আলো ২

পড়ে নিন প্রথম পর্ব

অঙ্কুশ

-বাবা আয়,খাওয়ারটা খেয়ে নে..

-তুমি খেয়ে নাও,আমার ইচ্ছা করছেনা

-আয় বাবা,কদিন ধরে কী হয়েছে বলতো তোর?

-কিচ্ছুই হয়নি মা।

আচ্ছা যাও,আসছি।

-এই না গুড বয়। আয় আমি অপেক্ষা করছি কিন্তু।

অন্ধকার ঘরটায় চোখ মেলে তাকায় অনির্বান। ডঃ অনির্বান বাগচী।

কবছরেই রীতিমতো শিরোনামে চলে এসেছিলো সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে। নিজস্ব টেকনিক,গতানুকতা ভেঙে নিজের মতো কাউন্সেলিং- পেসেন্ট মহলে ভীষন প্রিয় ডঃ অনির্বান আজ নিজেই গাঢ় অন্ধকারে।

মানুষ অজান্তে কখন একটা ভুল করে ফেলে,আর সারাজীবন ধরে তার মাসুল দেয়। ঘটনাটাকে ফেলে রেখে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়ার পরও সেটা ছেড়ে যায়না। গলায় আঁটকে থাকে। কাঁটার মতো।

সিক্রেটস! কাওকে গড়ে দেয়,কাওকে ভেঙে গুড়োগুড়ো করে দেয়। চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা করে,বললে হয়তো একটু শান্তি লাগতো। কিন্তু অনির্বান গোড়া থেকে চুপচাপ থাকার মানুষ। পেসেন্টের সামনে হাসাহাসি করা,হালকা মেজাজে থাকা মানুষটাই এমন সিরিয়াস বনে যায়,যে চেনা মুস্কিল হয়।

ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে আসে। খায় মার সাথে। গুম মেরে থাকে সবসময় আজকাল। শুধু হুঁ হাঁ এইসব।

মা বলে চেম্বার যাওয়ার কথা। কদিন ধরে ঘর থেকেই বেড়োয়নি।

অনির্বান ভাবে তাই করা যাক। বছরের শেষ দিন,আজকের দিনটা অন্তত একটু কাজে ফেরা যাক।

রেডি হয়ে গাড়ীতে রওনা দেয় চেম্বারের উদ্দেশ্যে।

সবার মনের সমস্যা হলে গন্তব্য যে সাইক্রিয়াটিস্ট,সেই সাইক্রিয়াটিস্টের সমস্যা হলে সে কোথায় যাবে?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনির্বান। না ভাবনাটাই বেশী হয়ে যাচ্ছে। যেমন চলছে চলুক।

চেম্বারে এসে দেখে দশ-বারোজনের মতো পেসেন্ট। দুজন পেসেন্ট দেখে প্রথমে। সিম্পটমেটিক ম্যানেজম্যান্ট। মাথা কাজই করতে চাইছে না। বিরক্ত লাগছে। তাও চেষ্টা করছে যতটা ভালোভাবে দেখা যায়।

তিন নম্বরে একটা মাঝবয়সি ছেলে ঢুকলো। বয়স আঠারোর দোরগোড়ায়। চুল এলোমেলো।

সঙ্গে একজন মেয়ে। প্রায় অনির্বানেরই বয়সী।

মেয়েটাকে কোথাও দেখেছে মনে হচ্ছে?!

ছেলেটা গেম-অ্যাডিক্ট। সারাক্ষন গেম খেলতে থাকে। পড়াশোনা-কথা বলা অবধি বাদ পড়ে যাচ্ছে।

আজকাল কমন কেস এটা। রাতে ঘুম হয়না,ঘুমের ওষুধ।
লাইফস্টাইল মডিফিকেসন। একবার সাইকোলজিষ্টের কাছে পাঠায় ব্যহবিহরাল থেরাপীর জন্য।

পুরো সময়টাতে অনির্বান লক্ষ্য করলো,মেয়েটা বারবার করে তাকাচ্ছে ওর দিকে। যেনো মেয়েটা ভালো করেই চেনে তাকে। ওরও চেনা লাগছে মুখটা,কিন্তু কোথায় দেখেছে মনে করতে পারছেনা।

-তো ডক্টরবাবু এখন কফি হাউসে পেসেন্ট দেখেননা?
কফি হাউস অ্যালাও করেনা নাকী এখন?!

বলেই খিলখিল করে হেসে ওঠে মেয়েটা। এই হাসি চেনা,কোথাও তো দেখেছে।

-চিনতে পারছেন না তো?
আমি অন্তরা,অন্তরা মিত্র,বছর দুই আগে আপনার কাছে ‘ট্রিটমেন্ট’ করিয়েছিলাম। বড় অদ্ভুত সেই ট্রিটমেন্ট,আমি আজ অবধি এরকম ট্রিটমেন্ট দেখিনি।

কফিহাউস,পুঁটিরাম,ময়দান,প্রিন্সেপ ঘাট! আচ্ছা আপনি গল্প টল্প লেখেন নাকী,দিনটা তো বেশ গল্পের মতোই ছিলো,বাস্তবে এরকম হয়না। কী বলেছিলেন সেদিন মনে আছে?

‘প্রতিদিন নেচার আমাদের ফ্রীতে মর্নিং-ইভিনিং শো দেখায়,আমরা চোখ মেলে দেখি কদিন?’

‘যা আজ বাঁচে তার কাল নিয়ে টেনশন করার সময় কোথায়? লিভ,বিফোর ইউ ডাই।’

মনে পড়ে ডক্টর?

তারপরে নিজেকে গুছিয়েছি ভালো করে। যোগা ক্লাস নিয়েছি,রেগুলারলি এক্সারসাইজ করি,ঠিক সময়ে ঘুম-খাওয়া। একটা এন জি ও জয়েন করেছি,গরীব বাচ্চাদের পড়ানো হয়। আমিও পড়াই,উৎসবে জামাকাপড় দি নিজের পকেটমানি বাঁচিয়ে। আর খুব বাঁচি। মাঝে মাঝেই ফোন অফ করে প্রিন্সেপ ঘাট এ গিয়ে একা বসে থাকি। এটা আমার বস কে বলবেন না প্লিজ,হাহাহা।

হতবম্ব হয়ে বসে থাকে অনির্বান। কী বলবে কিছু বুঝতে পারে না। তখন সবে মেডিক্যাল কলেজ থেকে সাইকিয়াট্রিতে এম ডি করেছে,শরীর-মনে তুমুল উদ্দীপনা। সব কিছুকে নিজের মতো করে গুছিয়ে নেওয়া। এক্সপেরিমেন্ট। সেসব দিন গেছেও বটে…আহ!

তারপরেই সব কেমন হয়ে গেলো। ঘেঁটে ঘ। এখন এতো কিছুর মধ্যে জড়িয়ে গেছে,বাঁচাটাই হয়ে ওঠে না আর…

ডক্টর,ডক্টর,কোথায় হারিয়ে গেলেন?
ডক্টর কিছু মনে করবেননা,এনিথিং রং উইথ ইউ?
আপনাকে এরকম দেখে রীতিমতো অদ্ভুত লাগছে। একদম মেলাতে পারছিনা…

-কিছুই হয়নি। কিছুই হয়নি আমার।
এখনো আট-দশটা পেসেন্ট দেখতে হবে,সময় নেই বেশী। ওষুধ খেয়ে না কমলে একমাস পরে আসবেন। আসুন।

বিরক্তই লাগে অনির্বানের। তারপরেও নটা পেসেন্ট। মাঝে ব্রেক নিলো পনেরো মিনিট মতো। শেষের দিকে কেজড লাগছিলো ভীষন,শুনতে ইচ্ছা করছিলোনা,সামনের কাগজ-কাঁচ সব ছুড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছা করছিলো। চিৎকার করতে ইচ্ছা করছিলো। চেয়ারের হাতলে শক্ত করে হাতটা চেপে রেখে নিজেকে সামলে ছিলো অনির্বান।

পেসেন্ট দেখা শেষ। একটা কোকের ক্যান নিয়ে বসে গান শুনছিলো। সেসময়ই মেসেজটা ঢুকলো।

‘ইয়োর মম হ্যাজ বিন কিডন্যাপড। এক লাখ টাকা নিয়ে যে অ্যাড্রেসটা পাঠানো হচ্ছে,সেখানে চলে আসুন। কোনোরকম চালাকির চেষ্টা করবেন না করলে ফল ভালো হবেনা।’

দেখেই চোখ কপালে ওঠে অনির্বানের। মাসিটাও দুদিন ধরে আসছেনা। মা ছাড়া কেউ নেই ওর। মা কে হারাতে বড্ড ভয় অনির্বানের। সব দিতে রাজি মা এর জন্য।

আলমারীতে টাকা রাখা থাকে কিছু। সেখান থেকে টাকা নিয়ে ব্যাগে পুরে রওনা দেয়।

বাবুঘাটে যেতে বলা হয়। যায়। গাড়ী রেখে ভেতরে ঢুকতে বলা হয়। কিছুটা হাঁটলে একটা গুমটি মতো ঘর পড়ে,হাওড়া ব্রিজ আর বিদ্যাসাগর সেতুর ঠিক মাঝামাঝি জায়গায়। গিয়ে বসে। এই জায়গাটায় আসেনা কেউ,পরিত্যক্ত।

আগে এই প্রিন্সেপ ঘাটে কত সন্ধ্যা কাটিয়েছে। পেসেন্টের সাথেও। একাও। সন্ধ্যার পর সন্ধ্যা একা বসে কাটিয়েছে। সূর্যাস্ত দেখেছে। পাওভাজি খেয়েছে। সব এখন অতীতের খাতায়।

ভেতরে চাপা টেনশন। মেসেজ করে বলেছে,অপেক্ষা করতে। আচ্ছা পুলিশে জানিয়ে দিলে কী ভালো হতো? না জানিয়ে আসাটা বোকামো হয়ে গেলো না তো?

কখন সন্ধ্যা নামে। সোনালী হয়ে যায় সব। বছরের শেষ সূর্যাস্ত। ভিতরে চাপা টেনশন,কিন্তু তারপরেও…

অনেকক্ষন হয়ে গেলো। ফাঁকা হচ্ছে জায়গাটা। কয়েকটা দল কেক কেটে সেলিব্রেট করছে। ঠান্ডা বেশ পড়েছে জমিয়ে।

হঠাৎ চিৎকারে চমকে উঠে। একসঙ্গে ১০-১৫ জন একসাথে। তার নাম ধরে ডাকছে। ওর নামেই।

ঘুরে দেখে ১০-১২ টা বাচ্চা। জামা কাপড় দেখেই গরীব তা বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু মুখের হাসিটা আছে। তারমানে অনেক বড়োলোক ওরা। অনেক।

সবার হাতে রিবন,মাথায় টুপি। হাতে কেক। আর অনেকটা উদ্দীপনা।

ওদের মাঝখানে দাড়িয়ে ঐ মেয়েটা। অন্তরা। অন্তরা মিত্র।

আর ওর পাশে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে মা।

‘কী ডক,কি ভাবেনটা কি নিজেকে? শুধু আপনিই প্র‍্যাঙ্ক করতে পারেন,আপনিই গল্প সাজাতে পারেন? আপনার ঐ অবস্থা দেখেই আপনার কার্ডে লেখা অ্যাড্রেস দেখে আপনার বাড়ী যাই। রিস্ক নিয়েই যাই,ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বার করলে করুক। তারপরে তো কাকীমার সঙ্গে ব্যাপক জমে গেলো,আমি আর কাকীমা মিলেই প্ল্যানটা বানালাম। কী কাকিমা,প্ল্যান সাকসেসফুল তো নাকী?’

অনির্বান মার দিকে তাকালো।
নাহ,মা কে আর নিজের দলের লোক বলে মনে হচ্ছেনা।

‘মা,শেষে তুমিও?’

মার মুখে মুচকি হাসি। কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে,’মেয়েটা খুব মিষ্টি। বিয়ের বয়সও হয়েছে। তোরও তো কম হলোনা,তো বলছিলাম যেটা…’

মাআআআ! আর কোনো কথা নাই জীবনে তোমার?

কেক কাটা হয় সবাই মিলে। গান গাওয়া হয়।

বাচ্চারা ভীষন মিষ্টি। একটা বাচ্চা খুব ছোট,অনির্বান কোলে তুলে নেয়।

‘বুঝলেন ডক,আমরা বড্ড নিজেকে নিয়ে ভাবি,তাই এতো সমস্যা,এদের দেখুন তো,কী আছে এদের,কিচ্ছুটি নেই,তারপরে এই কেক টুকুও পেয়ে কী আনন্দে! এদের মাঝে আসুন,হাসি ভাগ করুন দেখবেন মন একদম খুশ।

অন্যকে আলো দেখালে নিজের রাস্তাও কিন্তু আলোকিত হয়।’

অনির্বান শোনে। শুনতে মন্দ লাগেনা।

‘এই শোনো,সবাই শোনো,ডক্টর তো ব্যাগভর্তি টাকা এনেইছেন,আজ আমরা রেস্টুরেন্টে খেতে যাবো সবাই মিলে। অবশ্য ডক টাকা না দিতে চাইলে আমিই দেবো। কিন্তু নতুন বছরের শুরু করবো সেলিব্রেট করে। কি সবাই যাবে তো?’

সবাই মিলে গর্জে ওঠে।

যাওয়া হয়। রুফটপ রেস্টুরেন্ট। পুরো কলকাতা জুড়ে যেনো ছোট্ট আলোর মেলা বসেছে।

খাওয়া হয়। খেতে খেতেই বারোটা বাজে। পটকায় কান ফেটে যায়। সবাই মিলে চিৎকার করে,একে অপরকে শুভেচ্ছা জানায়। গান হয়।

খেতে খেতে অনেক রাত। ঠিক হয় ভোর হলে যে যার জায়গায় পৌছে দিয়ে তারপরে বাফী ফিরে ঘুম।

অনির্বান সাইডে একটা ফাঁকা চেয়ারে এসে বসে থাকে। অন্তরা আসে।

-কী দেখছেন,ডক্টর?

-দেখোনা কতো অন্ধকার চারিদিকে। আলোগুলোও নিভে আসছে এবার। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছেনা ঠিক করে…

-অন্ধকারের পরই তো আলো আসে,ডক্টর…

সূর্য ফোটে ওঠে। আলোকিত হয় চারিদিক। সব দৃশ্যমান হয় একে একে।

নতুন দশক। নতুন বছর। নতুন সকাল। নতুন সুযোগ।

নতুন শুরু….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *