আলো

অঙ্কুশ

-হ্যালো আমি সাইকিয়াট্রিস্ট ডঃ অরিন্দম বাগচীর সঙ্গে কথা বলতে পারি?

-হ্যাঁ বলুন,আমি ওনার পি এ বলছি।

-আসলে আজ আমার অ্যাপয়মেন্ট ফিক্স করা ছিলো ওনার সাথে।

-আচ্ছা আপনার নামটা একবার বলুন।

-অন্তরা। অন্তরা মিত্র।

-ওয়ান মিনিট প্লিজ।

-শিওর।

-হ্যাঁ,অন্তরা মিত্র,পেয়েছি। হ্যাঁ আজ দুপুর দুটোয় কলেজ স্ট্রীটে কফি হাউসে চলে আসবেন। উপরে উঠে একদম বামদিকের টেবিলটায় বসবেন।

-কফি হাউসে? ওনার চেম্বার?

-ওটাই ওনার চেম্বার!

-বুঝলাম না

-যেমন বলা হচ্ছে করুন। আর আশা করি আপনার জানা আছে ডক্টর পার পেশেন্ট সময় দেন অনেক বেশী,তাই তার চার্জ টাও তুলনায় বেশী।

-হ্যাঁ জানি। মানি ইজ নট দ্য প্রবলেম। আই ওয়ান্ট সলুউশন। আই এম টায়ার্ড উওথ মাই লাইফ।

-বেশ তাহলে দুটোয় চলে আসুন। রাখলাম। হ্যাভ এ নাইস ডে।

কি অদ্ভুত! কফি হাউসে কোন ডাক্তার দেখে। পাগল দেখতে দেখতে ডাক্তারও পাগল হয়ে গিয়েছে বোধহয়।

কিন্তু আর পারা যাচ্ছিলো না। রাতে ঘুমের ওষুধ ছাড়া ঘুম নাই। নানা রকমের বাজে দুশ্চিন্তা,আদৌ যার কোনো ভ্যালু নেই। সবসময় একটা ভয়। কিসের ভয় ভাবতে বসলে আর কোনো উত্তর মেলে না,কিন্তু ভয় টা জাঁকিয়ে ধরে থাকে সবসময়। বারবার মানিব্যাগ চেক,হারিয়ে গেলো না তো? ঘরে ঢুকে ছিটকিনি বারবার চেক,ও জানে ভালো করে যে ছিটকিনি ও টেনেছে,তাও মনে হয় যদি খোলা থেকে যায়।

বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যাচ্ছিলো। সবাই বলতো কেমন মনমরা হয়ে থাকিস সবসময়।

শেষে নিজেই সাহস করে সিদ্ধান্তটা নিলো অন্তরা।

স্নান করে হালকা একটু খেয়ে রেডি হয়ে নিলো। ক্যাব বুক করে পৌছে গেলো কলেজ স্ট্রীটে। উপরে উঠে বামদিকের টেবিলটায় গিয়ে বসলো। কফি হাউস অন্তরার পছন্দের জায়গা নয়,সিগারেটের গন্ধ সহ্য হয়না একেবারে।

দুটো বাজতে মিনিট দশেক দেরী। কফি হাউস আজ তুলনামূলক ভাবে অনেকটা ফাঁকা। সামনের টেবিলে একটা প্রায় সমবয়সী ছেলে কফি নিয়ে ফোন ঘাঁটছে। সবাই নিজের নিজের মতো গল্প করিছে,ধোঁয়া উড়াচ্ছে।

দুটো বাজলো। দুটো পনেরো। আড়াইটা।

ফোন করলো। ফোন ও তোলেনা। কি অদ্ভুত!

হঠাৎ করে সামনে বসা সেই ছেলেটা উঠে তার টেবিলে এসে বসলো।

-এক্সিউজ মি,আপনাকে অনেকক্ষন ধরে দেখছি,আপনাকে কি ডঃ বাগচী এখানে আসতে বলেছেন?

বিস্মিত হয় অন্তরা।

-আপনি কি করে জানলেন?

-আমারও তো সেম কেস। এদিকে ফোনও ধরছেননা। কি যে বাজে ঝামেলায় পড়লাম। দেখি আর আধঘন্টা মতো,মনে তো হয়না আর আসবেন।

-হুম দেখা যাক।

অল্পবিস্তর কথা হলো। অন্তরা ভীষন ইন্ট্রোভার্ট,অচেনা লোকের সঙ্গে একদম কথা বলতে পারেনা। তাও ছেলেটার সঙ্গে অনেক কথা বললো। ছেলেটা ভীষন মজাদার। কথায় কথায় হাসে। মনে হচ্ছিলোনা এর কোনো মানসিক রোগ থাকতে পারে। তবুও,বাহির থেকে কী আর সব বোঝা যায়!

তিনটে বাজলো। ফোনও ধরছেননা। নাহ এবার উঠতে হয়।

-আচ্ছা আপনার প্ল্যান কি আজ?

-কোনো প্ল্যান নেই। ডক্টর তো অনেক সময় নিয়ে দেখেন শুনেছিলাম,তাই আর কোনো প্ল্যান রাখিনি।

-আমিও তো তাই। আচ্ছা আপনি তো বললেন কলকাতা তেমন চেনেননা,চলুন আপনাকে কলকাতা চেনাই।

-কীভাবে শুনি?

-প্রথমেই যাবো কাছেই পুঁটিরাম এ,কড়াইশুঁটির কচুড়ি আর রাবড়ী দিয়ে টিফিন। তারপরে মেট্রো করে ময়দান। শীতের কুয়াশাঘেরা ময়দান ভীষন মায়াবী। তারপরে হলুদ ট্যাক্সি করে কাছেই প্রিন্সেপ ঘাট। সেখানে নৌকা করে সূর্যাস্ত। আহা জমে ক্ষীর। কি বলেন?

ঢোক গিললো অন্তরা। এরকম পাগলের মতো ও বাঁচতো এককালে। তারপরে কবে যে বাঁচতে ভুলে গেলো কে জানে।

আরে ছেলেটার নামটাই তো জানা হয়নি।

-শুভব্রত। লোক প্যার সে হমে শুভ বুলাতে হ্যায়।

-হাহা।

-বলুন এবার যাবেন কি না? এরকম অফার কিন্তু অ্যামাজনেও পাবেননা! আর একটা রিকোয়েস্ট,প্লিজ আপনি বলবে না আর,ওতো ও বুড়ো হয়ে যাইনি এখনো!

না বলতে গিয়েও কখন হাঁ বলে ফেললো অন্তরা। নিজের ভেতরের বন্যপ্রানীরা বহুদিন পর লাগাম খোলার সুযোগ পেয়ে নাচানাচি জুড়েছে।

পুঁটিরামে খেলো। ময়দানে বিকেলের রোদ মাখলো। এবার গন্তব্য প্রিন্সেপ ঘাট।

শুভ ও একের পর এক জোকস বলে হাসিয়েই চলেছে। যেখানে সেখানে গুনগুনিয়ে ওঠে নিজের মতো।

প্রিন্সেপ ঘাট এ পৌছে তার মাথায় আর এক ভূত চাপলো।

-প্রাঙ্ক করবো

-মানে?

-আরে প্রাঙ্ক!! ভিডিও দেখোনি

-হ্যাঁ সে দেখেছি খানকতক। কিন্তু এখানে?

-হ্যাঁ এখানেই।
শোনো প্ল্যানটা। দেখো লোকজন এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তো আমি প্রথমে হাঁটতে হাঁটতে একটা জায়গায় এমন ভাবে টপকাবো যেনো ওখানে কিছু পড়ে আছে। আসলে কিচ্ছুই নেই। কিন্তু ভান করবো। তুমিও ইক্সাক্টলি একই জিনিস করবে। তিন নম্বরে যে পার করবে তার রিয়েকশান কি হয়,আমরা দেখবো।

যথারীতি তাই হলো। প্রথমে শুভ করলো,দেখাদেখি অন্তরা। ওদের পরে আসছিলো একটা ছেলে,হাতে ক্যামেরা। সেও দেখাদেখি ওইটুকু যায়গা লাফ দিয়ে পার হলো,কিন্তু ঘুরে কিছু দেখতে পেলোনা!

ওদের তো হাসতে হাসতে পেটব্যাথা। হাসি থামতেই চায়না। অন্তরাও হাসলো প্রানখুলে,অনেকদিন পর।

এরপরে নৌকা নেওয়া হলো একঘন্টার জন্য। সারা নদী যেনো সোনায় মুড়ে গেছিলো। অন্তরা হাঁ হয়ে দেখছিলো সেই দৃশ্য।

-ম্যাডাম,প্রতিদিন নেচার ফ্রীতে মর্নিং আর ইভিনিং শো দেখায়,আমরা দেখি কদিন?

-সুর্যাস্তটা বড়োই সুন্দর।

-জানি। আচ্ছা কোনো গান চালানো যাক।

শুভ গান চালালো। ‘জানি দেখা হবে’,শ্রেয়া ঘোষালের গলায়..

অন্তরা ভাবছিলো কিকরে এতোদিন এতো কাছে থেকেও এতো সুন্দর সন্ধ্যাগুলো ও মিস করতে পারে! উঠতে ইচ্ছা করছিলো না৷ কিন্তু সময় হয়ে এসেছে।

-ম্যাডামজি,আমাদের জীবনে এতো টেনশন,এতো দুশ্চিন্তা কেনো জানো? আমরা এই মুহুর্তে না বেঁচে ফিউচারে বাচতে যাই,হুইচ ইউ অবভিয়াসলি কেন্ট ডু। ফলে এইসব আসে। যে আজকের দিনটায় বাঁচে তার টেনশন করার সময় কোথায়?

লিভ ম্যাডাম,লিভ। মরার আগে বেঁচে নিন। বুঝলেন?

অন্তরা তখনো ঘোরে। অনেকদিন পর একটা সত্যিকারের ভালো দিন কাটালো।

রাত হয়েছে। ক্যাব বুক করলো। আসার আগে শুভকে নিজের নম্বর দিলো। মিসকল করে দিতে বললো। সেভ করে নেবে। এরকম ভালো বন্ধু আজকাল সহজে পাওয়া যায়না।

ট্যাক্সিতেও সেই ঘোর যায়না। হাসি ফুটে ওঠে মুখের কোনায়। অনেকদিন পর।

হোয়াটসঅ্যাপ খোলে। অনেকক্ষন খোলা হয়নি হোয়াটসঅ্যাপ।

দেখে ডক্টরের পি এ-এর ম্যাসেজ। অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে দেওয়া হয়েছে,যাতে ভিজিট অ্যামাউন্টটা পাঠিয়ে দিতে পারে।

দেখেই মাথাটা গরম হয়ে গেলো। হাউ কেয়ারলেস এন্ড এরোগেন্ট!

ফোন করে। ঝাঁঝালো গলায় বলে কীসের ফিজ,ডক্টর তো আসেনইনি।

পি এ অবাক হয়। সারাদিন তো আপনার সঙ্গেই ছিলেন ডক্টর!

শুভর তখনকার মিসকল দেখে হোয়াটস অ্যাপ নম্বরটা খোলে অন্তরা ম্যাসেজ করার জন্য। দেখে নীচে ছোট্ট হরফে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম,ডঃ অরিন্দম বাগচী।

আর প্রোফাইল পিকচারে একটি বিখ্যাত লাইন। বাংলা মানে করলে যেটা দাঁড়ায়-

‘অন্ধকার কখনো অন্ধকার নেভাতে পারেনা। শুধু আলোই পারে……’

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: