ব্যয় সংকোচের খুঁটিনাটি

নিলয় বরণ সোম

মিতব্যয়ী লোকের সংসারে দুর্নাম হয় না, গৃহিনী মিতব্যয়ী হলে তো সাক্ষাৎ লক্ষ্মী! তবে ট্যাক্সের জগতে যেমন ট্যাক্স প্ল্যানিং আর ট্যাক্স ইভেশন বলে দুটি কথা আছে, আর ট্যাক্স প্ল্যানিংকে চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে যাওয়া কর ফাঁকিরই নামান্তর ধরা হয়, তেমনি চূড়ান্ত মিতব্যয়ী লোক শেষ অব্দি কৃপণ আখ্যা পায়।

তা সে আপদ বালাইদের দিয়ে শুরু করি কেন, মধ্যবিত্ত শহুরে বাঙালীর ব্যয় সংকোচের দু’ চারটি চলতি পন্থা দিয়েই শুরু হোক। কিছুটা আলোচনাও।
গড় বাঙালী অনেক সাহসী হয়েছে। না, বঙ্গ ললনাদের সাহসী পোশাক বা স্ফীতোদর বাঙালী পুরুষের যেখানে সেখানে হাফ পেন্টুল পরে ঘুরে বেড়ানোর কথা বলছি না , যে সব রেস্তোরাঁয় ঢুকতে মধ্যবিত্তের গা ছম ছম করত, আজ অক্লেশে সেসব জায়গায় গড় বাঙালী উইকেন্ড ডিনার করতে ঢোকে, হরেক কার্ডের ভরসায় হলেই বা।তবে সদলবলে চর্ব -চোষ্য খেয়ে, ডেসার্ট মুহূর্তে, একাধিক কণ্ঠে শোনা যায় – চল, আইসক্রিমটা বাইরে গিয়ে খাই!এখানে ভীষণ দাম!

সুতরাং চার কি পাঁচ অংকের বিল চুকিয়ে, নিক্তি মতন বকশিশ রেখে, বাবু বিবিরা চললেন রেস্তোরাঁর বাইরে স্ট্র্যাটেজিক পজিশনে দাঁড়িয়ে থাকা আইসক্রিম ওয়ালার দিকে।

আবার ধরা যাক কেনাকাটার কথা। গড়িয়াহাট নিউ-মার্কেট, কালের নিয়মে, মধ্যবিত্ত -উচ্চবিত্তের পছন্দের তালিকা থেকে বিদায় নিয়েছে। এখন প্রথম পছন্দের তালিকায় মলৱাশি। কিন্তু সেই সার সার বিপণীর সামনে নামার আগে ড্রাইভারের প্রতি সতর্কবার্তা প্রায় অবশ্যম্ভাবী, ‘গাড়িটা বাইরে কোন গলিতে পার্কিং করে দিও’!
হাজার হাজার টাকার জিনিস কিনে, এমনকি ‘বাই টু গেট ওয়ানের চক্করে’ বাজেটের মুখে ছাই দিয়ে কর্তা -গিন্নী যুদ্ধজয়ের আনন্দে পকেট কাটা যাওয়ার বহরটা বুঝতে পারেন নি ঠিকই , কিন্তু এক দুশ টাকা পার্কিং ফি বাঁচিয়ে কোন অর্থ সাশ্রয় হয় কে জানে! অনেকে আবার পার্কিং জোনে গাড়ি রেখেও ফিস দিতে অস্বীকার করেন, রোয়াব দেখিয়ে বলেন, আমি অমুক অফিসের তমুক বাবু!

অনেক ভেবে দেখেছি , ব্যাপারটা আসলে হয়ত ‘ভ্যালু ফর মানি’-র ধারণা থেকে আসে। পছন্দের জামাকাপড় পরে বর – বৌ বা , গার্ল ফ্রেন্ড -বয় ফ্রেন্ডরা পরস্পর থেকে বাড়তি আদর পেতে পারে , রাস্তায় বেরোলে নজর কাড়তে পারে; ফেসবুকে ছবি দিলে হাজারো লাইক পেতে পারে ; কিন্তু পার্কিং ফি দিলে তো লবডঙ্কা! তা , কেন মিছে এত কোলাহল ?

কার্ড দেখিয়ে পার্কিং ফি না দেওয়ার মত আরেকটি প্রবণতা হল কোনো দর্শনীয় স্থানে টিকিট না কাটা। বেশ ক’টি জায়গায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নোটিশ টানিয়ে দিয়েছে, ” দয়া করে আপনার সরকারী বা আধা সরকারী অফিসের আইডেন্টিটি কার্ড দেখবেন না। ব্যয় সংকোচের এই পন্থা সমূহ অবশ্য আর মজার থাকে না, বিরক্তিকর হয়।

তবে পর্যটন ক্ষেত্রে সুবিধে নেওয়ার ব্যাপারটা বাঙালী বা ভারতীয়দের একচেটিয়া নয়। পৃথিবীর সর্বত্র , দেশের নাগরিক ও বিদেশীদের জন্য আলাদা প্রবেশ মূল্য নির্ধারিত থাকে, যে কোনো দর্শন ক্ষেত্রে। কিছুদিন আগে কর্ণাটকের হাম্পি দেখতে গিয়েছিলেন আমার এক প্রাক্তন বস। এক পাল চীনে নারী-পুরুষ দর্শনার্থীদের দলে ছিল। ভারতে রেসিডেন্ট পারমিট নিয়ে তারা বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত। টিকিট বাবুর সঙ্গে তারা ঝোলাঝুলি করছিল, তারা তো রেসিডেন্ট, তাহলে বিদেশী ট্যুরিস্টদের মত বেশি দর্শনমূল্য কেন দেবে ওরা !

এবার একটু পাঞ্জাবী পাড়ায় ঘুরে আসি । মধ্যবিত্ত বাঙালি অনেককাল হল এক সন্তান নিষ্ঠ হয়েছে -কিন্তু উত্তরে বা দক্ষিণেরঅন্যান্য প্রদেশে ,আজও, অনেক সন্তান না হলেও দুটি সন্তান প্রায় সব দম্পতিরই কাম্য । আমার এক বন্ধুর এক পিসিশাশুড়ি পাঞ্জাবী। উচ্চপদে চাকুরীরতা ভদ্রমহিলা একাধারে সুন্দরী ও রসিকা। নতুন জামাইকে কথাপ্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন- “তোমরা বাঙালীরা তো একের বেশী সন্তানে যাও না – কিন্তু দুটি সন্তান সবসময় ভাল-ওরা নিজের মত বেড়ে ওঠে। তবে আমরা পাঞ্জাবীরা অনেক হিসেবে নিকেশ করে নেই -দুটো বাচ্চার মধ্যে বছর দুয়েকের বেশি গ্যাপ রাখি না -!একজনের বই আরেকজনে পড়তে পারে।, দুটি ছেলে বা দুটি মেয়ে হলে একজন আরেকজনের পোশাকও পরতে পারে, খেলনার জন্যও আলাদা খরচ হয় না। আর একটি ছেলে একটি মেয়ে হলেই বা মন্দ কি, ছোট বয়সে শীতের জামা তো একরকম পরানোই যায়!

এরকম মস্তিকের কাছে বাঘা বাঘা পরিবার পরিকল্পনাবিদ মার খেয়ে যাবেন , সন্দেহ নেই!

এর পরের কথাটি ঠিক মজার কথা নয়। আই আই এম কলকাতার অধুনা অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ড: অনুপ কুমার সিনহা তাঁর অনেক বক্তৃতায় এটিকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন । ধরুন হঠাৎ বাজার অগ্নিমূল্য হয়েছে , অথবা অবসর নেওয়ার জন্য বা চাকরি চলে যাবার পর কোনো পরিবারে অর্থসংকট দেখা দিয়েছে। সে সময় ব্যয় সংকোচের পন্থা হিসেবে দৈনিক খবরের কাগজটিকে ছাঁটাই করা হয়। যুক্তি হিসেবে বলা হয়, খবর তো টিভিতেও শোনা যায়(সিরিয়াল লক্ষীর কল্যানে সে খবর কতটা সুগম, সেটা উহ্যই থাক, বাড়িওয়ালা , ভাড়াটে, পাশের ফ্ল্যাট থেকে ধার করে বা নিদেনপক্ষে পাড়ার চায়ের দোকানেও পড়া যায়। আসলে সহজ বিকল্প এবং অপব্যয়ের ধারণা -এর থেকে খবরের কাগজের উপর কোপ। এর পরবর্তী কোপ হয়ত ঠিকে ঝি , রাজনীতিসম্মতভাবে বলতে গেলে, সহায়িকার উপর। এর কারণটি সহজ, আমাদের দেশে বিশেষত গৃহবধূদের শ্রম সহজলভ্য ।

পুজোর সময়ে এক ছাঁটের জামাকাপড় বাড়ির বাচ্চাদের জন্য কেনা , ইস্ত্রি করার পরিবর্তে তোষকের নীচে জামাকাপড় রাখা , বিয়ের মরসুমে ধোপাখানা থেকে স্যুট ভাড়া করে নিয়ে পর , নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালীর জীবনে একসময় চালু ছিল – তবে সুখের কথা, সেরকম অর্থসংকট এখন লোকে সাধারণভাবে কাটিয়ে উঠেছে।
ব্যয় সংকোচের আরেকটি উপায় হল রিসাইক্লিং। বিয়ে ,জন্মদিন বা অন্য কোন অনুষ্ঠানে এক জাতীয় উপহার অনেক ক’টি পাওয়া যায় অনেকসময়। তাদের কয়েকটি সুড়ুৎ করে অন্য কোন অনুষ্ঠানবাড়িতে চালান করা যেতেই পারে। তবে বিয়ের উপহারটি আবার নিজের পঞ্চম বিয়ে বার্ষিকীতে ফেরত আসতেই পারে, সেটা মাথায় রাখতে হবে । শৌখিন টি শার্ট এই সেদিন অব্দি ঘর মোছার ন্যাকড়া হয়ে যেত , ‘মপ ‘ আসায় সেই চোটে ভাঁটা পড়েছে। কিন্তু গৃহলক্ষ্মীরা যে উপহারের রাংতার মোড়ক গুলো সযত্নে ভাঁজ করে রাখেন, সেটি একদম স্পেশ্যাল ব্যয় সংকোচ।

ব্যয় সংকোচের ফন্দিফিকিরের মধ্যে কয়েকটি ব্যাপার পুরুষদের নিজস্ব। সিগারেটের ‘কাউন্টার ‘কিংবা চায়ের ‘কাটিং’, বাঙালী পুরুষদের নিজেদের উদ্ভাবন।

প্রবাসী সমাজে ব্যয় সংকোচের নিজস্ব কিছু পদ্ধতি আছে। প্রবাসী সমাজ গুলো সাধারণত ছোট হয়- সুতরাং উপহার রিসাইক্লিং ওখানে নৈব নৈব চ। তবে জন্ম দিন, বিয়ে বার্ষিকী উদযাপন আর নৈশ পার্টি দেশের তুলনায় অনেক বেশি হয়-উপহার দেওয়ার মূহর্তও অনেক বেশি। অনেকে স্পেশাল ডিস্কাউন্ট চলাকালীন সম্বৎসরের উপহার হোলসেল কিনে রাখেন, সে ঘর সাজানোর জিনিস হোক, বা পোশাক আসাক। অনেকে ছুটি-ছাটায় দেশে এলে ডজন ডজন কলম কিনে নিয়ে যান- বিদেশী মুদ্রায় কলম কিনবেন না বলে। তবে আমার সন্দেহ হয়, এত জমানো কলমের কালি জমে না যায়- তাহলে, লিখতে লিখতে ‘লাভ’ হয়ে যাবার পরিবর্তে লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

প্রবাসীদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যাদের পরিবার দেশে থাকেন । এরকম একজন ফোর্সড ব্যাচেলারকে দেখেছি, বোধহয় ব্যয় সংকোচ ও আলস্য দুটির কারণেই, সর্বধর্মে মতির এক আশ্চর্য দৃষ্টান্ত রাখতে। মাসের চারটি রবিবার উনি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, হিন্দু মন্দির, গুরুদ্বার, স্বামী নারায়ণ মন্দির ও ইস্কনে প্রার্থনায় যোগ দিতেন, দু হাতে প্রণাম ঠেকিয়ে ডান হাতের ব্যাপারটিও সেরে নিতেন। ওঁর উদ্ভাবনী বুদ্ধির তারিফই করতাম, কিন্তু যখন দেখলাম লংকার কেজিতে এক থেবে (এক পয়সার সমতুল মুদ্রা) বাঁচানোর জন্য উনি কয়েক লিটার পেট্রল খরচ করে দূরবর্তী মলে ছোটাছুটি করছেন ও সে গল্পটি ফলাও করে বলছেন, তখন ভদ্রলোকের বুদ্ধির উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলাম।

খরচ বাঁচানোর একটি সহজ উপায় হচ্ছে গাড়ি ঘোড়ায় না উঠে হন্টন লাগান। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক সহপাঠী ছিল, সম্পন্ন মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে। তার মিতব্যয়িতা, মিতব্যয়ের সীমানা পেরিয়ে কার্পণ্যের জগতে ঢুকে পড়েছিল। বাড়ি থেকে ইউনিভার্সিটি, সেখান থেকে দূর দূর টিউশন বাড়ি যাতায়াত সে করত পায়ে হেঁটে । এর আগে কোনো মাড়োয়ারি ছেলেকে টিউশন করতে শুনিনি সেটা আলাদা, কাজটি সে ভালোই করত, কিন্তু মাইলের পর মাইল হাঁটার পেছনে তার একটিই যুক্তি ছিল, মানি সেভড ইজ মানি আর্নড।

ছেলেটির আবার দুটি যমজ বোন ছিল। এক সহপাঠিনী সেই কথা শুনে ‘হাউ সুইট’বলে উচ্চ্বাস প্রকাশ করতেই সে বলে, “ইসমে প্রব্লেম ভি হ্যায়!” সহপাঠিনী চোখ গোল গোল করতেই সে বলে, “খরচা ডাবল হো যাতা হ্যায়!”

যাতায়াতের খরচ বাঁচানোর ব্যাপারে একটা চালু রসিকতা এই সুযোগে বলে নেই । ইহুদীদের মিতব্যয়তা তথা কার্পণ্য জগৎ প্রসিদ্ধ। ওদের কোনও একটি শহরে বাস কোম্পানি লোকসানে চলছিল – কারণ লোক বাসে চড়েই না, হেঁটে হেঁটে অফিস আদালত সব যায়। কোম্পানির বিশেষ বৈঠক বসল , বাসভাড়া চার সেকেলকে অর্ধেক করে দুই সেকেল করে দেওয়া হল। মিটিং সেরে কর্তারা নাক ডেকে ঘুমোতে গেলেন – পরদিন থেকে কোম্পনি লাভের মুখ দেখবে।

কিন্তু ও হরি, ও জেসাস! পরদিন কোম্পানির কাউন্টারের টিকিটবাবুরা ঘেরাও মারমুখী জনতার হাতে। জনতা ক্ষিপ্ত, দু’ বছর ধরে ওরা কষ্ট করে চার চার আট সেকেল জমাচ্ছিল, সেটা অর্ধেক হয়ে যাবে!

তবে ব্যয় সংকোচের উদ্ভাবনী পন্থার কথা বলতে গেলে পরবর্তী কালে আলাপ হওয়া এক ভদ্রলোকের কথা বলতে হয় । ভদ্রলোক একটি আধা সরকারী সংস্থায় উচ্চপদে কর্মরত – ঠিক হাই থিংকিং এর জন্য না হলে, সিম্পল লিভিং এর জন্য তার খ্যাতি সুবিদিত। তবে খরচ বাঁচানোর জন্য মাঝে মাঝে ওঁর উদ্ভট খেয়াল চাপে, আবার এ নিয়ে ‘ম্য কঞ্জুস হুঁ ‘ বলে ঘোষণাও করেন জনসমক্ষে।

একবার বললেন, “এ সি মেশিন জিনিসটাই বেকার, শুধু শুধু ইলেকট্রিক বিল ওঠে -আমি তো এ সি উঠিয়ে বেডরুমে এক্সহস্ট ফ্যান লাগিয়ে দিয়েছি-একই রকম ঠান্ডা হয়!” আরেকবার আমাকে কথা প্রসঙ্গে বললেন , “জানো সোম ,ঘর সংসারের অনেক নতুন নতুন জিনিস বেরোচ্ছে – টিভির এডভার্টাইজমেন্ট দেখলেই জানতে পারা যায় । আমি মনে মনে ভাবছি, একী হইল আজ, জলেতে ভাসে শিলা! একটু থেমে তখনি বললেন , “আর এডভার্টাইজমেন্টগুলো যদি না দেখ, তোমার অনেক পয়সা বেঁচে যাবে!”

ওঁর অনেক কথাতেই মজা পেতাম এরকম । তবে ওঁর অফিসের দুই অধস্তন লীভ ট্রাভেলের দরখাস্ত করার পর ওদের যে লম্বা লেকচার দিয়েছিলেন , লীভ ট্রাভেলে তো শুধু প্লেন ভাড়া পাবে – বেড়ানর নাম করে হোটেলওলাকে বড়লোক করে তোমার কি লাভ , সেসব শুনে ওরা একদম মজা পায় নি,আমি নিশ্চিত।

ওর থেকে আরো অনেক কাঠি উপরে আমার এক রিটায়ার্ড সহকর্মী । অফিসার পদে কাজ না করলেও সরকারী চাকরিতে ওকে নিম্ন বেতনভুক কর্মচারী বলা যেত না – পরিবার ছোট ছিল , অন্যান্য দায়িত্ব আছে বলে শুনি নি কখনো। কিন্তু অফিসের ট্যুরে গেলে আলাউনসের টাকা বাঁচানোর জন্য ওর চেষ্টা একটু বেশি হয়ে যেত। আমরা যখন হোটেলে বসে মাছ ভাত কি মাংস রুটি সাঁটাতাম, ওকে দেখা যেত, এক গ্লাস জলে চিনি গুলে , তার মধ্যে রুটি ডুবিয়ে খেতে ! সহকর্মীরা পিছনে লাগলেও উনি বেশ নির্মোহ, নির্বিকার থাকতে পারতেন! তবে কৃপনদের সম্বন্ধে অনেক বাজে গল্পও রটে থাকে । গাড়ি ভাড়া না করে না করে উনি জামাইবাবুর হাসপাতালের এম্বুলেন্স ফোকটে নিয়ে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন , এ নেহাতই গালগল্প হবে ।

এবার সাহিত্য পরিক্রমা করে নেই । মহাকবি শেক্সপিয়ার সেই কোনকালে শাইলকের কথা লিখে গেছেন, সেই সুদখোর ইহুদী ঋণগ্রহীতার থেকে পাউন্ড অফ ফ্লেশ দাবি করতেও কুন্ঠিত হত না । কবিগুরুর ‘পুরাতন ভৃত্য’ কবিতায় আবার রয়েছে, ‘পতির পুণ্যে সতীর পুন্য, নহিলে খরচ বাড়ে!’

এককালে কৃপনদের নাম, হাঁড়ি ফাটার ভয়ে, পাড়াগাঁয়ে লোকে মুখে আনত না – তাদের সর্বজনীন নাম হত একাদশী । শরৎচন্দ্রের ‘একাদশী বৈরাগী’গল্পে, জনশ্রুতিতে, একাদশী একটি ‘পিচেশ ‘।

নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তার ‘একাদশীর রাঁচি যাত্রা’ গল্পে টেনিদার এক মহা কৃপণ পিসেমশায়ের গল্প করেছেন। ডাল আর ডাঁটা চচ্চড়ি খেয়ে খেয়ে বোর হয়ে গিয়ে পিসিমা এক নতুন পন্থা বেড়ে করেছিলেন । পিসেমশাই আদালতে চলে গেলেই উনি মাংস পোলাও রেঁধে খেতেন , বাড়ির চাকর বাকর, অতিথি সব শুদ্ধু । একদিন আদালত আগে ছুটি হওয়ায় পিসেমশাই বাড়ি ফিরে এসব কান্ড কারখানা ডেকে অবাক হয়ে যান। পিসি ভুজুং ভাজুং দিয়ে তাকে বুঝিয়ে দেন, খাবার গুলো মক্কেল দিয়েছে, গাছের ডাল পালা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার হয়েছে, বাড়তি কোনও খরচা হয় নি। খুশী হয়ে পিসেমশাই খেতে বসলেন ঠিকই , কিন্তু হঠাৎ তার মাথায় এল -, কিন্তু বাসন কোসন -সেগুলো তো নিজের- সেগুলো তো ব্যবহার হল ! সেই ভেবে বিলাপের আর অন্ত রইল না ,শেষ অব্দি ওর স্থান হয় রাঁচিতে।
তারাপদ রায়ের একাধিক গল্প আছে এমনি। এক কৃপনের বাড়িতে অতিথি এলে তার উপযুক্ত প্রশিক্ষন প্রাপ্ত ছেলে এক গ্লাস জল দিয়ে, একটি বাতাসা এঁকে দেখায় । অতিথি চলে গেলে কৃপণ অব্যয় ছেলের উপর চোটপাট করে- এত বড় বাতাসা আঁকলি কেন -পয়সা কি গাছে ফলে ?

এক ভদ্রলোক স্ত্রীর উপর অসন্তুষ্ট-তিনি সারাক্ষন নাকি কেবল টাকা চান- হাজার হাজার টাকা । শ্রোতা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, এত টাকা দিয়ে বৌদি করেন কী? ভদ্রলোক অম্লানবদনে বলেন, করবে কী করে, আমি কোনোদিন টাকা দিয়েছি নাকি !

শিব্রাম লিখে গেছেন কঞ্জুস কাকার গল্প । স্মৃতিতে যেটুকু আছে সেটা এরকম, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কাকার জ্ঞান ফেরাতে , বিনি তাকে শরবত পান করতে দেয় । জল মিষ্টি লাগছে কেন, এর উত্তরে বিনি যখন জানায় , জলে চিনি দিয়েছে , কঞ্জুষ কাকা জলে চি — করতে করতে পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হন ।

সকলের কথা বললাম । নিজের কথা বলি এবার। অনেক বন্ধু আমার লেখা নিয়ে একটা বই প্রকাশ করতে বলছেন। এখনো ঠিক করি নি, সে পথে হাঁটব কি না । তবে যদি বই বের করি, অন্নপ্রাশন জন্মদিন বিয়েবাড়ি যেখানেই নিমন্ত্রণ পাই না কেন , ঘরের কোনে স্তুপ করে রাখা বিক্রি না হওয়া বইগুলো ছাড়া কারুকে কিচ্ছু উপহার দেব না , এই বলে দিলাম। ব্যয় সংকোচের এর থেকে উৎকৃষ্ট পন্থা আছে?

পাদটিকা: সরকারী ও বেসরকারী স্তরে ব্যয়সংকোচ নিয়ে অনেক কথা উঠে আসে – ডাউন সাইজিঙ , রাইট সাইজিঙ ,অপারেশন ডেড উড, পিঙ্ক স্লিপ, বেনচিং , অটোমোশন , এ আই , বেকারি , etc etc । এই লঘু লেখাটিতে সেগুলো সযত্নে পরিহার করলাম।

(ফিচার ইমেজ pixabay থেকে নেওয়া)  

Nilay Baran Som

Nilay Baran Som

নিলয় বরণ সোমের জন্ম ১৯৬৫ সালে উত্তর পূর্ব ভারতের ত্রিপুরার সালেমায়I স্থায়ী বাসস্থান কলকাতায়I প্রাথমিক শিক্ষা পিতার কর্মস্থল ত্রিপুরার বিভিন্ন মফস্বলে,উচ্চতর শিক্ষা কলকাতার দীনবন্ধু এন্ড্রুজ কলেজ ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে I কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরI ভারত সরকারের আয়কর বিভাগে ১৯৯০সাল থেকে কর্মরতI জীবিকাসূত্রে কলকাতা ছাড়াও চেন্নাই ও ডেপুটেশন সার্ভিসে আফ্রিকার দক্ষিণে বতসোয়ানায় কাজ করেছেনI লেখালেখি ছাড়া পড়াশুনা , আড্ডা, গান শোনা ও ভ্রমণে আগ্রহী। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকও লেখকের পছন্দের জায়গাI শৈশবে লেখালেখি শুরু করলেও কলেজ জীবনে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে বঙ্গ সাহিত্য সমিতির সভানেত্রী , বাংলার অধ্যাপিকা প্রয়াত মৈত্রেয়ী সরকারের উৎসাহে ও অভিভাবকত্বে ছোট গল্প লেখা শুরু হয়। বর্তমানে মুক্তগদ্য ও রম্যরচনায় ব্যাপৃতI ছাত্রজীবন ও পরবর্তীকালে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও বিভাগীয় সাময়িকী ও প্রবাসকালে পূজা সংকলনে লেখকের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয়েছে 'কলেজ স্ট্রিট পত্রিকায়, ২০০১ সালেI দীর্ঘ বিরতির লেখালেখি ২০১৬-১৭ সালে শুরু I২০১৮ ও ২০১৯ এ অনুস্টুপ পত্রিকার শারদ সংকলনে লেখকের দুটি মুক্তগদ্য ও ২০১৯ সালে ফেসবুক গ্রূপ ' শনিবারের আসরের' ২০১৯ পূজা সংকলনে একটি রম্যারচনা প্রকাশ পায় I ওয়েবজিন 'সময়.ইন ' এর কয়েকটি সংখ্যায় লেখকের রম্য রচনা স্থান পেয়েছেI সৃজনাত্মক সাহিত্যের পাশাপাশি আয়কর আইন সংক্রান্ত বিষয়ে লেখক লেখালেখি করেন।২০১৩ সালে বিভাগের 'ট্যাক্সপেয়ার ইনফরমেশন সিরিজে' যুগ্মলেখক হিসেবে 'Royalty and Fees for Technical Services' শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ পায়I ২০১৯ সাল থেকে বিভাগীয় ওয়েবজিন 'ট্যাক্সলোগ'-এ লেখকের লেখা প্রকাশিত হয়েছেI

আপনার মতামত:-

%d bloggers like this: