি কোনোকালে।

মার্কেটিং ম্যানেজমেন্ট পড়াতেন এমন এক অধ্যাপকের একটি থিওরি ছিল -ট্রাউজারের ঘের নাকি বছর দশেক বাদে ঘুরে ঘুরে আসে, সেই জন্য ট্রাউজার নাকি তিনি জমিয়ে রাখেন ! তখন বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও এখন দেখছি , অতি হাইপোথিসিস মাত্র – ‘ফিরে এস চাকা’ বললেও যেমন চাকা ফেরে না , বেলবটমও তেমনি আর ফেরে নি কোনোদিন। আজকের দিনে ট্রাউজারের ঘের অতি বিপ্লবী কিছু নয়, ক্যাজুয়াল হিসেবে জিনসের চলন বেশি।

অর্ধাঙ্গ ঢাকার জন্য শার্ট ও টি শার্টই মূলত পোশাকের তালিকায় – জিনসের ট্রাউজারের সঙ্গে পাঞ্জাবি পরার চল মূলত হালে।তবে হিন্দী সিনেমার অনুকরণে অনেকে চোখে সানগ্লাস, গায়ে ‘সাফারি শার্ট’ শোভিত হয়ে অফিস- আদালত করত ,আর সত্যিকারের ইনফরমাল পার্টিতে হয়তো গলাবন্ধ কোটপ্যান্ট পরে অক্লেশে ঢুকে পরত।

আমরা , যাদের গোঁফ গজিয়েছে আশি বা নব্বইয়ের দশকে কিংবা তারও আগে , ঘরের পোশাক হিসেবে কেন জানি না লুঙ্গিকে বর্জন করেছিলাম – সে জায়গায় এসে গেছিল পায়জামা। কোনো বিবাহিত যুবকও ঘরে লুঙ্গি পড়লে তার স্ত্রীকে , বান্ধবীদের মুখে শুনতে হত , ওমা , তোর বর লুঙ্গি পরে ! মাঝে সাঝে দড়ি বিশ্বাসঘাতকতা না করলে পোশাক হিসেবে পায়জামা দিব্য ছিলI কিছুদিন আগে আমাদের বন্ধুদের একটি হোয়াটস্যাপ গ্রূপে নব্বই দশকের গোড়ার দিকের একটি গ্রূপ ছবি কেউ একজন পোস্ট করেছিল। পুরীর সমুদ্রতীরে তোলা সেই ছবিতে চব্বিশ পঁচিশ বছরের জনা দশেক যুবকের সকলের পরনে শার্ট ও পাজামা। এখন আমরা ঈষৎ স্ফীতোদর ও রোমশ অথচ প্রায়শই , মুরগী সদৃশ সরু ঠ্যাং নিয়ে যত্র তত্র হাফ পেন্টুল বা বারমুডা পরে ঘুরে বেড়াই , মধ্যবিত্ত বাঙালীর সে চলটা তখনও হয় নি। হাফ প্যান্ট বা শর্টস এককালে প্রবাসী ভারতীয়দের দস্তুর ছিল, বাঙালী পুরুষের ঘরের পোশাক হিসেবে আজ সেই হাফ প্যান্ট অথবা বারমুডা মোটামুটি থিতু হয়েছে।আর শীতকালে ট্র্যাকস্যুট I পোশাক দেখে রাজনৈতিক কর্মীদের দলীয় আনুগত্য বোঝা যেত একসময়। নেতারা সকলে ধুতি পাঞ্জাবি পরলেও ফিনফিনে পাঞ্জাবী পা জামা মানে কংগ্রেস , আর মোটা পাজামা, ওপরে শার্ট বা পাঞ্জাবী, গালে দাড়ি, কাঁধে ঝোলা মানে কমরেড।

তবে শীতকাল পড়লেই , সুপর্ণা থাকুক না থাকুক , সেকাল থেকে একাল, বাঙালী পুরুষ স্যুট বা ব্লেজারে সজ্জিত হয়ে ঘুরতে ভালবাসে, আম্মো তার ব্যতিক্ৰম নই। ক্যাজুয়াল হিসেবে এককালের উইনচিটারের বদলে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হুডি , মাফলারের মধ্যেও সেও কেশো বুড়োর ব্যাপারটা নেই, ডিজাইনার মাফলার এখন রীতিমত ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। বাঙালীর প্রিয় মাংকি ক্যাপও আধুনিক হয়ে এর ওর মাথায় চরে বেড়াচ্ছে।

এবার আবার ফেয়ার সেক্স। মধ্যবিত্ত পরিবারে মেয়েবেলার পোশাক হিসেবে ধার্য ছিল ফ্রক,একটু বড় হয়ে গেলে স্কার্ট-ব্লাউজ , পরবর্তীকালে যার নাম হয় স্কার্ট আর টপ। মালতি স্কুলগুলিতে ‘আমি তখন নবম শ্রেণী , আমি তখন শাড়ি ‘ চালু হলেও কলেজে যাবার আগে বাড়িতে কেউ শাড়ি পরত না।

আমাদের দিদিমা ঠাকুমা রা ঘরে সাধারণত শাড়ি একটু অন্যরকম করে পরতেন -‘সাধারণভাবে শাড়ি পরা’ বলে একটি কথা চালু ছিল। বাইরে বেরোনোর সময় জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর উদ্ভাবিত কুঁচি দেওয়া বা ড্রেস দিয়েই শাড়ি পরতেন। মা মাসী বা কাকিমাদের প্রজন্মে একটু শহরমুখী নারীদের ওই ‘সাধারণভাবে শাড়ি পরার ‘ ব্যাপারটা বিদায় নেয়। আরও বেশ কয়েক প্রজন্ম জাঁকিয়ে রাজত্ব করার পর , কর্মব্যস্ততা ও আনুষঙ্গিক কারণে মধ্যবিত্ত উচ্চমধ্যবিত্তদের শাড়ি এখন ‘পার্টি উইয়ার ‘ বা পূজা উৎসবের পরিধেয় বলেই বিবেচিত I সত্তরের দশকে যাকে ‘সালোয়ার কামিজ ‘বলত , সেটাই চুড়িদার নামধারী হয়ে বঙ্গজীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে I ফ্যাশনের তাগিদে পাটিয়ালা ,পালাজো,লেগিংস ইত্যাদি নানাবিধ অবতারে বিভিন্ন সময়ে আবির্ভাব হলেও মূল ব্যাপারটা সেই চুড়িদারই I পেশাদার মহিলারা অনেকে ফর্মাল স্যুটেও অফিস -কাছারি করছেন।

একটু অল্প বয়সী মেয়েদের মধ্যে মিনি মিডি এসব ড্রেস ঘুরে ঘুরে আসে , ঘরোয়া পোশাক তো খানিকটা লিঙ্গ নিরপেক্ষ হয়েই গেছে। ক্যাজুয়াল হিসেবে কাঁধের কাছটা খানিকটা গর্ত করা একরকম পোশাক আজকাল বাজারে চলছে , সকালে তার নামটা মাথায় আসছিল না। এক প্রিয়ভাষিণীকে ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম , ড্রেসটার নাম I বললাম , “নামটা মনে পড়ছে না , হট শোল্ডার না কী যেন!”প্রিয়ভাষিণী জানালেন,”পুরুষের দৃষ্টি তো , হট ছাড়া তোদের মাথায় কিচ্ছু আসে না ! ওর নাম তো কোল্ড শোল্ডার!” ইংরেজিতে কোল্ড শোল্ডার মানে উপেক্ষা করা – কিন্তু এরকম অভিনব পোশাক উপেক্ষা করে কে !

একটু আগেকার দিনে , মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত মহলে মেয়েদের পোশাক প্রধানত দুরকম থাকত -ভ্রমণের পোশাক আর সংসারের পোশাক। ভ্রমণের পোশাক বলতে চুড়িদার বা জিন্স , যা পরে গৃহবধূরা দার্জিলিং এর ম্যাল বা দীঘা -মন্দারমনির সৈকতে দাঁত কেলিয়ে ঘাড় হেলিয়ে ফটো তুলত, পাশে স্বামীরা নাড়ুগোপাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। সংসারে বাইরের পোশাক বলতে সবেধন নীলমনি শাড়ি। তবে ভ্রমণের সময়েও ডাইনিং টেবিলে বা হোটেলের বারান্দায় পরনে সেই রংজ্বলা ম্যাক্সি বা নাইটি , উপরে মডেস্টি রক্ষার্থে একটি ওড়না-সেই ট্র্যাডিশন কিছুটা হলেও আজও বোধহয় রয়ে গেছে!

মাঝ নব্বুইতেই বোধহয় একটু ফ্যাশন সচেতন মহিলাদের প্রিয় হয়েছিল পিঠ ও গ্রীবার দিকে জানালা ডিজাইনের ব্লাউজI কলেজে দুস্টু সহপাঠীরা সেই জানালা তাক করে চক ,কাগজের হেলিকপ্টার এসব ছুড়ঁত, তবে এসব উপদ্রব মেয়েরা সাধারণত সহাস্য প্রশ্রয়ে স্বীকারই করত।

পোশাক বিতর্ক যে মেয়েদের পেছন ছাড়ে না তার মূল কারণ পুরুষতন্ত্র বা মেল্ হেজেমনি। নব্বইয়ের দশকে চুড়িদার পাঞ্জাবীর মত নিরীহ পোশাক নিয়ে একটি শুভঙ্করী বিতর্ক শুরু হয়েছিল, পরবর্তীকালেও খবরের কাগজ, টিভি নিউজডেস্ক বা ফেসবুকের পাতা এসব অকিঞ্চিৎকর বিষয় নিয়ে সরগরম হয়। পোশাক নিয়ে আরেকরকম বিতর্ক হয় অভিজাত বা নব্যজাত ক্লাবগুলোতে ড্রেস কোড নিয়ে। এরকম ড্রেসকোডের বিরুদ্ধে মকবুল ফিদা হাসান বিদ্রোহ করেছেন, লেক ক্লাবের লেকে এক সাংসদ খালি গায়ে সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে স্নান করেছেন। তবে এক্ষেত্রে আমার মতামত একটু রক্ষনশীল -অর্থাৎ রোমে গেলে রোমান হও , বনে গেলে জংলী।আর স্থান কালের একটা ব্যাপার আছেI অর্থাৎ কোট প্যান্ট পরে আমি যেমন হরি সংকীর্তন শুনতে যাব না ,চপ্পল পরে ক্লাব চত্বরে না ঢুকলেই হয় !

স্থান কালের ব্যাপারে আরেকটি গল্প বলি। বেশ কবছর আগে ,চেন্নাইতে সুনামিতে সমুদ্র সৈকতের কাছাকাছি বসবাসকারী মৎসজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন সবচেয়ে বেশী। খোলা হাতে ত্রাণের ডাকে সাড়া দিয়েছিল সারা দেশ। কিন্তু নাগরিক মামনিরা যে প্রচুর পরিমানে জিন্স, টপ, স্কার্ট ইত্যাদি দিয়েছিলেন – তা দেখে মৎসজীবীদের মুখপত্র রাগে ফেটে পড়েছিলেন – ওঁর বক্তব্য ছিল, আমরা ভিখিরি নই, গৃহস্থ – আমাদের সাহায্য করতে হলে এমন জিনিস দিন যা ব্যবহার করা যায়। আমাদের সমাজে মেয়েরা এসব পোশাক পরে না। সুতরাং পোশাকের ব্যাপারে সাংস্কৃতিক দিকটি উপেক্ষা করা যায় না। প্রত্যন্ত গ্রামে যেসব শহুরে ছেলে মেয়েরা পড়াতে যাচ্ছেন , পোশাকের ব্যাপারে সেসব এলাকার লোকেদের আর্থিক অবস্থা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশটা একটু মাথায় রাখলে ভাল হয়।

তবে ড্রেস কোড নিয়ে বাড়াবাড়ি এক এক সময় অসহ্য মনে হতে পারে। ভারতের মত গ্রীষ্ম প্রধান দেশে কাঠ ফাঁটা রোদে সেল এক্সিকিউটিভদের টাই পরতে বাধ্য করার মানে হয় না। কোর্ট গুলোও এখন কলোনিয়াল হ্যাংওভার থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে , এটা সুখ ও স্বস্তির।

আটপৌড়ে বাস্তব থেকে একটু বেরোই এবারIপ্রথমেই মনে পড়ে পোশাক প্রসঙ্গে মোল্লা নাসিরুদ্দিনের একটি গল্প । এক ধনীর বাড়িতে ভোজ ছিল, রবাহূত হয়ে নাসিরুদ্দিন সেখানে হাজির।তার সাধারণ পোশাক দেখে, অতিথিদের দেখাশুনার ভার যার উপর ছিল, মোল্লাকে ঠেলে দিলেন এক কোণে। বুদ্ধিমান মোল্লা বুঝে গেল, এখানে খেতে হলে রাত কাবার হয়ে যাবে। তাই চুপি চুপি বাড়ি ফিরে গিয়ে সে ঠাকুরদার আমলের ঝলমলে এক আলখাল্লা আর পাথর বসানো পাগড়ি পরে চলে এল। এবা তার আর খাতির দেখে কে!সটান তার সামনে চলে এল এক পাত্র পোলাও । তা দেখেই নাসির তার খানিকটা পোশাকে মেখে নিল। লোকজন অবাক হওয়াতে তার নির্লিপ্ত জবাব, এই পোশাকের দৌলতেই খেতে পেলাম যখন,একে না দিয়ে খাওয়া যায় ?

তবে পোশাকের ব্যাপারে সবথেকে বৈপ্লবিক কাজ যিনি করতে পেরেছিলেন , তাঁর নাম মহাত্মা গান্ধী। ট্রেনে করে চেন্নাই থেকে মাদুরাই যাওয়ার সময় তাঁর উপলব্ধি হয়, এই পোড়া দেশে যেখানে অর্ধেকের বেশি লোক নগ্ন থাকতে বাধ্য হয় -সেক্ষেত্রে জননেতা হিসেবে নিজে আপদমস্তক পোশাকে নিজেকে ঢাকেন কী করে? পরের দিন রাতেই জন্ম হল অর্ধনগ্ন ফকিরের- যার এই পোশাক মহামহিম চার্চিল সাহেবের উষ্মা তথা ভীতির উদ্রেক করেছিল ।

তবে গান্ধী পরবর্তী সময়ে, আরও বেশি আজকাল, দেশে দেশে যে রাজনেতাদের দেখতে পাওয়া যায় – এরকম বোধোদয় কি তাদের কখনোই হতে পারে ? বহুমূল্য পোশাকে সজ্জিত হলেও আদতে সেরকম রাজাধিরাজ অর্ধ নন, পুরোই নগ্ন, অপেক্ষা শুধু সেই রাখাল বালকের, যে বলবে, রাজা তোর কাপড় কোথায় ?

Nilay Baran Som

Nilay Baran Som

নিলয় বরণ সোমের জন্ম ১৯৬৫ সালে উত্তর পূর্ব ভারতের ত্রিপুরার সালেমায়I স্থায়ী বাসস্থান কলকাতায়I প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কর্মস্থল ত্রিপুরার বিভিন্ন মফস্বলে,উচ্চতর শিক্ষা কলকাতার দীনবন্ধু এন্ড্রুজ কলেজ ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে I কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরI ভারত সরকারের আয়কর বিভাগে ১৯৯০সাল থেকে কর্মরতI জীবিকাসূত্রে কলকাতা ছাড়াও চেন্নাই ও ডেপুটেশন সার্ভিসে আফ্রিকার দক্ষিণে বতসোয়ানায় কাজ করেছেনI লেখালেখি ছাড়া পড়াশুনা , আড্ডা, গান শোনা ও ভ্রমণে আগ্রহী। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকও লেখকের পছন্দের জায়গাI শৈশবে লেখালেখি শুরু করলেও কলেজ জীবনে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে বঙ্গ সাহিত্য সমিতির সভানেত্রী , বাংলার অধ্যাপিকা প্রয়াত মৈত্রেয়ী সরকারের উৎসাহে ও অভিভাবকত্বে ছোট গল্প লেখা শুরু হয়। বর্তমানে মুক্তগদ্য ও রম্যরচনায় ব্যাপৃতI ছাত্রজীবন ও পরবর্তীকালে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও বিভাগীয় সাময়িকী ও প্রবাসকালে পূজা সংকলনে লেখকের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে 'কলেজ স্ট্রিট পত্রিকায়, ২০০১ সালেI দীর্ঘ বিরতির লেখালেখি ২০১৬-১৭ সালে শুরু I২০১৮ ও ২০১৯ এ অনুস্টুপ পত্রিকার শারদ সংকলনে লেখকের দুটি মুক্তগদ্য ও ২০১৯ সালে ফেসবুক গ্রূপ ' শনিবারের আসরের' ২০১৯ পূজা সংকলনে একটি রম্যারচনা প্রকাশ পায় I ওয়েবজিন 'সময়.ইন ' এর কয়েকটি সংখ্যায় লেখকের রম্য রচনা স্থান পেয়েছেI সৃজনাত্মক সাহিত্যের পাশাপাশি আয়কর আইন সংক্রান্ত বিষয়ে লেখক লেখালেখি করেন।২০১৩ সালে বিভাগের 'ট্যাক্সপেয়ার ইনফরমেশন সিরিজে' যুগ্মলেখক হিসেবে 'Royalty and Fees for Technical Services' শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ পায়I ২০১৯ সাল থেকে বিভাগীয় ওয়েবজিন 'ট্যাক্সলোগ'-এ লেখকের লেখা প্রকাশিত হয়েছেI

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: