রোদ্দুরের আড়ালে অন্ধকার

অনুপম ব্রহ্ম

নিবারণ চক্রবর্তীকে মনে আছে?
আচ্ছা বিনয় মজুমদার? মলয় রায়চৌধুরী?

ইতিহাস সরলরেখায় চলে না | সভ্যতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে | ধ্যান-ধারণা তৈরি হয় | জ্ঞান-ট্যানের বিকাশ হয় | এই করতে করতে একটা চরম বিন্দু আসে | তারপর ক্ষয় শুরু হয় | মানবিকতার পতন | নীতি-নৈতিকতা হারিয়ে যেতে থাকে | দেশভাগ হল | দুর্ভিক্ষ | শরণার্থীর স্রোত | দন্ডকারণ্য | খাওয়ার নেই, বাচ্চা কাঁদছে, বিষ্ঠার গর্তের পাশে সঙ্গম | সে-সবের পাশেই নির্বিকার শহর দৌড়চ্ছে | চাকরির খোঁজে তোষামোদি চলছে, ব্যবসার প্রয়োজনে ঘুষ | অন্ধকারের খবর নিয়ে শংকরের চৌরঙ্গী বেরলো |

এই অবক্ষয় সম্পূর্ণ করতে বাংলা কবিতায় হাংরিয়ালিস্ট মুভমেন্ট | কবিতা হবে সর্বগ্রাসী | কবিতা হবে ধ্বংসের প্রতীক | প্রতিটা কবিতা অবক্ষয়কে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যাবে | সভ্যতাকে একটু একটু করে খেয়ে নেবে | এই কবিতা শালীনতার ধার ধারে না | সমাজ অশালীন হলে কবিতার কোনো দায় নেই শালীনতা বজায় রাখার |

মলয় রায়চৌধুরী, বিনয় মজুমদার এই হাংরিয়ালিস্ট কবি | এঁদেরই সৃজিত মুখার্জি বাইশে শ্রাবণে এনেছিলেন নিবারণ চক্রবর্তী করে |

কবিরা তবু শিক্ষিত | আর প্রথাগত শিক্ষা নেই যাদের? বস্তিতে থাকে, সকালে পায়খানা করা থেকে রাতে বিড়ি খাওয়া অবধি যাদের প্রতিটা কাজ,খুশি,শখ- সবকিছু ঝগড়া করে আদায় করতে হয়? সাউথ সিটির ঝাঁ-চকচকে চত্বর একটু এগোলেই লেক গার্ডেন্সের ভেতর যে বস্তি, সেখানকার মানুষগুলোর কেমন লাগে রোজ ভোগবাদের একটু করে ছ্যাঁকা খেতে?
এই সাব-অল্টার্নরা হল নবারুণ ভট্টাচার্যের ফ্যাতাড়ু | বড়লোকদের সব আমোদ-আহ্লাদের জিনিস এরা গুঁড়িয়ে দিতে চায় | নৈরাজ্য চায় | কারণ ধ্বংস না হলে নতুন আসবে না | হাংরি কবিরা কবিতায়, আর এরা কাজে- অবক্ষয়কে সম্পূর্ণ করতে চায় |

আমাদের এখনকার সমাজের দিকে তাকিয়ে দেখুন | রাজনৈতিক ন্যাংটামি, আমাদের ভন্ডামি-দ্বিচারিতা, সহ-নাগরিকের প্রতি সন্দেহ-বিদ্বেষ, নিয়ম-না-মানার প্রবণতা, নারী-ধর্ষণ, অন্যকে প্যাঁচে ফেলে কাজ আটকে রাখা – অন্ধকার আর অন্ধকার |

এই পর্যায়ে একজন কবি লিখলেন –

সমাজের এই হাল ;
অন্ধকার আজকের দিনে হারিয়ে গিয়েছে কাল |
তোমার আমার তরে-
রাখিয়াছে ঘরে ঘরে
রাষ্ট্রের পচা খাল |

সে খালে বহিছে রক্ত
তাই তুমি-আমি দেশভক্ত |

এই তোমার আমার দেশ
দেখো না, চলছে বেশ |
র‍্যাশনাল কথা বললে পরে –
তোমাকে দেশদ্রোহী বলে |
আরে, দেশটা কোথায় যে দ্রোহী হবে তুমি!

পতাকা নয় দেশ, তোমার সংবিধান নয় দেশ
দেশ তোমার আমার চেতনা |
দেশ থাকলে, এমন হত না |

দেশ থাকিলে তার থাকিত ভবিষ্যত,
ব্লগারের বুকে বহিত না এত রক্ত,
হইত না আজ গুজরাট |
এত গুন্ডায় ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাইত না তোমারে আমারে |

এত কাটা মাথা, এত শহীদ পড়িত না মাটিতে,
দেশ থাকিলে
সত্যই তুমি সে দেশের পরে বসিতে, খাইতে, হাঁটিতে |

এই কবির নাম রোদ্দুর রায় |

মূল কবিতা এটা নয় | আমি কিছু কিছু শব্দ বদলেছি | কারণ সেই শব্দগুলো তথাকথিত ইতর শব্দ | আমার লেখার সাহস নেই |

আমি এই ভদ্রলোকের উকিল নই | উনি যে খুব মহান কিছু করছেন তাও মনে করি না | উনি নিজের কবিতায় যা খুশি শব্দ ব্যবহার করতেই পারেন, সেটা রবীন্দ্রনাথের গানে করতে পারেন না- সে কথাও মানি |

কিন্তু সেই গান খেল কারা? আমরাই তো? এই সমাজই তো? কাকে দোষ দেবেন? রবীন্দ্রনাথের আদর্শে তো এখন বিশ্বভারতীই চলে না, সমাজের ক’টা মানুষ জানেন রবীন্দ্রনাথকে? এই ভুলে যাওয়াতে রবীন্দ্রনাথের যে অপমান, তার থেকে বেশি অপমান কি রোদ্দুর রায় করেছেন ওই গানটা ওভাবে গেয়ে?

ওই গাঁজা খাওয়া, নোংরা হয়ে থাকা, উস্কো-খুস্কো দাড়ি
– ওই যে মূর্তিটা – ওটাই আমরা- আমাদের সমাজ |

পরিবর্তন আমাদেরই হাতে |

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *