কর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে

অগ্নিভ সেনগুপ্ত

আমার অনেক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করেন নেদারল্যান্ডসের কর্মসংস্কৃতির সাথে ভারতের কর্মসংস্কৃতির পার্থক্য সম্বন্ধে। প্রথমেই বলে রাখি, আমার অভিজ্ঞতা শুধুমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি জীবিকাতেই সীমিত​, এবং ভারতবর্ষে কাজ করেছি মাত্র দু-বছর​। তবু, যেহেতু বেশীরভাগ সহকর্মীই ভারতীয়​, এবং কর্মসূত্রে বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে কাজ করার সুযোগ হ​য়েছে, সাংস্কৃতিক পার্থক্যের একটা সম্যক ধারণা তৈরী হ​য়েছে। সেই বিষ​য় নিয়েই আজকের প্রবন্ধ – নেদারল্যান্ডসের কর্মসংস্কৃতি এবং তার সাথে ভারতবর্ষের তুলনামূলক আলোচনা।

এই বিষ​য়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে নেদারল্যান্ডসের আর্থ​-সামাজিক পরিবেশ সম্বন্ধে দু-চার কথা জানিয়ে রাখা আবশ্যক​। নাহলে পার্থক্যের কারণটা ধরা যাবে না।

প্রথমত​, নেদারল্যান্ডস অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল একটি দেশ​। এই দেশে মাথাপিছু বাৎসরিক আয় গ​ড়ে ৫২ হাজার ডলার​, যেখানে ভারতবর্ষের মাত্র ৭ হাজার ডলার​। সুতরাং, কিছু বিলাসিতা এই দেশের মানুষের শোভা পায়​, যা আমাদের সামর্থ্যের​ বাইরে।

দ্বিতীয়ত​, নেদারল্যান্ডসের দক্ষ কর্মীর চাহিদা আছে। তিনটি আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্ক​, শেলের মতো তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের কোম্পানি, ফিলিপ্সের মতো ইলেক্ট্রনিক্স কোম্পানি বা ইউনিলিভারের ভোগ্যপণ্য​-প্রস্তুতকারকের পাশাপাশি বুকিং ডট কম বা উইট্রান্সফারের মতো তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর নেদারল্যান্ডসে। তা ছাড়া, রটারড্যাম বন্দর (ইয়োরোপের বৃহত্তম​) এবং স্কিফোল বিমানবন্দরে (ইয়োরোপের তৃতীয় ব্যস্ততম​) কর্মী-চাহিদা প্রবল​।

নেদারল্যান্ডসের জনসংখ্যা মাত্র ১.৭ কোটি​, অর্থাৎ মুম্বাইয়ের থেকেও কম​। সুতরাং, কর্মক্ষেত্রে ডিমান্ডের তুলনায় সাপ্লাই কম।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় এমন অনেক সহকর্মী পেয়েছি, যাঁরা কোনদিন তথ্যপ্রযুক্তির সাথে যুক্ত ছিলেন না, বা এই বিষ​য়ে প​ড়াশুনা করেন নি। এমনও হ​য়েছে, হ​য়তো আগে রাজ​মিস্ত্রীর কাজ করতেন​, বা ট্যাক্সি চালাতেন, অথবা শিক্ষকতা করতেন। তথ্যপ্রযুক্তিতে সরাসরি চাকরী পেয়েছেন এবং সফলভাবে জীবিকা-নির্বাহ করছেন​।

তৃতীয়ত​, নেদারল্যান্ডসের সামাজিক এবং কর্মী সুরক্ষা আইন বেশ শক্তিশালী। যেমন আগেও লিখেছিলাম​, যদি এখানে কর্মরত (অর্থাৎ, নেদারল্যান্ডসে নিযুক্ত​) কারোর চাকরী চলে যায়​, তাহলে সরকারের পক্ষ থেকে ন​য় মাস অবধি বেতনের কিছু অংশ দেওয়া হ​য়​।

সরকারী নিয়ম অনুযায়ী নেদারল্যান্ডসে প্রত্যেক কর্মীর নির্দিষ্ট ন্যূনতম পারিশ্রমিক নির্ধারিত করা আছে। সেই নিয়ম অনুযায়ী প্রতি মাসে অন্ততঃ ১৬১৫ ইউরো প্রত্যেক কর্মীর প্রাপ্য​। তা ছাড়া, সামাজিক নিরাপত্তা, এবং বিশেষ ক্ষেত্রে মেডিকেল ইনসিওরেন্স বাবদ নির্ধারিত অঙ্ক প্রত্যেক কর্মীর প্রাপ্য​।

চতুর্থত​, যেকোন প্রতিষ্ঠানে একশো বা তার বেশী কর্মী কর্মরত হলে কর্মীস্বার্থ রক্ষার্থে সেই প্রতিষ্ঠানে ওয়ার্কস কাউন্সিল বাধ্যতামূলক​। কর্মক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন আনতে হলে ওয়ার্কস কাউন্সিলের অনুমোদন আবশ্যক​। অর্থাৎ, আপনার অফিসের ব​ড়বাবু হঠাৎ করে এমন কোন সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করতে পারবেন না, যা কর্মীদের অসুবিধায় ফেলতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, যেমন আপনারা বুঝতেই পারছেন​, নেদারল্যান্ডসে কর্মীস্বার্থকে ব্যবসায়ীক লাভের থেকে বেশী প্রাধান্য দেওয়া হ​য়​। সেই কারণেই এই দেশে কর্মসংস্কৃতি বেশ খোলামেলা, ভারতবর্ষের মতো চাকরীসর্বস্ব জীবন এখানকার মানুষ নির্বাহ করেন না। এবং, কর্মীদের পছন্দ​-অপছন্দের মূল্য তাদের পেশাগত জীবনের গতিপথ নির্ধারণে প্রাধান্য পায়​।

সর্বোপরি, এখানে বেশীরভাগ মানুষের কাছেই জীবিকা নিতান্তই গ্রাসাচ্ছাদনের নিমিত্তমাত্র​। ব্যক্তিগত জীবন তাদের কাছে সমান গুরুত্ব পায়​, এবং সেই কারণে নির্দিষ্ট সম​য়ের বাইরে বেশীরভাগ মানুষই অফিসের কাজ বা আলোচনা করতে পছন্দ করেন না। অনেকেই অফিসের জন্যে আলাদা ফোন নাম্বার ব্যবহার করেন​, যা নির্দিষ্ট সম​য়ের বাইরে ব্যবহৃত হ​য়না। হ​য় সুইচ​-অফ​, অথবা সাইলেন্ট​, অর্থাৎ আপনি শত চেষ্টাতেও যোগাযোগ করতে পারবেন না। কারণ​, অফিসের নির্দিষ্ট সম​য়ের বাইরে বাকিটা প্রত্যেকের নিজস্ব সম​য়​, এবং সেই সম​য়ে কেউ অফিসের কাজ নিয়ে বিরক্ত করুক​, সেটা অনেকেই চান না।

যেমন আগেও বলেছিলাম​, নেদারল্যান্ডসের সিদ্ধান্তগ্রহণ পদ্ধতি মূলতঃ সর্বসম্মতিমূলক​। যেকোন বিষ​য়ে প্রত্যেকের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হ​য়​। এই মানসিকতা কর্মক্ষেত্রেও বিদ্যমান​। কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে মিটিং, ওয়ার্কশপ​, অফসাইট ইত্যাদি করে সাধারণ মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা হ​য়​। তাই, এখানে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বেশ সম​য়সাপেক্ষ​।

ভারতবর্ষে আমাদের বেশীরভাগ সময় কাটে অফিসে। দিনে ১২ – ১৩ ঘন্টা অনেকেই কাজ করে থাকেন​, এমনকি উইক​এন্ডও বাদ যায়না। তা ছাড়া, সেখানে ওয়ার্কপ্লেস কালচার অনেকটাই আলাদা।  তাই, নেদারল্যান্ডসের কর্মপদ্ধতি অনেক ভারতীয় কর্মীর কাছেই কালচারাল শক​।

প্রথম শক আসে সম্বোধনে। আমরা, যারা কলকাতায় কাজ করে অভ্যস্ত​, সাধারণতঃ সিনিয়রদের ‘দাদা’ বা ‘দিদি’ সম্বোধন করি। অন্যান্য রাজ্যে শুনেছি ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন করাটাই রীতি। স্বাভাবিকভাবেই, নেদারল্যান্ডসে দাদা বা দিদি সম্বোধন বাস্তবসম্মত ন​য়​, কিন্তু সাধারণতঃ এখানে (এবং, সম্ভবত ইয়োরোপের সমস্ত দেশেই) সি-ই-ও থেকে সাধারণ কর্মী, সকলকেই নাম ধরে ডাকাটাই স্বাভাবিক​।

আমরা প্রথম​-প্রথম নাম উচ্চারণে বেশ মুশকিলে প​ড়েছিলাম​। না, আড়ষ্টতায় ন​য়​, বানানে। যেমন আগে একটা প্রবন্ধে লিখেছিলাম​, এখানে ‘IJ’-কে ‘Y’ হিসাবে উচ্চারণ করা হ​য়​। অফিসের ঠিকানায় দেখলাম লেখা আছে – ‘BIJLMER’। সাধারণ ইংরাজীর জ্ঞানে রাস্তায় লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম ‘বিজ্লমার’-এর দিকনির্দেশ​, যথারীতি কেউ বুঝল না। অবশেষে কাগজে লেখা ঠিকানা দেখাতে হলো (তখন ‘কাগজ নেহী দিখায়েঙ্গে’ বললে মুশকিলে পরতে হতো)। তারপর​, অফিসে পৌঁছে আবিষ্কার করলাম​, আমার ম্যানেজারের নাম ‘MIJNDERT’। ততক্ষণে বুঝে গেছি যে সাধারণ ইংরাজীর জ্ঞানে এই উচ্চারণ হওয়া অসম্ভব​। এবং, অবশ্যই, নিজের থেকে ত্রিশ​-পঁয়ত্রিশ বছরের ব​ড় কাউকে নাম ধরে ডাকার একটা অস্বস্তি তো ছিলই। তাই, প্রথম​-প্রথম ম্যানেজারকে প্রোএক্টিভলি সম্বোধন করতে চেষ্টাও করিনি।

খাওয়াদাওয়া নিয়েও বেশ মুশকিলে প​ড়েছিলাম প্রথম​-প্রথম​। অফিস ক্যান্টিনে শুধু বিভিন্ন প্রকারের পাঁউরুটি, হাগেলস্লাগ, ডিমসেদ্ধ​, দুধ ইত্যাদি। কলকাতায় অফিসে লাঞ্চ মানে পাত​-পেড়ে খাওয়াদাওয়া, তাই এখানকার লাঞ্চ এক বিশাল কালচারাল শক​। সৌভাগ্যবশতঃ আমাদের অফিসের সামনেই ম্যাকডোনাল্ডস ছিল​, সেখানেই কোনরকমে পিত্তরক্ষার ব্যবস্থা করতাম​।

পাঁউরুটি আর হাগেলস্লাগ​: নেদারল্যান্ডসের অফিস​ লাঞ্চ

এ তো গেল দৈনন্দিন জীবনের গল্প​। সেই পার্থক্য রপ্ত করতে বা বিকল্প ব্যবস্থা করতে খুব​-একটা বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু, প্রায় দশ বছর নেদারল্যান্ডসে কাজ করার পরেও কর্মপদ্ধতির পার্থক্য বেশ চোখে প​ড়ে। ভারতীয়দের কাছে সবকিছুতেই ‘ইয়েসটার্ডে ওয়াজ দ্য ডেডলাইন​’। তাই, যেকোন কাজেই আমরা খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করি। কিন্তু, যেমন বললাম​, নেদারল্যান্ডসে যেকোন সিদ্ধান্তই সম্মতি-ভিত্তিক​, যা বেশ সম​য়সাপেক্ষ​। প্রত্যেকের মতামতই  সেখানে গুরুত্বের সাথে বিচার করা হ​য়​।

মতামতের ক্ষেত্রেও আমরা অনেক ক্ষেত্রে উর্দ্ধতন ম্যানেজারের অভিমতকেই বেদবাক্য মনে করি, খুব​-একটা মতপার্থক্যে যাই না। কিন্তু, নেদারল্যান্ডসে প্রত্যেকেই নিজের মত স​ৎভাবে প্রকাশ করেন​, তা সে ম্যানেজারের মতের সম্পূর্ণ বিপরীত মতই হোক না কেন​। এখানে কাজ করতে-করতে শিখেছি, ‘না’ বলতে শেখাটা এক মহ​ৎ গুণ।

আমরা হ​য়তো অনেক ক্ষেত্রে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের বিরোধীতায় ভ​য় পাই, কারণ ভারতবর্ষে নেদারল্যান্ডসের মতো কর্মী-সুরক্ষার কবচ নেই। তাই, দিনে ৮ ঘন্টার চুক্তিতে ১২ ঘন্টা কাজের অন্যায় আবদারকেও আমরা মেনে নিয়েছি, উইক​এন্ডে পরিবারকে বা নিজের শখকে সম​য় না দিয়ে অফিসের অবাস্তব প্রজেক্ট ডেডলাইন ঠেলে গেছি, এবং অ্যাপ্রাইজাল বা লে-অফের জুজুকে ভ​য় পেয়ে গেছি।

অবশ্য অনেকেই আছেন​, যাঁরা অফিসের কাজ করতে ভালোবাসেন​। তাঁদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য ন​য়​। এবং, নেশাই যদি পেশা হ​য়​, তাহলে আক্ষেপেরও খুব​-একটা জায়গা নেই। নেদারল্যান্ডসেও আমার কিছু সহকর্মী আছেন​, যাঁরা প্রযুক্তি ভালোবাসেন​। তাই, বাড়ীতে বসেও অফিসের সার্ভারে ঢুকে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত পরীক্ষা চালান​।

কিন্তু, কোন ক্ষেত্রেই জবরদস্তি কাজকে ভালোবাসার কোন দায় কারোর নেই। নেহাতই গ্রাসাচ্ছাদনের নিমিত্ত​, চুক্তিবদ্ধ, এবং সেই অধিকার সরকার এবং কর্মপ্রতিষ্ঠানের নিয়ম​ দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত।

যাক​, নেদারল্যান্ডসের কর্মস্থলের দুটো ইন্টারেস্টিং তথ্য দিয়ে প্রবন্ধ শেষ করব​।

প্রথম​, নেদারল্যান্ডসে বেশীরভাগ মানুষের অফিসে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পরিবহন হচ্ছে – সাইকেল​। এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩৬% মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের জন্যে সাইকেল ব্যবহার করেন​। এমনকি, নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রীও অফিসে যাতায়াতের জন্যে সাইকেল ব্যবহার করতেই পছন্দ করেন​।

নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী সাইকেলে অফিস যাতায়াত করেন​

দ্বিতীয়​, নেদারল্যান্ডসে অনেকেই পার্ট​-টাইম কাজ করতে পছন্দ করেন​। অর্থাৎ, সপ্তাহে ৪০ ঘন্টার কম (সাধারণতঃ ৩৬ ঘন্টা অথবা ৩২ ঘন্টা)। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের ২৬.৮% পুরুষ এবং ৭৬% মহিলা পার্ট​-টাইম কাজ করেন​, যা ইয়োরোপের গ​ড়ের তুলনায় অনেক বেশী। এর কারণ সম্বন্ধে নানা মুনির নানা মত​, তা নিয়ে নাহ​য় অন্য কোন​ প্রবন্ধে আলোচনা করা যাবে।

যেমন প্রথমেই বলেছি, আমার এই প্রবন্ধ শুধুমাত্র আমার অভিজ্ঞতার প্রতিফলন​-মাত্র​। অন্যান্য পেশায় এই অভিজ্ঞতা কতটা প্রাসঙ্গিক​, ধারণা নেই। আপনারা, যারা তথ্যপ্রযুক্তির সাথে যুক্ত নন এবং নেদারল্যান্ডস বা অন্য কোন দেশে কাজ করছেন অথবা করেছেন​, নিজেদের অভিজ্ঞতা আমাদের জানিয়ে সমৃদ্ধ করুন​।

প​ড়ুন​, অন্যদের প​ড়ান​, এবং আপনার মতামত জানান​। ভালো থাকবেন​, সাথে থাকবেন​। ধন্যবাদ​।

Agniv Sengupta

Agniv Sengupta

পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অগ্নিভ সেনগুপ্ত লিখেছেন বহু পত্র-পত্রিকায়। সময়ে তার লেখা শুরু হল্যান্ডের হালহকিকত দিয়ে, এ ছাড়াও লিখেছেন আরও অন্যান্য সমকালীন বিষয়ে।

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: