সুখী কে?

অর্চনা পাল

দৃশ্য এক

রোজকার মতন আজও সন্ধ্যা হতেই উঠানে প্রদীপ জ্বালিয়ে, ঠাকুর ঘরে ধূপ-ধূনো সাজিয়ে, কণিকা দেবী সন্ধ্যা বেলার পূজোটা দেন। তারপর তুলসী তলায় শঙ্খ বাজিয়ে ঘরে ঢুকে উঠানের দরজাটায় তালাটা লাগিয়ে দেন। উঠোনের লাইট নিবিয়ে, বারান্দার লাইট নিবিয়ে ঠাকুর ঘরের ছোট্ট টিম টিমে আলোটা জ্বেলে দিয়ে বসার ঘরে এসে বসেন।

টিভিটা চালিয়ে সন্ধ্যেবেলার বাংলা সিরিয়াল গুলো দেখতে বসেন। এটাই তার রোজের রুটিন। আজ সাথে কিছু সফ্ট টয় বানানোর সরঞ্জাম নিয়েও বসেছেন। ছোট্ট নাতনিটার জন্য কখনও সফ্ট টয়, কখনও সোয়েটার সব নিজের হাতে বানিয়ে রাখছেন তিনি। 

আজ প্রায় পনের বছর হলো স্বামী মারা গেছেন। একা থাকার অভ্যাস আজ নতুন নয় তবুও কখনো কখনো খুব একা লাগে। কনিকা দেবীর ছেলে বিদেশে থাকেন। গত বছর উনি নিজেও ঘুরে এসেছেন সেখান থেকে। ছোট্ট ফুটফুটে তিন বছরের একটা নাতনি আছে উনার। কদিন খুব আনন্দে কেটেছিল ছেলে, বৌমা, নাতনি নিয়ে।

যদিও চাকরি ব্যাপার গুলো সমস্তটাই বোঝেন উনি তবুও মাঝে মাঝে ছেলের উপর একরকম অভিমান হয় তার। একা থাকতে আর যে ভাল লাগে না। এক মেয়েও আছে উনার। কিন্তু তার পক্ষেও সংসার ছেড়ে প্রায়ই মার সঙ্গ দেওয়া হয়ে ওঠে না। ছেলেপিলে, স্বামী, শশুর, জা, ভাসুর নিয়ে অনেক বড় সংসার তার, অনেক দায়িত্ব। 

প্রতিদিন ছেলের সাথে, মেয়ের সাথে, নাতি নাতনীদের সাথে কথা হয় ফোনে। তবু মন থেকে একাকীত্ব যেন যায় না। সব সময় মন সবাইকে কাছে পেতে চায়। নিঝুম নিস্তব্ধ বাড়িটা চঞ্চলতায় ভরে থাকুক এটাই মন চায় সবসময়। টাকা পয়সার অভাব নেই। মাসে মাসে স্বামীর ভালো পেনশন পান তিনি, এছাড়াও ছেলে প্রতিনিয়ত মাকে টাকা পাঠায়। শুধু কষ্ট দেয় একাকীত্ব। 

এক সময় মনে মনে খুব চাইতেন বয়সকালে সাদা সনের মত চুলের মাঝখান লাল করে সিঁদুর পরবেন। কিন্তু চুল সাদা হওয়ার অনেক আগেই সিঁথি সাদা হয়ে গেল। আজকে তাই বৌমার মা শিবানী দেবীকে অজান্তেই মনে মনে হিংসে হয় তার। কি সুখী সেই মানুষটি। এত বয়সেও কি সুন্দর স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে মিশে সংসার করছে। 
আর উনার মনে ঘুরে ফিরে সেই গানের লাইন কটা যেন উঁকি দিয়ে যায় বারবার….
“দুঃখীর পঙ্খি উইড়া গেলে দুঃখী শূন্য খাঁচায় কান্দে রে….”

দৃশ্য দুই

“কি যে কপাল আমার! না হলে …….! বাবা-মার কথা শুনে বিয়ে করলে আজকে রাজরাণী হয়ে থাকতাম। আর এখন! রাঁধুনি হয়েই জীবনটা কেটে যাচ্ছে।” 
সন্ধ্যা দেবী তার বৌমাকে বলেছিলেন, “আজকে রাতে আমার জন্য দুটো রুটি করো বৌমা।” বৌ মুখ ঝামটা দিয়ে উপরের কথাগুলো শাশুড়ির উদ্দেশ্য বলে ফোনটা হাতে নিয়ে বলল,”আপনার ছেলেকে বলে দিচ্ছি আসবার সময় দোকান থেকে কিনে নিয়ে আসবে।” সন্ধ্যা দেবী তাও একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন,”দোকানের ওই ময়দার রুটি আমি খেতে পারি না জানো তো বৌমা।” “তাহলে নিজেরটা বানিয়ে নিন! আমায় ছেলেকে পড়াতে বসাতে হবে। ভাত করে রেখেছি। আর এখন আমি আটা মেখে রুটি করতে পারবোনা।” কথাগুলো বলে সে নিজের ঘরে চলে গেল।

টিভিটা বন্ধ করে সন্ধ্যা দেবী হাঁটুতে ব্যথার ওষুধটা লাগিয়ে নিলেন। তারপর রান্নাঘরে এসে আটা মাখতে লাগলেন। এ সময় চার বছরের ছোট্ট নাতি ঠাকুমার পাশে এসে দাঁড়ায় কখন। পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে ডিঙ্গি দিয়ে উঁচু হয়ে সে পর্যবেক্ষণ করে ঠাকুমার কাজকর্ম।সন্ধ্যা দেবী হেসে বলেন,”কি দেখছ অমন করে বাবু?”নাতিটি আদো গলায় বলে,”ঠাম্মা তোমাল হাতে কি ওতা? আমাকেও দাও একতু।”
ছোট্ট নাতিটার মুঠোর মধ্যে একটু মাখা আটা দিয়ে দেন তিনি। সে তখন খুশি হয়ে আটা নিয়ে এটা সেটা বানাতে বসে। সন্ধ্যা দেবীর চোখে জল চিক্ চিক্ করে আসে। রান্না ঘরের জানালার ওপাশে রায় বাড়ির রান্নাঘরের জানলা। বাড়ির কর্তৃ মাধবী দেবীকে দেখা যায়। আহা কি সুখী সে! কেমন বৌমা শাশুড়ি মিলে রান্নাঘরে হেসে হেসে কাজকর্ম সামলাচ্ছে। 
তার বৌমা অফিস করে। আবার কত খেয়ালও রাখে শশুর- শাশুড়ির। অফিস করে এসেও সমান হাতে সংসার সামলায়।ওদের বাড়ির টিভিটা বেশ জোরে চলছে। একটা গান ভেসে আসছে। বড় করুণ সে গানের কথাগুলো। সন্ধ্যা দেবী হৃদয়ে এসে তারা বারে বারে ধাক্কা দিয়ে যায়…
“আমি আজ আকাশের মতো একেলা, কাজল মেঘের ভাবনায়, বাদলের এই রাত ঘিরেছে ব্যথায়, আমি আজ আকাশের মতো একেলা…”

তৃতীয় দৃশ্য

“তোমার মত অপদার্থ কে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। আজ অবধি একটা ইংরেজি লেখার মানে উদ্ধার করে ফর্মটা ভরে রাখতে পারলে না?”
“চল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবনে আজকে আমাকে নতুন জানলে না কি ? জাননা ইংরেজি বুঝে লিখতে অসুবিধা হয় আমার?”
“ওই বলেই খালাস থাকো। সব দায়িত্ব তো আমার। এরপর তো নাতি-নাতনির সঙ্গে কথাও বলতে পারবে না।”
শিবানী দেবীর চোখের কোনে জল আসে স্বামীর এহেন কথা শুনে। এত বছর বিয়ে হয়ে গেল কিন্তু একদিনের জন্যও ভালো ব্যবহার পেলেন না স্বামীর কাছ থেকে। এত বছরের অভ্যাস…তবুও, তবুও এখনো খারাপ লাগে। এখনো ভারি হয়ে আসে মন। 
আমতা আমতা করে বললেন,”কালকে খাট থেকে পড়ে গিয়ে চশমার একটা ডাটি ভেঙে গেছে। আমার খুব অসুবিধা হচ্ছে, একটা নতুন চশমা …..” ঢোক গেলেন শিবানী দেবী।
“আবার চশমা ভেঙে বসে আছো! ঘুমতে যাওয়ার আগে টেবিলে রাখত পার না? নতুন বানানো অনেক খরচার ব্যপার।সামনে প্রচুর খরচ। নিয়ে আসো দেখি সুতো দিয়ে বেঁধে দি।”
“এত যখন খরচা, থাক! তোমায় আর সুতো দিয়ে চশমা বেঁধে কাজ নেই। আমার চশমা লাগবে না। না হয় কদিন বই খবরের কাগজ পড়বো না। কিন্তু কদিন আগেই একটা নতুন মোবাইল কিনলে দেখলাম। ওটা খরচা নয় অকারণ?”
” পয়সা আমার। আমার যেরকম ইচ্ছা খরচা করব। তার জন্য কাউকে আমি হিসাব দেবো না।”
শিবানী দেবী চুপ করে উঠে এসে খাওয়ার ঘরে নিজের মনে এক কাপ চা নিয়ে বসেন। খাবার টেবিলের পাশে জানলা দিয়ে বাইরে মন চলে যায় অনেক দূরে। দুই মেয়েই দূর দেশে বিবাহ সূত্রে হয়েছে। কেউ নেই কাছের যে অন্য কথা, গল্প করে হালকা হবেন। 
বড় জামাই অমিতের মা কণিকা দেবীর কথা প্রায়ই মনে হয় তার এসময়গুলোতে। উনি স্বামীহারা আজ অনেকদিন ঠিকই। কিন্তু নিজে কত স্বাধীন! নিজের মত ঘুরে বেড়ান, নিজের মর্জিতে থাকেন। যা মন চায় নাতি নাতনীদের কিনে দেন। নিজের ভালো লাগা মন্দ লাগা সব নিজের হাতে। যেটা ভালো লাগে নিজের হাতে বানাচ্ছেন, বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে ঘুরে বেরিয়ে আসছেন। এভাবে থাকাও তো একরকম আনন্দের। 
দিনে দিনে তার নিজের জীবন যেন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে । দিন ভোর খাটাখাটুনি আর স্বামীর অনাবশ্যক কষ্টদায়ক কথা শোনার জন্যই যেন বেঁচে থাকা। জানলার বাইরে থেকে একটা চেনা গান ভেসে আসছে। ক্লাবের ছেলেগুলো বসে নিজেদের মধ্যে মাঝেই গান করে। কি সুন্দর গাইছে একটা ছেলে…..
“বলবো না গো আর কোনদিনভালোবাসো তুমি মোরে….”

চতুর্থ দৃশ্য

“মামুনি-ই-ই, মামুনি-ই-ই-ই ঘুমিয়ে পড়েছিস? চল মা রাতের খাবারটা খেয়ে নে, তারপরে ঘুমাস।”
“রাত্তিরে কি খাব মা? মাংকো? মাথ দিলে খাবো না কিন্তুউউউ …”
“রোজ রোজ কেউ মাংস খায় বলতো? বৌদি দেখ কি সব যেন ভালো ভালো রান্না করেছে তোর জন্য।”
“আত্ছা… তল তল..”
“তুমি আস্তে আস্তে হাতটা ধরো আমার দেখি! হ্যাঁ… নামো এবার। এ্যা…. এ্যাই তো…! নাও  চলো খাওয়ার টেবিলে যাই।”
মামনি জন্ম থেকেই ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত। বয়সে বড় হলেও তার মস্তিষ্ক সচল হয়নি। মাধবী দেবীর স্বামী, ছেলে, ছেলের বউ, নাতি, নাতনি আর এই তিরিশ বছরের অবুঝ মেয়ে মামনি কে নিয়ে সংসার।
ছেলে, ছেলের বউ খুব ভালো। খুবই খেয়াল রাখে তারা। কিন্তু ভবিষ্যতের কথা ভাবলে মাধবীর ভয় হয় সব সময়। কতদিন ধৈর্য্য ধরে মায়ের মত অন্য কেউ মামণির দায়িত্ব নিতে পারবে? তাদেরও তো সংসার বড় হয়েছে। মাধবীর চিন্তা হয় যে তাদের কর্তা গিন্নির দুজনের চোখ বুজলে এই অবুঝ মেয়েকে কতদিন কে দেখবে?
আজও মেয়েকে নিজের হাতে খাইয়ে দিতে হয় তাকে। মামনি টুকটাক খাওয়ার নিজে খেতে পারলেও ভাত রুটি নিজে খেতে গেলে সব ছড়িয়ে ফেলে। মামণি কিছু ছবির বইয়ের পাতা উল্টে দেখতে থাকে আর তার মা তাকে খাইয়ে দেন। এ সময় রোজ একবার হলেও মাধবী দেবী চোখ ছলছল করে আসে। এত বড় মেয়ের এই ছেলেমানুষী বড্ড দুশ্চিন্তায় রাখে তাকে।
পাশের বাড়ি সন্ধ্যা দেবীকে তার খুব ভালো লাগে। সমবয়সী উনারা। সত্যি সন্ধ্যার মতো যদি আমার কপালটা হতো। মেয়েটা আমার সুস্থ হলেই চাওয়ার আর কিছু ছিল না। সন্ধ্যার কি সুন্দর পরিবার ছেলে প্রতিষ্ঠিত বৌমা ঘর সামলায়। ফুটফুটে নাতি। সন্ধ্যার মেয়েরও সুন্দর বিয়ে হয়ে গেছে। তারও সুন্দর সংসার। সত্যি সন্ধ্যা কত সুখী।
পাশের ঘরে মাধবী দেবীর স্বামী অন্ধকার ঘরে মোবাইলে বহু পুরনো সব গান শুনতে থাকেন। ভেসে আসা সে গান 
“কী আশায় বাঁধি খেলাঘর বেদনার বালুচরে, নিয়তি আমার ভাগ্য লয়ে যে নিশিদিন খেলা করে, বেদনার বালুচরে….”

পঞ্চম দৃশ্য

রাত অনেক হলো। কনিকা, সন্ধ্যা, শিবানী, মাধবী সবাই যে যার বিছানায় শুয়ে পরেছে। ঘুম এখনো আসেনি কারোরই। চোখে তাদের সব দিনের মতই আজও অদৃষ্টের প্রতি সেই একই জিজ্ঞাসা। মরীচিকাময় ভালোলাগা অন্যের জীবনের প্রতি। সবারই একই বিশ্বাস যে নিজেদের না দেখতে পাওয়া, না উপলব্ধি করতে পারা সকল ভালোলাগার অনুভূতিগুলো অন্যেরা তাদের জীবনে অনায়াসেই রসাস্বাদন করে চলেছে । আজও সুখের চাবিকাঠি তাদের নিজেদের জীবনের কোন এক অজানা বাক্সে বন্দী করে রাখা আছে যেন। যার সন্ধান পেল না কেউ। আজ জীবনের সায়াহ্নে দাঁড়িয়েও সুখের সাথে তাই তাদের বনিবনা হলো না কারোরই। অধরা সেই সুখ কাঠির স্বপ্ন চোখে নিয়ে ঘুমিয়ে যায় সব আঁখি আবার এক নতুন ভোরের পথ চেয়ে।
আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে॥
তবু প্রাণ নিত্যধারা, হাসে সূর্য চন্দ্র তারা, বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে ॥
তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে, কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ-সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে ॥

(সমাপ্ত)

The following two tabs change content below.

Archana Pal

Latest posts by Archana Pal (see all)

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: