পেগ

অঙ্কুশ

-এই নে দু প্যাকেট বাদাম,চিপস,কোল্ড ড্রিংকস আর তোর জন্য জলজিরা। আর আজকের বিশেষ অতিথি…আ হা!

-ভাই এতোবড়ো এনেছিস কেনো? মাত্র তো দুজনই আমরা

-তাতে কী? কতোদিন ঠিকমতো খাইনি বলতো। আজ গলা অবধি গিলবো। নেশায় চুর হয়ে যাবো। আজ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। হ্যাপী ইন্ডেপেন্ডেন্স ডে টু ইউ। চল পেগ বানা এবার।

(সৌরভ গ্লাসে কোল্ড ড্রিংস ঢালে। পেগ বানানো শুরু করে।

অর্চিস্মান ছাদে মাদুরটায় গা এলিয়ে দেয়। চোখ তারাগুলোর দিকে)

-আকাশটা কী সুন্দর লাগছে না রে? কি সুন্দর তারারা টিমটিম করে জ্বলছে। জানিস সৌরভ,ছোটবেলায় স্বপ্ন ছিলো মহাকাশচারী হবো। অ্যাস্ট্রোনট

-হ্যাঁ,এই নে ধর,গিলে ফেল

-(ঢকঢক করে গিলে) ঘর ভর্তি পেপার কাটিং ছিলো আমার। পেপার এ মহাকাশ নিয়ে কিছু লিখলেই কেটে রেখে দিতাম। ম্যাগাজিন কিনতাম। গল্প পড়তাম। আলাদাই রোমাঞ্চ লাগতো তখন…

-হ্যাঁ ভাই,গ্লাসটা দে,পরের পেগ বানাই

-হ্যাঁ ভাই,কড়া করে বানা,একদম নেশা লাগছে না

-আরে সবে তো খেলি। লাগবে লাগবে

-হুম তো যা বলছিলাম। ছোটবেলা। তারপরে তো মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট হলো। তারপরে এইচ এস। তারপরে গ্রেজুয়েশান। ব্যাঙ্কিং এর প্রিপারেশান। তারপরে এই জব। শালা বুঝে পাইনা কবে কেটে গেলো এতগুল সময়..এই তো কদিন আগে..এই ভাই পেগ দে,কত সময় লাগে পেগ বানাতে..

-এই নে হয়ে গেছে। খুব কড়া করে বানিয়েছি,আস্তে খা।

-(একঢোঁকে পুরো পেগ শেষ করে) কবে যে বড়ো হয়ে গেলাম এতো। সারা সপ্তাহ ডিউটি। রাতে ছাদে গিয়েও তারা দেখা হয়না জানিস,মাথায় টেনশন ঘুরে,কাল এতো কাজ গিয়ে ঘুমাই,প্রোজেক্টটা শেষ হবে তো?! কুত্তা জিন্দেগী হয়ে গেছে ভাই

-আরে আরে সবার হয়। আমার কথাই ভাব…

-সে ঠিক আছে,কিন্তু আগে তুই বল নেশা লাগছেনা কেনো

-লাগবে ভাই লাগবে৷ যেটা বলছিলাম,ফ্যামিলী বিজনেসটা আমার উপর চাপিয়ে তো বাবা পটল তুললো,আমিও বিজনেসের কিচ্ছু বুঝিনা। একের পর এক ধাক্কা। এখন কিছুটা শিখে সামলে উঠেছি। কিন্তু কলেজের সেই আর্টিস্ট হবো,সেগুলো কবে শেষ। একটা বেসিক স্ট্রাকচার আঁকতে গেলে হাত কাঁপে এখন

-হেহেহে। এই ভাই গল্প আবার বহুত সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে,চল বরং তোকে কিছু মজার কেস বলি এই মহাকাশযাত্রা নিয়েই। তুই পেগ বানা

-হ্যাঁ থাম বানিয়ে নি,এটা খেয়ে শুরু কর

(বানানো হয়। খায় দুজনে। ক্ষনিকের নিস্তব্ধতা। অর্চিস্মান আবার শুরু করে)।

-আচ্ছা ভাই একটা কথা বল,এতোগুলো তো পেগ হয়ে গেলো নেশা লাগছেনা কেনো?

-সেটাই ভাই,এবার তো আমারও সেটা মনে হচ্ছে। আচ্ছা এবারটা আরও কড়া করে বানাচ্ছি।

-হ্যাঁ বানা। তো যেটা বলছিলাম,মহাকাশযাত্রা।

দু-তিনবছর আগে মনে কর একটা রব উঠেছিলো মঙ্গল যাত্রা নিয়ে। যে নাসা কিছু সিলেক্টেড মানুষকে মঙ্গলে নিয়ে যাবে,ভলেন্টিয়ার হওয়া যাবে। তো আমার তো প্রচুর অ্যাস্ট্রোনমি পেজ লাইক করা আছে,তো এরকম এক পেজ থেকে ই-মেল আসে।

-কীসের ইমেল?

-মঙ্গল যাওয়ার সুবর্ন সুযোগ। যা যা ডিটেলস দিতে হয় দিলাম। দিনরাত তখন স্বপ্নে ভাসছি। আহ মঙ্গলে যাবো। প্রথম মানুষ। ফার্স্ট স্টেপ। ইতিহাসের পাতায় স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে ভাই। অর্চিস্মান। অর্চিস্মান হাজরা। হু ওয়াজ দ্য ফার্স্ট পার্সন টু স্টেপ ইন মুন? -নীল আর্মস্ট্রং। এন্ড ইন মার্স? -অর্চিস্মান হাজরা। উফফ। ভাবলেও কেমন লাগে। ভাব তুই যেমন করে আমরা নীল আর্মস্ট্রং এর নাম মুখস্থ করেছিলাম,ওরকম রাশিয়া বা আফ্রিকার কোনো বাচ্চাও আমার নাম মুখস্থ করবে। উফ। তোর গর্ব লাগবেনা বল?

-কি বলিস ভাই,ভীষন গর্ব হবে। আমি তো আমার সব বন্ধুকে বলবো আমার বন্ধু অর্চিষ্মান প্রথম মঙ্গলে গেছিলো। উফফ। এই নে ভাই,পেগটা নে

-(পেগটা খেয়ে)

কিন্তু ভাই তুই ‘গেছিলো’ বললি কেনো?

গেছে বল। গিয়ে এসেছে বল। মানে কি না আসার একটা চান্স আছে? এটা আমি পড়েওছিলাম,রিস্ক আছে

আচ্ছা যদি ফিরে না আসি তাহলে আর ব্যাঙ্কে যেতে হবেনা বল? উহুহু! একদম ফ্রীডম। শুধু দিনরাত আকাশ দেখবো। পৃথিবী দেখবো। হাত নাড়াবো ভাই। তুই এই ট্যাঙ্কির উপরে উঠে দাঁড়াস বুঝলি তো,নাহলে দেখা যাবেনা তোকে

-হ্যাঁ ভাই,আমি ট্যাঙ্কির উপরে উঠে মুখে ফ্ল্যাস মেরে বসে থাকবো,যাতে তুই আরও ভালো করে দেখতে পাস

-একদম একদম। কিন্তু ভাই,ওখানে একা একা কী করবো? বোর হয়ে যাবোনা? এককাজ কর,তুইও চল আমার সাথে। আর কয়েকটা বোতলও তুলে নিবো। চুটিয়ে পার্টি হবে। টেনশনও থাকবেনা পরেরদিন অফিসের৷ যত রাত ইচ্ছা পার্টি করবো। কেমন আইডিয়া বল?

-ভাই আইডিয়া তো সেরা। কিন্তু প্রাক্টিক্যাল না। একটা জিনিস তো ভাবিস ই নি।

-কী?

-ওয়াই ফাই? আছে ওখানে? রিয়াল মাদ্রিদের খেলা দেখবো কীকরে?

-এই রে,এটা তো ভাবিনি। সত্যি এটা তো ভেবেই দেখা হয়নি। কী করা যাবে? থাম ভাবতে দে। তুই এককাজ কর,পেগ বানা,আমি ভাবি। আর কি হচ্ছে বল তো,নেশা লাগছেনা একদম..

-জানিনা ভাই। দেখি বানাই আবার।

-হুম বানা। ইউরেকা! ভাই আমার বাড়ীর ওয়াই-ফাই টা নিলেই তো হয়,আমার বৌ তো সারাদিন ওটা দিয়ে সিরিয়াল দেখা ছাড়া কোনো কাজও করেনা..।

-ওক্কে বস। মনে করে প্যাক করে নিয়ো তবে ওটা। ভুলো না যেনো আবার।

-না না ভাই,এসব বেসিক জিনিস,এসব ভুলি

পেগটা হয়ে গেছে,দে দেখি,নেশাটা একদম লাগছে না

-হ্যাঁ নে

-(ঢকঢক করে গিলে)

হ্যাঁ তো কী নিয়ে গল্প করছিলাম রে?

-মঙ্গল

-হুম। তো আমার বাড়ীতে মঙ্গলবার করে নিরামিষ হবেই,ছোট্ট থেকে দেখে আসছি…

-আরে,এই মঙ্গল না,মঙ্গল গ্রহ। যাওয়ার প্ল্যান..

-ও হ্যাঁ হ্যা মনে পড়েছে। তো আমি আর তুই ওয়াই ফাই নিয়ে যাবো। ভাই একটা রিকোয়েস্ট কিন্তু আছে,তুই যাচ্ছিস চল,কিন্তু ধোঁকা দিসনা

-কী বল

-ভাই প্রথম স্টেপটা আমাকেই ফেলতে দিস। সেকেন্ডটা তুই ফেলিস।

ভাই সবাইকে বলে যাবো। প্রেস্টিজের ব্যাপার আছেনা।

আচ্ছা তুই যদি চাস তো একসঙ্গে ফেলবো না হয়,জয়েন্ট রেকর্ড থাকবে দুজনের,কিন্তু প্লিস ভাই প্রথমে ফেলিসনা।

-আরে আরে টেনশন নিস কেনো,তোর আইডিয়া,আমি কেনো ফেলবো? রিল্যাক্স থাক,তুই দুটো স্টেপই ফেলবি,তারপরে আমি ফেলবো

-থ্যাঙ্কস ভাই। আসলে ধোঁকায় এতো জীবন খেয়েছি না,যে আর কাওকে ভরসা করতে পারিনা আর..

-না না ভাই বুঝি রে,আমিও কী কম ধোঁকা খেয়েছি,মা বলেছে রবিবার মাংস হবে,এসে দেখি ও বাবা ধোঁকার ডালনা বানিয়েছে

-একদম ভাই। থ্যাঙ্কস রে।

তবে আরেকটা জিনিস মনে হচ্ছে ভাই

-কী ভাই?

-আমরাও মন্দ নেই ভাই। মঙ্গলে কাজ থাকবেনা কোনো,কদিন ভাল লাগবে,তারপরে কি করবো? কাজ আছে বলেই বোধহয় এই শনিবার-রবিবার গুলোর গুরুত্ব আছে ভাই।

-ঠিকই বলেছিস ভাই এটা

-হ্যাঁ ভাই ছাড়। পরে নাহয় আন্দামান ঘুরতে চলে যাবো সবাই মিলে যেটা প্ল্যান হচ্ছিলো। বউটাও ওয়াই-ফাই এ সিরিয়াল দেখুক নাহয়

-একদম ভাই। এটা বেস্ট ডিসিশন

আচ্ছা আর একটা পেগ হবে লাস্ট। বানাচ্ছি

-হ্যাঁ বানা। কিন্তু কী হলো বলতো,এতোটা খেয়ে নিলাম,নেশা তো একটুও লাগলো না…..

The following two tabs change content below.
Avatar

Ankush

Avatar

Latest posts by Ankush (see all)

আপনার মতামত আমাদের প্রেরনাঃ-

%d bloggers like this: