টোকাই ধর্ম টোকাই কর্ম

গৌরব বিশ্বাস

এ যুগেও যারা সত্যম শিবম সুন্দরম এর সাধুতার মন্ত্র জপেন, তাঁরা একবার বুকে হাত রেখে বলুন তো, ক্লাস ফাইভের পর স্কুল কলেজের পরীক্ষায় সম্পূর্ন সাধু সেজে কেউ পরীক্ষা দিয়েছেন? চোথা না করুন, পাশের বন্ধুটির খাতায় নজর দেননি? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করেননি প্রশ্নের উত্তর। হল কালেকশন করেননি?ক্যালকুলেটরের খাপে পেন্সিল বক্সের ভেতরে টুকটাক লিখে নিয়ে যাননি? তবে আজ যেসব টুকলি বাজির গপ্প শোনাব এসব তার কাছে নগন্য।

কেউ কাগজ নিয়ে আসে পকেটে। কারও হাতে লেখা। রীতিমত সেসব উচ্চমানের শিল্প। কেউ নখে লেখে। কেউ বেঞ্চে কেউ দেওয়ালে। গোবর ডাঙ্গার এক কলেজে পরীক্ষা দিতে গিয়ে বুঝেছিলাম টুকলিবাজিও একটা আর্ট। সে কলেজের সমস্ত দেওয়াল হরেক কালির ছবি লেখায় সুসজ্জিত এমনকি সিলিংও বাদ যায়নি। এত রঙ লেখা মিলিয়ে দিব্যি খোলতাই রূপ হয়েছে ঘরের। যেন গ্রাফিটি। কলেজের কর্তাব্যক্তিরা ইচ্ছে করেই দেওয়াল রঙ করাননি। তারা শিল্পের মর্যাদা রাখতে জানেন। এক কালে মনে করা হত টুকলিতে ছেলেদেরই হাতযশ। সে জামান এখন গেছে। নারী পুরুষ এখন উভয়েই সমান। প্রথম যে ঘটনানটা বলব, এমন টুকলির বুদ্ধি কিন্তু একজন মেয়ের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল।তখন মাস্টার্সের ফাইনাল ইয়ার। আমাদের ডিপার্টমেন্টে যে কজন মেয়ে ছিল তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী ‘অ’। অ শুধু রূপবতীই নয় আমাদের মধ্যে সবচেয়ে স্টুডিয়াসও বটে। এমন মেয়ের প্রেমিক হওয়ার দৌড়ে সব ছেলেই ইঁট পেতে রাখে। আমিও ছিলাম। তবে এসব ইট সরিয়ে ‘অ’ একদিন প্রেমে পড়ল ‘দ’এর। অ প্রেম পড়াশুনা দুইই দক্ষ হাতে সামাল দেয়। দ এর কিন্তু প্রেমে পড়ে পড়াশুনা লাটে উঠল। ওদিকে পরীক্ষার জুজুও সামনে। দ সারাবছর যা পড়াশুনা করেছে, হাতে ধরিয়ে পাস না করালে উতরানো মুস্কিল। অ বলল-” ম্যায় হু না। আমি পাশ করলে তুইও করবি”। পরীক্ষা শুরু হল। অ আর ক য়ের রোল নম্বর পাশাপাশি। অ এর ঠিক পেছনের সিটেই পড়ল ক। অ শর্ট টপ পরে পরীক্ষা দিতে আসে। সামনে একটু ঝুকলেই পিঠের নিচের দিকের অনেকটা  অংশ উন্মুক্ত হয়ে যায়। সেখানেই ক্ষুদি ক্ষুদি অক্ষরে উত্তর লেখা। দ তাই দেখে টুকতে থাকে। পাঁচ দিন এই ভাবেই চলে। কেউ ধরতেও পারেনি। একজন ইনভিজিলেটর একটু সন্দেহ করেছিলেন। অ বলেছে ওটা ট্যাটু। ইনভিজিলেটর কিছক্ষন অবাক হয়ে তাকিয়ে ক্ষান্ত দিয়েছেন। দ তো পরীক্ষায় পাশ করে গেল। কিন্তু অ এর উন্মুক্ত পিঠের সম্মোহনে তার আশে পাশে বসা ছেলে গুলোর পরীক্ষা গোল্লায় গেল।

আমাদের স্কুলের সাথে ‘ন’ স্কুলের বিরোধ জন্মগত। সে কোনো কালে  দুই স্কুলের মধ্যে ফুটবল ম্যাচ হয়েছিল। তাতে ন স্কুলের গোল বাতিল করে রেফারি। সেই থেকেই শত্রুতা। আমাদের তরফ থেকে অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল মিটিয়ে নেওয়ার। কিন্তু তারা শত্রুতা জিইয়ে রাখতে চায়। সেবারও আমাদের মাধ্যমিকের সিট পড়ল ন স্কুলে। ও স্কুলের ইনভিজিলেটররা একেক জন বাজ পাখি। আর ও স্কুলের সুদেব স্যার। বাপরে। ভাটার মতো চোখ দুটো বনবন করে ঘোরে ।  আমাদের স্কুলের বিখ্যাত টুকলিবাজ রিন্টু। বাড়ি মেদিনীপুরে। এখানে পেয়িংগেস্ট থাকে। তবে এবার যে ওর মামুলি টুকলি খাটবে না সেটা ভালোমতই জানে। ও বেশ চিন্তিত। চিন্তা ভাবনার মাঝেই পরীক্ষা চলে এল। পরীক্ষার আগের দিন সন্ধ্যে বেলা। জোর কদমে পড়ছি। হঠাৎ সুবীরের ফোন। সুবীর রিন্টুর রুমমেট। উত্তেজিত হয়ে বলল-” তোরা তাড়াতাড়ি আয়। রিন্টু কেমন করছে”। আরও দুই বন্ধু জুটিয়ে গেলাম রিন্টুর বাড়ি। রিন্টু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। শুনালম ওর নাকি ক্রনিক গ্যাস্ট্রিক আছে। মাঝে মাঝেই নাকি ওমন হয়। পাড়ার ডাক্তার আউট অফ স্টেশন। এই ডাক্তারই মাস খানেক আগে ওকে দেখেছিল। সে প্রেসক্রিপশন দেখেই সব ব্যবস্থা করলাম। পেট খালি রাখা চলবে না। মাঝে মাঝে হাল্কা কিছু খেতে হবে। ওষুধের সাথে এক প্যাকেট মারি বিস্কুটও কিনে দিয়ে এলাম।

পরদিন আমাদের অবাক করে দিয়েই রিন্টু হাজির পরীক্ষা দিতে। যন্ত্রণায় কাতর। হাতে ছোট একটা টিফিন বক্স। সুদেব বাবুর সন্দেহ হল। জিজ্ঞেস করলেন-” কি আছে এতে”? ‘ মারি বিস্কুট । শরীর খারাপ। ডাক্তার পেট খালি রাখতে বারণ করেছে”। চি চি করে উত্তর দিল রিন্টু। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দেখাল। পরীক্ষা শুরু হল। রিন্টু লিখছে খুব আস্তে আস্তে। মাঝে মাঝে দু একটি মারি বিস্কুট জল দিয়ে গিলে খাচ্ছে। সুদেব বাবুরও দয়া হল। মাঝে মাঝে রিন্টুর কাছে গিয়ে ওর পিঠে হাত বোলাতে লাগলেন।

পরীক্ষা শেষের কয়েকদিন পরের ঘটনা। রিন্টু ততদিনে পুরোপুরি সুস্থ। রিন্টুর বাড়ি গিয়েছি আড্ডা মারতে। আড্ডা মারতে মারতে ক্ষিদে পেয়ে গেল। রিন্টু বিস্কুটের কৌটো হাতে ধরিয়ে দিল। একটা মারি বিস্কুটে কামড় দিতে গিয়ে চোখ আটকাল। বিস্কুটের পিছনের পিঠে কিসব যেন লেখা। পেন্সিলের লেখা আবছা হয়ে গেছে তবুও পড়া যায়। অবাক হয়ে দেখলাম কোনোটায় অংকের ফর্মুলা। কোনোটায় জীবন বিজ্ঞানের ছবি। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে রিন্টু। ওর পিঠে চাপড় মেরে বললাম- শালা বাঘের বাচ্চা”।

সেবার উচ্চমাধ‍্যমিকের সিট পড়েছিল ‘ন’স্কুলে। সিট এরেঞ্জমেন্ট যেরকম করেছিল, সৌভাগ্যবশত কাছের বন্ধু বান্ধবরা মোটামুটি পাশাপাশি পড়েছিলাম।  কিন্তু কেমেস্ট্রি পরীক্ষার দিন একটা সমস্যা দেখা ছিল। কেমিস্ট্রি প্রশ্ন একটু কঠিন ছিল। আর গার্ড দিচ্ছিল যে স্যার খুব চালাক তিনি। দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম। একটা শান্তিনিকেতনি রাবীন্দ্রিক ভাব রয়েছে । আর এই মুখোশের আড়ালেই উনি শিকার ধরে বেড়ান। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করেই বাইরে বেরিয়ে যান। ছেলেরা তখন একটু দেখাদেখি টুকলি এসব শুরু করে। আসলে উনি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সব লক্ষ‍্য করেন। তারপর সুযোগ বুঝে শিকারি বিড়ালের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েন। কারও খাতা ক্যানসেল। কারও খাতা ঘন্টা দুয়েক আটকে রাখা। সে বেচারা শেষ ঘন্টায় লিখেও পাশ করতে পারবে না। আমরা চোথা বার করার সুযোগ টুকুও পাচ্ছি না। একটা সময় মাথায় এক ফন্দি এল। ওই স্যার খুব শৌখিন। খুব চড়া গন্ধের কোনো পারফিউম মাখতেন। দরজার কাছাকাছি এলে একটু দূর থেকেও পারফিউমের গন্ধ পাওয়া যেত। ওটাই আমাদের কাছে একটা এলার্ম। নাকে ওই পারফিউমের গন্ধ আসলেই আমরা সতর্ক হয়ে যেতাম।

ওই উচ্চমাধ‍্যমিকেরই ফিজিক্স পরীক্ষারদিন। প্রশ্ন দেখে সবার বেলুন চুপসে গেছে। একা পরীক্ষা দিয়ে পাশ করা কঠিন। সুতরাং প্ৰথম ঘন্টা থেকেই শুরু গুজুরগুজুর ফিসফাস। ঘন্টা দুয়েক বাদে চোথা বার করার পালা। মৈনাক সবে বার করেছে চোথা, ঠিক তক্ষুণি একজন স্যার এসে হাজির। আমাদের দিকেই গটগট করে হেঁটে আসছে। ভূত দেখার মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছি আমরা। আজ শেষ। স্যার কিছুক্ষণ আমাদের দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন-“আমায় ভয় পাচ্ছ! আমায় স্কুলে কেউ ভয় পায়না গো! যা করছিলে করো। বেশি গোলমাল কোরো না”। আমরা তো থ।

এই গল্পটা করতে করতে ইউনিভার্সিটির একটা চোথার গল্প মনে পড়ে গেল। ফার্স্ট ইয়ার। অন্য কলেজে সিট পড়েছে পরীক্ষার। ফিফথ পেপারটা বেশ কঠিন। সেই পেপারের দিনই শুরু হল কড়া গার্ড। একজন বয়স্ক মতো স্যার গার্ড পড়লেন আমাদের রুমে। আমাদের সাথে একটা ছেলে পড়ত, চন্দন নামে। একেবারেই গোবেচারা ছেলে। চোথা আনা দূরে থাক একটু ঘাড়ও ঘোরায় না। সেই ছেলেই ফিফথ পেপারের দিন চোথা আনল। আনবি তো আন, একটা বিশাল A4 সাইজ কাগজে চোথা এনেছে ব্যাটা। বার করতেই একবারে ক্যাচ কট কট। সেই বুড়ো স্যার ধরে ফেললেন চোথা । আমরা অবাক। বেচারা এত ভালো ছেলেটা একদিন চোথা করতে গিয়ে ভোগে গেল। কিন্তু স্যার যা করলেন তা আরও আজব।স্যার ওকে জিজ্ঞেস করলেন-“কত বয়স তোমার?” ও, বলির পাঠার মতো কাঁপতে কাঁপতে উত্তর দিল-” চব্বিশ”। স্যার বলেন-” বিয়ে করার বয়স তো হয়ে এল। দুদিন পর ছেলে মেয়ের বাপ হবে। কি শেখাবে বাচ্চাদের? এটা থাক আমার কাছে। যদি কিছু অসুবিধা হয় আমাকে জিজ্ঞেস কোরো আমি টুকটাক বলে দেব”।

স্কুলে একটা ছেলে পড়ত স্বর্ণ…নামে। হেবি হা*মি ছেলে। একটু বড় হয়ে হাড়কাটা গলিতে যাতায়াত করত শুনেছি। ও টুকলি আনত ইতিহাস পরীক্ষার দিন। একবার চোথা করা চোখে পড়ে গেল পাণ্ডে স্যারের। স্যার গটগট করে এগিয়ে এল ওর দিকে। কিন্তু কোথায় কি!চোথার কাগজ যেন বেমালুম হাওয়া! স্যার চমকে গিয়ে ছেড়ে দিলেন ওকে। ব্যাটা স্যারকে আসতে দেখেই জল দিয়ে গিলে ফেলেছে চোথা।

স্কুলের হাইটেক টুকলিবাজদের মধ্যে রিন্টু ছাড়াও অন্যতম ছিল ‘ব’।সেবার ক্লাস টেনের টেস্ট চলছে। আমার পাশেই বসেছে ‘ব’। যারা পুরনো সিলেবাসে মাধ্যমিক দিয়েছেন, অর্থাৎ যখন ক্লাস নাইন টেন একসাথে ছিল, অনেকেরই হয়ত খেয়াল থাকবে তেইশ নম্বর আর চব্বিশ নম্বর উপপাদ্য ভীষণ গুলিয়ে যেত। প্রায় একই রকম, পার্থক্য খুব সামান্যই। চট করে চেনা মুস্কিল। যথারীতি ওই দুটির একটি এসেছে পরীক্ষায়। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই খেয়াল করছিলাম ‘ব’উসখুস করছে। জীবন স্যারের গার্ড ছিল, কথা বলার সাহস পায়নি ‘ব’। জীবন স্যার একটু বেরোতেই চুপি চুপি ব আমায় বলে-“ভাই বুঝতে পারছি না ঠিক”। আমি চুপি চুপি উত্তর দেই-“কেন কি হল?” ব বলে-” ভাই চোথা  এনেছি..”। চমকে উঠি আমি। ও বলে-” তেইশ চব্বিশ দুটোরই  চোথা এনেছি, কিন্তু কোনটা তেইশ কোনটা চব্বিশ গুলিয়ে যাচ্ছে ভাই”। অতএব বাকিটা ব টোকে আমার খাতা দেখে।

এই ‘ব’-ই চোথা এনেছিল ফিজিক্স পরীক্ষার দিন। এমনই কপাল সব চোথা কমন। সেকি আনন্দ ব এর । আমাদের নিয়ে ফিস্টি দেবে কথা দিল। কিন্তু ওপরওয়ালা অন্যরকম কিছুর ব্যবস্থা করেছিলেন। দিনদুই পর, কোচিং ক্লাসে পড়তে গিয়ে দেখা ‘ব’এর  সাথে। মুখ গম্ভীর। জিজ্ঞেস করতে বলল-“ভাই কেলো হয়ে গেছে। বারোটা চোথা নিয়ে গেছিলাম। একটা খুঁজে পাচ্ছি না”। কয়েকদিন পরেই ‘ব’এর গার্জিয়ান কল। বেটা, আনন্দের ঠেলায় লুজ পেজ পিন করার সময় একটা চোথাও পিন করে দিয়েছিল।

এই ‘ব’ এখন বিয়ে টিয়ে করেছে। আমাদের বন্ধুদের মধ্যে ওই প্ৰথম বিয়ে করেছে। যে মেয়েটাকে ভালো বাসত, একদিন জানা গেল মেয়েটি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। ‘ব’এর বাড়ির লোক স্বভাবতই বেঁকে বসেছিল এ সম্পর্কে।সেই অসুস্থ মেয়েটিকে বিয়ে করেছে ‘ব’ বাড়ির সবার অমতে। এখন দিব্যি আছে দুজনে। এমন ভেজাল টুকলিবাজির যুগে এমন খাঁটি প্রেম কজন করতে পারে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *